Saturday, March 10, 2018

শিÿাÿেত্রে চাই মৌলিক পরিবর্তন

শিÿাÿেত্রে চাই মৌলিক পরিবর্তন
আলী ফোরকান 
বোর্ডের সব বই এখনও ছেলেমেয়েদের হাতে পৌঁছায়নি। দোকানে বই নেই। অভিভাবকরা চিন্তিত, বই খুঁজে হয়রান। বোর্ডের বই না পাওয়া গেলেও নোট, গাইড এবং সহপাঠ বইয়ে বাজার সয়লাব। নোট-গাইড ছাড়া একালে ছাত্রছাত্রীরা যেন লেখাপড়ার কথা চিন্তাই করতে পারে না। গাইড বইয়ের সঙ্গে পালøা দিয়ে চলছে কোচিং-এর ব্যবসা। কোচিং না করলে শিÿার্থীদের মনও পোষায় না, ভাল রেজাল্টও করা যায় না। তথাকথিত ভাল স্কুলেও ভর্তি হওয়া যায় না। ভাল স্কুল কতখানি ভাল সেটা বড় কথা নয়। বিষয়টি হয়ে গেছে স্ট্যাটাস সিম্বল। আভিজাত্যের প্রতীক। ছেলে বা মেয়েটি কোন স্কুলে পড়ে, একশ্রেণীর গার্জেনের কাছে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাচ্চাটি পাড়ার কোন অনামী স্কুলে পড়ে, সে কথা বলতে বাপমার মুখ চুন হয়ে যায়। আর যারা শোনেন, তারাও মুখ বাঁকিয়ে বলেন, ও! সমাজমনের এই অবস্থায় দেশজুড়ে শিÿার নামে শুরু হয়েছে বেপরোয়া বাণিজ্য। শিÿকদের এক বিরাট অংশ পেশার যাবতীয় মহত্ত¡ এবং আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে হয়ে উঠেছেন নিরেট ব্যবসায়ী। বাণিজ্য ল²ীর পেছনে তারা ছুটে চলেছেন চোখ-কান বন্ধ করে। শিÿা যখন পুরোপুরি বাণিজ্য হয়ে গেছে, বোধগম্য কারণেই তখন (বাণিজ্যিক) প্রতিযোগিতা তুমুল। শিÿা নিয়ে কোয়ালিটি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন বুদ্ধিমানরা। রাজধানী ঢাকায় এখন ইংরেজি মাধ্যম শিÿার প্রতাপ মোটেও অনুলেøখ্য নয়। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর অভিজাত এলাকাসমূহ তো বটেই তুলনামূলক কম অভিজাত এরিয়াতেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছড়াছড়ি। এইসব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের যারা উদ্যোক্তা এবং যারা এসব স্কুলে ছেলেমেয়েদের পড়তে দেন, তাদের যুক্তি অবশ্য ফেলে দেয়ার মত নয়। তারা বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজিটা ভাল না জানলে ছেলেমেয়েরা প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে যাবে। একবিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জ তারা মোকাবিলা করবে কেমন করে! মনে হতেই পারে আমড়া কাঠের ঢেঁকি বানানোর জন্যই বুঝিবা আমাদের প্রচলিত শিÿাব্যবস্থা। আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ রকমের শিÿা চালু রয়েছে। এ তথ্য প্রকাশ করেছেন খোদ শিÿামন্ত্রী। এমতাবস্থায় ১৯৭৪ সালের কুদরত-ই-খুদা শিÿা কমিশনের রিপোর্টের আলোকে দেশে নতুন শিÿানীতি প্রবর্তন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে বর্তমানে প্রাইমারি পর্যায়ে কি কি ধরনের শিÿা চালু রয়েছে সেদিকে খানিকটা দৃকপাত করা যাক। এদেশে সরকারি টাকায় চলে এরকম প্রাইমারিই আছে তিন-চার রকমের। নিখাদ সরকারি প্রাইমারি স্কুল তো আছেই। তার সঙ্গে আছে রেজিস্টার্ড প্রাইমারি। রয়েছে কমিউনিটি প্রাইমারি স্কুল। অন্যদিকে আছে মাদ্রাসা শিÿাবোর্ডের অধীনে এবতেদায়ী। এবতেদায়ী মাদ্রাসায় যারা পড়ে তারা ভবিষ্যতে পড়বে আলিয়া মাদ্রাসায়। ফাজেল, আলিম, কামিলÐএইসব ডিগ্রি নিয়ে তারা হবে আলেম মাশায়েখ। তাদের সার্টিফিকেট ও ডিগ্রিও ক্রমানুযায়ী প্রচলিত এসএসসি, এইচএসসি, বিএ ও এমএ’র সমতুল্য। মাদ্রাসা পড়া ছেলেমেয়েদের কেউ কেউ আলিম পাস করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হয়। বলছিলাম প্রাইমারি পর্যায়ের কথা। প্রাইমারি পর্যায়ে সরকারি বা আধা সরকারি স্কুল ছাড়াও আছে অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন স্কুল। এসব কিন্ডারগার্টেনের কোনো কোনোটি বাংলা মাধ্যম, কোনোটি ইংরেজি। এছাড়াও আছে এনজিও পরিচালিত বিভিন্ন স্কুল। দেশের বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাক প্রাইমারি স্কুল পরিচালনা করে থাকে। অন্যদিকে উপ-আনুষ্ঠানিক শিÿার নামেও বিভিন্ন এনজিও স্কুল পরিচালনা করে। এরা বিভিন্ন এলাকায় নিরÿতা দূরীকরণের জন্য সরকারি ফান্ড নিয়ে পরিচালনা করে অনানুষ্ঠানিক শিÿা। এদের কল্যাণে, এদের সাফল্যকে বড় করে দেখাবার জন্য পাঁচ-ছয় বছর আগে বলা হয়েছিলো যে, দেশে সাÿরতার হার ৬২ শতাংশ। পরে জরিপ করে দেখা গেলো সাÿরতার হার ৪২ শতাংশের বেশি নয়। প্রাইমারি পর্যায়ে এ ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখেই অনুমান করা যায় যে, আমাদের সামগ্রিক শিÿা ব্যবস্থায় কিরকম একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজমান। যেখানে নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা, সেখানে কিছু লোক দাঁও মারার তালে থাকবেই। সুযোগ সন্ধানীরা সুযোগ নেবে। কেউ ঘুষ খাবে, দুর্নীতি করবে, কেউ ব্যবসায় ফেঁদে বসবে। অনিয়মের রাজ্যে এটাই নিয়ম। আমাদের শিÿাÿেত্রে যাবতীয় সমস্যার মূলে রয়েছে সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা এবং বিশৃঙ্খলা। দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে সরকারি শিÿা দপ্তর। রসিকতা করে কেউ কেউ বলেন, শিÿা অফিসের চেয়ার-টেবিলগুলো পর্যন্ত ঘুষ খায়। এই রসিকতা বা নালিশ কতখানি সত্য তা জানেন ভুক্তভোগীরা। কালে-কালে আমাদের শিÿানীতি কম হয়নি। বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিও হয়েছে অনেক। বিশেষজ্ঞ মহলের অনেকেরই অভিমত দেশ স্বাধীনের পর কুদরত-ই-খুদা কমিশন যে সুপারিশ পেশ করেন, সেটি এ যাবৎকালের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য নীতিমালা। বঙ্গবন্ধু সরকার আমলে সেই নীতির বা¯Íবায়ন সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। পরবর্তীতে কুদরত-ই-খুদা কমিশনের রিপোর্ট হিমাগারে চলে যায়। তারপরেও একাধিক কমিশন হয়েছে। সেসব কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে অনেক অস্ব¯িÍকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেখেছি আমরা। এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ÿমতায় এসে কুদরত-ই-খুদা কমিশনের সুপারিশের আলোকে সময়োপযোগী রিপোর্ট প্রণয়নের জন্য গঠন করেন শামসুল হক কমিশন। সে কমিশনের রিপোর্টও বা¯Íবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ২০০১ সালে জোট সরকার ÿমতায় এসে আবারও গঠন করে নতুন আরেকটি শিÿা কমিশন। স্বাধীনতা-উত্তর এটি ৬ষ্ঠ শিÿা কমিশন। এই কমিশনের রিপোর্ট নানা কারণে বিতর্কের সৃষ্টি করে। এই কমিশন মাদ্রাসা শিÿার আধুনিকায়ন এবং মানোন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিলেও অভিন্ন শিÿা ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি এড়িয়ে যায়। এখন আবার মহাজোট সরকার নতুন শিÿানীতি প্রবর্তনের কথা বলছেন। শিÿানীতি একটি ব্যাপক বিষয়। সামগ্রিক শিÿা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা সীমিত পরিসরে সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় কিছু মৌলিক বিষয়ে এখানে দু’য়েকটি কথা বলা বাঞ্ছনীয় মনে করি। প্রাইমারি পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সারাদেশে সর্ব¯Íরে অভিন্ন শিÿাক্রম নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যকীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে মনোযোগ দেয়া দরকার সর্বাধিক। একইরকম পাঠ্যসূচী, সবশিÿা প্রতিষ্ঠানে শিÿার অভিন্ন মান, শিÿা প্রতিষ্ঠান এবং শ্রেণীকÿগুলোই হবে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার অবিকল্প কেন্দ্র, শিÿার্থীর জীবন তথা লেখাপড়ার পরিবেশ হবে আনন্দময় এবং শিÿা নিয়ে বাণিজ্য নয় কোনো অবস্থাতেই। এই পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে সবার জন্য শিÿা নিশ্চিত করা যেমন সম্ভবপর হবে, তেমনই সুগম হবে প্রকৃত শিÿায় শিÿিত একটি জাতি গড়ে তোলার পথ।  মনে রাখতে হবে স্কুল মানে একটি মহতী প্রতিষ্ঠান। এটি কোথায় অবস্থিত, কোন শ্রেণীর ছেলে-মেয়েরা ঐ স্কুলে পড়ে সেটা মোটেও বিবেচ্য নয়। একটি স্কুলে একই ক্লাসে একজন দিনমজুরের ছেলেও পড়তে পারে, কোটিপতির ছেলেও পড়তে পারে। শিÿার্থীর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড প্রত্যÿ বা পরোÿ, সচেতন বা অবচেতনে কোনোভাবেই বিবেচনায় আসবে না। শিÿার্থীদের মানস গঠন এবং মেধার সম্যক বিকাশে স্কুলই পালন করবে মূল ভ‚মিকাটি। কাজেই প্রত্যেকটি স্কুলকে, সে গ্রামের হউক, কিংবা শহরের হউক।।হতে হবে মানসম্মত। টেকনাফের সুদূরবর্তী গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যে পরিবেশে যে ধরনের লেখাপড়া করবে, শহরাঞ্চলের ছেলেমেয়েরাও পড়বে সেই একই পরিবেশে। শিÿকরাও হবেন একই রকম দÿ। দÿতায় উনিশ-বিশ হতে পারে। কিন্তু কোনো অদÿ লোক শিÿক হবেন না। এই একটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ভাল স্কুল মন্দ স্কুলের বিরক্তিকর প্রতিযোগিতা থাকবে না। স্ট্যাটাস খুঁজে বেড়ানো গার্জেনরাও তাদের স্থূলতাটা বুঝতে পারবেন ক্রমান্বয়ে, যা সুন্দর সমন্বিত সামাজিক পরিবেশ তৈরিতেও কাজে লাগবে।
প্রাইমারি শিÿা ধনী গরীব সবার জন্য একইরকম হওয়া উচিত। বেসরকারি খাতে প্রাইমারি শিÿা আংশিকও থাকা উচিত নয়। শিÿাবোর্ডও থাকা উচিত একটিই। প্রাইমারি ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পৃথক পৃথক শিÿাবোর্ড থাকার কোনো প্রয়োজন আছে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের কেউ কেউ মনে করেন না। প্রতিটি স্কুলই হবে লেখাপড়ার মূলকেন্দ্র। উন্নতবিশ্বে প্রাইমারি থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিÿার্থীরা বাড়িতে এসে লেখাপড়া করে না বললেই চলে। প্রাইভেট কোচিং তো পরের কথা। সম্প্রতি নেদারল্যান্ড থেকে এস রহমান নামের একজন অভিভাবক লিখে জানিয়েছেন যে, সে দেশে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা পাঠ্যবই কোনোদিন বাসায় নিয়ে আসে না। ক্লাসেই শিÿক পড়ান, সেখানেই পড়া তৈরি করা হয় এবং ক্লাসের ডেস্কেই বইগুলো সংরÿিত থাকে। বাচ্চারা হোম টাস্কের খাতাগুলোই কেবল বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় বসে হোম টাস্কগুলো করে, কিন্তু রাত জেগে পড়া মুখ¯Í করে না। যা শেখার, যা মুখ¯Í করার, তার সব ক্লাসেই হয়ে যায়। শিÿকরা তাদের সেভাবেই পড়ান এবং গাইড করেন। আর আমাদের স্কুলগুলো হলো ফিস আদায় করার জায়গা। শিÿকরা ক্লাসে গাদাগাদা পড়া দিয়ে দেন। নানা ধরনের বই কেনার পরামর্শ দেন। প্রাইভেট পড়ার প্ররোচনা দেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে হবে। নিম্নমানের এবং কুরুচিপূর্ণ গাইড বই, নোট বইয়ের রচনা, প্রকাশনা এবং বিপণন বন্ধ করতে হবে। আজকাল দেখেছি টেলিভিশনে গাইড বই, নোট বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। শুনেছি নোট-গাইড বইয়ের ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। বাজার অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক নানান যুক্তি দেখিয়ে কোন কোন পন্ডিত হয়তো বলবেন, কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ করে যে পাবলিকেশন ব্যবসা, সেই বিনিয়োগকারীদের (ব্যবসায়ীদের) দিকটাও দেখতে হবে। সত্যিকারের শিÿার প্রশ্নে এ রকম যুক্তি ও দাবিÐ অন্যায় এবং অশালীন। শিÿার বাণিজ্যিকীকরণ কিছুতেই বাঞ্ছনীয় হতে পারে না। স্কুলে, ক্লাসে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিশ্চিত করা গেলে গাইড এবং কোচিং-এর প্রয়োজন পড়বে না। এই ÿেত্রে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। আর তা হলো পাঠ্যপু¯Íক এমনভাবে লিখিত হওয়া উচিত, যা পড়ে শিÿার্থী নিজেই প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে পারে। কিন্তু বা¯Íবতা হচ্ছে এমন অনেক পাঠ্যবই বর্তমানে চালু আছে, যেগুলো পড়ে শিÿার্থীদের পÿে গাইড বইয়ের সাহায্য ছাড়া প্রশ্নোত্তর তৈয়ার করা কঠিন। আর শিÿকরা প্রশ্নোত্তর তৈরি করে দেবেন সে মানসিকতাই তো নেই অধিকাংশের। এমতাবস্থায় পাঠ্যপু¯Íক যারা প্রণয়ন করেন এবং যারা সম্পাদনা করেন, তাদেরও দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রয়োজন রয়েছে। সরকার নতুন শিÿানীতি চালু করার কথা ভাবছেন। ভাল কথা। কিন্তু শিÿানীতির মূল উদ্দেশ্যটি হওয়া চাই সবার জন্য মানসম্মত শিÿার নিশ্চয়তা বিধান। আমাদের জীর্ণ এবং ব্যবসাদুষ্ট শিÿা ব্যবস্থাকে বদলাতে হবে। শিÿা ÿেত্রে পরিবর্তন আনা না গেলে দিন বদলের যে রূপকল্পের কথা বলা হচ্ছে, তার বা¯Íবায়ন সুদূরপরাহত হয়ে থাকবে। 

0 comments:

Post a Comment