Monday, March 12, 2018

খাদ্য সংকটে লোকালয়ে বনের পশু, হারাচ্ছে প্রাণ


খাদ্য সংকটে লোকালয়ে বনের পশু, হারাচ্ছে প্রাণ

|
আপডেট: ২০১৩-১২-২০ ৫:৩০:৩৯ পিএম
বিলুপ্তিতে ভয়ানক ভূমিকা পালন করে। 

এ পরিস্থিতিতেই সুন্দরবনে শুরু হতে যাচ্ছে বাঘ শুমারি। বাঘ শুমারির জন্য ইতোমধ্যে ৩৩ জন শুমারকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। ইউএনডিপির ২০০৬ সালের পরিসংখ্যানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪২টি, ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩রা মার্চ পর্যন্ত তথ্যমতে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। এর আগে ১৯৯৩-৯৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৬২। 

অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৌলভীবাজার জেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণীরা খাদ্যের জন্য লোকালয়ে আসছে। আর লোকালয়ে আসায় কখনও মানুষের হাতে, কখনও গাড়ি চাপা পড়ে শুধু গত বছরই জেলায় ১১টি বন্যপ্রাণী মারা পড়ে। 

তবে বন্যপ্রাণী বিলুপ্তি বা মৃত্যুর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। গত বছর জেলার কুলাউড়া বড়লেখা সড়ক, রাজনগর কুলাউড়া সড়ক ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শ্রীমঙ্গলে গাড়িচাপায় চিতা, বনবিড়াল, ‌উল্লুক, অজগর ও ২টি মেছোবাঘ মারা পড়ে। এছাড়া কমলগঞ্জে আদিবাসীদের হাতে ধরা পড়ে ‘ধূমকল’ নামক বিরল প্রজাতির এক প্রাণী। 

বন্যপ্রাণীদের হতাহতের কোনো হিসাব বা পরিসংখ্যান সংশ্লিষ্ট দফতরে নেই। আবার পত্র-পত্রিকায় বন্যপ্রাণীর হতাহতের সব ঘটনাও প্রকাশ পায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশে বন্যপ্রাণী, বিরল প্রজাতির প্রাণী হতাহত হচ্ছে প্রতিদিনই। চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধানে থেকেও মারা যাচ্ছে বিরল প্রজাতিরে অনেক প্রাণী। 

বনাঞ্চলের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে সুন্দরবনের কথা। সুন্দরবনে রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির গাছ-গাছালি। ৫ হাজার ৭৭২ বর্গমাইলের সুন্দরবনের আয়তন বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি সুন্দরবনের আয়তন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত সুন্দরবন। অথচ এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর, বন্য শূকর, উদ, অজগর ও বন বিড়ালসহ নানা জাতের প্রাণী। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপ ও বহু ধরনের হাঙ্গর ও কুমির। 

১৯৮৭ সালে সুন্দরবন উপকূলে মোট ম্যানগ্রোভ অরণ্যের আয়তন ছিল ৪২০ হাজার হেক্টর। পরবর্তী দশ বছরে এর আয়তন হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২১২ দশমিক ৩ হাজার হেক্টরে। নির্বিচারে বন নিধন ও বনাঞ্চল নিশ্চিহ্ন হওয়ায় দুই-চারটা অভয়ারণ্যে বন্যপ্রাণীদের স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। বাধ্য হয়েই বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।  

চীনা বিজ্ঞানীরা ১২টি শহরের ১৪৩ প্রজাতির প্রাণীর ওপর গবেষণা করে দেখতে পান যে, সাপ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। ভূমিকম্পের ৫ দিন আগে ১২০ কিলোমিটার দূরে থেকেও সাপ আসন্ন ভূমিকম্পের আভাস পায় এবং অদ্ভুত আচরণ শুরু করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, খামারে সাপের এই আচরণ থেকে সংকেত পেয়ে মানুষ যদি আগেই সতর্কতা অবলম্বন করে, তাহলে ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা থেকে লাখ লাখ প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। 

ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে ব্যাঙ ফসল রক্ষা করছে। আর ব্যাঙ হচ্ছে সাপের খাদ্য। আবার গ‍ুঁইসাপ যদি সাপের ডিম না খায় তাহলে সাপের অত্যধিক প্রাদুর্ভাবে ভূ-পৃষ্ঠে মানব জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ত। এভাবেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়। 

আজ আমরা বন-জঙ্গল উজাড় করে মেছো বাঘ, চিতাবাঘ, বন বিড়ালের মতো বন্যপ্রাণীর জীবনধারণ অসম্ভব করে তুলেছি, তারাও কোনো না কোনোভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখে। 

ইতোমধ্যে বিশ্বখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতায় অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী মনুষ্য বাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পরিবেশের এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে মানুষকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অন্য কোনো গ্রহে আবাসস্থল খুঁজতে হবে। বন্যপ্রাণীর জন্য বন-জঙ্গল সৃষ্টি ও সংরক্ষণের গুরুত্ব এখানেই। 

লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ 
dr.fourkanali@gmail.com

বাংলাদেশ সময়: ১৭১৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২০, ২০১৩
সম্পাদনা: জাকারিয়া খান ও আসিফ আজিজ, নিউজরুম এডিটর

0 comments:

Post a Comment