দেশে আড়াই কোটি বেকার
আলী ফোরকান
দিন দিন দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আর এই বেকারদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই সম্পূর্ণ কর্মÿম যুবক। ১৯৯০ সালের তুলনায় বেকারের সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। ১৯৯০ সালে দেশের বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০২ সালে এ হার ছিল ৮ শতাংশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লÿ্যমাত্রার (এমডিজি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এ প্রতিবেদন চ‚ড়ান্ত করেছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে বেকারের সংখ্যা বলা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপÿে দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি হবে। কারণ ঋতুভেদে (মৌসুমী বেকার) দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়ে। এ হিসাব যুক্ত হলে বেকারের সংখ্যা হয়তো ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। সেÿেত্রে বলা চলে দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষই কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে এমডিজি’র ভিত্তি বছরে দেশে বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ওই বছর একশজনের মধ্যে বেকার ছিলেন মাত্র তিনজন। ২০০০-০২ সালে বেকারত্বের এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮ শতাংশে। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে বেকারত্বের হার বাড়ে ৫ শতাংশরও বেশি। ২০০৯ সালে এমডিজির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ সালে বেকারত্বের হার কমানোর লÿ্যে দেশে ১৫ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এখন পর্যন্ত পরিকল্পনার অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হলেও বেকারত্বের হার কমেনি। উল্টো বেড়েছে। গত ১৮ বছরে দেশে বেকারত্বের হার কমার পরিবর্তে বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ভারত ও ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি। ভারতে বেকারত্বের হার ১১ শতাংশ আর ভিয়েতনামে ৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দাতা গোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তা ছাড়া দেশীয় সম্পদের ব্যবহার ও বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের আরো সুযোগ সৃষ্টির জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে দেশে প্রচুর কর্মসংস্থান হবে। এতে বেকারত্ব অনেকাংশে কমে আসবে। দেশি-বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের জন্য দেশের মধ্যে যে কোন মূল্যে অনুক‚ল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০০ সালে দেশে এমডিজি বা¯Íবায়ন শুরু করার পর থেকে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লÿ্য ছিল তাতে কোন ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। দেশে দরিদ্রের হার কমিয়ে আনা, বেকারত্ব দূর করা এবং সবার জন্য প্রাথমিক শিÿা নিশ্চিত করাসহ এমডিজির ৮ লÿ্য বা¯Íবায়নে উন্নত বিশ্ব বিপুল অর্থ বাংলাদেশকে দেয়ার প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল। উন্নত বিশ্ব তা রÿা না করার কারণেই দেশে বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের এক সদস্য বলেন, এমডিজি গ্রহণ করার সময় উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশসহ সকল উন্নয়নশীল রাষ্ট্রকে তাদের মোট জাতীয় আয়ের দশমিক ৭০ শতাংশ অর্থ সহায়তা করার প্রতিশ্রæতি দিলেও তারা এ পর্যন্ত কোন বছরই প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী তহবিল সরবরাহ করেনি। তাই বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তবে অন্য সকল লÿ্য ব্যাপকভাবে সফলতার মুখ দেখেছে বলে তিনি মত দেন। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সহায়তা মেলেনি তাই বেকারত্ব কমেনি এ ধারণাটাই ভুল। বরং বলা যায়, বিগত দুই দশকে বিদেশী ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক দেশের শিল্প ও কৃষি খাতে বিদেশী সাহায্যনির্ভর প্রজেক্টের কারণে কর্মসংস্থান আরো নষ্ট হয়েছে। আমদানি নির্ভরতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় দেশের ছোট শিল্প-কারখানা ধ্বংস হয়ে গেছে। বেকারত্ব পরিস্থিতি আরো প্রকট আকার ধারণ করতো যদি দেশের জনশক্তি রফতানি থেকে রেমিট্যান্স আয় না হতো। তাই সরকারের এই বিদেশী সহায়তা না পাওয়ার ভাবনাটাই বদল করে অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।
বেকার সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে বেকার সাধারণত তিন ধরনের। এক. যারা একেবারে কোন কাজ করার ÿেত্র পায় না, দুই. কিছু কাজ করে কিছু সময় বসে থাকে, তিন. যথাযথ মজুরি পাচ্ছে না অর্থাৎ কাজ করে কিন্তু এত কম মজুরি পায় যে সেটা তার বা পরিবারের ভরণপোষণে কোন কাজে আসে না। এ সংখ্যাটা খুব বড় একটা অংশ। এখন এদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তাদের মজুরি বৃদ্ধি পায়। এখন মজুরি বাড়াতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা তখনই বাড়বে যখন উৎপাদকরা পণ্য উৎপাদন করে তার ন্যায্যমূল্য পাবে। এগুলো প্রতিটি বিষয়ই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, এছাড়া পণ্য বিপণনে সমবায় ব্যবস্থা প্রচলন। এসব উদ্যোগ যদি সফলতার মুখ দেখে তবে অবশ্যই এই বেকারত্বের হার নেমে আসবে। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণের মুখাপেÿী না থেকে রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবহার ও দেশীয় পণ্যের বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পের কোটামুক্ত ও শুল্কমুক্ত আন্তর্জাতিকভাবে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ আয় ব্যবস্থাকে জোরদার করার প্রতি তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।
0 comments:
Post a Comment