সীমান্তে ভারতের আড়াই হাজার মাইল দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া
আলী ফোরকান
স্নায়ুযুদ্ধের সময় পূর্ব জার্মানি পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে তার সীমান্তে দুর্ভেদ্য কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ করেছিল। ইতিহাসে এ দেয়াল বার্লিন দেয়াল নামে পরিচিত। ১৯৮৯ সালের ১৬ নভেম্বর বার্লিন দেয়ালের পতন ঘটে। অভিশপ্ত বার্লিন প্রাচীরের পতন ঘটলেও এখনো মানবজাতি অনুরূপ দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়ছে। বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া হচ্ছে তার একটি। দেশটি প্রতিবেশি বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর আড়াই হাজার মাইল দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করছে। বাইরের দেশের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় নয়াদিলøী এ উদ্যোগ নিয়েছে। পন্ডিধর হচ্ছে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যের একটি গ্রাম। এ গ্রামে আধাপাকা ও বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ির সংখ্যা ১৮টি। পন্ডিধরের ১৯৫ জন অধিবাসী মাছ, ভাত খেয়ে বেঁচে থাকে। শিশুরা শাক-সবজি ও ডালের চেয়ে বেশি কিছু খেতে পারে না। খুব কম সংখ্যক শিশু স্কুলে যায়। শ্রমিকদের বহন করে নিয়ে আসার জন্য ইছামতি নদীর অপর পাড়ের একটি পাকা ফ্যাক্টরি থেকে নৌকা পাঠানো হয়। অন্যরা শহরেই বসবাস করে। ভৌগোলিক বা¯Íবতা এসব সাধারণ মানুষের জীবনে এ বিড়ম্বনা ডেকে এনেছে। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত রেখা টানা হয়। পন্ডিধর গ্রামের অধিবাসী ফজলুর রহমানের কাঁচা ঘরের সামনে দুই দেশের সীমান্ত। তার ছোট ভাই বাস করে খুব কাছেই। তবে তার বসতবাটি বাংলাদেশে। ফজলুর রহমানের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার ছোট ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের কোনো তফাৎ নেই। পন্ডিধর গ্রামের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে। কখনো আম কুড়াতে অথবা সুপারি গাছে চড়তে তারা এমন করে থাকে। কয়েকশ’ মিটার দূরে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সীমান্ত রÿীরা টহল দেয়। শিশু ও তাদের পিতামাতারা সীমান্তের এ বা¯Íবতাকে অমান্য করতে পারে না। এক নম্বর পিলারের কাছে পন্ডিধর গ্রাম। সেখান থেকে দুই দেশের স্থল সীমান্ত শুরু হয়েছে। বিগত ৬০ বছর ধরে এসব সীমান্ত পিলারই হচ্ছে দুইটি দেশের স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক। তবে এখন সীমান্ত বরাবর কংক্রিটের কাঁটাতারের বেড়াও নির্মাণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও অন্যান্য দেশের অনুকরণে ভারত সীমান্তে প্রতিরÿা প্রাচীর নির্মাণ করছে। ভারত মনে করছে, সীমান্তের ওপার থেকে সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে এ দেয়াল একটি প্রতিরÿা প্রাচীর হিসাবে কাজ করবে। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শেষ হলে বাংলাদেশ প্রায় ঘেরাও হয়ে যাবে। একসময় বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের ভারত স্বাগত জানাতো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। তখন লাখ লাখ বাঙ্গালী শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। টাইমের মতে, তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শরণার্থী ভারতে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। এক পর্যায়ে শরণার্থীদের সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত হলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ দুই-তৃতীয়াংশ শেষ হয়েছে। অবৈধ অভিবাসী ও সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ বন্ধে তিন বছর আগে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু হয়। মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলা এ বেড়া নির্মাণের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি আÿরিক অর্থে ভারতের নিরাপত্তা সমস্যার একটি বা¯Íব সমাধান হিসাবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যের সীমান্ত খুব সামান্য। তবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আসামে বাংলাদেশী অভিবাসী বিরোধী ভাবাবেগ বেশি। বাংলাভাষী মুসলমানরা একসময় মৌসুমী কৃষি শ্রমিক হিসাবে আসামে যেতো। তাদের মজুরির পরিমাণ ছিল কম। টাইম লিখেছে তাদের সংখ্যা এখন রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাভাষীদের সংখ্যা তাদেরকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। ফলে তাদের নিয়ে উদ্বেগ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। অসমীয়রা মনে করে যে, বাংলাভাষীরা রাজ্যের সকল চাকরি দখল করছে। বাংলাভাষী মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধিকে সংখ্যাগুরু অসমীয়দের প্রতি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হুমকি হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। অসমীয়দের বেশির ভাগই হিন্দু। তবে বাংলাভাষী মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অসমীয় হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। জাতিগত অসমীয় রাজনৈতিক দল এবং ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রæপগুলো অভিবাসন বিরোধী এজেন্ডা গ্রহণ করেছে। গত বছরের ৩০ অক্টোবর আসামের রাজধানী গৌহাটিতে সিরিজ বোমা হামলায় ৬০ জনের বেশি লোক নিহত হয়। পুলিশ এ বোমা হামলার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী বোড়ো বিদ্রোহীদের দায়ী করছে। বোড়ো বিদ্রোহীরা স্বাধীন বোড়োল্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। তারা স্থানীয় মুসলমানদের সঙ্গে রক্তÿয়ী সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। লুঙ্গি অথবা দাড়ি রাখলেই অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী হিসাবে সন্দেহ করা হয়। সীমান্তরÿী বাহিনীর (বিএসএফ) উপর অবৈধ অভিবাসীদের আগমন এবং সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় জঙ্গি গ্রæপগুলোর আসামে অনুপ্রবেশ বন্ধের দায়িত্ব ন্য¯Í করা হয়েছে। এ অঞ্চলে ১ লাখ ৬০ হাজার বিএসএস মোতায়েন রয়েছে। তাদের মধ্যে অর্ধেক মোতায়েন করে রাখা হয়েছে আসামের সঙ্গে বাংলাদেশ সীমান্তে। ধুবড়ি শহরের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের একটি সংযোগ হচ্ছে বাংলাদেশ ও আসামের মধ্যকার বৃহত্তম প্রবেশদ্বার। বিএসএফ সদস্যরা সেখানে স্পীডবোট দিয়ে ২৪ ঘণ্টা টহল দেয়। দূরবর্তী গ্রামের শ্রমিকদের ফেরিতে করে ধুবড়ি, গৌহাটি ও শিলিগুড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। বিএসএফ প্রতিটি ফেরিতে তলøাশি চালায়। বাংলাদেশীদের প্রবেশ রোধে যাত্রীদের কাগজপত্র পরীÿা করা হয়। সূর্যা¯েÍর পর নৌকা চলাচলের অনুমতি দেয়া হয় না। ব্রহ্মপুত্র নদের এখানে-সেখানে চর। মৌসুমী বৃষ্টিপাতে চরের সীমানার পরিবর্তন ঘটে। কোনো কোনোটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ফলে চরে বসবাসকারী লোকজনকে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে স্থানান্তরিত হতে হয়। এসব লোকজনের ব্যাপারে বিএসএফকে খোঁজ নিতে হয়। কোথাও নতুন ঘর তোলা হলে সংশয় সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো চরে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে। গত বছর অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের জন্য ৪ হাজার ৯শ’ লোককে গ্রেফতার করা হয়। অথচ ২০০৫ সালে গ্রেফতার করা হয়েছিল ১০ হাজার লোককে। আসাম ও মেঘালয়ের বিএসএফ প্রধান পি কে মিশ্র তার কাজ কতটুকু কঠিন তা বুঝেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে নির্মিত বেড়া পরিদর্শন করেছেন। এ বেড়া পরিদর্শন শেষে তিনি বুঝতে পেরেছেন অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করা কত কঠিন কাজ।
0 comments:
Post a Comment