Friday, March 9, 2018

আঞ্চলিক যোগাযোগ : বা¯Íবায়ন কত দূর?

আঞ্চলিক যোগাযোগ : বা¯Íবায়ন কত দূর?
আলী ফোরকান
আঞ্চলিক যোগাযোগ ধারণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও এতোদিন এর কার্যকর কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি। সম্ভবত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের রসায়নটা সব সময় একই রকম না থাকায় এমনটি হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক যোগাযোগের ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনন্য নজীর থাকলেও এই উপমহাদেশে বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোন কাজই হয়নি। যোগাযোগের ÿেত্রে বাংলাদেশের কাছে ভারতের প্রধান চাওয়াটা হলো ট্রানজিট। উত্তর পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের জন্যে ভারত চাইছে এই ট্রানজিট বা যাতায়তের করিডোর। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে বিদ্যমান স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঐ রাজ্যগুলোতে পৌঁছতে হয়। তাই ট্রানজিট ভারতের কাছে বহুল আকাঙিÿত একটি বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটি নিয়ে রয়েছে নানা ঘরানার বিতর্ক। এই বিতর্কে খণ্ডিতভাবে নানা ধরনের মতপ্রকাশ করা হয়ে থাকে। কিন্তু মতগুলো সমন্বিত বা সামগ্রিকভাবে দেখার চেষ্টা হয়েছে খুব কম।ব্যবসায়ীদের অনেকের মতে বাংলাদেশ যদি কল্পনা করে কলকাতা, দিলøী, মুম্বাই হবে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার। তাহলে সেটা হবে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার মতো একটি বিষয়। তাদের মতে ভারতে বাংলাদেশী পণ্যের প্রধান বাজার হলো অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা সাতটি রাজ্য। বিষয়টি এমন নয় যে, এসব রাজ্যে বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে সেগুলো ভারতে তৈরি হয় না। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পণ্য রাজ্যগুলোতে নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচ অনেক বেশী। পÿান্তরে বাংলাদেশের পণ্য তুলনামূলক অনেক কম খরচে এসব রাজ্যে পৌঁছে যায়। এখন যদি বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে দেয় তাহলে বাংলাদেশ পরিবহনের দিক থেকে এগিয়ে থাকার সুবিধাটা হারাবে। কিন্তু বর্তমানে এশিয়ান হাইওয়ের যে রুট নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি কার্যকর হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যে বাংলাদেশ এই সুবিধা হারাতে পারে সেটি নিয়ে অবশ্য তেমন আলোচনা হতে দেখা যায়নি। এছাড়া ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হলে সেটিও বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এমন কথাও বলা হয়ে থাকে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় কয়েকটি রাজ্যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি থাকায় এ বিষয়েটি নিয়ে অনেককে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

এসব বিতর্কের মধ্যেও যে, আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে অগ্রগতি একেবারে হয়নি বিষয়টি এমন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা-কলকাতা বাস সার্ভিস চালু হয়। পরে বিএনপি সরকারের সময় ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু হয়। আর এই সেদিন তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সময় চালু হলো ঢাকা-কলকাতা ট্রেন সার্ভিস। দ্বিপাÿিক সম্পর্কের নানা জটিলতায় এসব সার্ভিস নিয়ে যাত্রীদের নানা ধরনের অসন্তোষ থাকলেও এগুলো চলছে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ÿেত্রে এ পদেÿেপগুলো এক ধরনের অগ্রগতি বিবেচিত হয়ে থাকে। তাছাড়া প্রায় তিন যুগ ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নৌ ট্রানজিট বিদ্যমান। তবে এখন নদী পথ নাব্যতা হারানোর কারণে নৌযান চলাচলের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। কলকাতা থেকে আসামগামী নৌযানের সংখ্যা এখন নামমাত্র। বাংলাদেশের অনেক সিমেন্ট কারখানার কাঁচামাল ফ্লাই এ্যাশ পরিবহনের জন্যে প্রায় তিনশ’ নৌযান চলাচল করে থাকে। খুলনার আংটিহারা ট্রানজিট পয়েন্ট দিয়ে কোস্টার ও কার্গো ভারতে যাতায়ত করে থাকে। আঞ্চলিক যোগাযোগের ধারণা নিয়ে পরবর্তীতে কিভাবে এগোন যেতে পারে সেটি সম্পর্কে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মো¯Íাফিজুর রহমান বলেছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে দু’দেশই লাভবান হতে পারে। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের আওতায় ভুটান ও নেপাল যাতে আমাদের বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে তৃতীয় দেশে আমদানি-রফতানি করতে পারে সে বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ ভারতের বেশ কিছু অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে এ কথা উলেøখ করে তিনি আরও বলেন, সবকিছু মিলিয়ে একটি প্যাকেজের আওতায় বিষয়টির সমাধান হলে ভাল হয়। তিনি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে গেলে বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে সেটি সম্ভব নয়। এই অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন প্রয়োজন হবে। এই অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয় কিভাবে মেটানো হবে, সেগুলো কি শর্তে ব্যবহার করা হবে এগুলো নিয়েও বি¯Íারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন, এÿেত্রে আমরা বিক্রি করব সেবা। এই সেবা বিক্রি করে আমরা কিভাবে নিজেদের আয় বাড়াতে পারি সেটি দেখতে হবে। এ ছাড়া আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে যেসব উদ্বেগ আছে সেগুলোকেও যথাযথভাবে চিহ্নিত করে প্যাকেজের আওতায় আনার পদÿেপ নেয়া যেতে পারে। যেমন, কি কি ধরনের পণ্য বর্ডার ক্রস করতে পারবে ও পারবে না তার একটি তালিকা থাকতে পারে। চূড়ান্তভাবে চুক্তি করার আগে পাইলট ভিত্তিতে প্রথমে রেলের ÿেত্রে চুক্তির কার্যকারিতা পরীÿা করে দেখা যেতে পারে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

আঞ্চলিক যোগাযোগ ÿেত্রে সর্বশেষ অগ্রতি হলো এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়। এ বিষয়ে মো¯Íাফিজুর রহমান বলেছেন, এশিয়ান হাইওয়ের ব্যাপারে সবসময় আলোচনার মধ্যে থাকতে হবে। যখন রুট নির্ধারণের আলোচনা হবে তখন অংশ নিতে হবে যাতে দেশের জন্যে সর্বোচ্চ কাঙিÿত সাফল্য নিয়ে আসা যায়।

যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেছেন, চুক্তির ১৫ এর ৩ ধারা অনুযায়ী সদস্য কোন দেশ প্রতিবেশি কোন দেশকে করিডোর বা ট্রানজিট দিতে বাধ্য নয়। প্রয়োজনে চুক্তি করার পরও বাংলাদেশ এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। সূত্র আরও জানায়, চুক্তি করলেই কেবল বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে এশিয়ার হাইওয়ের পথ পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারবে। যদি সদস্য রাষ্ট্র না হয় তবে কখনো এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। রুট পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্যে আবেদনও করতে পারবে না। এশিয়ান হাইওয়ে চুক্তির ১০ এর ২, ১১ ও ১৪ ধারা অনুযায়ী, সদস্য দেশ শুধু গতিপথ সংশোধন করতে পারবে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তরফে এ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে, এশিয়ান হাইওয়ে হলে পণ্য ও মানুষের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত সুগম হবে। চুক্তির বাইরে থাকলে রুট সংশোধনে কোন ভ‚মিকা রাখা যাবে না। তাতে ‘প্রাচ্যমুখী নীতি’ অগ্রগতি ব্যহত হতে পারে। চীনসহ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতি হতে পারে। বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিতে স্বাÿর না করে তখন বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে হবে। বাংলাদেশ বাইরে থেকে যাবে। তাতে চট্টগ্রাম বন্দরকে গভীর সমুদ্র বন্দর করার পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এশিয়ান হাইওয়ে বিষয়ে সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপাÿিক চুক্তির আওতায় টেকনাফ থেকে ইয়াংগুন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এর কাজ অনেক এগিয়ে গেছে।

উলেøখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণকাজ এ বছর শুরু হওয়ার কথা। ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তিন পর্যায়ে ২০৫৫ সালের মধ্যে এ নির্মাণ কাজ শেষ হবে। ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০১৫ সালে শেষ হবে এবং ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ ওই বন্দরে পণ্য ওঠানামার কাজ শুরু হবে। উলেøখ্য, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের অবকাঠামোগত অসুবিধার কারণে মাদার ভেসেলগুলো (বড় জাহাজ) সেখানে ভিড়তে পারে না। আমদানি পণ্য নিয়ে মাদার ভেসেলগুলো সিঙ্গাপুরে অবস্থান করে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অপেÿাকৃত ছোট জাহাজগুলো গিয়ে সেগুলো চট্টগ্রামে নিয়ে আসে। রপ্তানি বাণিজ্যও একই প্রক্রিয়ায় সম্পাদন হয়ে থাকে। অথচ চট্টগ্রাম ও সিঙ্গাপুর বন্দরের দূরত্ব ১২শ নটিক্যাল মাইল। একারণে আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের খরচ অনেক বেড়ে যায়। সময়ও বেশি লাগে। কিন্তু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর হলে মাদার ভেসেলগুলো সেখানে নোঙ্গর করবে। ফলে খরচ কমে আসবে, সময়ও বাঁচবে। এতে ভোক্তাদের উপরও দ্রব্যমূল্যের চাপ কমবে। সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। এছাড়া চীনের কুনমিং, মায়ানমার, নেপাল ও ভুটান ও ভারত এ বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। ফলে সোনাদিয়া হয়ে উঠবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আঞ্চলিক কেন্দ্র।

এশিয়ার হাইওয়ে ঃ বাংলাদেশের মধ্যে পথ

এশিয়ান হাইওয়ের বাংলাদেশের মধ্যে তিনটি গতিপথ বা রুট ঠিক করা হয়েছে। প্রথমটি বেনাপোল-যশোর-ঢাকা-কাচঁপুর-সিলেট-তামাবিল। দ্বিতীয়টি বাংলাবান্দা-হাটিকামরুল-ঢাকা-কাচঁপুর--সিলেট-তামাবিল। তৃতীয়টি হচ্ছে মংলা-যশোর-হাটিকামরুল (কুষ্টিয়া লালল শাহ ও যমুনা সেতু হয়ে)-ঢাকা-কাচঁপুর-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ। এরমধ্যে প্রথম দুটি গতিপথ ভারতের মধ্যে থেকে এসে ভারতে শেষ হবে। তিন নম্বর পথটি দিয়ে শুধু মায়ানমার যাওয়া যাবে। তবে মায়ানমারের যেখানে বাংলাদেশের পথ শেষ হয়েছে সেখানে এশিয়ান হাইওয়ের কোন পথ নেই।

ইউএন এসকাপ-এর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৬৫তম বার্ষিক অধিবেশনে বাংলাদেশের পÿ থেকে পর্যবেÿক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান। সেখান থেকে ফিরে তিনি এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যোগ হওয়ার পÿে মত দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইউএন এসকাপ-এর নির্ধারিত পথের ভিত্তিতে এশিয়ান হাইওয়েতে যেতে পারে এবং তা না করলে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়ে থেকে বাদ পড়বে। 

আগের সিদ্ধান্ত ঃ এর আগের কয়েকবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। ২০০৪ এ একবার ও ২০০৫ সালে দুই বার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফকে এশিয়ান হাইওয়ের এক নম্বর পথ হিসেবে দেখানোর জন্য ইউএন এসকাপ-এ প্র¯Íাব দেয়া হয়। কিন্তু কোন চুক্তি করা হয়নি। 

কোন্ কোন্ দেশ আছে ঃ এশিয়ার ২৮টি দেশ ইতোমধ্যে এই চুক্তিতে স্বাÿর করেছে। তারা এশিয়ান হাইওয়ে ব্যবহার করার জন্য একমত হয়েছে। ভারত, পাকি¯Íান, মায়ানমার, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, ভুটান, আফগানি¯Íান, থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, তুরস্কসহ ২৮টি দেশ।

এশিয়ান হাইওয়ে ঃ ২০০৩ সালে প্রথম এশিয়ান হাইওয়ে করা হয়। ২০০৫ সালের জুলাই থেকে এর কার্যকারিতা শুরু হয়। ২০০৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত যে-কেউ ইচ্ছা করলে এই চুক্তিতে স্বাÿর করতে পারতো। সে সময় ২৮টি দেশ স্বাÿর করে। বাংলাদেশ করেনি। এশিয়ান হাইওয়ের মূলত ৮টি প্রধান পথ। এগুলো হলো টোকিও থেকে তুরস্ক (বুলগেরিয়া বর্ডার), ইন্দোনেশিয়া থেকে ইরান, মঙ্গলিয়া থেকে চীন, সাংহাই থেকে তুরস্ক, দÿিণ এশিয়া থেকে মস্কো, ফিনল্যান্ড থেকে ইরান। 

0 comments:

Post a Comment