Friday, March 9, 2018

রক্তের আখরে লেখা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

রক্তের আখরে লেখা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
আলী ফোরকান
একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ভারতের জনগণ ও সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার পর শুরু হয়ে যায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পাক হানাদার বাহিনী শুরু করে ধ্বংসযজ্ঞ, ধর্ষণ, লুণ্ঠন আর হত্যা। ২৬ মার্চ সকাল থেকেই আকাশবাণী বারবার প্রচার করতে থাকে সেদিনের ঘটনার খবরাখবর। আর মাঝে মাঝে বাজাতে থাকে কবিগুরুর “আমার সোনারবাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” গানটি। যে গানটি পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় সংগীতে রূপান্তরিত করা হয়। বারবার আকাশবাণী থেকে প্রচারিত এ গান বাংলার মুক্তিকামী মানুষকে উজ্জীবিত করে। এভাবেই ভারত ও ভারতীয় জনগণ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য শুরু করে। দীর্ঘ ৩৮ বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কখনো শীতল আবার কখনো উষ্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভারতের সহানুভ‚তি কখনো শীতল হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে ভারতের তৎকালীন সরকারের সাথে বাংলাদেশের নেতাদের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ গড়ে উঠেনি। চুয়াডাঙ্গা থেকে ২৮ মার্চ প্রথম কলকাতার সাথে টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়। দেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধের খবরাখবর বিশ্ববাসির কাছে তুলে ধরতে কলকাতায় অবস্থিত বিদেশি সাংবাদিক ও ভারতীয় সাংবাদিকদের চুয়াডাঙ্গায় আনা-নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের গাড়াগঞ্জে পাকবাহিনীর সাথে প্রথম যুদ্ধ জয়ের খবর ভারতীয় সাংবাদিকদের সহযোগিতায় বিশ্ববাসি জানতে পারে। ৩১ মার্চ তাজউদ্দিন আহমেদ চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সীমান্ত পথে ভারতে পৌঁছেন। তার আগে অবশ্য চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর উইং কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী ও মেহেরপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তৌফিক ই এলাহী চৌধুরী বিএসএফ’র সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। রাতের আঁধারে সামান্য পরিমাণে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে থাকে বিএসএফ। তাজউদ্দিন আহমেদেকে বিএসএফ সংবর্ধনা জানায় এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কলকাতায় নিয়ে যায়। তিনি দিলিøতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক করেন। এ বৈঠকের পর ভারত সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে। এরপর ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার এক বিশাল আমবাগানে বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর, আমাদের মু্িক্তযুদ্ধে নতুন মাত্রা পায়। সরকার গঠনের পর ভারত সরকারি ভাবে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করতে থাকে। প্রথমে শুরু হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিÿণ দান। বিদেশি সরকার ও মিডিয়ার চোখ এড়িয়ে চলতে থাকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার প্রশিÿণ। তারপর তাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব প্রচার মাধ্যম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপনে ১০ মেগাওয়াট ÿমতা সম্পন্ন একটি ট্রান্সমিটার দিয়ে সাহায্য করে ভারত। এরপর প্রশিÿণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকতে থাকেন। তারা পাক বাহিনীর অবস্থানগুলো উপর চোরাগোপ্তা আক্রমণে চালিয়ে আতংকিত করে তোলেন। পাকসেনারা বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে থাকে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি লোকেরা বাংলাদেশের মানুষের সাহয্যে করতে এগিয়ে আসে। সীমান্ত পার হলে হাজার হাজার শরণার্থীকে তারা সাহয্য করেন। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে প্রথমে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। শরণার্থীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে লাখে পৌঁছে। তারপর কোটিও ছাড়িয়ে যায়। ভারত সরকার ও জনগণ এ বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর থাকার জন্য বিশাল বিশাল শিবির স্থাপন করেন। এক কোটির বেশি শরণার্থীর থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল সত্যিই দুরূহ ব্যাপার। কলকাতার থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী কার্যালয়ের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা করে ভারত সরকার। একই সাথে সরকারের নেতাদের কঠোর নিরাপত্তা বিধানেরও ব্যবস্থা নেয়া হয়। 

ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের সাহায্যের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনমত সৃষ্টি ও বিশ্বব্যাপি ক‚টনৈতিক সমর্থন আদায়ে তৎপরতা শুরু করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বসম্প্রদায়ের সমর্থন লাভের জন্য দেশেদেশে সফর করেন। তিনি বাংলাদেশে পাকবাহিনীর অত্যাচার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বিশ্ববাপীর সমর্থন লাভে সÿম হন। তখন বিশ্ব পরিস্থিতি সকল ÿেত্রে অনুক‚ল ছিল না। বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি মার্কিন প্রশাসন বিশেষ করে পররাষ্ট মন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার পুরাপুরি ছিলেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। সে সময় আমাদের অপর বৃহৎ প্রতিবেশি চীনও ছিল পাকি¯Íানের পÿে। এ বৈরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ভারত সরকার বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত সহায়তা দিতে থাকে। 

দিন যতই এগুতে থাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গতিও তত বাড়তে থাকে। নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাক বাহিনীর ওপর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। আতংকিত হয়ে পড়ে পাকি¯Íানী হানাদার বাহিনী। এরই মধ্যে এসে যায় ডিসেম্বর মাস। আমাদের বিজয়ের মাস। ৩ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় আসেন। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণদানকালে খবর আসে পশ্চিম সীমান্তে পাকি¯Íানী বিমান আক্রমণের। মিসেস গান্ধী দ্রæত দিলøী ফিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন বাংলাদেশের মু্িক্ত বাহিনীর সাথে একত্রিত হয়ে পাল্টা আক্রমণের। শুরু হয়ে যায় সর্বাত্মক যুদ্ধ। প্রথমে ভুটান ও পরে ভারত বাংলাদেশকে ক‚টনৈতিক স্বীকৃতি দেয়। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনা বাহিনীর যৌথ আক্রমণে একের পর এক শহর বন্দর গ্রাম হানাদার মুক্ত হতে থাকে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের কাছে পাকি¯Íানী জেনারেল নিয়াজীর ৯৫ হাজার পাক সেনাসহ আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষ ও ১২ হাজার ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সেনার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। 

১০ জানুয়ারি আর্ন্তজাতিক চাপের মুখে বঙ্গবন্ধুকে পাক¯Íানীরা মু্িক্ত দিতে বাধ্য হয়। লন্ডন হয়ে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে ফেরার পথে দিলøীতে বঙ্গবন্ধু মিসেস গান্ধীর সাথে দেখা করে আসেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন কবে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা বাহিনী প্রত্যাহার করবেন। মিসেস গান্ধী জবাব দিয়েছিলেন, ‘আপনার জন্মদিনের দিন ’৭২-এর ১৭ মার্চ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যহার শুরু হয়েছিল। যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এরপর যুদ্ধবিধ্ব¯Í বাংলাদেশ পূনর্গঠনে ভারত সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। পাকসেনারা তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে পোড়ামাটির নীতি গ্রহণ করে। ব্রীজ, রা¯Íাঘাট, শিল্প-কারখানা ধ্বংস করে রাখে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সাময়িক যোগাযোগ গড়ে তুলতে লোহার পাতের ব্রীজ তৈরি করে। ফেরি সার্ভিস চালুতে সাহায্য করে। ঢাকার সাথে সারাদেশের অতিদ্রæত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। যুদ্ধকালে বিধ্ব¯Í হার্ডিঞ্জ রেলব্রীজ, তি¯Íা ও ভৈরব রেল ব্রীজ ভারতীয় সহায়তায় পুনর্নির্মিত হয়। স্বল্পকালের মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়ে যায়। ভারতে অবস্থানরত এক কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ও তাদের পুনর্বাসনে ভারত সহায়তা করে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যখন উষ্ণ সম্পর্ক চলছে ঠিক তখন স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ও দেশের বামদের একটি অংশ ভারত বিরোধী প্রচারণায় মেতে উঠে। বঙ্গবন্ধুর সরকার যখন সব প্রতিক‚ল অবস্থার মোকাবেলা করে দেশেকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই ঘটে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকাণ্ড। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় জীবনে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দেশে ভারত বিরোধী প্রচারণা বেড়ে যায়। প্রথমে খন্দকার মোশতাক ও পরে জিয়াউর রহমান ÿমতায় আাসেন। তারপর বঙ্গবন্ধু কন্যা অসহায় দু’বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানে ভারতে আশ্রয় নেন। ঢাকাস্থ ভারতের তৎকালীন হাই কমিশনার সমর সেনকে হত্যা প্রচেষ্টা হয়। বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক শীতল হলেও বাংলাদেশের জনগণের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে ভারত। সামরিক সরকারগুলোর সময়ে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক বেশির ভাগ সময়ই শীতল ছিল। ’৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ÿমতায় আসার পর ভারতের সাথে অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ প্রশ¯Í হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে চলা পাহাড়ি জনগণের সশস্ত্র আন্দোলন থামাতে শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তিচুক্তিতে ভারত নেপথ্যে সহযোগিতা দেয়। নতুন করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান অংশীদার হচ্ছে ভারত। ভারতের সাথে আমাদের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেও স্বল্প সময়ে ও কম পরিবহন ব্যায়ে বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানি করছে। 
বর্তমানে ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে গতিশীলতা এনেছেন মনমোহন সিং সরকার। পারস্পরিক সম মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে চায় ভারত। বিশেষ করে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকার সাথে এমনকি চির বৈরি পাকি¯Íানের সাথেও সুসম্পর্ক গড়ার ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ রয়েছে।

0 comments:

Post a Comment