Sunday, March 4, 2018

জীবনানন্দ দাশের শিÿা ভাবনা- বিচ্ছিন্নভাবে শিÿার উন্নতি সম্ভব নয়

জীবনানন্দ দাশের শিÿা ভাবনা- বিচ্ছিন্নভাবে শিÿার উন্নতি সম্ভব নয়
আলী ফোরকান
আমি বাঙলাদেশের শিÿার কথা লিখছি। বোম্বে, মাদ্রাজ বা ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায় গত দু’-তিন দশক ধরে কি রকম শিÿা ব্যবস্থা চলে এসেছে- দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শিÿার কতদূর কি পরিবর্তন হ’লÐ ভারতবর্ষের আধুনিক শিÿার সে ইতিহাস লেখবার অবসর আমার আজকের এ প্রবন্ধ নেই।বাঙলাদেশের গত ত্রিশ-চলিøশ কিংবা পঞ্চাশ বছরের শিÿা মোটামুটি একই পথে চলেছে। মাঝে মাঝে অল্পস্বল্প বদল যে না হয়েছে তা নয়, কিন্তু আসল ভিত্তি ও গাঁথুনি একইরকম থেকে গেছে, কোথাও কোথাও গাঁথুনির সঙ্গে যোগ দেয়া হয়েছে কিছু, কোথাওবা ধসে গেছে খানিকটা, মেরামত করবার চেষ্টা চলেছে, চুনকাম করা হয়েছে মাঝে মাঝে। কিন্তু চলিøশ-পঞ্চাশ বছর আগে যারা ইস্কুল-কলেজে শিÿা পেয়েছিল তারা আজও দেখছে মেকলে রামমোহন ইত্যাদি যে ইংরেজি শিÿা চালিয়েছিল তারই সেই আদি চেহারা- এখন অনেকটা জীর্ণ ও ধ্বংসের দিকে যদিও- টিকে রয়েছে। ইস্কুলের ইংরেজি পাঠ্যের দিকে তাকালে হেরিকের ‘ড্যাফোডিল্স্’, ওয়ার্ডস্ওয়ার্থের ‘লুসি গ্রে’, ‘উই আর সেভেন’, ‘ড্যাফোডিল্স্’, সাদির ‘আফটার বেøনহেইম’, ব্যাম্বেলের ‘হোহেন লিণ্ডেন’, টেনিসনের ‘ব্রæক’ ইত্যাদি কবিতা চোখে পড়ে। উনিশশো বারো তেরো চৌদ্দ এবং এরো ঢেল আগের বাঙলাদেশের যে কোন ইস্কুলেই ছেলেরা এগুলো পড়েছে। আজকালকার ছেলেরাও সেই একই জিনিস পড়ছে; শিÿকেরা প্রায় একইভাবে পড়াচ্ছেন সব। অনেক আগেকার শিÿকদের ওপর অবশ্য আমার পÿপাত আছে; হয়তো সেটা আমার মনের ভুল। পঁয়ত্রিশ-চলিøশ বছর আগে ইস্কুলের ছেলেদের জন্য ইউনিভার্সিটির কোনো বাঁধাধরা পাঠ্যবই ছিল না, যদিও কয়েকটি বই পড়বার নির্দেশ দেয়া হত। কিন্তু সেসব বই থেকে আজকের তুলনায় এরকম টেক্স্টের প্রশ্ন বিশেষ কিছুই করা হ’ত না- যতদূর মনে পড়ে কোনো প্রশ্নই থাকত না। তখনকার দিনে ইস্কুলে ক্লাস নাইন-টেনে যেসব ইংরেজি বই পড়ানো হ’ত সেগুলোর কোনোরকম নোটই বাজারে কিনতে পাওয়া যেত না। কোনো অভিজ্ঞ শিÿক বা অধ্যাপক কেউই ইস্কুলের ছেলেদের জন্য নোট লিখতেন না। আজকের এত বড় ব্যবসা হওয়া দূরে থাকুক ইস্কুলের ছাত্রদের ইংরেজি পাঠ্যের নোট লেখার এই মর্মচ্ছেদী ব্যবসার কথা তখন কারো মাথায়ও ছিল কিনা বলতে পারছি না। আমার মনে হয় ইংরেজি পাঠ্যের জন্য বাজারে একটিও নোট না থাকায় ছেলেদের পÿে সেসব দিনকাল খুব ভালোই ছিল। গড়পড়তায় তখনকার ছেলেরা যে আজকের ছেলেদের চেয়ে বেশি নির্ভুল ইংরেজি জানত সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহই নেই। ইংরেজি ভাষা শেখাই সবচেয়ে আগে দরকার; অল্পস্বল্প ছেলে তাদের শক্তি ও রুচি অনুসারে ইংরেজি সাহিত্যেও পাঠ নিতে পারে, কিন্তু সকলের পÿে তার কোনো দরকার নই। নিখুঁত ইংরেজি জানাও সকলের পÿে সম্ভব হবে না; তার প্রয়োজনও নেই। তবে ব্যাকরণের বড়, মাঝারি ভুলগুলো অন্তত থাকা উচিত নয় ছেলেদের ইংরেজিতে। ত্রিশ-চলিøশ বছর আগে অনেক ছেলেরই মোটামুটি শুদ্ধ ইংরেজিতে দখল ছিল; আজকাল প্রায় কারুরই নেই। ইস্কুলের পাঠ্য পড়াবার ও পরীÿা নেবার পদ্ধতি এরকম হওয়া দরকারÐ ইংরেজি ভাষাকে এমন হৃদ্য করে তোলা উচিত যাতে নোটের অপর্যাপ্ত অসুস্থ ভাষা ছেড়ে তারা টেক্স্ট ও নানারকম বই, পত্র-পত্রিকা পড়বার স্বভাব তাগিদ বোধ করে। হয়তো কিছুতেই তা তারা বোধ করবে না। আর্থিক অবস্থা এত খারাপ- শিÿায় এত অসাধ- ইংরেজি- এমনকি বাঙলা পাঠ্য পড়তে গিয়েও নোটের নিরবচ্ছিন্ন পাঁচালির কাছে ছেলেদের আত্মোৎসর্গ এমনই বিষম অভ্যাসের জিনিস হয়ে উঠেছে যে, শিÿায় উৎসাহ ও উন্নতি ও প্রকৃত বা¯Íবতা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু গভর্ণমেন্টের কাছ থেকে টাকা আদায় করলে বা কমিশন বসিয়ে নিলে চলবে না, ছেলেদের মন সুস্থ করে তোলা দরকার; দেশের টাকা-কড়ি বেটে দেবার ও দেশ চালাবার কাজ যতদূর সম্ভব খাঁটি হওয়া উচিত। খারাপ দেশে প্রকৃত জ্ঞান, গুণ ও ভালো শিÿা ফলানো কঠিন। আমাদের দেশ এখনও যথেষ্ট খারাপ; স্বাধীনতা পেয়েও টাকাকড়ি ঠিকমতন খরচ হচ্ছে না, রাজ্য চালাবার সত্য ও পরিষ্কার কোনো সূত্র নেই। গভর্ণমেন্ট হয়তো বলবেন ব্রিটিশ যা দিয়ে গেছে তা রাতারাতি ভালো করা যায় না। সত্য কথা। কিন্তু এ পাঁচ বছরে ভালো করে তোলবার আগ্রহ সত্য হলে কাজ বেশি কিছু না হলেও একটা নতুন আবহ বোধ করা যেত। কিন্তু সেটাই হয়নি। ইংরেজের রাষ্ট্রের টাকার ও সমাজের সৎ ব্যবস্থার সঙ্গে শিÿা জড়িয়ে আছে। জট খসিয়ে শুধু শিÿাকে এককভাবে সফল করে তোলা সম্ভব নয়। কিন্তু টাকা চালিয়ে দেবার ও রাজ্য চালাবার ভার যাঁদের হাতে তাঁরা সেটাই গুছিয়ে উঠতে পারছেন না- শিÿাকে তাঁরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেন না। এভাবে কাজকর্ম চলতে থাকলে দেশের খারাপ অবস্থাও বদলাবে না- দেশবাসীর (ও ছাত্রদের) নৈষ্ফল্য ও দোষপাপও ঘুচবে না; শিÿার যে কোনো নতুন ব্যবস্থা টাকা ও চরিত্রের অভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। তবুও উপায়ই বা কি আছে- দেশের কর্মকর্তাদের হাতে দেশের অবস্থা যদি না শোধরায়, কোনো ভালো লÿণও অন্তত অনুভব করতে না পারা যায় তাহলে সে সবের প্রতিক্রিয়া ছাত্রদের পÿে এড়ানো সম্ভব নয়- শিÿকদের পÿেও না। অথচ অন্য পাঁচ রকম অভীষ্টের চেয়ে শিÿা ঢের বেশি দরকারী জাতির জীবনে। স্কুলের শিÿা ১৯১৫-২০ সালেও যা ছিল ১৯৫০-এও সেই পদ্ধতিতেই চলছে- সিলেবাসে ঢের বেশি ভারি হয়ে। কিছুটা হয়তো সিলেবাস লঘু থাকার ফলে অনেকটা অধীন দেশকে স্বাধীন দাঁড় করাবার একটা সর্বাত্মক বিশ্বাসের আবহে (যা প্রায় ধর্ম-বিশ্বাসের মত শক্তিশালী ছিল দেশে একদিন) বেড়ে উঠে (আর্থিক অবস্থাও তখন ততটা খারাপ ছিল না) পঁচিশ ত্রিশ চলিøশ বছর আগের ছাত্রদের মনে ঢিলেমি কম ও লÿ্যরে স্পষ্টতা বেশি ছিল। অবশ্য টাকা ও পদ প্রতিপত্তির লÿ্য একদল ছেলেকে চিরকালই টানে (আজকাল হয়তো বেশি টানে) ও তাদের লÿ্যকে স্পষ্ট করে তোলে। আমি সে লÿ্যরে কথা বলছি না; শিÿিত হয়ে ওঠার ইচ্ছা বা লÿ্যরে স্পষ্টতার কথা বলছি। আগেকার ছেলেরা গড়পড়তায় ইংরেজিই যে বেশি নির্ভুলভাবে শিখতে পেরেছে তা নয় (তা’ তো সামান্য কথা), মোটামুটি শিÿার সার্থকতা তারা বেশি পেয়েছে মনে হয়, বিদ্যা ও জ্ঞান আজকের ছাত্রদের চেয়ে বেশি লাভ করেছে। অথচ তখন শিÿা কমিশন এত বেশি ছিল না, শিÿা-বিজ্ঞান আজকের চেয়ে ঢের অপরিণত ছিল, শিÿা নিয়ে খোলাখুলি বা চাপা হুলেøাড় ও হৈ চৈ আজকের চেয়ে কম ছিল বলে আমার মনে হয়, স্কুলে ‘ট্রেন্ড্’ শিÿক ছিলই না প্রায় এরকম। আমি বলতে চাই না যে শিÿা-বিজ্ঞানের মতামত ও তার প্রয়োগের বিশেষ কোনো প্রসার যখন ছিল না দেশে, সেই পঁচিশ ত্রিশ চলিøশ বছর আগের গোড়ার ভিত্তিতে ছাত্রদের ফিরে যাওয়া দরকার। কিন্তু আজকের তুলনায় তখনকার ছাত্রদের চরিত্রে ও উদ্দেশ্যে যে বেশি শাস ও স্পষ্টতা ছিল- মোটামুটি চলনসই শিÿাও অন্তত পেতে হলে সেটাকে আমি প্রাথমিক দরকার বলে মনে করি। দেশ সমাজ যা বদলে গেছে, অর্থ যা বিপত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাতে আগেকার সেই মনের সুস্থতা ফিরে পাওয়া একালের ছাত্রদের পÿে নিতান্তই কঠিন- প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সে সুস্থতা ফিরে না এলে ইংরেজিই শুধু নয়Ð বাঙলা শেখাও বাঙালী ছাত্রদের পÿে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। জিনিসটাকে ‘সোজা’ করতে গিয়ে বাজারের নোট কঠিনতা বাড়াবে বৈ কমাবে না; টেক্স্ট্ ও নানা জাতীয় বই পড়া অভিধানের ব্যবহার স্বাধীন চিন্তা ও যুক্তি-জিজ্ঞাসার চল উঠেই যাবে একরকম। দশ পনেরো বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে বাঙলা দেশের শিÿায় এইসব বিশৃঙ্খলা ÿয় অÿমতা দেখা দিয়েছে। গভর্নমেন্টের কাছ থেকে বেশি টাকা, শিÿা কমিশন ও শিÿা বিজ্ঞানের আরো বেশি সাহায্য পেলে এ জিনিসের কোনো সৎ স্থায়ী মীমাংসা হবে বলে মনে হয় না- যতÿণ পর্যন্ত ছেলেরা মনের সঙ্গতি ফিরে না পায়। আমি বলতে পারছি না, শিÿকদের ও শিÿা পদ্ধতির বৈজ্ঞানিকতায় না রাজ্য চালাবার ও দেশের টাকাকড়ি খরচপত্রের ভালো বিচার-বিবেচনার ফলে সেটা পাওয়া বেশি সম্ভব হবে। যতদূর বুঝতে পারছি বিচার-বিবেকের রাজ্য ও তার আর্থিক সঙ্গতি অনেক দূরের জিনিস। কাজেই দেশের শিÿার জন্য যাঁরা আন্তরিকভাবে চিন্তা ও কাজ করছেন তাঁদের হাতে কাজ এসে জমেছে ঢের। গভর্নমেন্টের সহায়তা পেলে ভালো, কিন্তু দেশবাসী ও শিÿার কর্তা ও কর্মীদের সহায়তা নিতান্তই দরকারী।- সংÿেপিত। রচনাকালঃ ১৯৫২ই

0 comments:

Post a Comment