রোহিঙ্গা শরণার্থী : আমাদের জাতীয় সমস্যা
আলী ফোরকান
রোহিঙ্গা শরণার্থী আমাদের জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাদের স্বদেশ “মিয়ানমার”এ শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রায় দীর্ঘ ৪০ বছরে ও শেষহয়নি। ২০০৩ সালের জুন মাসের মধ্যে সব শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আন্তর্জাতিক সিন্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৭৮ সালে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমারের সামরিক সরকার জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। এরপর ১৯৯১-৯২ সালে আবার ও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে এদেশে ঠেলে দেয়। এছাড়া ও বাংলাদেশে কয়েক হাজার রাখাইন বৌদ্ধ শরণার্থী রয়েছে। তাদের মাত্র ৪০ জন ইউএনইচসিআর- এর তালিকা ভুক্ত এবং তাদের সবাই ঢাকায় বসবাস করছে। জেনারেল নেইউইনের সামরিক অভ্যুথানের পর ১৯৬৪ সালে সমাজতন্ত্রের দোহাই দিয়ে মিয়ানমারে সাধারন মানুষের জায়গা, জমি, কলকারখানা, ব্যাংক, দোকানপাটসহ সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করায় সমগ্র মিয়ানমারে বিশৃঙখলা ও অরাজকতার সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার,ধর্ষণ,হত্যা,নিপীড়ন শুরু হয়। বাংলাদেশের মানুষের সাথে মিয়ানমারের মুসলমানদের রয়েছে আত্মিক,সাংকৃতিক,ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক। আচার-আচরনে,ঈমান, আকিদায়, চেহারা ও গঠনে বাঙ্গালী মুসলমানদের অনুরুপ বিধায় তাদের বাঙ্গালী আখ্যায়িত করে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। মিয়ানমার সামরিক সরকারের সংজ্ঞা অনুসারে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব নেই। এখানে মানবাধিকার প্রতিনিয়ত লঙিঘত হচেছ। গুমরে গুমরে কাঁদছে মানবতা। এদের বিনামজুরিতে শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়। স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারছেনা। শত বছরের পুরনো মসজিদ,মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে যাওয়ার পর ও সংস্কার করতে দিচেছনা। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা মৌলিক অধিকার থেকে ও বঞ্চিত। আলেম সমাজ বিয়ে করতে চাইলে দাড়ি কর্তন করে এবং ভবিষ্যতে দাড়ি রাখবেনা এইমর্মে অঙ্গীকার দিয়ে বিয়ে করতে হয়। মুসলমানদের যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতে সামরিক সেনাসদস্যদের উৎকোচ দিতে হয়। রোহিঙ্গাদের চলাচলে কোন স্বাধীনতা নেই। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগের কোন অনুমতি দেয়া হচেছনা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও নাসাকাবাহিনী রোহিঙ্গাদের জায়গা জমি, বাস্ত-ভিটা, টাকা পয়সা জোরপুর্বক কেড়ে নিচেছ। রোহিঙ্গা মুসলমানেরা আজ নির্যাতিত,অধিকার হারা এবং গণহত্যার শিকার। এদের রক্তে অনেকবার লাল হয়েছে,বর্ণবালি এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও নাসাকা বাহিনীর নিষ্ঠুর হাত। বর্মী সামরিক ও নাসাকা বাহিনী হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে খুন করে নাফ নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে। কত সংসার বিরান হয়েছে,কত পরিবার গৃহহারা হয়েছে, কত মায়ের বুক খালি হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর,১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ উদ্বাস্তবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর)-এর মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তা প্রক্রিয়ার শম্বুকগতি আর রোহিঙ্গাদের অনিচছার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ইউএনএইচসিওআরআরসি (রিফিউজিরিলিজএ্যান্ডরিপ্যাট্রিয়েশন,কমিশনার) যৌথ প্রতিবেদনে জানাযায়, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৫ সালের র্মাচ পর্যন্ত ৪৭ হাজার ৩১৩ টি রোহিঙ্গা পরিবারের ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৪ জন শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো গেছে। ঐ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ রয়েছে যে, ২০০৫ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত কক্রবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার কুতুপালং এবং নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে ২০ হাজার ৫৪৪ জন শরণার্থী প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে বেসরকারি সুত্রমতে ২ লাখেরও বেশি শরর্ণাথী কক্রবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করছে। এরা বেশির ভাগ উক্ত দুই জেলার পাহাড়ী অঞ্চলে প্রথমে তাবু তৈরী করে বসবাস শুরু করে ও পরে পর্যায়ক্রমে পাহাড় কেটে সমতল করে বাড়ী ঘর করে বসবাস করতে থাকে। আবার অনেকে স্থানীয়দের সাথে সামাজিক আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করছে। তবে এদের সংখ্যা খুবই কম। কক্রবাজার জেলার ৭ উপজেলার ৬৪ টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ গ্রামে এদের বসবাস করতে দেখা যায় বলে জানাযায়। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী ও লোহাগড়া উপজেলার বেশ কিছু গ্রামে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। বান্দরবন জেলার থানচি, নাইখংছড়ি, আলীকদম ও লামা উপজেলায় এরা বসবাস করছে বলে স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক পরিবেশ নষ্টসহ বনানঞ্চল উজাড় করার পাশাপাশি আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হচেছ। তাই তাদের চিহিৃত করে তাদের দেশ ‘মিয়ানমার’এ ফেরত পাঠানোর দাবি উঠেছে।
এদিকে মিয়ানমারের সামরিক সরকার নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সমর্থন লাভের ব্যর্থ প্রয়াসে দাবি তুলেছে যে, আলকায়েদা রোহিঙ্গাদের মদদ দিয়ে আসছে। অথচ রোহিঙ্গা আর্মড গ্র“পের সাথে আলকায়েদার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে বলে এমন কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমেই আরো উত্তেজনা হয়ে উঠেছে।
শরণার্থীদের একটি বড় অংশ মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছে। কারণ সে দেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ভয়াবহ সামরিক নির্যাতন চলছে। এসব নির্যাতন নিপীড়নের চিত্র আইএলও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কতৃক প্রকাশিত একাধিক রির্পোটে রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রহণ করে বছরের পর বছর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনি এক আশ্রয়হীন অবস্থায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবন আজ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ডব্লিউএফপিএমএসএফ এবং কনসার্নের মতো কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংগঠন তাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবা সহায়তা দিচেছ, যা চাহিদার চেয়ে অনেক কম। অবশ্য শরণার্থী ও আন্তর্জাতিক পক্ষসমূহ অভিযোগ তুলেছে, বাংলাদেশের ক্যাম্প অথরিটি শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য জোর করে সই নিচেছ। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা শলণার্থীদের ভাগ্যে কি ঘটবে তা নিয়ে সব পক্ষই গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ বাংলাদেশ সরকারকে নিতে হবে। তা নাহলে মিয়ানমারে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এ শরণার্থী সংকট চলতে থাকবে। তাই বাংলাদেশে অবস্থিত সব শরণার্থীদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে সব আইনানুগ ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ আর্ন্তজাতিক গ্যারান্টির ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সরকারের উপর সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি এবং যথাশিগগির মিয়ানমারে জাতিসংঘ শান্তি মিশন প্রেরণ করা একান্ত প্রয়োজন।
0 comments:
Post a Comment