জেলেদেরকে জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচান
আলী ফোরকান
ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল ও হাওর নিয়ে এদেশ গঠিত। এছাড়া বাংলাদেশের দÿিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর ও বিশ্বঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন সুন্দরবন। সুন্দর বনের পাশ ঘেঁষে যেসব জেলা প্রবাহিত তন্মধ্যে অন্যতম হলো বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বাগেরহাট ও সাতÿীরা জেলা। উলিøখিত জেলার অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি (প্রায় ৫০%)। তারপরে একটা বড় অংশের লোকের পেশা মৎস্য শিকার। তবে গত এক দশক ধরে কৃষি মজুরি তুলনামূলক বৃদ্ধি না পাওয়ায় এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে জীবনের ঝুঁিক নিয়ে হলেও অধিক আয়ের আশায় প্রাকৃতিক ঝড়ঝঞা পেরিয়ে সাগরে কিংবা নদীতে মৎস্য আহরণের পেশাকে বেছে নেয়। জীবন ধারণের অন্য কোন পথ না থাকায় একটা বড় অংশ শহরে পাড়ি জমায়। সাগরে মৎস্য আহরণে দেশী জেলে নৌকার পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ট্রলার সংযোজিত হওয়ার পর থেকে গত দুই দশক ধরে উপকূলে এ সেক্টরের প্রসার ঘটে ব্যাপকভাবে। পাশাপাশি আগের চেয়ে ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া বিশ্ব আবহাওয়া পরিবর্তনের রেশ এ অঞ্চলেও প্রায়ই জেলেদের জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। তারপরও জীবন জীবিকার তাগিদে পরিবার পরিজনকে রেখে এইসব জেলেরা মহাজনের হাত ধরে সাগরে চলে যায়। মহাজন শ্রেণী নৌকা, জাল, রসদ কিনে দেয় ঠিকই, তবে তা বিনিয়োগ হিসেবে নয়, দাদন হিসাবে। দাদন দেবার সময়ই শর্ত থাকে পুরো মওসুম জুড়ে যত মাছ শিকার করা হবে তা সবই মহাজনকে দিতে হবে তার নির্ধারিত মূল্যে। এÿেত্রে উপকূল এলাকার জেলেদের মুখ থেকে জানা যায় মহাজনরা দাদনের বেড়াজালে জেলেদেরকে আটকিয়ে বাজার দরের চেয়ে অনেক কম মূল্যে মাছ কিনে নেয়। মাছ না পাওয়া, ঝড়ে জান-মাল বিপন্ন হওয়া কিংবা জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হওয়া এসবের দায় বহন করতে হয় অধিকাংশ ÿেত্রেই জেলেদের। ভুক্তভোগী জেলেদের সাথে কথা বলে জানা গেছে জলদস্যুরা অনেক সময় মুক্তিপণ নিয়ে পালবিহীন নৌকা কিংবা ট্রলারে করে সুন্দরবনের পাশ দিয়ে সাগরের দিকে যেতে বলেন এবং মোবাইলে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, ডাকাত দলের সুবিধামতো জায়গা থেকে মুক্তিপণ নিয়ে সংশিøষ্ট ব্যক্তিকে ছেড়ে দেন। আবার বেশ কয়েকজন জেলের মুখে শোনা গেছে জলদস্যুরা মোবাইলে ভুক্তভোগী লোকদের পরিবারকে জানিয়ে দেয় অমুক শহরের ‘ক’ হোটেলের সামনে অমুক রঙের শার্ট পরিহিত লোক দাঁড়িয়ে থাকবে একজন গিয়ে ওদের কাছে মুক্তিপণের নির্ধারিত টাকা প্রদান করবে। কোন প্রকার চালাকির আশ্রয় নিলে আটককৃত জেলের প্রাণ চলে যাবে। ভুক্তভোগী জেলেদের অধিকাংশেরই বাড়ি বরগুনা জেলার পাথরঘাটার চরপদ্মা, বাদুরতলা, রুহিতা, হরিণঘাটা, হাড়িটানা, টেংরা, চরদুয়ানী; বরগুনা সদরের নিশানবাড়ীয়া, নিদ্রা, ছকিনা, নলী; তালতলী উপজেলা; পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, খেপুপাড়া; পিরোজপুরের মাছূয়া, তুষখালী, চরখালী; বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, রায়েন্দা নামক পলøীতে। এত ভয়াবহ চিত্রের পরও ঐখানকার জেলে সম্প্রদায় বিকল্প পেশা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যায়। একদিকে দাদনের টাকা, অন্যদিকে মুক্তিপণের টাকা শোধ করতে করতে উপকূলীয় মৎস্যজীবীরা ঋণভারে ন্যুব্জ। এ জেলে সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয় ÿুদ্র ঋণ প্রদেয় এনজিওদের হাতে এবং মহাজনী সুদি ব্যবসার জাটাজলে। উপক‚লীয় এলাকার জেলে পলøীগুলো বিভিন্ন এনজিওর ÿুদ্র ঋণ কর্মসূচীর সফল উর্বর ÿেত্র হিসাবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যা গত ২৫ জানুয়ারি ইত্তেফাকে নাসিম আলীর প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাধ্য হয়েই পরিবারকে ঋণমুক্ত করা ও জীবিকা নির্বাহের কঠোর তাগিদে জেলে পলøীর তরুণ কর্মÿম সন্তানটি পূর্বপুরুষের পেশা পরিবর্তন করে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। জেলেদের এমন দুঃসহ জীবনে প্রকৃতিও অনুকূলে থাকেনি। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর হঠাৎ করে বাংলাদেশের দÿিণাঞ্চলের বিশেষ করে উপকূলীয় জেলাগুলোর উপর দিয়ে বয়ে গেল মহাপ্রলয়ংকরী সিডর যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ২৫০/২৬০ কিঃমিঃ। সিডরের তান্ডবে উপকূলীয় এলাকার সকল শ্রেণীর মানুষ ব্যাপকভাবে ÿতিগ্র¯Í হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশী ÿতিগ্র¯Í হয়েছে জেলে শ্রেণী। কেননা তার জীবিকার একমাত্র বাহন নৌকা, ট্রলার, জাল হারিয়ে জেলেরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনেক জেলে যারা সংকেতকে পাত্তা না দিয়ে সাগরে ছিল তারা কেউ ফেরেনি। উপকূলের স্বামীহারা সেইসব মহিলাদের আজও দেখা যায় স্বামীকে ফিরে পাবার আশায় সাগরের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করতে। যারা সবকিছু হারিয়ে প্রাণে বেঁচে আছেন সেইসব জেলেরা আবার নতুন করে মহাজন শ্রেণীর দাদন নিয়ে কিংবা নতুন কোন ঋণের বোঝা নিয়ে সাগরে নেমে পড়েছেন জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু দুঃখ দ্বারাই যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কীসের? আবারও সেই জলদস্যুর অত্যাচার, মুক্তিপণ আদায় এবার আরও বেড়ে গেল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় সরকারি প্রশাসন, বনবিভাগ, এলাকার জনপ্রতিনিধিসহ প্রায় সকলেই বিষয়টি অবগত থাকা সত্তে¡ও এ পর্যন্ত কোন পদÿেপ তারা গ্রহণ করেননি। গত ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজোট সরকার ÿমতায় আসার পর দÿিণ বঙ্গের ঐসব অসহায় জেলে সমাজ নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছেন তারা অচিরেই জেলেদেরকে জলদস্যুদের অত্যাচার থেকে রেহাই দিবেন এবং সত্যিকার অর্থেই দিন বদলের সূচনা করবেন। উপকূলীয় এলাকা ঘুরে এবং জেলেদের সাথে কথা বলে সম্ভাব্য কিছু সুপারিশ জানা যায় যার মধ্যে সুন্দরবন যাতে মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় না থাকে এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে স্থায়ী কোস্টগার্ড কিংবা নৌবাহিনীর জাহাজ স্থাপন করে এবং জেলেদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানকারী কোন সংগঠন সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠা করলে জেলে সম্প্রদায় তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান পালন করতে পারবেন।
0 comments:
Post a Comment