আমাদের বাঁচান
আলী ফোরকান
ছয় বছরের মেয়ে প্রিয়া। মায়ায় ভরা তার মায়াবী চেহারা। শান্ত,পরিশ্রান্ত প্রিয়ার প্রিয় পৃথিবী অপ্রিয় হয়ে গেছে। অন্য শিশুদের মতো “থাকব না’ক বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে ” সে কবিতা পড়লেও বাস্তবে পৃথিবী তাকে আবদ্ধ থেকে বদ্ধ ঘরে ডাকছে। কারণ তার শরীরে বাস করছে মরণ ব্যাধি এইচআইভি/এইডস ভাইরাস। প্রিয়া অজগাঁ থেকে তার মায়ের সাথে এসেছে একটি বেসরকারি সংস্থার অফিসে। প্রতি মাসে ১৩ জন এইচআইভি পজিটিভ নারী, পুরুষ, শিশু এ অফিসে সেবা নিতে আসে।
প্রিয়ার মায়ের চেহারায় করুণ আকুতি। সে জানায়, একই গ্রামের এক যুবকের সাথে তার বাবা মা ১৯৯৯ সালে বিয়ে দেয়। তাদের মধুর দাম্পত্য জীবনে এক বছর পর জম্ম হয় ফুটফুটে প্রিয়ার। মেয়েকে নিয়ে সোনার সংসার ভালোই চলছিল। এরই মধ্যে ২০০২ সালে হঠাৎ প্রিয়ার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ল। বিভিন্ন চিকিৎসা দেওয়ার পরও রোগ না সারাতে চিকিৎসক এইচআইভি পরীক্ষা করায়। পরীক্ষায় দেখাগেল প্রিয়ার বাবা এইচআইভি পজিটিভ।
অশ্র“ বিসর্জনরত প্রিয়ার মা আরো বললেন, প্রিয়ার বাবার এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়ার পর আমার ও মেয়ের রক্ত পরীক্ষা করাই। আমাদের ও ঘাতক ব্যাধি রেহাই দেয়নি। সে বছরই প্রিয়ার বাবা মারা যায়।
কি ভাবে স্বামী আক্রান্ত হল জানতে চাইলে প্রিয়ার মা জানায়, বিয়ের তিন / চার বছর আগে স্বামী কর্মসংস্থানের জন্য বোম্বে যায়। সম্ভবত: সেখান থেকেই তার শরীরে এ ব্যাধি বাসা বাঁধে। প্রিয়ার মা আরো জানায়, বাবার বাড়ী ও শশুর বাড়ীর লোকজনের ভালো বাসায় তারা বেচেঁ আছে। ঐ পল্লীর অন্য কেউ জানে না তারা এইআইভি পজিটিভ।
খুলনার হুমায়ন কবির (৩০) ১৯৯২ সালে কর্মসংস্থানের জন্য মালয়েশিয়া যায়। সেখানে একটি র্ফাণিচারের দোকানে কাজ করতো। ২০০০ সালের প্রথম দিকে তার পুরো শরীরে খোশ পাচড়া দেখা দেয়। প্রায় এক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পরও ভাল না হওয়ায় মালয়েশিয়ায় ইউকে এম হাসপাতালে ভর্তি হয়। রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার এইচআইভি পজিটিভ। সে সময় মানসিক ভাবে খুব ভেঙ্গে পড়ি। আমার বান্ধবী এ্যানি তখন আমাকে বাঁচতে সহযোগিতা করে, বললেন হুমায়ন। অবশেষে ২০০১ সালে বান্ধবী এ্যানিসহ দেশে ফিরে আসে। দেশে ফিরে এসে এ্যানিকে বিয়ে করে। গত ২৮ সেপ্টম্বর হুমায়ন দম্পতি বাবা মা হয়। তাদের শিশুর নাম সৌর্হাদ্য।
হুমায়ন বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। সে আরো জানায়, খুলনাঞ্চলের এইচআইভি পজিটিভদের একটি সংগঠন করেছে। বর্তমানে তার সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ২০ জন। প্রত্যেক সদস্য / সদস্যা প্রতি মাসে ১’শ টাকা করে সংগঠনে জমা রাখে। সমাজ কল্যাণ থেকে নিবন্ধণ পাওয়ার পর তার সংগঠন জাতীয় ভাবে কাজ করবে।
হুমায়ন তার বাচ্চা প্রসঙ্গে বলেন, নিকশির অসমাপ্ত কাজ করার জন্য আমাদের “সৌহার্দ্য ”কে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। উল্লেখ্য, নিকশির জর্¤§ দক্ষিণ আফ্রিকায়। বার বছর বয়সের নিকশির শরীরে বাসা বেধেঁছিল ভয়ানক ব্যাধি এইডস। ২০০০ সালে ডাবলিনের এইডস সম্মেলনে পৃথিবীর সকল মানুষের নজর কেড়েছিল নিকশি জনসন। দুর্বল কাপা কাপা কন্ঠে মাইক্রোফোনে সবার কাছে একটাই আকুতি জানাচিছল সে, আমাদেরকে বাচাঁন। সেদিন নিকশির করুণ আকুতি পৃথিবীর মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। নিকশি হয়ে উঠে ভয়াবহ এইডস সমস্যার জীবন্ত প্রতীক। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার প্রথম বারের মতো বুঝতে পেরেছিল, তাদের হাজারো এইডস আক্রান্ত শিশুর করুণ পরিনতির কথা। সম্মেলনে যোগদানের পর আর বেশিদিন পৃথিবীর আলো বাতাস উপভোগের সুযোগ হয়নি নিকশির। ২০০১ সালের জুন মাসে নিকশি চিরজীবনের জন্য উড়াল দেয় অন্য ভুবনে। নিকশির অন্তেষ্টিক্রিয়ায় শেষ ভালবাসা জানাতে জোহানবার্গের কেন্দ্রীয় র্গীজায় নেমেছিল হাজারও শোকসপ্ত মানুষের ঢল। নিকশির শেষ বিদায়ে আবেগ আক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন র্গীজার প্রধান যাজক । তিনি সেদিন উপস্থিতদের উদ্দ্যেশে বলেছিলেন, শুধু বলুন, নিকশির মতো অবোধ শিশুদের আত্মার শান্তির জন্য কি করতে পারেন আপনারা। আমার বিশ্বাস ঈশ্বর মরণব্যাধি এইডসের বিষয়ে সচেতন করার জন্যই নিকশিকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের মাঝে। কিন্তু তারপরও এইডসের বিস্তার কমেনি। বরং ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এশিয়াঞ্চলে এইডসের দূত হিসেবে কাজ করবে –হুমায়ন দম্পতির “সৌহার্দ্য” এই আশা ব্যক্ত করলেন হুমায়ন। সে তার সংগঠনের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
0 comments:
Post a Comment