Monday, March 12, 2018

পশুসম্পদ খাতে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব

পশুসম্পদ খাতে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব
আলী ফোরকান
দিন বদলের অভিযাত্রায় মানুষের কর্মসংস্থান অতি জরুরি। দারিদ্র সীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার হার ১৫% -এ কমিয়ে আনতে হলে মানুষের আয়-রোজগার বাড়াতে হবে। ঘোচাতে হবে বেকারত্ব। শুধু পশুসম্পদ খাতেই আগামী ছয় মাসে এক কোটি লোকের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। বি.বি.এস. ও কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ১,৫০,৮৯,০০০টি এবং কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি ২,২৯,৩১,০০০ জন। তাদের কেউ কেউ আবার মৌসুমী বেকারত্ব বা আংশিক বেকারত্বের শিকার, কখনও কাজ থাকে কখনও কাজ থাকে না। বাংলাদেশে ৪,৪৮৮টি ইউনিয়ন এবং ৮৭,৬২৩টি ছোট বড় গ্রাম রয়েছে। প্রতিটি গ্রাম থেকে যদি গড়ে ১২০ জন সুফলভোগী নির্বাচিত করা হয় তাহলে ৮৭,৬২৩টি গ্রাম থেকে মোট ১কোটি ৫লক্ষ ১৪হাজার ৭৬০ জন সুফলভোগী নির্বাচন করা সম্ভব এবং শুধু পশুসম্পদ খাতকে কাজে লাগিয়ে তাদের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এই ১২০ জন সুফলভোগীর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত থাকবে বেকার যুবক বা যুব মহিলা, বিধবা, স্বামী পরিত্যাক্ত মহিলা, শিক্ষিত বেকার যুবক ও উৎসাহী কৃষক। প্রতিটি গ্রাম থেকে ১২০ জন সুফলভোগীর মধ্যে ৩০ জনকে ‘দুধালো গাভী পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ’, ৩০ জনকে ‘গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ’, ৩০জনকে ‘ছাগল পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ’ এবং ৩০ জনকে ‘জৈব-নিরাপত্তা সম্পন্ন হাঁস-মুরগির খামার বিষয়ক প্রশিক্ষণ’ প্রদান করে তাদের জন্য স্বল্প সুদে বা বিনা সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকে ব্যাংকঋণ প্রদান করবে নিকটস্থ বাণিজ্যিক ব্যাংক, ঋণ আদায় করবে নিকটস্থ বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং তা তদারকি করবে স্থানীয় পশুসম্পদ অফিস। এজন্য কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের ন্যায় স্থানীয় উপজেলা পশুসম্পদ অফিসের মাধ্যমে ‘পশুসম্পদ স¤প্রসারণ কার্যক্রম’ হাতে নিতে হবে। সংশি¬ষ্ট উপজেলার অধীন¯Í প্রতিটি গ্রাম থেকে নির্বাচন করতে হবে উদ্যোমী, পরিশ্রমী ও নিরলস সুফলভোগীকে। তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, সেই সাথে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরী জ্ঞান দিতে হবে। সঠিকভাবে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের প্রতিটি খামার নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে এবং কোনও সমস্যা দেখা দেয়া মাত্রই তা সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগ প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন দিতে হবে এবং জৈব নিরাপত্তাসহ স্বাস্থ্যসম্পন্ন খামার স্থাপনের বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। খামারিগণ যেন পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার দিতে পারে সেজন্য তাদেরকে পশুপুষ্টি সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে। খামার ব্যবস্থাপনা, হাউজিং, লাইটিং, তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আদ্রতা, রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সম্পর্কে খামার ব্যবস্থাপকের সঠিক ধারণা থাকলে সকল খামারই লাভজনক খামারে পরিণত হবে। সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে যেন উদ্যোক্তাদের জন্য কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ ঋণ হিসেবে ‘সুদবিহীন ঋণ’ বা ‘স্বল্প সুদে ঋণের’ ব্যবস্থা করে দেয়া যায়।
ফসল উৎপাদনের জন্য এদেশের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকগণকে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ জমির পরিমাণ সীমিত। সকল কৃষকের পুকুর তৈরির জমি নেই। কিন্তু যাদের অন্তত বসতভিটা আছে, তার পক্ষে একটি গাভী, দুটি ছাগল আর কয়েকটি হাঁস-মুরগি পালন করা সম্ভব। তাই পশুসম্পদ খাতেই এদেশের কৃষকদের কর্মসংস্থান ও আয়-রোজগার বৃদ্ধি করার যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। পশুসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায় সারাদেশে দুধের চাহিদা ছিল ১৩.০১ মিলিয়ন মোট্রিক টন, উৎপাদন হয়েছিল ২.৬৫ মিলিয়ন মোট্রিক টন, ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১০.৩৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন। জনপ্রতি দুধের চাহিদা প্রতিদিন ২৫০ মিলি লিটার হলেও প্রাপ্যতা ছিল প্রতিদিন মাত্র ৫১ মিলি লিটার। বছরে সারাদেশে মাংসের চাহিদা ছিল ৬.২৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন, উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ১.০৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন, মাংসের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫.৩২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। জনপ্রতি মাংসের চাহিদা প্রতিদিন ১২০ গ্রাম হলেও প্রাপ্যতা ছিল প্রতিদিন মাত্র ১৯.৯৮ গ্রাম।
ডিমের চাহিদা ছিল সংখ্যায় ১৪,৮২৮ মিলিয়ন টি, উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ৫,৬৫৪ মিলিয়ন টি এবং ঘাটতি ছিল ৯,১৭৪ মিলিয়ন টি। জনপ্রতি বছরে ডিমের চাহিদা ১০৪ টি হলেও প্রাপ্যতা ছিল মাত্র ৩৯ টি। এতেই বোঝা যায় পশুসম্পদ স¤প্রসারণ কর্যক্রম শুরু করা কতটা জরুরি। বাংলাদেশে পশুসম্পদ একটি বিপুল সম্ভাবনাময় খাত হলেও বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে পশুসম্পদের প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ২.৪১ শতাংশ। জাতীয় অর্থনীতিতে পশুসম্পদের অবদান ছিল বছরে মাত্র ২.৭৯ শতাংশ। যা অনেক বেশি বৃদ্ধি করা যায়। শুধুমাত্র চামড়া হতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে বছরে  ৪.৩১ শতাংশ যা আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। গরুর গোবর ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা উৎকৃষ্ট মানের জৈব সার। অর্থ বছরে গরুর গোবর ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা থেকে জৈব সার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৮০ মিলিয়ন মেট্রিক টন যা অনেক বেশি বাড়ানো যায়। এদেশের মানুষের আছে উদ্যোম, আছে উচ্ছ¡াস, আছে স্বপ্ন, আছে অভিলাষ, আছে রক্ত দিয়ে বিজয় অর্জনের ইতিহাস। সামান্য পৃষ্ঠপোষকতা, উদ্বুদ্ধকরণ ও স¤প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ করে বিপুল সম্ভাবনাময় পশুসম্পদ খাতকে কাজে লাগিয়ে এদেশে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংগ্রামে অবদান রাখতে সক্ষম আমরা হবই। 

0 comments:

Post a Comment