কিশোর অপরাধীদের নিয়ে ভাবতে হবে
আলী ফোরকান
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে যে, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত কম বয়সী ছেলেরা। অনেক ÿেত্রেই তাদের বয়স ১৮-এর নিচে। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী ১৮ পর্যন্ত সকল মানব সন্তানকেই শিশু হিসেবে ধরতে হবে। শিশুদের বিবেচনা করা হয় নিরপরাধ হিসেবে। কিন্তু যখন ১৫-১৬ বছরের ছেলে-মেয়ে অপরাধ করে তখন এক শ্রেণীর মানুষ তাদের শিশু হিসেবে বিবেচনা করার বিরোধিতা করেন এবং ওই শিশু অপরাধীদের বয়স্ক অপরাধীদের সঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক শা¯িÍ দাবি করেন। আমাদের দেশের পুলিশ প্রশাসনও শিশু অপরাধীদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করে থাকে। কিন্তু আমরা কখনও খতিয়ে দেখার চেষ্টা করি না যে, ওইসব কম বয়সী ছেলে-মেয়ে কেন অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের প্রতি সমাজ তার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছে কি না। ওইসব শিশু সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ পেয়েছে কি না তা বিবেচনা না করে তাদেরকে সাজা দেযার জন্য সবাই তৎপর হয়ে ওঠে। ভেবে দেখা হয় না, সাজা দিলেই যে তারা অপরাধ করা থেকে দূরে থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই। একটি শিশু জন্মলগ্ন থেকেই অপরাধী হয় না। পরিবেশ তাকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে বাধ্য করে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরকে অপরাধের জগতে টেনে নিয়ে আসে বড় বড় অপরাধীচক্র। অথচ শিশুরা ধরা পড়ে শা¯িÍর মুখোমুখি হলেও অপরাধের মূল হোতারা কিন্তু বরাবরই নাগালের বাইরে থেকে যায়। শিশু-কিশোররা যাতে সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে তার জন্যই সমাজ ও রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে। শিশু-কিশোর সন্ত্রাসীরাই পরবর্তী সময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। শিশু-কিশোররা যাতে অপরাধকর্মে জড়িত হতে না পারে সেজন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। ব্যবস্থাটা পরিবারের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে। পরিবার অপারগ হলে সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও কার্যকর ভ‚মিকা পালন করতে হবে। সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে সবার। এ দায় কারও এড়ানো সম্ভব নয়। শিশুর সুরÿা যারা নিশ্চিত করতে পারবে না তারা শিশুর কাছ থেকে ভালো কিছুর প্রত্যাশাও করতে পারবে না। তই সবার আগে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সকল অধিকার বা¯Íবায়নের চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি যেসব শিশু ইতিমধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে তাদেরকে সুপথে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা আর এ কাজটা শুরু করা সহজ হবে সেইসব শিশু-কিশোরকে দিয়ে যারা ন্যায় বা অন্যায় যেভাবেই হোক পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
এক সমীÿায় দেখা গেছে, বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন কারাগারে বা হাজতে এমন কয়েক শ’ মানুষ আটক আছে যাদের প্রকৃত বয়স ১৮ বছরের নিচে। অপরাধী হিসেবেই তাদেরকে আটক করেছে পুলিশ। এদের সবাই যে প্রকৃত অপরাধী তাও কিন্তু নয়। তাই তাদেরকে পুনর্বাসনের মাধ্যমেই শুরু করতে হবে। আন্তর্জাতিক শিশু সনদ অনুযায়ী কোনো শিশুকে বয়স্ক অপরাধীদের সঙ্গে রাখা যাবে না। একই রকম আচরণ করা যাবে না। শিশু-কিশোরদের দাগী অপরাধীদের সঙ্গে রাখলে তারা ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরও খারাপই হবে। তাদের ওপর নির্যাতন চালালেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে, যা কখনোই মঙ্গলজনক হবে না। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু সনদে স্বাÿর করেছে অনেক আগেই। তাছাড়াও বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরপরই তৎকালীন সরকার এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। যার কারণে সেই ১৯৭৪ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করা হয়। সে আইনেও উলেøখ রয়েছে শিশুদেরকে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে বিচার করা যাবে না। ওই আইনের মূল নীতিই হচ্ছে কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশুর জন্য শা¯িÍ নয়, বরং সুরÿা নিশ্চিত করা। ওই আইনে অবশ্য ১৬ বছর বয়সী পর্যন্ত শিশু ধরা হয়েছে। সেই আইন আজও পুরোপুরি বা¯Íবায়ন করা হয়নি। কথা ছিল প্রতি জেলাতে শিশুদের জন্য পৃথক আদালত করার। ছিল শিশুদের সুপথে পরিচালনার জন্য প্রবেশন অফিসার নিয়োগ করার কথা। তারা শিশুর বি¯Íারিত খোঁজ-খবর নিয়ে তার নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবেন।
শিশুদের কারা ব্যবহার করে তা চিহ্নিত করতে হবে। বর্তমানে শিশুদের (যাদেরকে টোকাই বলা হয়) দিয়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাস কিছুটা কম হলেও অনেক চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী নানা ধরনের অপকর্ম করিয়ে থাকে। ঘরবাড়িবিহীন, অভিভাবকহীন শিশুরা নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ে অপরাধকর্মে। সুন্দর সমাজ গড়ার স্বার্থে শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা দরকার। কেবল রাষ্ট্র নয়, সমাজ এবং ব্যক্তিরও দায়িত্ব রয়েছে। সকলকেই আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের উচিত অবিলম্বে ১৯৭৪ সালের শিশু আইন পরিমার্জন করে তার বা¯Íবায়ন নিশ্চিত করা।
0 comments:
Post a Comment