দৃষ্টিপাত : প্রসঙ্গ : শিÿা
আলী ফোরকান
শিÿার যে একটি সামাজিক লÿ্য ও ভ‚মিকা রয়েছে, তা আজ সর্বজনবিদিত। আমরা যাকে সামাজিক উদ্যোগ (ঝড়পরধষ বহঃবৎঢ়ৎরংব) বলি, সেই কল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ ও আনুষঙ্গিক যাবতীয় দায়-দায়িত্ব পালনে শিÿার্থীকে উদ্বুদ্ধ ও প্রস্তুত করা শিÿার অন্যতম লÿ্য। এ গুরু দায়িত্বকে কিছুতেই খাটো করে দেখা যায় না। একই সঙ্গে জ্ঞানের খাতিরে জ্ঞান (শহড়ষিবফমব ভড়ৎ ঃযব ংধশব ড়ভ শহড়ষিবফমব) নাম এককালের বহুল প্রচলিত বাণীটির প্রতিও এখন কেউ আর আকৃষ্ট হয় না। জ্ঞান ও শিÿার ব্যবহারিক দিকটির ওপর গুরুত্বারোপ অবশ্য কোন নতুন ব্যাপার নয়। যেমন, এর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো। আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা বর্ণনা প্রসঙ্গে প্লেটো তাঁর সুবিখ্যাত ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে বলেন, শিÿার্থীদের দেশ ও দশের কল্যাণ সাধনের জন্য প্রশিÿণ দেয়া হবে শিÿার অন্যতম লÿ্য। এক দীর্ঘ প্রশিÿণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে মুষ্টিমেয় ব্যক্তি দেহ-মনের সামঞ্জস্য ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেবেন, তাঁরাই গ্রহণ করবেন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব। দেশের শিÿা ব্যবস্থায় দেহ পরিচর্যার জন্য যেমন থাকবে শরীর চর্চার বাধ্যবাধকতা, তেমনি মানসিক বিকাশ ও উৎকর্ষ অর্জনের লÿ্যওে থাকবে সংগীতসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চা ও অনুশীলনের আয়োজন। আজকাল আমরা সুস্থ দেহে সুস্থ মন (ংড়ঁহফ সরহফ রহ ধ ংড়ঁহফ নড়ফু) বলতে যা বুঝি, প্লেটোর শিÿাদর্শনে তারই পূর্বাভাস নিহিত। নাগরিকদের মধ্যে সৎসাহস, মিতাচার ও শালীনতার প্রেরণা সৃষ্টিই হবে শিÿা দর্শনের মূল লÿ্য। বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত অভিভাবকদের, বিশেষ করে শাসকদের অবশ্যই প্রাজ্ঞ ও বিচÿণ হতে হবে। আর এরই নিশ্চয়তা বিধান করা হবে উচ্চ শিÿার মাধ্যমে। শুধু সংগীত ও শরীর চর্চাই নয়, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সামরিক ও প্রশাসনিক প্রশিÿণও থাকবে উচ্চ শিÿার পাঠক্রম ও প্রশিÿণের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রায়োগিক মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটে আধুনিক ইউরোপীয় রেনেসাঁয়। তখন থেকেই শুরু হয় আধুনিক বিজ্ঞানের ক্রমিক অগ্রগতি। অতিপ্রাকৃতের স্থলে প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনার প্রতি আকর্ষণ, সভ্যতা ও প্রগতির লÿ্যে অক্লান্ত প্রয়াস বিবেচিত হলো মানুষের চিন্তা-ভাবনার মূল লÿ্য হিসেবে। ব্যবহারিক প্রয়োজনেই আধুনিক মানুষ আকৃষ্ট হলো শিÿা-দীÿা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি। এ পরিপ্রেÿিতেই ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) জ্ঞানকে অভিহিত করলেন শক্তি বলে এবং কেউ করলেন আলো বা অস্ত্র বলে এবং তার মাধ্যমে এঁরা সবাই গুরুত্ব আরোপ করলেন জ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর। জ্ঞানকে দেখা হলো সাহিত্য, শিল্পকলা, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয়ে অগ্রগতি অর্জনের উপায় হিসেবে।
তবে এখানে একটু সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে। কারণ শিÿাকে শক্তি, আলো কিংবা অস্ত্র হিসেবে দেখার সঙ্গে কিছু ঝুঁকি যুক্ত আছে। যেমন ফ্রান্সিস বেকন শিÿাকে আখ্যায়িত করেছেন শক্তি হিসেবে। প্রশ্ন ওঠেঃ আলোর কাজ কী? একইভাবে প্রশ্নঃ শক্তি বা অস্ত্র প্রয়োগেরইবা সঠিক উপায় কী? আলোতে বসে কেউ যেমন পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতে পারেন পুণ্য লাভের জন্য, একই আলোতে অন্য একজন আবার জাল দলিল তৈরি করতে পারে অপরকে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে। সুতরাং শিÿারূপ আলো দিয়ে কে কী করবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে সংশিøষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তির ভাল-মন্দের, নীতিবোধ ও মূল্যবোধের চেতনা থাকা-না-থাকার ওপর। অস্ত্র দিয়ে মানুষ খুন করা যায়, আবার এ দিয়ে অস্ত্রোপচার করে একটি মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচানো যায়। শিÿার ব্যাপারটা অনেকটা অনুরূপ নয় কি? শিÿা নিজে বলে দেয় না তাকে দিয়ে কী কাজ করা হবে। শিÿার ফলাফল বা পরিণতি নির্ভর করে মানুষের অন্তর্নিহিত উইল বা ইচ্ছাশক্তির গুণাগুণের ওপর। যেমন, শিÿাকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের বহু দৃষ্টান্ত লÿ্য করি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে, এমনকি সাম্প্রতিক অতীতে। যেমন, জার্মানির নাজি এবং ইতালির ফ্যাসিস্ট সরকারসহ অনেক সরকারই শিÿাকে ব্যবহার করেছে তাদের ÿমতা পাকাপোক্ত করার তথা বহুবিধ অশুভ উদ্দেশ্য হাসিলের উপায় হিসেবে। তার মানে শিÿা একটি সভ্যতা- সংস্কৃতিকে যেমন গড়তে পারে, তেমনি আবার চূর্ণও করে দিতে পারে। কিন্তু অশুভ শক্তির হাতে পড়ে শিÿা যদি সঠিক লÿ্য ও গতিপথ থেকে একবার বিচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে এই শিÿা (কুশিÿা) মানুষের সমূহ ÿতি করতে, এমনকি বহু কষ্টে অর্জিত মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির স্বাভাবিক স্রোতধারাকে ¯Íব্ধ করে দিতে পারে।
0 comments:
Post a Comment