বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও বর্তমান প্রেক্ষিত
আলী ফোরকান
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে প্রতিটি বাঙালীরই কম-বেশি জানা। বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এদেশের সর্ব¯Íরের জনগণ ‘৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন ও সর্বশেষ ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জন করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা দিয়ে এক অসম শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং অনেকে করেছে শাহাদাৎবরণ। আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলতে বুঝিঃ দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর ভালবাসা, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে শত অত্যাচারের মাঝেও শির উঁচু রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, দেশ ও জনগণের স্বার্থে যে কোন ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকা, জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আপোষহীন থাকা এবং নির্লোভ, সহজ, সাদা-সিধে জীবন-যাপন করা ইত্যাদি। এদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধুকে যে পরিমাণ ত্যাগ, দুঃখ-কষ্ট ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে, বিশ্বের আর কোন জাতির জনককে তেমনটি করতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ কথা কারও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে এদেশ আজ স্বাধীন হত না। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক এবং অবিচ্ছেদ্য। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক। বাঙ্গালী জাতির পরম সৌভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর মত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতীয়তাবাদী ত্যাগী নেতার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব পেয়েছিল, যা কোন জাতির ভাগ্যে যুগে যুগে কেন শতাব্দীতেও আসে না। বঙ্গবন্ধুর মত আদর্শ নেতৃত্ব পেয়ে যে কোন জাতি গর্ব করতে পারে এবং বদলে দিতে পারে তার ভাগ্য। কিন্তু বাঙালী জাতির চরম দুর্ভাগ্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত নব্য স্বাধীন একটি দেশে শত প্রতিক‚লতা কাটিয়ে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু যখন সকল জাতীয় শক্তিকে একত্রিত করে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিল তখনই আমাদের অসতর্কতা ও অনৈক্যের সুযোগে দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশালী শক্তি ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালোরাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে এ জাতির সম¯Í অহংকার, গর্ব ও আশা-আকাঙক্ষা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিল। সম¯Í জাতি ¯Íব্ধ হয়ে গেল। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা দিয়ে এ জাতির মুক্তির জন্য একদিন যুদ্ধ করেছিলাম, তারাও কিছুই করতে পারলাম না। কারণ, প্রতিক্রিয়াশালী চক্রের অনুচরেরা বঙ্গবন্ধুর অতি কাছেই গুরুত্বপূর্ণ পদে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। এরপর থেকেই ইতিহাসের চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে থাকে। দীর্ঘ যাবৎ চলল ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও অবদানকে ¤øান করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ একে একে মুছে ফেলে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার জঘন্য প্রচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে জনগণের দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে পর পর নির্বাচনে বাঙালী জাতি তার হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেলেও আমাদের দুর্ভাগ্য, নানা কারণে সে সুযোগ আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে, আগামী প্রজন্মকে একটি শোষণমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দেয়ার জন্যেই যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম। কিন্তু সে স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হয়নি, সাধারণ জনগণের ভাগ্যের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি, যদিও স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যক্তি ও শ্রেণী পর্যায়ে অনেকেই লাভবান হয়েছেন এবং বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। একজন এ দেশের সাধারণ নাগরিক হিসাবে আমার ব্যক্তিগত চাওয়া ও পাওয়ার কিছুই নেই। কিন্তু আমি যখন দেখি, একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, একজন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষ বাঁচার ন্যূনতম উপাদানটুকু পাচ্ছে না, তখন একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়, আর কিছুতেই গর্ববোধ করতে পারি না। আমরা জানি, দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে কিছু করতে গেলেই কায়েমী স্বার্থবাদীদের স্বার্থে আঘাত লাগে এবং তখনই তারা সুকৌশলে তা বানচালের চেষ্টা করে। আর, সেই কায়েমী স্বার্থবাদীরা এবং তাদের অনুচরেরা দূরে নয়, খুব কাছাকাছি, এমনকি খোদ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আসনে আত্মগোপন করে থাকে এবং সুযোগ বুঝেই চরম আঘাত হানে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এবং সময়ের প্রয়োজনে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সকল জাতীয় শক্তিকে একত্রিত করে যখন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিলেন, তখনই তার অতি কাছে আত্মগোপনকারী কায়েমী চক্র হানল চরম আঘাত। যার মাশুল আজও দিতে হচ্ছে সমগ্র জাতিকে। আবার জনগণের রায়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি মোতাবেক দেশ ও জনগণের স্বার্থে যখন কিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিচ্ছেন তখনই আমরা দেখছি যে, ষড়যন্ত্রকারীরা সরকারকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে পরিল্পিতভাবে একের পর এক অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে পরিচিত আমাদের সবাইকে অধিকতর দায়িত্বশীল ভ‚মিকা পালন করতে হবে। এমন কিছু করা সমীচীন হবে না যা জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে যায় এবং ষড়যন্ত্রকারীদের হাতকে শক্তিশালী করে। মনে রাখা দরকার, আমরা বিজয় অর্জন করার ঐতিহাসিক সুযোগ আবার পেয়েছি মাত্র, যা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সত্যিকার বিজয় অর্জন করতে হবে। আর এই সুযোগ বানচাল করার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী, কায়েমী স্বার্থবাদী দেশ-বিদেশী, প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। সরকারের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থানকারী সেই চক্রের দোসররা, যারা কোনভাবেই চায় না এই সরকার সফল হউক, তারাও আজ সুকৌশলে চেষ্টা চালাচ্ছে এই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে সরকারকে ব্যর্থ করে দিতে। যদি বিচক্ষণতার সাথে এবং শক্ত হাতে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা না হয়, আর যদি দেশ গড়ার এই সুযোগ আবার হাতছাড়া হয়ে যায়Ð তবে সে সুযোগ হয়ত আর কোনদিন আমরা ফিরে পাব না। লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
0 comments:
Post a Comment