Sunday, March 4, 2018

জসীমউদ্দীনের শিÿা ও কর্মজীবন

জসীমউদ্দীনের শিÿা ও কর্মজীবন
আলী ফোরকান
জসীমউদ্দীন একজন কবি ও শিÿাবিদ। তিনি ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। জসীমউদ্দীন পিতা আনসারউদ্দীন মোলøা ছিলেন একজন স্কুল শিÿক। 
শিÿাজীবন ঃ তার ছেলেবেলার বেশিরভাগ সময় কেটেছে গ্রামে। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশবে ফরিদপুর হিতৈষী স্কুলে জসীমউদ্দীনের প্রাতিষ্ঠানিক শিÿা শুরু হয়। তারপর ফরিদপুর জেলা স্কুলে থেকে প্রবেশিকা (১৯২১), রাজেন্দ্র কলেজ থেকেই আই.এ (১৯২৪) ও বি.এ (১৯২৯) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি এম.এ (১৯৩১) পাস করেন। 
কর্মজীবন ঃ জসীমউদ্দীনের কর্মজীবন শুরু হয় পলøীসাহিত্যের সংগ্রাহক হিসেবে। স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে দীনেশচন্দ্র সেনের আনুক‚ল্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এ কাজে তিনি নিযুক্ত হন। এম.এ পাস করার পর থেকে ১৯৩৭ সাল পযর্ন্ত তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী গবেষণা সহকারী ছিলেন। ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগদান করেন। এখানে ১৯৪৩ সাল পযর্ন্ত চাকরি করার পর ১৯৪৪ সাল থেকে তিনি প্রথমে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকার এবং পরে পূর্ব পাকি¯Íান সরকারের প্রচার বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে এখান থেকে ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে অবসর গ্রহণ করে তিনি ঢাকার কমলাপুরে নিজ বাড়িতে স্থায়িভাবে বসবাস করেন। জসীমউদ্দীনের কবিত্ব শক্তির প্রকাশ ঘটে ছাত্রজীবনেই। তখন থেকেই তিনি তাঁর কবিতায় পলøী-প্রকৃতি ও পলøীজীবনের সহজ-সুন্দর রূপটি তুলে ধরেন। পলøীর মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর অ¯িÍত্ব যেন মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। কলেজজীবনে ‘কবর’ কবিতা রচনা করে তিনি বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তাঁর এ কবিতাটি প্রবেশিকা বাংলা সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়। কবি হিসেবে এটি তাঁর এক অসানান্য সাফল্য। জসীউদ্দীনের সাহিত্যের নানা শাখায় কাজ করেছেন, যেমন গাথাকাব্য, খণ্ডকাব্য, নাটক, স্মৃতিকথা, শিশুসাহিত্য, গল্প-উপন্যাস ইত্যাদি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাখালী প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলি হলো-নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, রঙিলা নায়ের মাঝি, মাটির কান্না, সুচয়নী, পদ্মা নদীর দেশে, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে, পদ্মাপার, বেদের মেয়ে, পলøীবধূ, গ্রামের মায়া, ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়, জার্মানীর শহরে বন্দরে, স্মরণের সরণী বাহি, বাঙালীর হাসির গল্প, ডালিম কুমার ইত্যাদি। তাঁর রচিত ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্প’ ও ‘বোবা কাহিনী’ উপন্যাসটি সুখপাঠ্য। জসীমউদ্দীনের জারীগান ও মুর্শদী গান নামে লোকসঙ্গীতের দুখানি গ্রন্থ সংকলন ও সম্পাদনা করেন। ১৯৬৮ সালে তাঁর সম্পাদনায় কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত হয় জারীগান। জারি গান একান্তভাবেই বাংলাদেশের নিজস্ব সৃষ্টি। এ গ্রন্থে জারি গানের মোট ২৩টি পালা সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থের ভ‚মিকায় জসীমউদ্দীন জারি গানের উৎস এবং বিভিন্ন এলাকার জারি গানের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। দ্বিতীয় গ্রন্থটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যটি ‘দি ফিল্ড অব এমব্রয়ডার্ড কুইল্ট’ এবং ‘বাঙালীর হাসির গল্প’ গ্রন্থটি ফোক টেলস অব ইষ্ট পাকি¯Íান নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বাংলা কবিতার ধারায় জসীমউদ্দীনের স্থানটি বিশিষ্ট। তাঁর কবিতা অনাড়ম্বর কিন্তু রূপময়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও লোকজীবন জসীমউদ্দীনের সংগ্রামের কাহিনীই তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। তাঁর কবিতায় দেশের মাটি সাÿাৎ উপলব্ধি ঘটে। এজন্য ‘পলøীকবি’ হিসেবে তাঁর বিশেষ ও স্বতন্ত্র পরিচিত রয়েছে। তাঁর গদ্য রচনাও বিশেষ আকর্ষণীয়; সরল, সরস, গভীর ও আন্তরিকতার স্পর্শে তা মন ছুঁয়ে যায়। জসীমউদদ্ীন ছিলেন প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী এবং এ ধরনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। এরূপ মানসিকতার কারণেই ষাটের দশকে পাকি¯Íান সরকার রেডিও ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিলে অনেকের মতো তিনিও এ তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বাঙালির জাতিসত্তা বিকালের আন্দোলন (১৯৬৬-১৯৭১) এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার একজন দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। জসীমউদ্দীন বাংলা সাহিত্যের একজন বিশেষ সম্মানিত ও বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত কবি। তিনি প্রেসিডেন্টের প্রাইড অব পারফমেন্স পুরস্কার, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি, বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক ও স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভ‚ষিত হন। তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কারের জন্যও মনোমীত হয়েছিলেন, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর মরদেহ স্বগ্রামে সমাহিত হয়। 

0 comments:

Post a Comment