শীতলÿ্যা মরে যাচ্ছে
আলী ফোরকান
শীতলÿ্যাও এখন বিষাক্ত বর্জ্যরে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। শিল্প বর্জ্য আর নর্দমার ময়লায় সয়লাব শীতলÿ্যা। দশ লাখের বেশী জনসংখ্যা অধ্যুষিত দুই তীরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা চলে এই নদীতেই। পানির সঙ্গে সেই ময়লা একাকার হয়ে পানি আর পানি থাকে না। কলকারখানার বর্জ্য আর মানুষের সৃষ্ট বর্জ্যরে ভয়াবহ দূষণে অত্যাধুনিক বিদেশী প্লান্টেও এ নদীর পানি বিশুদ্ধ করা যাচ্ছে না। বিশুদ্ধ করার পরও পানিতে দুর্গন্ধ থেকেই যায়।
এককালের স্রোতসীনি শীতলÿ্যাকে নারায়ণগঞ্জের প্রাণ বলে আখ্যায়িত করে জেলার মানুষ। শীতলÿ্যা বাঁচলে নারায়ণগঞ্জ বাঁচবে-এমন ধারণাও রয়েছে তাদের মধ্যে। কিন্তু ক্রমশ মরে যাচ্ছে শীলতÿ্যা। শীতলÿ্যার স্বচ্ছ সুপেয় পানি শিল্প কারখানার বর্জ্যে এখন বিষাক্ত। পানি দূষিত হয়ে লালচে রং ও পঁচে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদী পারাপারের সময় যাত্রীদের দম বন্ধ হয়ে আসে। পানির দুর্গন্ধে নদীর পাড়ে বাস করাও কষ্টকর। জনশ্রæতি রয়েছে, এককালে শীতলÿ্যার পানি দিয়ে দুই পাড়ের মানুষ রান্নার কাজে ব্যবহার করতো। বিদেশ থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজগুলো যাওয়ার সময় এ নদীর পানি নিয়ে যেত। এসব ঘটনা ৪০-৫০ বছর আগের কথা। আজ সেই ঐতিহ্যবাহী শীতলÿ্যার পাড় দিয়ে হাঁটতে হলে নাকে রুমাল ছাড়া আর কোন গতি থাকে না। শীতলÿ্যার দুই তীরে এখন গোসল করতে দেখা যায় না জনসাধারণকে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন শিল্প বর্জ্যরে কারণে দেশের দ্বিতীয় দূষিত নদী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। বিষাক্ত শিল্পবর্জ্যে শীতলÿ্যা এখন মুমূর্ষু প্রায়। নারায়ণগঞ্জ জেলার ৭ থানা এলাকার তিন শতাধিক ডাইং ফ্যাক্টরীগুলোর মধ্যে বৃহৎ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) বা বর্জ্য পরিশোধন প্রকল্প স্থাপন বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই ব্যয়বহুলের কারণে তা স্থাপন করা হয়নি। ফলে শিল্প কারখানার বর্জ্যে নষ্ট হয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলÿ্যা, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী নদীসহ জেলার বেশিরভাগ খাল-বিলের পানি। কেমিক্যাল আর বর্জ্যে নদীর পানি দূষিত হয়ে লালচে রং হয়ে গেছে।
সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার কলাগাছিয়া থেকে ময়মনসিংহ জেলার টোক-বর্মী এলাকা পর্যন্ত ৬৫ মাইল বি¯Íৃত শীতলÿ্যা নদী। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় এই নদী প্রবাহিত হয়ে মুন্সীগঞ্জের মেঘনায় মিলিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জ থেকে নরসিংদীর ঘোড়াশাল পর্যন্ত গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কল-কারখানা। এসব কারখানায় কাজই হয় মূলত কেমিক্যাল দিয়ে। তিন শতাধিক ডাইং শিল্পকারখানার বর্জ্যই ৮০ শতাংশ। এছাড়াও রয়েছে বোর্ড মিল, ডায়িং, অয়েল রিফাইনারি কারখানা, লেদার প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, পাল্প অ্যান্ড পেপার মিল। এই কারখানাগুলোতে বর্জ্যরে ড্রেনেজ সিষ্টেম রয়েছে সরাসরি শীতলÿ্যা, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গায়। ফলে সব কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই এসব নদীতে এসে পড়ে। তার সঙ্গে এই নদীতে পড়ছে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীর নাগরিক বর্জ্য। ঢাকা শহরের উত্তরাঞ্চলের সব কারখানা ও নাগরিক বর্জ্য বালু নদীতে পড়ে। সেখান থেকে স্রোতের টানে সোজা চলে আসে শীতলÿ্যায়। নারায়ণগঞ্জ ও এর আশপাশের শিল্প-কারখানা থেকে ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশছে। এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিন, নানা ধরনের এসি দ¯Íা, নিকেল, সিসা, ফসফোজিপসাম, ক্যাডমিয়াম, লোগা অ্যালকালি।
এদিকে নারায়ণগঞ্জে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন শাখা প্রতিষ্ঠান না থাকায় ইটিপি প্রকল্প তেমন একটা বা¯Íবায়িত হচ্ছে না। ঢাকার পরিবেশ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জের ফতুলøা শিল্পাঞ্চলের ২১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে মামলা করলেও সেগুলো ফাইলবন্দী হয়ে রয়েছে। শীতলÿ্যায় বিভিন্ন ধরনের নৌযানের পোড়া মবিল, পেট্রোল, তেল, নদীর আশপাশের এলাকার ময়লা বর্জ্য, স্যুয়ারেজ লাইন সংযুক্ত হওয়ায় দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। শীতলÿ্যা বাঁচাও এ আন্দোলন নিয়ে নারায়ণগঞ্জের হাতেগোনা দুই-একটি সংগঠন রয়েছে। রয়েছে নদীটি বাঁচাতে নারায়ণগঞ্জের পরিবেশবাদী সংগঠন নির্ভীক, রূপগঞ্জে মীর আব্দুল আলিম, জেজেডিসহ বিভিন্ন সংগঠন শীতলÿ্যা বাঁচাও এ আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে আসলেও তাদের কার্যক্রম খুবই সীমিত। এসব সংগঠন প্রায়শই নৌ শোভাযাত্রা, মানববন্ধন, গণসচেতনতামূলক লিফলেট-পোষ্টার-মাইকিং, গণস্বাÿর কর্মসূচীসহ নানা কর্মকাণ্ড করলেও কার্যত কোন ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এ ব্যাপারে নির্ভীকের প্রধান সমন্বয়কারী এটিএম কামাল জানান, শীতলÿ্যা বাচাঁতে শুধু দখল বাণিজ্য বন্ধ করলেই চলবে না, এই নদীর পানিও দূষণমুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সকলের ঐক্যবদ্ধ সচেতনমূলক কাজ করা। সরকারকেও এ বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানান তিনি।
0 comments:
Post a Comment