Sunday, March 11, 2018

বাংলাদেশের বা¯Íবতায় জাতীয় শিশুনীতি ২০১০

বাংলাদেশের বা¯Íবতায় জাতীয় শিশুনীতি ২০১০
আলী ফোরকান 
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় শিশুনীতি, ২০১০-এর খসড়া জনসাধারণের মতামতের জন্য উপস্থাপিত হয়েছে। এর পাঁচটি মূলনীতির ভিত্তি হচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদসহ সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন (এমডিজি) ও বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি পূরণ। একে বলা হয়েছে ‘শিশুদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে একটি সুদূরপ্রসারী রূপকল্প’ এবং জাতীয় সব উন্নয়ন সংক্রান্ত নীতিমালা, কর্মসূচি বাস্তবায়নে ও বাজেট প্রণয়নেও জাতীয় শিশুনীতিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার অঙ্গীকার রয়েছে। তবে জাতীয় শিশুনীতির যে বিষয়গুলো অধিকাংশ সচেতন জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সেগুলো নিয়েই আমার এ লেখা। ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই (যারা মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ) ‘শিশু’ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ‘শিশু’র সংজ্ঞা নিয়ে বাংলাদেশে যে ভিন্নতা ও মতবিরোধ ছিল তার অবসান হবে। তবে এই সংজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে হলে আরও কয়েকটি সরকারি নীতিতে অচিরেই পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের বয়সভেদে যে ভিন্ন চাহিদা রয়েছে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় শিশুনীতির ‘শিশু’র বর্তমান সংজ্ঞা যুগান্তকারী এ কারণে যে, সমাজের একটি ব্যাধি ‘বাল্যবিয়ে’কে এখন থেকে ‘শিশু-বিয়ে’ বলে চিহ্নিত করা যাবে। তবে ১৮ বছর বয়সের কমে বিয়ে বন্ধ করা যাবে সেই নিশ্চয়তা সরকার বা অন্য কেউই দিতে পারবে না। ২০১০-এর জানুয়ারি মাসে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ১১ বছর বয়সী রেশমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল ৫০ হাজার টাকার যৌতুকের বিনিময়ে। বিয়েটি রোধ করা গেলেও বাংলাদেশের হাজারো কন্যাশিশুকে প্রতিদিনই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে। আর তাই তো বাল্যবিয়ে হয় এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান বহুদিন ধরেই তৃতীয়। যদিও আমাদের দেশে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন প্রচলিত সেই ১৯২৯ সাল থেকে। তথাপি এ আইনের যেসব অসঙ্গতি আছে তা আজও দূর করা হয়নি। যেমন, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু বা ২১ বছরের কম বয়সী যুবকের বিয়ে হয়ে গেলে সে বিয়ে অবৈধ গণ্য হচ্ছে না। আবার ১৯৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী স্ত্রীর বয়স যদি ১৩ বছরের ঊর্ধ্বে হয় তবে বিয়ে-পরবর্তী যৌন মিলন ‘ধর্ষণ’ বলে গণ্য হচ্ছে না। এ বিষয়টি ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। অর্থাৎ ১৮ বছরের কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের জন্য বাল্যবিয়ে দেয়ার পরিণামে যে শাস্তির বিধান আছে তাও কখনও কার্যকর হয়েছে কিনা এ সংক্রান্ত উপাত্তও জনগণের সামনে তুলে ধরা হয় না। জাতীয় শিশুনীতি বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন আইনগত দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশে¬ষণ করা প্রয়োজন। আর এ ব্যাপারে সময়োচিত পদক্ষেপ নিলে উচ্চ জš§হার, কিশোরী মাতৃমৃত্যু, রোগব্যাধির বিস্তৃতি যেমন রক্ষা করা যাবে তেমনি শিশুনীতি অনুযায়ী বর্তমানে না হলেও শিশুদের জন্য সুদূরপ্রসারী একটি পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রগুলো সহজ হবে।  জাতীয় শিশুনীতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, সুবিধাবঞ্চিত বা সামাজিক বঞ্চনার শিকার শিশুদের যেমনÑ প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী শিশু শ্রমিক এবং দুর্যোগ আক্রান্ত শিশুদের জন্য দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদনের প্রতিশ্র“তিও রয়েছে এতে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতিশ্র“ত এ কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নে যে ধরনের সমন্বিত ও আন্তরিকতার প্রয়োজন তার কতটুকু বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ঘোষণাও ধন্যবাদার্হ। মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় না বলে আদিবাসী শিশুদের মধ্যে বিদ্যালয়-ভীতি দূর হয় না এবং তাদের মধ্যে বিদ্যালয়ে প্রবেশের হার, শিক্ষার গুণগতমান অর্জন যেমন কম তেমনি ঝরে পড়ার হারও বেশি।  দুর্যোগকালীন শিশুর বিশেষত কন্যাশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের মাধ্যমে আমাদের গবেষণালব্ধ দাবির প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে। তবে শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়টি শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী নয়, দুর্যোগকালীনও যেন ব্যাহত না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আর এজন্য দুর্যোগ-পূর্ব সময় থেকেই প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন রয়েছে, যা নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়নি। শিশুর জš§নিবন্ধন আধিকারটি সর্বজনীন। কিন্তু বাংলাদেশে জš§নিবন্ধন আইনটির গতি একেবারেই শ¬থ। এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে ‘শিশু’র সংজ্ঞা নির্ধারণে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। কারণ, শিশু জšে§র পরপরই তার জš§নিবন্ধন হয় না বলে পরবর্তীকালে অসত্য তথ্য ব্যবহারের প্রচলন রয়েই গেছে। এক্ষেত্রে শিশুবিয়ে বা শিশুশ্রম প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। শিশুশ্রম নিরসনে শিশুনীতিতে প্রতিশ্র“ত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে উলে¬খযোগ্য হচ্ছে, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিয়োগ থেকে বিরত রাখা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় পরিবারের শিশুসন্তানের ওপর দরিদ্র পিতামাতার নির্ভরশীলতার পরিমাণ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে এই নীতিতে কর্মজীবী শিশুদের শিক্ষা, বিনোদন, মাসিক মাসোহারা, পিতামাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ ইত্যাদি বিষয়ের উলে¬খ থাকলেও শিশুশ্রম বন্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেয়া প্রয়োজন। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলোয়েও দরিদ্র শিশুদের বিশেষ চাহিদা পূরণের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করার ওপর জোর দিতে হবে। 
বাংলাদেশে শিশুবিষয়ক কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের কর্মক্ষেত্রে এই মর্মে অঙ্গীকার করতে হয় যে তারা দফতরে যেমন তেমনি গৃহকর্মেও শিশুদের নিয়োগ দেবেন না। এখানে বাঙালিরাও এই শর্ত মেনে চলেন। তবে আবারও বলছি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় শিশুশ্রম রহিত করার অর্থ একটি দরিদ্র পরিবারকে আরও প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। শিশু শ্রমিকের পিতামাতা বা অভিভাবকের জন্য আয়মূলক কাজের নিশ্চয়তা কে দেবে? কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর কারিগরি জ্ঞান বৃদ্ধি, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদফতরের নীতিমালা যুগোপযোগী করা ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা কমাতে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে জাতীয় শিশু নীতিমালাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের শিশু অধিকার রক্ষায় কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে শ্রমজীবী শিশুদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে। কিন্তু গবেষণালব্ধ তথ্য বলে সেই শিক্ষা এত বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রতুল যে ভবিষ্যৎ দারিদ্র্য বিমোচনে তা সফল হবে বলা যায় না। তাছাড়া কর্মজীবী শিশুদের জন্য বেশিরভাগ কর্মসূচিই রাজধানীকেন্দ্রিক এবং তা দেশব্যাপী অবহেলিত শিশুদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে না। যদি শিশুনীতি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হয় তবে তার শুরুটা গ্রামাঞ্চলেই হওয়া উচিত। শিশু ও অভিভাবকদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মসূচি হাতে নিলে ভাগ্যান্বেষীরা ঢাকার ফুটপাতে শিশুদের ব্যবহার করে দু’মুঠো অন্ন জোগানোর সংগ্রাম করত না।  সবশেষে, শিশুনীতির আরও একটি উলে¬খযোগ্য দিক, শিশুদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। অবশ্যই ভালো পদক্ষেপ। তবে যেখানে শিশুর বয়স নির্ধারণ এখনও জটিল এবং কিশোর-যুবরা স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে বিভিন্ন মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে; শোনা যায় অর্থের বিনিময়েও তাদের রাজনৈতিক সভা, মিছিলে যোগ দিতে হয়Ñ সেখানে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে বলেই মনে হয়। তাছাড়া মাধ্যমিক থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রবেশ ও অবস্থানের বয়সসীমা বিবেচনা করলে কলেজ পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি থাকবে না সেই প্রশ্নও সামনে এসে দাঁড়ায়। সার্বিকভাবে কাগজের হরফে ‘জাতীয় শিশুনীতি, ২০১০’ অনেক মানবিক। এ মানবিকতার যথাযথ প্রতিফলন হয়তো আমাদের পরবর্তী প্রজš§ অবলোকন করলেও করতে পারে। আপাতত আমরা কাগুজে ওই সৌন্দর্য নিয়েই মুগ্ধ থাকি। 

0 comments:

Post a Comment