জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন পশুসম্পদ
আলী ফোরকান
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়বহতা বিবেচনায় বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে অন্যতম। বিগত কয়েক দশকে আমাদের দেশে বন্যা, সাইক্লোন, জলোচ্ছ¡াস, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হর হামেশাই হচ্ছে। পশুসম্পদ সেক্টরেও এ দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বিগত কয়েকটি বড় পরিসরে সংঘটিত বন্যায় গবাদিপশুর মৃত্যু, উৎপাদন হ্রাস, পশুখাদ্য বিনষ্ট এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি পশুসম্পদ অধিদপ্তরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও নিরুপণ করা হয়ে থাকে। বিগত ১৯৯৮, ২০০০, ২০০৪ এবং ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত বন্যায় পশুসম্পদ সেক্টরের যথাক্রমে ৩১, ১৯০, ১৯১ এবং ৬৪ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়েছে। সিডর ২০০৭ এ বর্ণিত খাতে আর্থিক ১৩২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অতিস¤প্রতি (মে, ২০০৯) আইলার আঘাতে দক্ষিণাঞ্চল আবারও লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সিডর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আইলার আঘাত। আর এই আইলায় পশুসম্পদ সেক্টরে ১৩ কোটি টাকার (০৬/০৬/২০০৯ খ্রি: তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী) ক্ষয়ক্ষতির হিসেব পাওয়া গেছে।
জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদানের পরিবর্তনে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে জলবায়ুর আরও যে সব পরিবর্তন দেখা যায় তা হলÑ সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি : জলবায়ু পরিবর্তনের এই উপকরণটির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী। প্রতি বছরে গড়ে ০.৮ সে.মি. করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশে এখনও পর্যš- পশুসম্পদ সেক্টরে কোন ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। ২০৫০ সালে যখন বাংলাদেশের অনেক অংশই পানির নীচে তলিয়ে যাবে, তখন কিন্তু আর বুঝার বাকি থাকবে না সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমতল ভূমিতে লবণাক্ত পানির প্রবেশ : উপকূলবর্তী এলাকায় সাইক্লোন, জলোচ্ছ¡াস কিংবা চিংড়ি চাষের আওতাভূক্ত এলাকায় লবণাক্ত পানির প্রবেশে সবুজ ঘাস উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ওই এলাকার মানুষ গবাদিপশু পালনে উৎসাহ হারাচ্ছে।
অতিবৃষ্টি : অতিবৃষ্টি থেকে মাঝেমধ্যে বন্যা হয়। ফলে সৃষ্টি হয় মৌসুমী বন্যা ও জলাবদ্ধতা। এতে ফসল নষ্টের পাশাপাশি চারণভূমি ও সবুজ ঘাসের ক্ষতি হয়। পশুপাখির ভোগাšি- বাড়ে যা পরোক্ষভাবে উৎপাদনকে ব্যাহত করে।
উষ্ণতা বৃদ্ধি : উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কখনও কখনও তীব্র খরার সৃষ্টি হয়। খরায় ঘাস উৎপাদন ব্যাহত হয়, কাঁচা ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির উৎপাদন হ্রাস পায় এবং খামারের ব্যবস্থাপনা খরচ বৃদ্ধি পায়।
শৈত প্রবাহ : আমাদের দেশে শীতের তীব্রতা মেরু অঞ্চলের তুলনায় কম হলেও গ্রীষ্ম ও শীতের তাপমাত্রার পার্থক্য অনেক বেশি। এছাড়া শীতের সময় বৃষ্টিপাত কম হয় এবং অধিক শুষ্কতার জন্য সবুজ ঘাস উৎপাদন কমে যায়। এতে গবাদিপশু-পাখির উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং খামারের ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে গিয়ে আর্থিক ক্ষতি হয়। জলোচ্ছ¡াস, বন্যা, অতিবৃষ্টি, বর্ষা ও জলাবদ্ধতার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধুমাত্র গবাদিপশু-পাখির উৎপাদনই যে ব্যাহত হয় তাই নয়। তরকা, বাদলা, গলাফুলা, ক্ষুরারোগ, ডায়েরিয়া, আমাশয়, বদহজম, অপুষ্টিজনিত রোগ প্রভৃতি নানা প্রকার রোগ-ব্যাধির ব্যাপক সংক্রমণ ঘটে। সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার পরই এর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়ে থাকে। বস্তুত এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করে দুর্যোগের বৈশিষ্ট্য, প্রকার, তীব্রতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য গৃহীত বিভিন্ন প্রস্তুতির উপর। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে যে সকল উপকরণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে তার প্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে গবাদিপশুর উৎপাদন ব্যাহত এবং জীব-বৈচিত্রের পরিবর্তন হচ্ছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে অনেক প্রজাতির বন্য পশুপাখি, মৎস্য ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী, কীটপতঙ্গ, জলজ ও স্থলজ উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের দেশে এ সব ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রকৃতিতে এবং গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে যে বিরূপ প্রভাব পড়ে, এর জন্য কতটুকু উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং এর অর্থনৈতিক গুরুত্বইবা কতটুকু ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক এবং সুনির্দিষ্ট কোন গবেষণা নেই। প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে পশুসম্পদকে রক্ষার কতিপয় সুপারিশমালা : ১. ক্ষয়ক্ষতি, বিরূপ প্রভাব ও এর ব্যাপকতা বিষয়ে বি¯-ারিত সমীক্ষা এবং গবেষণা প্রয়োজন রয়েছে। ২. জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি রেখে ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য হবে এমন অঞ্চলভিত্তিক লালন-পালনের জন্য গবাদিপশুর জাত নির্বাচন, লালন-পালন ও খামার ব্যবস্থপনার উন্নয়ন এবং লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন বিষয়ে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ৩. দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় সব গবেষণার আলোকে লব্ধ ফলাফল মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কসপের ব্যবস্থা করতে হবে। ৪. লবণাক্ত এলাকায় গো-খাদ্যের সংকট দূরীকরণের জন্য কী ধরনের ঘাস চাষ করা যায় (লবণাক্ত সহনশীল ঘাস), গবেষণার মাধ্যমে সেই জাত উদ্ভাবন করতে হবে। ৬. পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য কৃষকদের করণীয় বিষয়ে সচেতন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৭. সমগ্র দেশের সাধারণ মানুষকে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের গুরুত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, এর কারণে বিরূপ প্রতিক্রিয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে শুধুমাত্র পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়কে এককভাবে নয়, আš-ঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে। তাছাড়া জলবায়ু এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি শুধুমাত্র বাংলাদেশের একার নয়। এটি বৈশ্বিক এবং সমন্বিত একটি বিষয়। তাই সবাইকে সমান আগ্রহে এগিয়ে আসতে হবে সুন্দর পৃথিবী গড়ার আশায়।
0 comments:
Post a Comment