জলদস্যুদের টোকেন ছাড়া জেলেরা সাগরে যেতে মানা
আলী ফোরকান
বঙ্গোপসাগরে জেলেদের মাছ ধরতে যেতে হচ্ছে জলদস্যুদের টোকেন নিয়ে। জনপদ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সাগরবÿে জলদস্যুদের অত্যাচার-নিপীড়ন কোন নতুন ঘটনা নয়। সাগরে ইলিশ ধরার মওসুমে জলদস্যুদের উৎপীড়ন চলে সবচেয়ে বেশি। এজন্যে নিরাপদে মাছ ধরার জন্য জেলেরা বাধ্য হয়ে দস্যুদের নির্ধারিত চাঁদা দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করে সাগরে নামছে। এখন চলছে মাছ ধরার মওসুম। একই সাথে সশস্ত্র জলদস্যুরাও দÿিণ বঙ্গোপসাগর এলাকায় তৎপর। প্রতি মওসুমে বঙ্গোপসাগরের একটি বিশাল এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এরা কখনো কখনো জেলের বেশে সাগরে দস্যুবৃত্তি করে থাকে। অথৈ সাগরে দস্যুরা অস্ত্রের মুখে জেলেদের জিম্মি করে তাদের আহরিত মাছ, জাল, টাকা-পয়সাসহ সব কিছু কেড়ে নেয়। কখনো আবার তাদের ট্রলারও ছিনতাই করে। সাগরবÿে জেলেদের নিÿেপ করার ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। জেলেদের ট্রলারের চেয়ে বেশি শক্তির ইঞ্জিন লাগিয়ে তারা সাগরে বিচরণ করে। সুযোগমত তারা জেলেদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। গত এক মাসে বঙ্গোপসাগর এলাকায় অন্তত ৩৪টি জলদস্যুদের মাছ ধরা ট্রলারে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় জেলেদের মাছ, টাকা, জ্বালানি লুট করে নেয় জলদস্যুরা। একই সময় দস্যুরা অন্তত ৪৬জন জেলেকে অপহরণ করে। গত ২৫ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরের হরিণঘাটা নামক স্থান থেকে ১৫জন জেলেকে অপহরণ করা হয়। এর আগে ১৬ জানুয়ারি গভীর সাগরের গাঙ্গেরআইন নামক স্থান থেকে ৩১জন জেলেকে জলদস্যুরা অপহরণ করেও মুক্তিপণের দাবিতে জেলেদের সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে তাদের গোপনআ¯Íানায় নিয়ে আটকে রাখে। একেকজন জেলের মুক্তির জন্য ২০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়। দস্যুদের নির্দেশ অনুযায়ি জেলেরা মোবাইল ফোনে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নিকট নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে মুক্তিপণের টাকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনার কথা জানায়। উপায়ান্তর না পেয়ে আত্মীয়রা মাথাপিছু ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে অপহৃতদের মুক্ত করে নিয়ে আসে। জলদস্যুদের কবল থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরে আসা ভান্ডারিয়ার চরখালি গ্রামের হাবিব মৃধা (৫০) ইত্তেফাককে জানান, সাগর থেকে অপহরণ করে নিয়ে তাদের সুন্দরবনের গভীরে জিম্মি করে রাখা হয়। জলদস্যুরা তাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালায়। ১০দিন জিম্মি থাকার পর ৪০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দিয়ে তিনি ও তার কয়েকজন সঙ্গী জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পান। অপর একটি সূত্র জানায়, মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কেউ কেউ জলদস্যুদের হয়ে কাজ করে। সাগর থেকে কোন জেলেকে অপহরণ করা হলে তারা দালালীর কাজ করে। তারা তখন অপহৃত জেলেদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আবার কখনো কখনো জলদস্যুরা তাদের ঐ দালালদের নাম বলে দিয়ে মুক্তিপণের অর্থ তাদের নিকট দিতে বলে। দাবিকৃত টাকা পেয়ে দালালরা ফোনে ‘প্রাপ্তীস্বীকার’ খবর দেয়ার পর আটক জেলেদের মুক্তি দেয়া হয়। কিছুদিন যাবৎ জলদস্যুরা নতুন এক প্রথা চালু করেছে। যেসম¯Í ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যাবে তাদের আগাম চাঁদার টাকা দিয়ে টোকেন নিতে হবে। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের সামনে পড়লে তাদের ঐ টোকেন দেখালে আর কোন ঝামেলায় পড়তে হবে না। এক একটি ট্রলারকে সাগরে নামার আগে জলদস্যুদের এজেন্টদের ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। ট্রলারের আকার ও জেলেদের সংখ্যার উপর এ টাকার অঙ্ক নির্ভর করে। আর এই টোকেন ছাড়া কোন ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে গেলে তাদের বিপদে পড়তে হয়। জলদস্যুদের টোকেনগুলোতে বিশেষ বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। কোনটির এক পাশে কোন প্রাণী বা ইলিশ মাছের ছবির সিল মারা থাকে। কোন টোকেনে ফুলের ছবি অথবা গোপন কোড নম্বর লেখা থাকে। এগুলো জলদস্যুরা দেখলেই বুঝতে পারে ঐ ট্রলার কোন এলাকা থেকে এসেছে এবং কার কাছে টাকা দিয়েছে। অধিকাংশ টোকেনের নিচে লেখা থাকে ‘কার্ড না করে নামলে সমস্যা হবে।
0 comments:
Post a Comment