সমন্বিত ও মানসম্পন্ন শিÿা প্রয়োজন
আলী ফোরকান
বাংলাদেশের শিÿা ব্যবস্থা নিয়ে আশাব্যঞ্জক কোন কথা বলার কারণ নেই। পাকি¯Íান আমলে পশ্চিম পাকি¯Íানি সরকারের একপেশে নীতির কারণে আমরা বঞ্চিত হয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর সে সমস্যা না থাকলেও নানামুখি সমস্যার আবর্তে এখন জাতির শিÿা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। দুর্নীতিকে প্রধান কারণ হিসেবে সনাক্ত করলেও অন্যান্য সমস্যাগুলো কম মারাত্মক নয়। স্বাধীনতার পর অনেকগুলো শিÿাকমিশন গঠন করা হয়েছে, কমিশন রিপোর্টও দাখিল করেছেন, ভালো হোক মন্দ হোক তার অনেকগুলোই জাতির সামনে অবমুক্ত করা হয়নি। বা¯Íবায়নের তো প্রশ্নই ওঠে না। শিÿা মন্ত্রাণালয় এবং সংশিøষ্ট দপ্তর এদেশের শিÿা ব্যবস্থা নিয়ে যে নানা রঙের এক্সপেরিমেন্ট করেছেন তা অন্য কোন ÿেত্রে করা হয়নি। এইসব নিরীÿা-পরীÿার যাতাকলে পিস্ট হয়ে শিÿানামক অঙ্গটি বিকল হতে বসেছে। তার ওপর ছাত্র-শিÿক রাজনীতির ভয়াবহ পরিণামে দেশের সামগ্রিক শিÿার অধঃপতনকে বিভীষিকা বললে আশা করি কেউ চমকে উঠবেন না।
এতসব ভয়াবহ অবস্থার পর বর্তমান শিÿামন্ত্রী আমাদের বেশ আশার কথা শোনাচ্ছেন। আমরা নতুন আশায় পুলকিত হচ্ছি, তবে সত্য হলো কথা কাজে পরিনত না হওয়া পর্যন্ত আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। কয়েক দিন আগে একটি বেসরকারি চ্যানেলে টকশোতে সাংবাদিকের ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মতামতে তিনি তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তিনি শিঘ্রই কী কী পদÿেপ নেবেন এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেছেন, তাদের সময়ে শিÿা কমিশনের প্র¯Íাব বা¯Íবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। শিÿার পরিবেশ রÿা করা হবে এবং সমন্বিত বা একমুখীন শিÿা ব্যবস্থা চালু করা হবে। আমরা এসব প্র¯Íাব আশু বা¯Íবায়নের আশা করছি।
প্রাইমারী থেকে এসএসসি বা এইচএসসি পর্যন্ত আমাদের নানা প্রকারের শিÿা ব্যবস্থা চালু রয়েচে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি হাইস্কুল ও কলেজকে লেখাপড়ার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচেনা করা জরুরি। এদেশে প্রাথমিক ¯Íরে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল রাখার কোন প্রয়োজন নেই। এখানে স্পষ্টত ধনী ও গরীব দুটো শ্রেণী তৈরি হচ্ছে। বাংলা ভাষা না শিখে গাদা গাদা ইংরেজি শব্দ, বানান মুখ¯Í করে কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশ ÿতিগ্র¯Í করছেন সব মা-বাবারা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভালো ইংরেজি পড়ানো হলে সবাই ইংরেজি (যা প্রয়োজনীয়) শিখতে পারবে। ইংরেজি শেখার প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা অস্বীকার করি না। তবে, সেটা সবার জন্য সমন্বিত এবং সেটা মাতৃভাষায় বিকাশ লাভ করার পর। এদেশে বসবাসকারী বিদেশীরা রাজধানী বা অন্যান্য বড় শহরের দু’একটি ইংরেজি স্কুল চালু করতে পারে।
মাদ্রাসা শিÿাকে আধুনিক করা প্রয়োজন। এদেশের সবাই প্রায় মুসলমান কাজেই যারা ইসলামী শিÿায় শিÿিত হতে চায়, তারা মাদ্রাসায় পড়বে তবে সেখানে বাংলা ইংরেজি বা অন্যান্য বিষয়ে সাধারণ বিদ্যালয়ের মতো পাঠের ব্যবস্থা থাকবে। মাদ্রাসায় গরীব ছেলে-মেয়েরা পড়বে এবং তারা চাকরি-বাকরির সুযোগ না পেয়ে অল্প টাকার প্রলোভনে বোমাবাজ হবে এটা সভ্য দেশে বাঞ্ছনীয় নয়। আলীয়া মাদ্রাসার বাইরে খারেজী বা কওমী বা হাসেজী মাদ্রাসার দিকে নজর দিতে হবে। প্রয়োজনে সেখানেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিÿা চালু করা দরকার।
এদেশে অজস্র স্কুল কলেজ মাদ্রাসা তৈরি হয়েছে দলীয় নেতাদের রাজনীতির কারণে আর মন্ত্রণালয়ের অপরিসীম দুর্নীতির ফলশ্রæতিতে। একটি থানায় ছাব্বিশটি পর্যন্ত কলেজ রয়েছে। স্থানীয় এমপি, শিÿা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মিলে বেকার যুবকের কাছ থেকে কয়েক লÿ টাকা নিয়ে শিÿা প্রতিষ্ঠানের নামে স্পষ্টত ব্যবসা চালু করেছে। ছাত্র-ছাত্রী নেই, চেয়ার বেঞ্চ নেই, ক্লাসরুম লাইব্রেরী নেই, শিÿক আছে। তাদের সরকারি মাসোহারা নিয়মিত করার জন্য বছরে কয়েকবার প্রিন্সিপাল টাকার ব্যাগ ও উপহার সামগ্রী নিয়ে মন্ত্রণালয়ে যান। এই হচ্ছে বেসরকারি শিÿা প্রতিষ্ঠানের হাল।
হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকীগুলোর অবস্থা ভয়াবহ রকমের খারাপ। তারা সোজা কথায় সনদ বিক্রি করছে। পরীÿার খাতায় ছেলে-মেয়েরা যাই লিখুক বিপ্লাস বা এ পেয়ে যাচ্ছে। শিÿক নেই, অবকাঠামো নেই, লাইব্রেরী নেই, ক্লাস নেই। শুধু গাদা গাদা টাকা নিয়ে ভর্তি এবং পাস। মালিক কর্তৃপÿ আলুপটল ব্যবসায়ীর মতো টাকা কামাই করছে। সরকার ও ইউজিসি মাঝে মধ্যে সরব হলেও কোন কার্যকর কিছু আজো চোখে পড়েনি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা ভালো নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন-চারগুণ বেতন দেয়ার জন্য এখন কোন মেধাবী ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিচ্ছে না। আর স্বল্প বেতনের চাকরিতে সংসার চালানো অসম্ভব বলে বাধ্য হয়ে পার্টটাইম চাকরি নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিÿকেরা। এটা অপরাধ। নিজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়া রীতিমত অন্যায়। তাহলে তিনি কী বা করবেন? ইউজিসি যে বাজেট বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জানি। সরকারি বাজেটে শিÿক-কর্মচারীদের বেতন দেয়া সম্ভব হয় না। বছরের শেষের দিকে কর্তৃপÿ শিÿক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড বা অন্যান্য ফান্ড থেকে টাকা ধার করে বেতন দেয়। গবেষণা, উন্নয়ন, অবকাঠামো ও অন্যান্য বিষয়ের কথা তো বাদ দিলাম।
আগে তবু বাইরে স্কলারশিপ পাওয়ার সুযোগ ছিল। সে সুযোগ কমে আসছে। সরকার নানাভাবে শিÿকদের বাইরে যাবার সুযোগ বাধাগ্র¯Í করছেন। এক নিয়মে বলা হয়েছে সহযোগী অধ্যাপকের বাইরে গেলে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। সোজা কথায় মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ফাইল সরাতে তাকে ঘুষ দিতে হবে, ধর্ণা দিতে হবে এবং তিনি শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে এই দুরাশা ত্যাগ করবেন। অন্য প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোন বিভাগের ২০% এর বেশি শিÿক বাইরে যেতে পারবে না। এর ফলে ভয়াবহ পরিণতি ঘটবে। একজন বহু কষ্টে ফেলোশীপ ম্যানেজ করে যদি বাইরে উচ্চশিÿার জন্য না যেতে পারেন তাহলে স্পষ্টত বিভাগে বিবাদের সৃষ্টি হবে। এখানে আরো একটি বিষয় বলা জরুরি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের এই রকম প্রজ্ঞাপন জারি করা কতটা যুক্তিযুক্ত? এটা কি বিশ্ববিদ্যালয় মানতে বাধ্য? যেসব শিÿক বাইরে যাবেন এবং শর্ত মানবেন না বা প্রয়োজনীয় গবেষণা শেষে ফিরে আসবেন না তাদের চাকরি চলে যাবে সেটাই তো যথেষ্ট। শিÿা মন্ত্রণালয়ে বাইরে থেকে যেসব বৃত্তির অফার আসে শিÿকদের জন্য তা যথাসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছায় না। মন্ত্রণালয়ের বহু কর্মকর্তা গবেষণা করতে বাইরে গেছেন, এমনকি পুলিশ কর্মকর্তা পর্যন্ত।
সবমিলিয়ে দেশের শিÿা ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে। সুষ্ঠু নীতি ও তার বা¯Íবায়ন করা প্রয়োজন। প্রাইমারী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিÿকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রয়োজন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে শিÿকদের বেতন আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। তা করা সম্ভব হলে মেধাবী ব্যক্তিরা শিÿক হবেন। সঠিক জাতীয় শিÿানীতি বা¯Íবায়ন, দুর্নীতি রোধ ও শিÿকদের মানসম্পন্ন জীবন নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের শিÿা ব্যবস্থা অবশ্যই আলোর মুখ দেখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
0 comments:
Post a Comment