Sunday, March 11, 2018

ঘনিয়ে আসছে গ্যাসের মহাসংকট

ঘনিয়ে আসছে গ্যাসের মহাসংকট
আলী ফোরকান
আমাদের জ্বালানির প্রধান উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস। নতুন কোন গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত না হওয়ার পাশাপাশি ক্রমবধর্মান চাহিদার বিপরীতে যথেচ্ছ উত্তোলনের কারণে দেশের নির্ভরযোগ্য মজুদ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে আসছে। বর্তমানে প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে এর ৫২ শতাংশই ব্যবহƒত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এছাড়া সার কারখানায় ব্যবহার করা হচ্ছে ১৬.৭৭ শতাংশ, বিভিন্ন শিল্প কারখানা ব্যবসা-বাণিজ্য ও আবাসিক এলাকায় ব্যবহƒত হচ্ছে ৩১.৬৬ শতাংশ। গ্যাস ফিল্ডগুলোতে প্রমাণিত ও সম্ভাব্য মিলিয়ে রয়েছে গ্যাস ইনপে¬স ২০.৯৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। উত্তোলনযোগ্য ১৫.১৯ টিসিএফের মধ্যে গত ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত খরচ হয়ে গেছে ৬.৮ টিসিএফ। অবশিষ্ট ৮০৩৯ টিসিএফ মজুদ থেকে এখন গ্যাস উত্তোলন চলছে। বিশ্বব্যাংক প্রণীত গ্যাস সেক্টর মাস্টার প¬ান (জিএসএমপি) থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বর্তমানে প্রমাণিত যে মজুদ আছে তা দিয়ে ২০১০-১১ সাল পর্যন্ত মধ্যমানের চাহিদা পূরণ করা যাবে। আর সম্ভাব্য ২টি ক্যাটাগরির যে মজুদ আছে তা আবিষ্কার করা গেলে ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত চাহিদা পূরণ সম্ভব হতে পারে। জিএসএমপি’র তথ্য মতে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাহিদা পূরণের জন্য অতিরিক্ত ২৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কৃত হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে চাহিদা পূরণের জন্য আর কোন মজুদ অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং এখন থেকে নতুন গ্যাসফিল্ড আবিষ্কারসহ বহুমাত্রিক জ্বালানি ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে হুমকির মুখে পড়বে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। ২০০২ সালেই জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সভা সেমিনারে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ চরম গ্যাস সংকটে পড়বে বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিশেষজ্ঞদের সেই সতর্কবাণী আমলে নিয়ে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ তো করেইনি বরং নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির মাধ্যমে পুরো জ্বালানি খাতকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে যায়। যার দায় জাতিকে বহু বছর টানতে হবে। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে তাদের বিপর্যস্ত করে রেখে যাওয়া গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ খাতের ওপরও। গ্যাসনির্ভর অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের উৎপাদন কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে সার কারখানাগুলোর উৎপাদন বিঘিœত হচ্ছে। সেচ যন্ত্রগুলো বিরামহীন সচল না থাকার বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। ফলে খাদ্য ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে ঘাটতির আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাসনির্ভর শিল্প উৎপাদনও কমে যাচ্ছে আশংকাজনকভাবে। এ কারণে কমে যাচ্ছে রফতানি আয়ও। জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্প, কৃষি, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে। জ্বালানি খাতে বিগত জোট সরকার যে বিপর্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখে গেছে তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর পক্ষে কাটিয়ে ওঠা খুব সহজ হবে না। বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে বর্তমান সরকার ২০২০ সাল পর্যন্ত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তাতে প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে প্রতিদিন গ্যাসের প্রয়োজন হবে ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। খননদাতা সংস্থা ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হওয়ায় অর্থায়নে বড় কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু সমস্যা হবে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি। ফলে সরকারের এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হবে। উলে¬খ করা যেতে পারে, বর্তমানে গ্যাস ফিল্ডগুলোর প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ১ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। দেশে এখন দৈনিক প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। আর এর পেছনে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যয় করতে গিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এদিকে সার উৎপাদন, কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য আবাসিক সব খাতেই গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুতের জন্য অতিরিক্ত এ বিশাল পরিমাণ গ্যাসসহ অন্যান্য খাতের বর্ধিত চাহিদার গ্যাস কিভাবে সংস্থান হবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ২০১১ সাল থেকে নিশ্চিতভাবে দেশে গ্যাসের মহাসংকট শুরু হবে আর ২০১৫ সালের মধ্যে আবিষ্কৃত মজুদ শেষ হয়ে যাবে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাপকহারে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে হবে এবং উত্তোলনের ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি দেশের কয়লা খনির উন্নয়ন ও উত্তোলনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সেইসঙ্গে নিজস্ব জ্বালানির উৎসের বিকল্প সহজ আমদানির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে, গ্যাস ঘাটতির কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। এখন প্রয়োজন গ্যাস সংকট নিরসনে আরও নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত আবিষ্কারের কাজ শুরু করা। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বঙ্গোপসাগরের ওপর প্রাধান্য দিয়ে দেশের তেল গ্যাস সম্পদের অনুসন্ধানে অতিদ্রুত বিডিংয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
দেশে ৭৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জ্বালানি শক্তির সমপরিমাণ কয়লা মজুদ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের খসড়া কয়লানীতিতে এখন থেকে ১০ বছরের মধ্যে বার্ষিক ২০ মিলিয়ন টন, ২০ বছরের মধ্যে বার্ষিক ৪০ মিলিয়ন টন কয়লা তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে এখন থেকেই আমাদের কয়লার কথা ভাবতে হবে। যদিও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়লা পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে। তারপরও কয়লার গুরুত্ব আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া জ্বালানি পাওয়ার একটি অপার সম্ভাবনাময় উৎস হচ্ছে সৌরশক্তি। এ শক্তি ব্যবহার করে দেশে অন্তত ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায় হলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হয়েছে। শুধু সৌরশক্তিই নয়, বায়ুশক্তি ব্যবহার করেও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এরই মধ্যে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় বায়ুশক্তি থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে লোকজন। সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি দিয়ে আমাদের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এসব দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ আর প্রচুর সময়। তবে আপাতত ব্যবস্থা হিসেবে সহজ ও সংক্ষিপ্ত সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস আমদানি করা যেতে পারে। ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ এবং মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।  গ্যাস আমাদের মহামূল্যবান সম্পদ। কিন্তু এ সম্পদ অনিঃশেষিত নয়। নিঃশেষ হওয়াই এর নিয়তি। সুতরাং গ্যাসের মজুদ ও প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দুর্ভোগের চাপ কম পড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাসের নির্ভরশীলতা কমান উচিত। এ ক্ষেত্রে কয়লার ব্যবহার বাড়ান গেলে গ্যাসের বিপুল সাশ্রয় হবে। সার উৎপাদনেও গ্যাসের বিকল্প ব্যবহারের চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতি সচল রাখতে হলে এখনই জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তুলতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া দেশের দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ হচ্ছে একটি দেশের জীবন ও সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি।

0 comments:

Post a Comment