Sunday, March 11, 2018

বিদ্যুৎ গ্যাসসহ অবকাঠামো খাতের সমস্যা প্রবল : দুর্নীতি আর সরকারি অর্থের অপচয়

বিদ্যুৎ গ্যাসসহ অবকাঠামো খাতের সমস্যা প্রবল : দুর্নীতি আর সরকারি অর্থের অপচয়
আলী ফোরকান 
ব্যবসায়ে নিæ প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বেড়াজালে আটকে রয়েছে বাংলাদেশ। গত এক বছরে বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতার কিছু সূচকে উন্নতি ঘটলেও তা প্রতিযোগিতার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো খাতের সমস্যা খুবই প্রবল। অপর্যাপ্ত ও র্দুবল ভৌত অবকাঠামো ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এখনও প্রধান সমস্যা। দ্বিতীয় প্রধান সমস্যাটি হচ্ছে প্রশাসনযন্ত্রের অদক্ষতা। অপর বড় সমস্যাটি হল দুর্নীতি। প্রশসান ও সুশাসনের কিছু কিছু জায়গায় উন্নতি ঘটলেও রাজনীতিকদের মধ্যে আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি অর্থ ব্যক্তিগত কাজে স্থানান্তর, অপচয়, অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি কাজ পাওয়া, বিশেষ শ্রেণীকে সরকারি কাজ পাইয়ে দেয়া ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ঘুষ দেয়ার প্রবণতা এখনও ব্যাপকভাবে চলছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডবি¬উইএফ) প্রকাশিত বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ডবি¬উএএফের পক্ষে বাংলাদেশে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও সিনিয়র গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ বছর বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম। ২০০৯ সালে ১৩৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৬তম। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় একধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। যদিও এবারের সূচকে নতুন করে যুক্ত হওয়া ৬টি দেশকে হিসাবে নিলে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা এগিয়েছে। পুরো ২০০৯ সালকে প্রতিপাদ্য ধরে গত ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল সময়কালে বড় বড় ৯০ জন উদ্যোক্তার ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশটি প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মৌলিক অবকাঠামো সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরের তুলনায় এবার ৬ ধাপ নিচে নেমে গেছে। মৌলিক অবকাঠামো সূচকে পিছিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা সার্বিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছি। অথচ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করায় আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী দেশগুলো ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন শ্রীলংকা। দেশটি সার্বিক বিশ্ব প্রতিযোগিতার সূচকে (জিসিআই) ৭৯তম অবস্থান থেকে ১৭ ধাপ এগিয়ে এবার ৬২তম অবস্থানে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, মানবসম্পদ, আইসিটি, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে বাংলাদেশ গত এক বছরে বেশ এগিয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের অত্যন্ত বাজে অবস্থান রয়েছে। অবকাঠামোয় বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল ১০টি দেশের একটি বাংলাদেশ। জরিপে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সরকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটার বাস্তবায়ন তারা দেখেনি। উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলেও তারা মনে করেন। তাদের মতে, সড়ক যোগাযোগে আমরা পিছিয়ে গেছি। বন্দরের উন্নতির বিষয়টিও আগের জায়গায় আটকে রয়েছে। জরিপে দেশের শীর্ষ বেসরকারি উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দেশে দুর্নীতির বিষয়ে অগ্রগতি থমকে গেছে। রাজনীতিকদের মধ্যে এখনও আর্থিক দুর্নীতি এখনও ব্যাপক। বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেয়ার প্রবণতা রয়ে গেছে। দুর্নীতি, নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে তেমন কোন উন্নতি ঘটেনি। রাজনীতিকদের আর্থিক দুর্নীতি ও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি কাজ পাওয়া থেমে নেই। ব্যবসায়ীদের প্রায় ৮৬ শতাংশই এমনটি মনে করেন। সরকারি তহবিলকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা, সরকারি অফিসে ঘুষের প্রবণতা এখনও ব্যাপকভাবে চলছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে আগের মতোই উৎকোচ দিতে হচ্ছে। সারাবিশ্বে একযোগে প্রকাশিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ বছরও জিসিআই সূচকে এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। সুইডেন গতবারের চতুর্থ অবস্থান থেকে এবার দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে। আর এবারও সিঙ্গাপুরের অবস্থান তৃতীয় স্থানেই রয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনের অবস্থান এবার ২৭তম, ভারত ৫১তম, পাকিস্তান ১২৩তম, ভিয়েতনাম ৫৯তম, ইন্দোনেশিয়া ৪৪তম। বাংলাদেশের এবারকার অবস্থান সম্পর্কে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রতিযোগিতার দক্ষতায় আমরা অনেক জায়গায় পিছিয়েছি, অনেক জায়গায় থমকে গেছি। আবার অনেক জায়গায় এগিয়েছিও। তবে সবকিছু মিলিয়ে দৌড়ানোর মতো যথেষ্ট বল আমাদের ছিল না। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সূচকের কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল এসেছে। কিন্তু সার্বিকভাবে অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের তুলনা করতে হবে। তাদের তুলনায় আমাদের উন্নতি হচ্ছে না। অথচ তাদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশের বাজারে প্রতিনিয়ত আমাদের প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে হচ্ছে। ডবি¬উইএফের পক্ষে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের ওপর সিপিডির করা জরিপে দেখা যায়, ব্যবসায় প্রধান বাধাগুলোর ক্ষেত্রে আগের বছরের দ্বিতীয় অবস্থান থেকে দুর্নীতি এ বছর তৃতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে। যদিও দুর্নীতি আগের মতোই। ব্যবসায়ে আগের বছর তৃতীয় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সরকারি আমলাতন্ত্র এ বছর দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। অবকাঠামো খাতের সমস্যা গত বছরের মতো এবারও এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা (২৩ দশমিক ৮ শতাংশ)। ব্যবসায় প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ নীতি স্থিতিশীল না থাকা, অর্থায়নের সুযোগ না থাকা, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল, কর কাঠামো, সরকারি অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত বিধিমালা, মূল্যস্ফীতি, চুরি, অন্যান্য অপরাধ ইত্যাদি। 

0 comments:

Post a Comment