Sunday, March 11, 2018

বোর্ড বইয়ের খোঁজ নেই ।। বাজার সয়লাব নোট-গাইডে

বোর্ড বইয়ের খোঁজ নেই ।। বাজার সয়লাব নোট-গাইডে
আলী ফোরকান 
বোর্ডের মাধ্যমিক ¯Íরের এক-পঞ্চমাংশ বই এখনো বাজারে আসেনি। কবে সব বই মিলবে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু দেশের লাইব্রেরিগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে প্রতিটি বইয়ের গাইড। এনসিটিবি গাইড বইয়ের বিষয় নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে নারাজ। তারা বলছে, সরকার নোট-গাইড দুটিই নিষিদ্ধ করেছে। তবে বিষয়টি এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ঝুলে আছে। জাতীয় শিÿাক্রম ও পাঠ্যপু¯Íক বোর্ডের (এনসিটিবি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, আইনি ফাঁক-ফোকর দিয়ে সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশকরা গাইড বই ছাপছে এবং দেশের প্রতিটি লাইব্রেরিতে পুরোদমে বিক্রি করছে। তিনি বলেন, এক শ্রেণীর প্রভাবশালী প্রকাশক-মুদ্রাকর বোর্ডের বই না ছেপে আগে নোট বই ছেপেছে। এ কারণেও বাজারে পাঠ্যবইয়ের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে পাঠ্যবইয়ের সংকট সৃষ্টি হয়। এবছর থেকেই শুরু হয়েছে নতুন সৃজনশীল পদ্ধতি। তাই নতুন বই পাবার জন্য শিÿার্থী- অভিভাবকরা আছেন উৎকক্তায়। প্রথম ¯Íরের বই আসার জন্য এনসিটিবি ঘোষিত তারিখ ছিল ৬ জানুয়ারি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বই না আসলেও ২ জানুয়ারি থেকেই এসব বইয়ের গাইড লাইব্রেরিতে দেখা গেছে। বইয়ের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাঞ্জেরী, লেকচার, অনুপম, অনুসন্ধান, ইন্টারনেট, জুপিটার, জেনুইন, ট্যালেন্ট, জননী, লেকচার, নিউটনসহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রকাশনীর এসব গাইড পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি লাইব্রেরিতে রয়েছে কয়েকশ গাইড। কিন্তু এমন লাইব্রেরি রয়েছে যেখানে ১০টির বেশি বোর্ড বই পাওয়া যাচ্ছে না। এসব লাইব্রেরিতে প্রতিটি বইয়ে অতিরিক্ত দাম রাখছে ১০ থেকে ১২ টাকা।
১০ জানুয়ারি থেকেই মাধ্যমিক ¯Íরের ৭৬ বইয়ের মধ্যে ব্যাকরণ ও সহপাঠ্য ছাড়া সব বইয়েরই গাইড বিক্রি পুরোদমে শুরু হয়। এখন প্রতিটি লাইব্রেরির তাকগুলো সাজানো হয়েছে গাইড বই দিয়ে। অভিভাবক এবং শিÿার্থীরা বোর্ডের বই চাইলে বিক্রেতারা কোন একটি প্রকাশনীর গাইড বই ধরিয়ে দেয়। তারা জানায়, মূল বই আসতে আরো দেরি হবে। তবে কবে বোর্ড বই আসবে তাও জানতে পারছেন না অভিভাবক -শিÿার্থীরা। এনসিটিবি কঠোরভাবে মনিটরিং করলেও ফেব্রæয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে তৃতীয় ¯Íরের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর কৃষি শিÿা, ইসলাম শিÿা, বাংলা রচনা ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি এবং নবম-দশম শ্রেণীর পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, জীব বিজ্ঞান, কৃষি শিÿা, ব্যবসায় উদ্যোগ, বাণিজ্যিক ভূগোল, বাংলা ব্যাকরণ, বাংলা সহপাঠ, বাংলা রচনা, হিসাব বিজ্ঞান, মাধ্যমিক ভূগোলসহ ২৪টি বই বাজারে আসবে। কিন্তু এসব বইয়ের গাইড এখন মিলছে লাইব্রেরিগুলোতে। গাইড বই নিয়ে পুলিশ বা প্রশাসনের পÿ থেকে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিভাবকরা তাদের অভিযোগে জানান।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে বাজারে দ্বিতীয় ¯Íরের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর সামাজিক বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান, হিন্দু ধর্ম শিÿা, বাংলা ব্যাকরণ, বাংলা দ্রæত পঠন, ইংরেজি গ্রামার এ্যান্ড কম্পোজিশন, ইংরেজি র‌্যাপিড রিডার, শারীরিক শিÿা, চারু ও কারু কলা এবং নবম ও দশম শ্রেণীর অর্থনীতি, পৌরনীতি, ব্যবসায় পরিচিতি, ইসলাম শিÿা, সামাজিক বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান, উচ্চতর বীজগণিত, উচ্চতর জ্যামিতি, গার্হস্থ্য অর্থনীতিসহ ৩৮টি বই বাজারে এসেছে বলে দাবি করলেও এসব বই লাইব্রেরীতে পাচ্ছে না অভিযোগ অভিভাবকের। কিন্তু গত ২০ জানুয়ারি এসব বই আসার বিষয়ে দ্বিতীয় দফা তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বই বাজারে না আসলেও দ্বিতীয় ¯Íরের এ বইগুলোর গাইড মিলছে ১০ থেকে ১৫ দিন আগ থেকে।
বাংলাবাজারের রাফিদ বুক হাউস, মিম পাবলিকেশন, পু¯Íক ভবন, নিউ বিশ্ববিচিত্রা, হোসেন প্রকাশনী, জুয়েল পাবলিসার্স, মনির বুক হাউস, বিসমিলøাহ বুক হাউস, সপ্ননীল বুক হাউস, ফার্মগেটের তোফাজ্জল বুক হাউস, মিরপুরের বুক প্যালেস ছাড়াও দেশের প্রতিটি লাইব্রেরীতে পাওয়া যাচ্ছে গাইড বই।
তৃতীয় ¯Íরের বই এখনো ছাড়া শুরু হয়নি। এনসিটিবি জানিয়েছে, তৃতীয় ¯Íরের বই আসবে ৩১ জানুয়ারি। এবার প্রতিটি বইয়ে যুক্ত হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি। যে গাইড বই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে তার প্রতিটিতে সৃজনশীল প্রশ্ন যোগ করা হয়েছে। সংশিøষ্টরা বলছেন, বইয়ের পজিটিভ থেকে গাইড বইয়ের জন্য আলাদা প্রিন্ট করা হয়েছে এবং তা থেকে গাইড তৈরি করা হয়েছে। এসব বইয়ের পজিটিভ কোথায় পেলেন। কয়েকজন প্রকাশক জানান, গাইড বই ছাপার ব্য¯Íতার কারণে প্রকাশকরা মূল বই ছাপতে পারছে না। যেসব প্রতিষ্ঠান বোর্ড বই ছাপার কাজ পেয়েছে তারাই গাইড বই ছাপছে। এছাড়া এবার সৃজনশীল পদ্ধতির যোগ হওয়ার কারণে অভিভাবক এবং শিÿার্থীদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা নেয়ার জন্য অভিভাবকরা এবার গাইড বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বোর্ডের বইয়ে ৩৭ শতাংশ কমিশন দেয় সরকার। এর ১৭ শতাংশ পায় খুচরা বিক্রেতারা। কিন্তু গাইড বইয়ে এর চেয়ে তিন-চারগুণ লাভ হওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা গাইড বই বিক্রি করছে।
গাইড বই বিক্রি নিয়ে এনসিটিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গাইড বই নিয়ে এনসিটিবি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে চায় না। তিনি জানান, নোট বইয়ে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট আইন রয়েছে। সেখানে উলেøখ আছে, কোন প্রতিষ্ঠান নোট বই বিক্রি এবং বাজারজাত করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারের ঐ আইনে নোট বই সম্পর্কে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেয়া রয়েছে। তিনি বলেন, সংজ্ঞা অনুযায়ী নোট এবং গাইড বই একই অর্থ প্রকাশ করে; কিন্তু শুধু ‘গাইড’ শব্দটি উলেøখ না থাকায় বই নিষিদ্ধ করতে গেলে এক শ্রেণীর প্রকাশক এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা দায়ের করে। এনসিটিবি পরে এ বিয়য়ে উচ্চ আদালতে আপিল করে জয়ী হলেও প্রকাশকরা পুনরায় উচ্চ আদালতে আপিল করে। ফলে নোট ও গাইড বিষয়টি এখনও ঝুলে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিটিবির মধ্য সারির কয়েকজন কর্মকর্তা প্রকাশকদের সাথে যোগসাজশে নানা অন্যায় ও দুর্নীতি করে থাকে। তারা এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ সভা ও সিদ্ধান্ত প্রকাশকদের কাছে প্রকাশ করে দেয়। ফলে কোন মনিটরিং ব্যবস্থা বা কোন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ শুরুতেই ভে¯েÍ যায়।
শুধু ঢাকায় নয়, দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় চলছে পাঠ্যবইয়ের সংকট। কোন সংকট নেই নোট বইয়ের। রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার শরীফ সুমন জানান, এই বছর শিÿা নগরীখ্যাত রাজশাহীতে মাধ্যমিক পর্যায়ের সব বই এখনো বাজারে না আসলে বাজারে প্রায় সব বিষয়েরই পাঞ্জেরী, লেকচার, অনুপম, জেনুইন ও টুপিটারসহ কয়েকটি প্রকাশনার গাইড বই এসে গেছে। অপরদিকে দোকানে প্রতিদিন নতুন বইয়ের জন্য ভিড় জমালেও শিÿার্থীদের হতাশ হয়ে বাড়ী ফিরতে হচ্ছে। এই নিয়ে রাজশাহীতে শিÿার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে এক ধরনের চাপা ÿোভ। দোকানগুলিতে কেবল ৬ষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি ও অংক বই এসেছে। নতুন বইয়ের বিষয়ে বীণা পানি বুক ডিপোর উত্তম তলপাত্র মালিক বলেন, গত বছর জানুয়ারীর প্রথমেই বোর্ডের বিভিন্ন শ্রেণীর মোট ১৪টি বই এসেছিল। এবার ৬ষ্ঠ থেকে নবম-দশম পর্যন্ত কেবল বাংলা, ইংরেজি ও অংক বই এসেছে। শিÿার্থীদের মধ্যে অন্য বিষয়ের বইগুলির ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এখন পর্যন্ত না আসায় রাজশাহীর কোন পু¯Íক ব্যবসায়ীই তা পূরণ করতে পারছেন না। পু¯Íক প্রকাশনা সমিতির এক নেতা ইত্তেফাককে জানান, এনসিটিবি সঠিক সময়ে বই দিতে না পারায় শিÿার্থীরা বাধ্য হয়েই গাইড বই কিনছে। তাছাড়া প্রয়োজনের তাগিদে গাইড বই দরকার। বর্তমানের নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে শিÿকরা ততটা অভিজ্ঞ নন। শিÿার্থীরাও এ পদ্ধতি নিয়ে নানা আশংকায় রয়েছে। বিষয়টি সহজ করার জন্য গাইড বইয়ের প্রয়োজন আছে। 

0 comments:

Post a Comment