Friday, March 2, 2018

বিপ্লবীদের গ্রাম পটিয়ার ধলঘাট

বিপ্লবীদের গ্রাম পটিয়ার ধলঘাট 
আলী ফোরকান
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার পটিয়া। পটিয়ার একটি ইউনিয়ন ধলঘাট। উত্তরে বোয়ালখালী এবং পূর্বে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা। দুর্গম ও সুন্দর ছবির মতো এ গ্রাম বা ইউনিয়ন। ধলঘাটজুড়ে আ¯Íানা ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মী ও বিপ্লবীদের। ধলঘাট থেকে মাস্টার দা সূর্যসেন ও বীরকন্যা প্রীতিলতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। ওই গ্রামেই জন্ম বিপ্লবী কন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বিপ্লবী অর্ধেন্দু দ¯িÍদার, শশাংক শেখর দত্ত, জিতেন্দ্র লাল দাশ গুপ্ত, পুলিন দে, বিনোদ দত্ত, সাবিত্রী দেবীসহ শতাধিক বিপ্লবী। তাদের টানে এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রচার-প্রচারণার সহজ ও নিরাপদ এলাকা হওয়ায় এখানে ছুটে এসেছেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, নেলী সেনগুপ্ত, মাওলানা মনিরুজ্জমান ইসলামাবাদী, প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, প্রমোদ রঞ্জন চৌধুরী, মনোরঞ্জন সেন, কৃষ্ণ চৌধুরী, বিনোদ দত্ত। লিখেছেন : রাইসা চৌধুরী রেশমী 
ঘটনা প্রবাহÑ
কালারপুল যুদ্ধ : ১৯৩০ সালের ৬ মে পটিয়ার জুলধা ও কালারপুল এলাকায় ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বিপ্লবী স্বদেশ রায়, রজত সেন, মনোরঞ্জন সেন ও দেবপ্রসাদ গুপ্ত মারা যান।
ধলঘাট যুদ্ধ : ১৯৩২ সালের ১৩ জুন ধলঘাটের সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে বিপ্লবীদের আশ্রয়রত অবস্থায় ব্রিটিশ বাহিনী হামলা চালায়। তখন বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন মারা যান। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামেরুন বিপ্লবীদের আক্রমণে মারা যান। ওই সময় মাস্টার দা সূর্যসেন ও প্রীতিলতা সাবিত্রী দেবীর ঘরেই ছিল। ভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে যান। 
গৈড়লা : ১৯৩৩ সালের ২ ফেব্রæয়ারি গৈড়লা গ্রামে ÿীরোদ প্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে বিশ্বাসঘাতদের সহযোগিতায় পুলিশের হাতে মাস্টার দা সূর্যসেন বন্দি হন। 
পটিয়া থানা ডাকবাংলো : পুলিশ মাস্টার দাকে গৈড়লা থেকে বন্দি করে পটিয়া থানা সংলগ্ন ডাকবাংলোতে কাঁটাতারের ঘেরায় অবরুদ্ধ করে রাখে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতারা পটিয়ার ধলঘাট ইউনিয়নকে নিরাপদ এলাকা মনে করতো। ১৯৩০ সালের দিকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখে তারা। ধলঘাটে প্রতিদিন গুপ্ত বৈঠক হতো প্রীতিলতার নেতৃত্বে। বিপ্লবীদের দমন-পীড়নে ব্রিটিশ সরকার ধলঘাট এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প করে। বিপ্লবীরা প্রতিশোধ হিসেবে প্রায় সময় ওই ক্যাম্পের অস্ত্র লুট করে। ধলঘাটে ক্যাম্প হওয়ার পর বিপ্লবীরা পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন কেলিশহর, গৈড়লা, রত্তনপুর, সুচক্রদÐী, মুজাফফরাবাদ, অবিভক্ত পটিয়ার বরমা ইউনিয়নে অবস্থান নেন। এসব বিপ্লবীর প্রভাব আজো বাঙালি জীবনে প্রবাহিত। এদের আন্দোলনের ফসল ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ। এদের কাছ থেকে বাঙালি শিখেছে সা¤প্রদায়িক উদারতা, দেশপ্রেম। 
আমাদের বিপ্লবীরাÑদেশ প্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত : জন্ম ২২ ফেব্রæয়ারি ১৮৮৫ অবিভক্ত পটিয়ার বরমা গ্রামে। সর্বভারতীয় কংগ্রেসের প্রধান সারির নেতা। কলকাতা সিটি করপোরেশনের ৫ বার নির্বাচিত মেয়র। তার প্রত্যÿ ও পরোÿ ছায়ায় মাস্টার দা বিপ্লবী কাজ পরিচালনা করেন। মৃত্যু ২২ জুলাই ১৯৩৩। 
মাওলানা মনিরুজ্জমান ইসলামাবাদী : জন্ম ১৮৭৫ সালে বরমা ইউনিয়নের আড়ালিয়া গ্রামে। ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত। কংগ্রেস নেতা নেতাজি সুভাস বসুর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার’ নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালে ১৩ অক্টোবর ৭০ বছর বয়সে ব্রিটিশ সরকারের হাতে বন্দি হন। ১৯৫০ সালে মারা যান।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার : জন্ম ১৯১২ সালের ৫ মে ধলঘাট গ্রামে। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তার নেতৃত্বে নগরীর পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলা হয়। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা না পড়ার লÿ্যে বিষাক্ত পটাশিয়াম সায়াসাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রথম শহীদ নারী। 
প্রমোদ রঞ্জন চৌধুরী : ১৯০০ সালে তিনি পটিয়ার কেলিশহর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ সুপারকে হত্যার অভিযোগে তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদÐ কার্যকর করে। 
শশাঙ্ক শেখর দত্ত : ১৯১২ সালে পটিয়ার ডেঙ্গাপাড়ায়। ১৯৩০ সালের
২২ এপ্রিল ১৮ বছর বয়সে জালালাবাদ যুদ্ধে মারা যান। 
জিতেন্দ্র লাল দাশ গুপ্ত : জন্ম ১৯১১ সালে গৈড়লা গ্রামে। ১৯ বছর বয়সে তিনি জালালাবাদ যুদ্ধে মারা যান। 
অর্ধেন্দু দ¯িÍদার : জন্ম ধলঘাটে। বিপ্লবের জন্য বোমা বানাতে গিয়ে আহত হন। তিনি জালালাবাদ যুদ্ধে অংশ নেন এবং পুলিশের হাতে আটক হন। ১৯৩০ সালের ২৪ এপ্রিল ২০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। 
মনোরঞ্জন সেন : ১৯৩০ সালের ৬ মে কালারপোল যুদ্ধে তিনি মারার যান। এ সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর। 
কৃষ্ণ চৌধুরী : তিনি ১৯০৮ সালে কেলিশহর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৪ সালের ৫ জুন ইউরোপিয়ান ক্রিকেট মাঠে বোমা ছোড়ার অপরাধে ভারতের একটি জেলে তার ফাঁসি হয়। ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর।
সাবিত্রী দেবী : ধলঘাটের এ বিধবার আশ্রয়ে মাস্টার দা সূর্যসেন বিপ্লবীর কাজ পরিচালনা করতেন। সূর্যসেন গ্রেফতার হলে তিনিও কারাগারে নিÿিপ্ত হন। তার কিশোর ছেলেরও কারা নির্যাতন ভোগ করে মৃত্যু হয়।
বিনোদ দত্ত : জন্ম মঠপাড়া গ্রামে ১৯০৮ সালে। মাস্টার দার ফাঁসির পর বিপ্লবী দলে তিনি নেতৃত্ব দেন।
পুলিন দে : জন্ম ১৯১৩ সালে ধলঘাটে। বিপ্লবীদের ছাত্র সংগঠক পুলিন দে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন। তিনি ২০০০ সালের ১১ অক্টোবর মারা যান। 

0 comments:

Post a Comment