শাল দুধ শিশুর জীবন বাঁচায়
ড.ফোরকান আলী
সুন্দরবন গ্রামের গৃহবধূ ফুলবানু (২৩)। বিয়ের তিন বছর পর সম্প্রতি তিনি যমজ (ঃরিহ) দু’টি ছেলে সন্তানের মা হয়েছেন। একসাথে ফুটফুটে চাঁদের মতো দু’টি পুত্র সন্তানের মা হয়েছেন। ফুলবানু ও তার স্বামী জমির মিয়া এবং শ্বশুর-শাশুড়ী খুব খুশী। মাতৃত্বের আনন্দে আত্মহারা ফুলবানু।
কিন্তু তাদের এই আনন্দ হঠাৎ থেমে গেল। নতুন অতিথির আগমনে ক’দিন আগে রতনপুর গ্রামের যে বাড়িতে ছিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাস, সেই বাড়ির লোকদের আনন্দ এখন ম্লান। কারণ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নবজাত শিশু দু’টিকে মায়ের বুকের প্রথম দুধ অর্থাৎ শালদুধ খেতে দেয়া হয়নি। জন্মের পর থেকে চারদিন পর্যন্ত তাদের শুধুমাত্র সাদা পানি, মিস্রির পানি এবং কখনও কখনও সামান্য মধু খাওয়ানো হয়। এমনিতেই যমজ শিশু দু’টির দেহের ওজন আড়াই কেজির কম এবং অপুষ্টিতে ভুগছে। এরপর তারা আবার জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ও পৃথিবীর সেরা পুষ্টিকর খাদ্য মায়ের বুকের দুধ খেতে পায় নি। এর ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধ মতা কমে গিয়ে শিশু দু’টি শারীরিকভাবে অসুস্থ ও ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ে। নবজাতক শিশু দু’টির শরীরের এ অবস্থা দেখে ফুলবানু ও তার স্বামী জমির মিয়া হতবাক হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
এ খবর শুনে এলাকার স্বাস্থ্যকর্মী, পাড়া পড়শি ও আত্মীয় স্বজন জমির মিয়ার বাড়িতে আসেন। তাদের পরামর্শে শিশু দুটিকে ত্বরিত শহরের এক শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ও নার্সের তত্ত্বাবধানে ফুলবানুর বুকের দুধ বের করে তা পরিষ্কার বাটিতে রেখে চামচ দিযে ধীরে ধীরে অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে অল্প অল্প করে শিশু দু’টিকে বার বার খাওয়ানো হয়। আর ফুলবানুকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে আর্সেনিক মুক্ত বিশুদ্ধ নিরাপদ পানি ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে ফুলবানুর পর্যাপ্ত পরিমাণে স্বাভাবিক দুধ আসতে শুরু হয়। দুধের পরিমাণ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পায় ও দুধের প্রবাহ সহজ হয়। হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্স বলেন, শিশু যতো বেশি মায়ের দুধ পান করবে, মায়ের স্তনে ততো বেশি দুধ তৈরি হবে। তাঁদের পরামর্শে এজন্য শিশু দু’টিকে দিন ও রাতে কমপে ১০/১২ বার মায়ের বুকের দুধ (উভয় স্তন থেকেই) খাওয়ানো হয়। অধিকন্তু হাসপাতালের একই বেডে শিশু ও মা ফুলবানুকে একসাথে রাখা হয়। রাতে মায়ের পাশে শুয়ে থাকাকালে শিশু দু’টির চাহিদা মতো মায়ের দুধ পান করেছে। এভাবে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে শিশু দু’টি ক্রমশঃ সুস্থ হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য প্রসূতি মা এখনও সুন্দরবন গ্রামের ফুলবানুর মতো অসচেতনতা, অজ্ঞতা, অশিা, কুসংস্কার বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে নবজাতক বুকের প্রথম দুধ অর্থাৎ শালদুধ খেতে না দিয়ে ফেলে দেন। এর ফলে শিশু তার জীবনের প্রথম ও অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য থেকে বঞ্চিত হয়। এতে নবজাতক শিশুর দেহে রোগ প্রতিরোধ মতা কমে যায় এবং তারা নানা প্রকার রোগব্যাধি ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়। এমনকি এজন্য অনেক শিশু অকালে মারাও যায়। আর যারা বেঁচে থাকে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক শিশুর মতো হয় না। এক তথ্যে জানা যায় যে, দু’মাস বয়সের শিশু যারা মায়ের বুকের শালদুধ খায় নি, তাদের মাঝে ডায়রিয়ার প্রকোপ মায়ের শালদুধ পানকারী শিশুদের চেয়ে দ্বিগুণ এবং ডায়রিয়াজনিত কারণে তাদের মৃত্যু পঁচিশগুণ বেশি। বস্তুতঃ শিশুর বেঁচে থাকা এবং সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের বুকের দুধই সর্বোৎকৃষ্ট পুষ্টিকর খাদ্য। তাই ভূমিষ্ট হওয়ার পর পরই নবজাতক শিশুকে মায়ের বুকের প্রথম দুধ অর্থাৎ শালদুধ খেতে দিতে হবে। কেননা, শালদুধ শিশুর জন্য খুবই পুষ্টিকর, নিরাপদ ও রোগ প্রতিরোধক। এ দুধে তুলনামূলকভাবে প্রোটিন, খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন ‘এ’র পরিমাণ স্বাভাবিক মায়ের দুধের চেয়ে অপোকৃত বেশি থাকে। অপরদিকে শালদুধে স্নেহ ও শর্করার পরিমাণ অপোকৃত কম থাকায় নবজাতক শিশুর জন্য তা সহজপাচ্য। শালদুধে শর্করা ল্যাকটোজরূপে থাকে, যা শিশুর মস্তিস্কের কোষের পূর্ণতার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট।
পুষ্টি উপাদান সরবরাহের পাশাপাশি শালদুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা রোগ প্রতিরোধকারী উপাদান। এসব উপাদান শিশুর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধ মতা অর্জনে সহায়তা করে। সুতরাং এ দুধ ফেলে না দিয়ে অবশ্যই শিশুকে খেতে দিতে হবে। জন্মের পর পর শালদুধ পান করালে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ মতা বাড়ে এবং একই সাথে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টিও লাভ করে। তাই শালদুধকে শিশুর জীবনের প্রথম টিকা বলা হয়। জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুকে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রা করা যায়। কারণ, শিশুর জন্য অত্যাবশ্যকীয় সব পুষ্টি উপাদান যেমন-প্রোটিন, শর্করা, ভিটামিন, স্নেহ পদার্থ, খনিজ লবণ ও পানি মায়ের দুধে সঠিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। তাই মায়ের দুধ খাওয়ালে শিশুরা স্বাস্থ্যবান হয় এবং দেহে রোগ প্রতিরোধ মতাও জন্মায়। যেসব শিশু বোতলে করে গরুর দুধ বা কৌটার গুঁড়ো দুধ খায়, তাদের তুলনায় যেসব শিশু মায়ের বুকের দুধ খায় তারা রোগব্যাধি ও অপুষ্টিতে ভোগে কম। শালদুধ তথা মায়ের বুকের দুধে পালিত শিশু সুস্থ-সবল ও মেধাবী হয়ে বেড়ে ওঠে। মোদ্দাকথা, জন্মের পর শিশুকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলার জন্য মায়ের বুকের দুধই হচ্ছে শিশুর আদর্শ পুষ্টিকর খাবার। এর কোন বিকল্প নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ শিশুদের পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধই উপযোগী খাবার বলে অনুমোদন করেছে। তাই জন্মের পর পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। এছাড়া নবজাতক শিশুকে সঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য প্রসূতি মাকেও সচেতন হতে হবে। ইউনিসেফ এর এক তথ্য মতে তৃতীয় বিশ্বের সব মা যদি তাদের শিশুদের সঠিক নিয়মে বুকের দুধ খাওয়ান তাহলে প্রতি বছর ১০ লাখেরও বেশি শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। প্রসূতি মায়ের নিজের স্বাস্থ্য রা এবং পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদনের জন্য প্রসূতি মাকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিসমৃদ্ধ বিভিন্ন ধরনের খাবার খেতে হবে। এছাড়া তার স্বাস্থ্য পরিচর্যার প্রতিও বিশেষ ল্য রাখা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলতে হয়, একটি সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান শিশুই জাতির ভবিষ্যৎ। পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য নিয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা তাদের জন্মগত অধিকার। কাজেই ফুলবানুর শিশু পুত্র দুটির মতো দেশের আর কোন নবজাতক শিশু যেন মায়ের বুকের শালদুধ ও বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়, সেজন্য ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই সকল শিশুকে মায়ের বুকের শালদুধ ও বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য আরও বেশি সচেষ্ট ও সচেতন হতে হবে। সর্বোপরি নারীদের যাবতীয় অবজ্ঞা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার ল্েয দেশে নারী শিা প্রসারে আরও বেশি কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। এ েেত্র সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সৃষ্টিতে মিডিয়া রাখতে পারে অনবদ্য ভূমিকা।
Tuesday, December 24, 2013
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
0 comments:
Post a Comment