Monday, March 12, 2018

শিÿা ভবনে শিÿক হয়রানি


শিÿা ভবনে শিÿক হয়রানি
আলী ফোরকান
‘শিÿকদের জীবনে সবচেয়ে অপমানজনক ও ভোগান্তিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় এই ভবনটিতে এসে। মানুষ গড়ার কারিগর যাদের বলা হয় সেই শিÿকদের এখানে বিভিন্ন প্রয়োজনে এসে ঘুরতে হয় তাদেরই এক সময়কার ছাত্র এখানকার বিভিন্ন কর্মকর্তার দরজার সামনে। শিÿকরা দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হন ভবনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণীর পিয়ন পর্যন্ত সবার কাছে’Ðশিÿাভবনের ভেতরে জাম গাছতলার বাঁধানো বেদীতে বসে দীর্ঘ ৩২ বছরের শিÿকতা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে শিÿাভবন সম্পর্কে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার একটি মাধ্যমিক স্কুল শিÿক সায়েদুল করিম।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ছুটে আসা নিরীহ শিÿকদের হয়রানি, নানা টালবাহানা করে অর্থ আদায়ের চালচিত্র এখনও বদলায়নি শিÿাভবনে । প্রতিনিয়ত হয়রানির মাত্রা বাড়ছে। বদলাচ্ছে ঘুষ আদায়ের কৌশল। কর্মকর্তার ড্রাইভার থেকে শুরু করে শিÿাভবনের অধিকাংশ কর্মচারী শিÿক হয়রানির সাথে জড়িত। নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলের প্রবীণ শিÿক আব্দুর রহিম তার এমপিওর কাগজ সংগ্রহের জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুরছেন এই ভবনে। নিয়মানুযায়ী এই কাগজটি সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন ২/১ দিন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ঘুরে এখনও বয়সের ভারে ন্যূব্জ এই শিÿক জানেন না তার কাগজটা আদৌ তিনি পাবেন কিনা। তিনি বলেন, প্রথম ২ দিন এসে আমি এই ভবনে ঢুকতেই পারিনি। এরপর এখানে এসে খোঁজ নিয়ে জানলাম ২নং ভবন থেকে এ ধরনের কাগজ দেয়া হয়। কিন্তু এই ভবনের যে কÿেই যাই সেখান থেকেই তাড়িয়ে দেয় পিয়নরা। এভাবে এক রুম থেকে আরেক রুমে ঘুরতে চলে যায় আরও এক সপ্তাহ। এরপর আরও কিছুদিন ঘোরাঘুরির পর এক পিয়ন আমাকে নির্দিষ্ট একটি অংকের টাকার বিনিময়ে কাগজটি সংগ্রহ করে দিতে রাজি হয়। সেই লোক টাকা নিয়ে এখন আবার ঘোরাচ্ছে। কাগজটি আমার প্রয়োজনীয় হওয়ায় ২/১ দিন পরপরই ঐ লোকের কাছে আসি। 
ময়মনসিংহের নান্দাইল থেকে আসা একটি কারিগরি বিদ্যালয়ের শিÿক নাজমুল হুদা তার বিদেশ যাওয়া সংক্রান্ত একটি কাগজের জন্য গত এক সপ্তাহ ধরে শিÿাভবনে ঘুরছেন। ঢাকায় কোন থাকার জায়গা না থাকায় পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। তিনি বললেন, আমার কাগজটি বের করার জন্য প্রয়োজন দুই-একদিন। কিন্তু একেবারে অহেতুকভাবে আমাকে এই চার-পাঁচদিন ধরে ঘোরানো হচ্ছে এই ভবন থেকে ঐ ভবনে। এদিকে যেহেতু এই কাগজটির সাথে আমার বিদেশ যাওয়া জড়িত তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তুলতে না পারলে অনেক বড় ÿতি হয়ে যাবে। ভবনের কর্মকর্তাদের অনেক অনুরোধ করেও এই বিষয়টি বোঝাতে পারছি না।

রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিÿা অধিদপ্তরের ভবনটিই শিÿাভবন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩০ হাজারের বেশি শিÿা প্রতিষ্ঠানের শিÿক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সকল এমপিও, টাইমস্কেল, পদোন্নতি, বদলি, পেনশনসহ সার্বিক কাজ এই ভবন থেকে পরিচালিত হয়। যার কারণে প্রতিদিন কয়েক হাজার ফাইল আদান-প্রদান হয় এখান থেকে। শিÿকরা তার প্রয়োজনীয় কাজের জন্য তাকিয়ে থাকেন এই ভবনটির দিকে। শিÿক-কর্মচারীদের আশা-আকাঙÿার এই ভবনটি নিয়ে রয়েছে শিÿকদের নানা অভিযোগ। যৌক্তিক দাবি আদায়ের ÿেত্রেও হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। দিতে হয় ঘুষ। বছরের পর বছর ধরে এমন অভিযোগ এই ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু শিÿক হয়রানি কমেনি।
শিÿাভবন এলাকায় প্রতিদিন ঘোরাফেরা করে এক শ্রেণীর দালাল। এরা কেউ ড্রাইভার, কেউ পিয়ন বা সুইপার। এছাড়া বাইরের কিছু লোকও নিয়মিত ঘোরাফেরা করে। এদের সাথে সখ্যতা রয়েছে শিÿা ভবনের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের। এরাই কৌশলে শিÿকদের বিভিন্ন কাজ করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে টাকা আদায় করে।

শিÿকরা বলেন, যেখানে এসে শিÿকরা সমাধান চাইবেন সেখানে এসেই শিÿকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যে কোন কাজের জন্য তাদের ঘুষ দিতে হচ্ছে। প্রতিদিনই শিÿাভবনের সামনে আসেন কয়েকশ’ শিÿক। জেলা অফিসের মাধ্যমে পাঠানোর কাজের কোন সমাধান না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়েই শিÿা অধিদপ্তরে ছুটে আসেন। এসে প্রথমে শিÿাভবনের বাইরে বসে থাকেন। দুইটার পূর্বে ভেতরে প্রবেশ নিষেধ এমন সাইনবোর্ড দেখিয়ে কর্তব্যরত আনসার ভেতরে বসতে বাধা দেয়। আবার আনসারের হাতে ২০-৩০ টাকা গুঁজে দিতে পারলেই অনায়াসেই ভেতরে প্রবেশের সুযোগ মেলে।
প্রতিদিনই মাধ্যমিক ¯Íরের শিÿকরা ভিড় করেন উপ-পরিচালক সিরাজুম মুনিরার কÿের সামনে। এর কারণ হিসাবে রফিকুল ইসলাম নামের শিÿক বলেন, কাজ করানোর জন্য টাকা দিয়েছি কিন্তু কাজ হয়নি। কাজ কোন্ পর্যায়ে রয়েছে তা জানতে এখানে এসেছি। এ বিষয়ে সিরাজুম মুনিরা বলেন, অনেকে কোথাও টাকা দিয়ে এখানে আসে। এখানে এসে টাকা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। কিন্তু কোন্ ব্যক্তির কাছে টাকা দিয়েছে তার নাম বলতে চান না বা তাকে না জেনেই টাকা দিয়েছেন। শুধু টাকা নয়, এর বাইরেও শিÿকরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। 
শিÿাভবনের নিচে সিটেজেন চার্টারে কোন কাজ করতে শিÿকদের কতদিন লাগবে তার একটি সময়সূচি টানানো আছে। টাইমস্কেল-এমপিও সংশোধন, উচ্চতর স্কেল সংক্রান্ত কাজ দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে-এমন উলেøখ থাকলেও বা¯Íবে এক বছরেও পারছে না শিÿা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

একজন শিÿক তার টাইম স্কেল বা এমপিওর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও কোন কাজ হয় না। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছে সংশিøষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারি। তার কাছে পুনরায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়। এভাবে কাগজ অযতœ-অবহেলায় রেখে এবং তা হারিয়ে শিÿকদের হয়রানি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজ ও মাধ্যমিক শাখায় শিÿকরা ঘোরাফেরা করেন এবং একরকম প্রকাশ্যে ঘুষ দেন। সংশিøষ্ট কর্মকর্তা এগুলো জানলেও এ বিষয়গুলো আমলে নেন না। শিÿকরা অভিযোগ করছেন, কর্মকর্তারাও ঘুষের বিনিময়ে কাজ করেন।
সিরাজুম মুনিরা বলেন, প্রতিদিন আমাকে দুই হাজার ফাইলে স্বাÿর করতে হয়। তিনি শিÿক হয়রানির জন্য জনবল কম থাকার বিষয়টি উলেøখ করেন।
শিÿা অধিদপ্তর 
মহাপরিচালক ছাড়াই জোড়াতালি দিয়ে চলছে ৩০ হাজার শিÿা প্রতিষ্ঠান তদারকির প্রধান এই প্রতিষ্ঠানটি। কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালককে মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একই সাথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন দায়িত্ব পালন করায় অধিদপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্র¯Í হচ্ছে। ভেঙে পড়তে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিÿা ব্যবস্থা। গত বছরের আগস্ট মাসে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে অধিদপ্তরে মহাপরিচালক অধ্যাপক কে এম আওরঙ্গজেব চাকরি থেকে অবসর নেন। সরকার মহাপরিচালক পদে কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক খান হাবিবুর রহমানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়। পরে মহাপরিচালক পদের জন্য সিনিয়র অধ্যাপকদের দিয়ে ১১ জনের তালিকা তৈরি করা হয়। এদের তিনবার মৌখিক পরীÿা নেয়া হলেও কাউকেই নিয়োগ করা হয়নি। পরে খান হাবিবুর রহমানকে জাতীয় শিÿাক্রম ও পাঠ্যপু¯Íক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান করে পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) পদে নিয়োগ দেয়া হয় ড. লিয়াকত আলী খানকে এবং পরে অধ্যাপক নোমানুর রশীদকে। কিন্তু মহাপরিচালক পদে কাউকে নিয়োগ না দিয়ে তাকেই মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। 
মাধ্যমিকের ২৬ হাজার শিÿা 
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার 
জন্য ৪৩ কর্মকর্তা 
মাধ্যমিক ও উচ্চশিÿা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখা চলছে মাত্র ৪৩ জন কর্মকতা দিয়ে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপ-পরিচালকের ৯টি পদই শূন্য। ফলে শিÿা প্রশাসনের কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিÿা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখা। যে কাজ একদিনে করা সম্ভব তা করতে লাগছে ১০ দিন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সাড়ে ২৬ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের ৮৫৩টি পদের মধ্যে ৬১৫টি পদই শূন্য। এছাড়া সহকারী পরিচালকের ২টি পদের মধ্যে দুইটিই, বিদ্যালয় পরিদর্শকের ৮টি পদের মধ্যে ৬টি, বিদ্যালয় পরিদর্শিকার ৮টির মধ্যে ৩টি এবং সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের সবই শূন্য। বিদ্যালয় পরিদর্শক দিয়ে চলছে উপ-পরিচালকের দাপ্তরিক কাজ, প্রধান শিÿক দিয়ে সহকারী পরিচালকের কাজ। ফলে প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এছাড়া দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩১৭টি প্রধান শিÿক পদের মধ্যে ২৩৫টি পদই শূন্য। 

0 comments:

Post a Comment