ভাবনা : শিÿা ব্যবস্থার পুনর্গঠন
আলী পোরকান
শিÿা এবং উন্নয়ন পরস্পর সম্পৃক্ত। উন্নতমানের শিÿা ছাড়া আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হতে পারে না। সাম্প্রতিককালে এশীয় দেশসমূহে বিশেষ করে জাপান, চীন, দÿিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশে যে বিপুল আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে তার কারণ, ঐসব দেশে শিÿাকে প্রকৃত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে গুণগত শিÿার বিপুল প্রসার ঘটানো হয়েছে। তার ফলে ঐসব দেশে যে নতুন জনশক্তি গড়ে উঠেছে তারা উদ্যমী, উদ্ভাবনাময়, দেশপ্রেমিক ও সৃজনশীলতার অধিকারী। এই নতুন প্রজন্মের শিÿার্থীরা জাতীয়তাবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে বিজ্ঞান মনস্কতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে। এরা যুক্তিবাদী, আধুনিক, গঠনমূলক চিন্তার অধিকারী এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তার ধারক হয়েও আন্তর্জাতিক চিন্তা-চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ রকম একটি দÿ ও নতুন চিন্তা-চেতনার অধিকারী জনশক্তি গড়ে ওঠার ফলে ওই দেশ আর্থ-সামাজিক ÿেত্রে বিপুল অগ্রগতি সাধন করতে পেরেছে। এ জন্যই এইসব দেশকে ‘এমার্জিং টাইগার’ হিসেবে আখ্যাত করা হয়েছে। পাশ্চাত্যের ভাষ্যকারেরা ওই দেশগুলোর বিপুল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক জাগরণ সম্পর্কে অবহিত হয়ে একবিংশ শতাব্দীকে ‘এশীয় শতাব্দী’ হিসেবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে।
এশিয়ার ওইসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশ যে অনেক পিছিয়ে আছে আমরা সকলেই তা জানি। শুধু ওই দেশগুলো নয়, দÿিণ এশীয় প্রতিবেশী কোন কোন দেশের চেয়েও আমরা পিছিয়ে। ভারত, শ্রীলংকা এমনকি নেপালও শিÿা ÿেত্রে আমাদের চাইতে অনেক ইতিবাচকভাবে অগ্রগতি লাভ করছে। গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে না পড়লে শ্রীলংকার শিÿাগত অগ্রগতি হতে পারতো বিস্ময়কর। এখনো সে দেশের শিÿার হার ৯৫ ভাগেরও উপরে। ভারতও নতুন প্রযুক্তিগত শিÿিতের হারে বিশ্বমান অর্জন করেছে। এবং বিশ্বের নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থাৎ আই,টি নির্ভর শ্রমশক্তির ÿেত্রে বিশ্বে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে নিয়েছে। আর এ ÿেত্রে তারা বিশ্বের সর্বোন্নত দেশেও জনশক্তি রপ্তানি করতে পারছে। অথচ এইসব ÿেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। আমাদের দেশ শিÿা নিয়ে যে চিন্তা-ভাবনা না করে এমন নয়, শিÿা কমিশনও গঠিত হয় বার বারই। কিন্তু, শিÿা ÿেত্রে কাঙিÿত গুণগত মান অর্জিত হয় না। কিন্তু, কেন হয় না? আমরা মনে করি আমাদের শিÿা ব্যবস্থা ও শিÿার পরিকল্পনা ত্রæটিপূর্ণ। প্রথম কথা হলো আমাদের দেশে প্রাথমিক শিÿার উপযুক্ত ভিত্তি নির্মিত হয়নি। নিবেদিতপ্রাণ শিÿক নেই, মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই, স্থানীয় শিÿানুরাগী ও স্থানীয় সমাজের নীতি-নির্ধারণগত অংশগ্রহণ নেই। ফলে প্রাথমিক শিÿার বেহালদশা। অথচ শিÿা ÿেত্রে সত্যিকার উন্নতি ঘটাতে চাইলে গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ওপর সরকার এবং সমাজের নজরদারি বাড়াতে হবে। গ্রামাঞ্চলের মাধ্যমিক স্কুলগুলোর দুর্দশাগ্র¯Í এবং দলীয় রাজনীতির প্রভাবে এবং ভাল শিÿকের অভাবে বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা শহরের নামী-দামী স্কুলগুলোর ছেলে-মেয়েরা যখন মাধ্যমিক পরীÿার ফল বেরোবার পর জি.পি.এ-৫ পাবার উলøাসে উচ্ছল হয়ে ওঠে তখন গ্রাম-বাংলার শত সহস্র স্কুলের পরীÿার্থীরা নিম্নমানের ফলাফলের গøানিতে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে। ঢাকায়, চট্টগ্রাম শহরে নয় গ্রামের স্কুলসমূহে শত-সহস্র কণ্ঠে যখন লÿ লÿ ছাত্র-ছাত্রী জিপিএ-৫ পাবার আনন্দে উলøাস ধ্বনি করে উঠবে তখনই না আমরা বলতে পারবো সারাদেশে শিÿা ÿেত্রে এক প্রকৃত জাগরণ ঘটে গেছে। নতুন সরকার দিন বদলের ঘোষণা দিয়ে জনগণের বিপুল ভোটে ÿমতাসীন হয়েছে। এখন তারা তাদের অঙ্গীকারকে বা¯Íবায়িত করতে চাইলে রাজনৈতিক দলাদলির চাপে বেপথু এই বিদ্যালয়গুলোতে যদি তরুণ শিÿার্থীদের জানার কৌত‚হল বিজ্ঞান-বুদ্ধি বিবেচনা শক্তি ও যুক্তিবাদকে জাগ্রত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন তখনই হতে পারে শিÿা ÿেত্রে এক নীরব বিপ্লব। এই ধারায় না এগিয়ে বিগত সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার লÿ্যে বিদেশি অর্থে বা দেশীয় রাজনীতির আধিপত্যে অপরিকল্পিতভাবে শত সহস্র মাদ্রাসা গড়ে তুলেছে। এতে লাভ না হয়ে ÿতিই হয়েছে বেশি। মাদ্রাসা অবশ্যই থাকবে কিন্তু সে মাদ্রাসা হবে আলøামা ওবায়দুলøাহ্ আল ওবেদী সোহরাওয়ার্দীর পরিচালিত মাদ্রাসার মতো। অথবা মওলানা মনিরুজ্জামান এসলামীবাদী পরিকল্পিত মাদ্রাসার মতো- যে মাদ্রাসার ছাত্ররা হবে ধর্মগ্রন্থর গভীরতর ব্যাখ্যা-বিশেøষণে অনুরক্ত, ইতিহাস, ভ‚গোল, বিজ্ঞান ও দেশপ্রেমিকতার শিÿায় শিÿিত। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু এইরকম মাদ্রাসা শিÿাই চেয়েছিলেন এবং ইসলামী শাস্ত্রে আন্তর্জাতিকমানের গবেষণার জন্য ইসলামী ফাউন্ডেশন গঠন করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সেই প্রতিষ্ঠানকে হীন রাজনৈতিক লÿ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ শোনা যায়।
আমাদের দেশে আর্থিক ÿমতাসম্পন্ন একটি বড় আকারের মধ্যবিত্ত সমাজের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের সন্তানদের শিÿার প্রয়োজনে বহু স্কুল-কলেজ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। সরকারের পÿে গোটা শিÿা ব্যবস্থা পরিচালনা সম্ভব নয় বলে ব্যক্তিখাতে শিÿা ব্যবস্থার আয়োজন না করে উপায় নেই। কিন্তু বর্তমানে যেসব প্রাইভেট স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে তার অধিকাংশই অপরিকল্পিত। ফলে ঐসব শিÿা প্রতিষ্ঠানে গুণগতমানের শিÿার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু জনগণ শিÿা লাভের প্রচন্ড আকাঙÿায় ঐসব শিÿা প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানদের পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। জনগণের এই অবস্থা লÿ্য করে কিছু অসৎ ব্যক্তি শিÿার নামে যেনতেনভাবে শিÿা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ছাত্রদের হাতে শিÿা সমাপনান্তে একখানা সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিচ্ছে। একে শিÿা না বলে শুধুই সার্টিফিকেট বিক্রির কারখানাই বলা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্ট অনেক বড়। সেখানে বিশ্বের বহু বিদ্যা শাখার একত্র সমাবেশ থাকতে হবে। তবেই না তা বিশ্ববিদ্যালয়। এবং এত বিদ্যা শাখার একত্র অবস্থানও বিশেষ লÿ্যইে করা হয়ে থাকে। কারণ, তাতে এক বিদ্যা শাখার শিÿার্থী অন্য বিদ্যা শাখার শিÿার্থীর সঙ্গে পারস্পরিক সংযোগের সুযোগ পাবে। তাতে সে শিÿার্থী একমুখী চিন্তাকে বিসর্জন দিয়ে বহুত্ববাদী চিন্তায় অভ্য¯Í হয়ে উঠবে। কিন্তু, আমাদের দেশে বর্তমানে দু’-তিনটি বিদ্যা শাখা খুলে যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় চালানো হচ্ছে তাকে কোন মতেই বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে না। বড় জোর ইনস্টিটিউট বলা যায়। মাঠ নেই, নিজস্ব ভবন নেই, বৃহৎ গ্রন্থাগার নেই, ল্যাবরেটরি নেই, ছাত্রাবাস নেই, তাহলে একটি দোকানের পাশে বা গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ভাড়া করা বা বাড়ির একটি বা দু’টি ফ্লোর নিয়ে গড়ে তোলার যে প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা হচ্ছে তাকে লোক ঠকানো আখড়া ছাড়া আর কি বলা যায়? ভাল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিÿকদেরও আত্মসমালোচনা করা দরকার। তাদের অনেকে নিজ নিজ ক্লাস নেন না কিন্তু প্রাইভট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান বা কনসালটেন্সি করেন। নতুন শিÿামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ দেশের বরেণ্য শিÿাবিদদের নিয়ে বর্তমান শিÿা ব্যবস্থা সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তার গুরুত্ব স্বীকার্য। ওই সভা থেকে যে সুপারিশসমূহ বেরিয়ে এসেছে তার সঙ্গে আমাদের আজকের এই বক্তব্য বিবেচনা করার অনুরোধ জানাই।
0 comments:
Post a Comment