বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেক হবে নগরবাসী
আলী ফোরকান
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আÿেপ করে বলেছিলেন, ‘দাও ফিরিয়ে অরণ্য; লহ এ নগর’। আজ একবিংশ শতাব্দী। গত প্রায় শতাব্দী জুড়ে বহু অরণ্য উজাড় হয়ে পরিণত হয়েছে ঝকঝকে আধুনিক নগরে। পরিবেশবাদীরা মনুষ্য পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে হরহামেশাই। অথচ তা সত্তে¡ও অরণ্য উজাড় থেমে নেই। দিন দিন নগর কেন্দ্রিক অর্থনীতি ভর করছে বিশ্ব ফোরামে। তারা একে দেখছে ইতিবাচক হিসাবে। তবে জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে প্রমাদ গুনছেন পরিবেশবাদীরা। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে- চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হয়ে যাবেন নগরবাসী। যা হবে ইতিহাসে প্রথমবারের মত উলেøখযোগ্য একটি ঘটনা। রিপোর্টে একই সঙ্গে উলেøখ করা হয়েছে বর্তমান নগরবাসীর সংখ্যা ৩৩০ কোটি হলেও ২০৫০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৬৪০ কোটিতে। সে সময় বিশ্বের মোট জনসংখ্যা হয়তো দাঁড়াবে ৯২০ কোটি। অথচ বর্তমান জনসংখ্যা ৬৭০ কোটি। রিপোর্টে বলা হয়েছে- বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অধিকাংশ আফ্রিকা ও এশিয়ায় বসবাস করলেও নগরবাসীর সংখ্যা এ দুই মহাদেশে তুলনামূলকভাবে কম। সেÿেত্রে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী ও নিকটবর্তী দ্বীপসমূহ নিয়ে গঠিত ওশিয়েনিয়া মহাদেশে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে নগরে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা বেশি। একই অবস্থা ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেও বিপোর্টে উলেøখ করা হয়েছে- দিন দিন নগরায়নের ফলে গ্রামীণ পরিবেশে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ২০০৭ সালেও গ্রামীণ মানুষের সংখ্যা ছিল ৩৪০ কোটি। যা আশংকাজনক হারে আরো কমে গিয়ে ২০৫০ সালে দাঁড়াতে পারে ২৮০ কোটিতে। এÿেত্রে উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছেÐ ভারতের দুইটিÐ উলেøখযোগ্য বড় নগরের কথা। বলা হয়েছে পলøী এলাকা উন্নয়নের উৎসাহ দিয়ে এবং নগরায়নের রাশ টেনে ধরার পরও ২০০৭ সালে মুম্বাই ও দিলøীতে মোট জনসংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৯০ লাখ ও ১ কোটি ৮৮ লাখ। কর্তৃপÿ এ ব্যাপারে উদাসীন হলে হয়তো নগরবাসীর সংখ্যা বেড়ে যেতো আরো। এদিকে জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক বিভাগের প্রধান হানিয়া জোতনিক সাংবাদিকদের বলেছেন, নগরায়ন কোন কোন সময় অর্থনীতির গতি চাঙ্গা হওয়ার লÿণ। তার মতে, শুধু নগরায়নে খুশি হলেই চলবে না। সংশিøষ্ট সরকারকে নগরবাসীর মৌলিক সেবার ওপরে রাখতে হবে স্বাস্থ্য সেবা। উলেøখ্য, এখনও এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ লোক বাস করে গ্রামে। তবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে নগরবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। হানিয়া জোতনিকের মতে, দুই মহাদেশে নগর ও গ্রামে বর্তমানে যথাক্রমে বাস করছে মোট জনসংখ্যার ৪০ ও ৬০ ভাগ। কিন্তু দ্রæত এ চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। ২০৪৫ থেকে ২০৫০ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুধু আফ্রিকায়ই অর্ধেক জনসংখ্যা নগরবাসীর আওতায় চলে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইভাবে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে অর্ধেক জনসংখ্যা বনে যেতে পারেন নগরবাসী। জোতনিক আরো জানান, বর্তমান চীনে মোট সনসংখ্যার ৪০ ভাগ বাস করে নগরে। ২০৫০ সালে এ হার ৭০ ভাগ হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর তখন ১ কোটি লোক বাস করবে শুধু নগরেই। জনসংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ভারতে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৯ ভাগ লোক বাস করে নগরে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ নাগাদ নগরবাসীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৫ ভাগ। অপরদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সমস্যা প্রতিটি ÿেত্রে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে কোনো দেশের জন্য একটি অভিশাপ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে হয়তোবা দাঁড়ানোর জায়গাটিও থাকবে না এদেশে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তৎকালীন পূর্ব পাকি¯Íান বর্তমান বাংলাদেশ ১৯৬৪ সালে জনসংখ্যা ছিল ৫ কোটি। ১৯৭৪ সালে ৭ কোটি, ১৯৮১ সালে ৯ কোটির কিছু বেশি। ১৯৯১ সালে ১২ কোটি ৯৩ লাখ এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ কোটিতে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পর এমন পর্যন্ত বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। কল্পনা করা যায় ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট এই দেশে জনসংখ্যা ১৫ কোটি! জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বসবাসের জন্য বৃদ্ধি পাচ্ছে ঘরবাড়ি। ফলে হারাতে হচ্ছে ফসলি জমি। ফসলি জমি হারানোর ফলে কমে আসছে ফসলের উৎপাদন। আবাসস্থল তৈরির জন্য ধ্বংস করা হচ্ছে গাছপালা। ফলে পরিবেশের ওপর পড়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কমে যাচ্ছে আমাদের মাথাপিছু আয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে না কর্মসংস্থান। ফলে বাড়ছে বেকারত্ব। এসব সমস্যা কি আমাদের দেশের জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনে না? প্রতিটি সমস্যা সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধি। আগে ে াগান ছিল ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট।’ বর্তমানে ‘একটি হলে ভালো হয়, দুটি সন্তানের বেশি নয়’। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই থাকে তাহলে হয়তো বা ভবিষ্যতে ে াগান হবে ‘ছেলে মেয়ে কোন সন্তানই নয়, প্রয়োজনবোধে বিয়েই নয়’। একটু হাস্যকর হলেও এমন ে াগান ভবিষ্যতে আসতেও পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি আমাদের দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে অতিরিক্ত জনসংখ্যা। এ বিষয়ে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে দেশের সচেতন মহলকে। দেশের প্রতিটি গ্রামে পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতির কথা ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি মানুষকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার বৃদ্ধির বিষয়ে সচেতন করতে হবে। তাহলে আসুন আমরা দেশের সচেতন নাগরিকরা জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করি।[রয়টার্স অবলম্বনে
0 comments:
Post a Comment