Monday, March 12, 2018

বাংলাদেশে উচ্চশিÿা পরিস্থিতি

 বাংলাদেশে উচ্চশিÿা পরিস্থিতি
আলী ফোরকান
পরিবর্তিত পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বাংলাদেশে উচ্চশিÿা ÿেত্রে প্রবর্তিত হয়েছে সেমিস্টার পদ্ধতির শিÿাব্যবস্থা। পরীÿার ফল নির্ধারণেরও সনাতন পদ্ধতি পরিত্যাগ করে নেয়া হয়েছে গ্রেডিং পদ্ধতি। এখনো কিছু কিছু ÿেত্রে সনাতন পদ্ধতি চালু থাকলেও, অদূর ভবিষ্যতে যে সর্বত্র নতুন পদ্ধতি চালু হবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। যে-কোনো পদ্ধতিরই ভালো-মন্দ দু’টো দিকই থাকে। এÿেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। বহির্বিশ্বে গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশিত হয়। তাই এ ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প ছিল না আমাদের। কিন্তু সেমিস্টার পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণের সুযোগ আছে।

সন্দেহ নেই, সেমিস্টার পদ্ধতিতে উচ্চশিÿা গ্রহণ এখন বিশ্বপ্রবণতা। কিন্তু আমাদের দেশে এ পদ্ধতির সুফল নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর নানামাত্রিক নেতিবাচক কর্মসূচি সেমিস্টার পদ্ধতির কার্যকরিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শ্রেণীকÿ, পাঠ্যপু¯Íক এবং পাঠদান পদ্ধতিÐ কোনো কিছুই আমাদের দেশে সেমিস্টার উপযোগী বলে মনে হয় না। সেমিস্টার পদ্ধতিতে শ্রেণী-শিÿকই সর্বেসর্বা। তিনিই পাঠদান করেন, প্রশ্ন করেন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন। প্রশ্নপত্র সমন্বয়ের কোনো বালাই নেই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে, অধিকাংশ ÿেত্রেই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন কেবল শ্রেণীশিÿক। শিÿক যা পড়াননি, তা যে পরীÿার প্রশ্নপত্রে দেবেন না, তা লেখাই বাহুল্য। দ্বিতীয় পর্যায়ের শিÿার্থীদের ফল আশানুরূপ না হলে শ্রেণী-শিÿকের দÿতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে; অতএব, উত্তরপত্র মূল্যায়নে এক ধরনের পূর্ব-সিদ্ধান্ত কাজ করে বলে আমার মনে হয়। সামগ্রিক এই ব্যবস্থায় শিÿকের সততার ওপরই আমাদের নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ওই সততার জায়গাটা যে ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে আসছেÐ একথা কে অস্বীকার করবে?
কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার পদ্ধতির নামে প্রচলিত হয়েছে জগাখিচুড়ি পদ্ধতি। সেখানে প্রশ্নপত্র সমন্বয়ের ব্যবস্থা আছে, উত্তরপত্র দু’জনকে দিয়ে মূল্যায়নের বিধান আছে, এমনকি মান-উন্নয়ন পরীÿারও বিধান আছে। সেমিস্টার পদ্ধতির পরীÿার সঙ্গে মান-উন্নয়ন পরীÿা বেমানান। অথচ সেটাই চালু করা হয়েছে। মান-উন্নয়ন পদ্ধতি চালু থাকলে পরীÿার ফল প্রকাশ বিলম্বিত হবে, দেখা দেবে বহুমাত্রিক জটিলতা, ব্যাহত হবে এই পদ্ধতি প্রবর্তনের মৌল উদ্দেশ্য।
পূর্বেই ব্যক্ত হয়েছে যে, সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিÿকই সর্বেসর্বা। তিনি যেটুকু পড়াবেন, তার মধ্য দিয়েই প্রশ্ন করবেনÐ এটাই স্বাভাবিক। ফলে প্রশ্ন সম্পর্কে শিÿার্থী অনেকটা নিশ্চিত থাকতে পারে। এর ফলে জ্ঞানার্জনের পথে একটা ভাসা-ভাসা অবস্থা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে হয়। সনাতন পদ্ধতিতে ক্লাসে পাঠদানকারী শিÿক, প্রশ্নকর্তা, উত্তরপত্র পরীÿকÐ ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি হতেন। ফলে শিÿার্থীর পÿে কোনো পূর্ব-ধারণায় উপনীত হওয়া ছিল দুরূহ। তাই তাকে জানতে হতো অনেক কিছু, পড়তে হতো ব্যাপকভাবে। এÿেত্রে ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে জ্ঞানের শূন্যতা। সেমিস্টার পদ্ধতি আমাদের দেশে ক্রমশ হয়ে উঠছে পরীÿা গ্রহণ ও ফল-প্রকাশের পদ্ধতি। কী পড়ানো হলো, শিÿার্থী কী পড়লোÐ এসবের পরিবর্তে যেন-তেনভাবে পরীÿা নেয়াটাই এ পদ্ধতির প্রধান প্রবণতা হয়ে উঠছে আমাদের দেশে। এই প্রবণতাই শঙ্কার কারণ হয়ে উঠছে ক্রমশ।

জাতি গঠনে শিÿার গুরুত্ব সর্বজনস্বীকৃত। শিÿার মূল কাজ শিÿার্থীর চেতনায় জ্ঞান সৃষ্টি করা। জ্ঞান সৃষ্টি যদি না-ই হলো, তাহলে তো ব্যর্থ হলো শিÿার মূল উদ্দেশ্য। এ সত্য আজ স্বীকৃত যে, কোনো দেশের উচ্চশিÿার হাল-চাল সে দেশের উন্নতি-অবনতির সবচেয়ে বড় সূচক। মনে করতে পারি পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর এই উক্তিÐ ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু যথারীতি সুষ্ঠু হলে জাতির সব কিছু সুষ্ঠু হয়।’ লেখাই বাহুল্য যে, উচ্চশিÿার ÿেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা এখন মোটেই সুষ্ঠু নয়। সর্বত্রই চলছে একটা জগাখিচুড়ি, একটা দায়সারা ভাব।
উচ্চশিÿা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দু’টি বিষয় খুবই জরুরি। বিষয় দু’টো হচ্ছেÐ স্বায়ত্তশাসন (অঁঃড়হড়সু) এবং জবাবদিহি (অপপড়ঁহঃধনরষরঃু)। এই দুটো ÿেত্রেই আমাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। স্বশাসন এবং জবাবদিহির অভাব আমাদের উচ্চশিÿা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নটি কঠিনভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বশাসনের নামে যাতে স্বেচ্ছাচারের চর্চা না করে সেদিকেও দৃষ্টিপাত জরুরি। শিÿাকে পণ্য বানানোর ফলে তার মূল উদ্দেশ্যই আজ ব্যাহত। সেÿেত্রে অবশ্যই রাষ্ট্রের একটা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তাই যথার্থ জ্ঞানার্জনের পথ সৃষ্টি করতে হলে উচ্চশিÿা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এজন্য সময়ÿেপণেরও আর সময় নেই। অধিকাংশ শিÿার্থীই উচ্চশিÿা গ্রহণ করেন সরকারি-বেসরকারি কলেজে। কলেজগুলোও বিবিধ সমস্যায় জর্জরিত। সেদিকেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

0 comments:

Post a Comment