রাজধানীর রেলক্রসিং এর কন্ট্রোল রুমে কি হচ্ছে?
আলী ফোরকান
রাজধানীর বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে রেলগেটকে সুরÿিত রাখার গুরুদায়িত্ব গেটম্যানদের হলেও বা¯Íব তারা জড়িয়ে পড়েছেন নানা অপরাধে। রেলক্রসিংয়ের ছোট্ট কন্ট্রোল রুমগুলো সন্ধ্যায় পরিণত হয় গেটম্যানদের জুয়ার আখড়ায়। সন্ধ্যা পার হলে এখানে বসে মদ ও জুয়ার আসর। আর রাত গভীর হলে চলে মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি। টহল পুলিশ ও এলাকার উঠতি সন্ত্রাসীরা যোগ দেয় এতে। অন্যদিকে, পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে রেলক্রসিংয়ের দুপাশে তরকারি, ফলের দোকান, চায়ের দোকান ও অবৈধ স্থাপনা বসিয়ে রমরমা বাণিজ্য করছেন এই গেটম্যানরা। সায়েদাবাদ, মগবাজার, মালিবাগসহ বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
অন্যদিকে, অনেক গেটম্যানই চাকরির পাশাপাশি রিকশা চালান, কেউবা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আবার কেউ কারওয়ান বাজারে মিনতির কাজ করে থাকেন। আবার অনেক সময় অনেক গেটম্যান হিসেবে সরাসরি নিজে দায়িত্ব পালন না করে ছোট ছেলেদের দিয়ে ট্রেন আসার আগে গেট ওঠানামা করান। তাদের দায়িত্বে অবহেলা ও বিশৃঙ্খলার ফলে অনেক সময় রেলক্রসিংগুলোতে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। অথচ রাজধানীর প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে ১২ জন থেকে ১৫ জন গেটম্যান রয়েছেন। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে মোট ১৯টি রেলক্রসিংয়ে মোট ২৫৫ জন গেটম্যান কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে ৩৬ জন স্থায়ী এবং বাকি ২১৯ জন অস্থায়ী গেটম্যান। রাজধানীর সায়েদাবাদ রেলক্রসিংয়ে ৩ শিফটে ১৫ জন গেটম্যান দায়িত্ব পালন করেন। এদের মধ্যে আব্দুল কুদ্দুস, নাজির আহমেদ ও কালাম স্থায়ী গেটম্যান। বাকি ১২ জন অস্থায়ী গেটম্যান। গত কয়েকদিন আগে সায়েদাবাদে ট্রেন-বাস দুর্ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার কারণে গেটম্যান আবুল কাশেমকে মহাখালীতে বদলি করা হয়। তার জায়গায় মহাখালী থেকে বদলি করে আনা হয় আব্দুল কুদ্দুসকে। ওই দুর্ঘটনায় গেটম্যান জুয়েলসহ ৬ জন নিহত ও প্রায় ৩৫ জন আহত হন।প্রকাশিত খবরের সুত্র মতে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে অস্থায়ী এক গেটম্যান বলেন, গেটম্যান কালাম ও কাশেমসহ কয়েকজন গেটম্যান কন্ট্রোলরুমে রাত ১০/১১টার পর মদ ও জুয়ার আসর বসান। গভীর রাতে মেয়েমানুষ নিয়েও ফুর্তি করা হয়। একই অভিযোগ করেন বেশ কয়েকজন এলাকাবাসী। তারা বলেন, প্রায় প্রতি রাতেই রেলক্রসিংয়ের কন্ট্রোলরুমে জুয়ার আসর বসে। মধ্যরাতে চলে মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি। টহল পুলিশও এদের সঙ্গে জড়িত। তবে গেটম্যান কালাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শুনেছি এক সময় এসব হতো। এখন হয় না। এলাকাবাসী ফারুক, আকতার, জুয়েল অভিযোগ করে আরো বলেন, রেললাইনের দুপাশে তরকারি, ফলের দোকান, চায়ের দোকান ও অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন বাণিজ্য করেন এই গেটম্যানরা। রেলওয়ের অফিসারদের জ্ঞাতসারেই এই বাণিজ্য চলে এবং তারাও এর ভাগ পান বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর গত ৫ অক্টোবর সায়েদাবাদ রেলক্রসিংয়ের দুপাশে অবৈধ স্থাপনায় উচ্ছেদ অভিযান চালান রেলওয়ের এস্টেট অফিসার মোঃ মুজিবুর রহমান। এতোদিন কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কিছুদিন পরপরই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলি। কিছুদিন যেতে না যেতেই সুবিধাভোগী কিছু লোক রেলক্রসিংয়ের জায়গা দখল করে দোকানপাট তৈরি করে। আমরা আবার উচ্ছেদ অভিযান চালাই। লোকজন ভাবে সরকারি জায়গা দখল করা সহজ, তাই দখল করে। রেলক্রসিংয়ের কন্ট্রোলরুমে গেটম্যানরা জুয়ার আসর বসায় কিনা আমার জানা নেই। এটা আমাদের দেখার বিষয়ও নয়। গেটম্যানদের দেখভাল করেন ইঞ্জিনিয়াররা। অভিযোগ রয়েছে, এস্টেট অফিসারদের যোগসাজশে গেটম্যানরা রেলক্রসিংয়ের দুপাশে অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বসিয়ে রমরমা বাণিজ্য করে থাকেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে মুজিবুর রহমান বলেন, এস্টেট অফিসারদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগটি সত্য নয়। কোথাও অবৈধ স্থাপনা করা হলেই আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে তা ভেঙে ফেলি। এদিকে, সায়েদাবাদ রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার জন্য রেলক্রসিং লাগোয়া বাসস্ট্যান্ডকেও অনেকাংশে দায়ী করলেন গেটম্যানরা। গেটম্যান আব্দুল কুদ্দুস ও নাজির আহমেদ জানান, রেলক্রসিং লাগোয়া বাস্টস্ট্যান্ড থাকায় এখান থেকে দূরপালøার গাড়ি বের করার সময় রেলক্রসিংয়ে লম্বা গাড়ির জট লেগে যায়। ট্রেন দেড় কিলোমিটার দূরে থাকতেই আমরা অটো বেলের মাধ্যমে ট্রেন আসার সংকেত পাই। কিন্তু ওই অল্প সময়ের মধ্যে গাড়ির জট সরিয়ে গেট ফেলতে হিমশিম খেতে হয়। অন্যদিকে, রেললাইনের পাশ দিয়ে বাসগুলোকে এমনভাবে রাখা হয়েছে যে, গোপীবাগের দিক থেকে ট্রেনটিকে ৫০০ গজ দূর থেকে দেখা যায় না আড়ালে থাকায়। এই দুই কারণেও অনেক সময় দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। গেটম্যান ও এলাকাবাসীরা মনে করেন, সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডটি রেলক্রসিংয়ের পাশ থেকে সরিয়ে নেয়া উচিত। ওদিকে, মগবাজারে রেলক্রসিংয়ে মোট ১২ জন গেটম্যান রয়েছে। এদের মধ্যে মনির, আমিরুল ও শামসু স্থায়ী গেটম্যান। বাকি ৯ জন অস্থায়ী গেটম্যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২ জন গেটম্যান জানান, এখানেও কন্ট্রোলরুমে রাতের আঁধারে মদ ও জুয়ার আসর বসে। মধ্যরাতে চলে নারী নিয়ে ফুর্তি। পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে রেলক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে বেশ কিছু চায়ের দোকান বসিয়ে রমরমা ব্যবসা চালানো হচ্ছে। তবে স¤প্রতি রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার পর এগুলো কমেছে। সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, রেলক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে ৪/৫টি চায়ের দোকান রয়েছে। এখানকার অস্থায়ী গেটম্যানরাও চাকরির পাশাপাশি কেউ রিকশা চালান, কেউবা কারওয়ান বাজারে মিনতির কাজ করেন। তবে এ ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে জানান অস্থায়ী গেটম্যান ইউসুফ। তিনি জানান, একজন অস্থায়ী গেটম্যান মাত্র ২৪ শত টাকা বেতন পান। এ দিয়ে জীবন চলে না। বাধ্য হয়েই অন্য কাজ করতে হয়। ইউসুফ আরো বলেন, অস্থায়ী গেটম্যানের চাকরি নিতে হলে রেল অফিসারদের ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। আর স্থায়ী হতে গেলে ৩/৪ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। স্থায়ী গেটম্যানরা ১২/১৩ হাজার টাকা বেতন পান। পাশাপাশি তারা কলোনির ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে আরো ১২/১৩ হাজার টাকা আয় করেন। তাদের বাইরে কাজ না করলেও চলে। প্রতিদিন ডিউটি করার পরও অফিসাররা ইচ্ছে করেই আমাদের মাসে ২ দিন অনুপস্থিত রাখেন। আমাদের হাজিরা শিট প্রতি মাসের ১৪ তারিখে হেড অফিসে যায় এবং ফিরে আসে ১৬ তারিখে। ফলে ২ দিন হাজিরা খাতায় নাম ওঠে না। এর ফলে বছরে ২৪ দিন অনুপস্থিত থাকতে হয়। যে কারণে চাকরিতে স্থায়ী হতে ঝামেলা পোহাতে হয়। মগবাজারের মতো মালিবাগ রেলক্রসিংয়েও ১২ জন গেটম্যান রয়েছেন। এখানেও রেলক্রসিয়ের দুপাশে রয়েছে ৮/১০টি চায়ের দোকান। পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে রেললাইনের দুপাশের দোকান বসিয়ে গেটম্যানরা রমরমা বাণিজ্য করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে কন্ট্রোলরুমে রাতের আঁধারে বসে নেশার আসর। তবে গেটম্যান মোঃ আব্দুল মতিন এসবে গেটম্যানদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রেললাইনের দুপাশে বেশ কিছু চায়ের দোকান রয়েছে। সেগুলো স্থানীয় নেতারা বসিয়ে ফায়দা নিচ্ছে। এর সঙ্গে আমরা জড়িত নই। সে ÿমতাও আমাদের নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক গেটম্যান বলেন, রাতে কখনো কখনো কন্ট্রোলরুমে নেশার আসর বসে ঠিক। স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী তা জোরপূর্বক করে থাকে। তারা এতোটাই শক্তিশালী তাদের বিরুদ্ধে গেটম্যানদের প্রতিবাদ করার সাহস নেই। মহাখালী, তেজগাঁওসহ রাজধানীর অন্য রেলক্রসিংয়েও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।আমরা আশাকরি সংশিøষ্ট কতৃপÿ এদিকে কটোর নজর দিবে।
0 comments:
Post a Comment