নিরাপদ পানি নিয়ে ভাবনা
আলী ফোরকান
২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশ পড়েছে নিরাপদ-বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে। বিশেষ করে মিঠাপানির সঙ্কট সারা দেশেই তীব্রতর হচ্ছে। ভূগর্ভে আর্সেনিক দূষণ, আর ভূপৃষ্ঠে পুকুর থেকে নদী পর্যন্ত মিঠাপানির আধার ও দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে। ফলে নিরাপদ পানি ক্রমেই সাধারণ মানুষের কাছে দু®প্রাপ্য হয়ে উঠছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে বছর জুড়ে নিরাপদ পানির তীব্র সঙ্কটের কারণে দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার পথে। আর সঙ্কটে পড়েছে সাত কোটি মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাবলিউএইচও) সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে গভীর সঙ্কটে পড়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণী-পেশার সাত কোটি মানুষ রয়েছে। ডাবলিউএইচওর মতে, এক লিটার পানিতে শূন্য দশমিক শূন্য এক (০.০১) মিলিগ্রাম আর্সেনিক থাকলে তা গ্রহণযোগ্য। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পানিতে প্রতি লিটারে আর্সেনিকের মাত্রা শূন্য দশমিক শূন্য পাচ (০.০৫) মিলিগ্রাম। দেশের জলবায়ু ও আবহাওয়া বিবেচনায় এ মাত্রাও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয় । এর চেয়ে বেশি মাত্রায় আর্সেনিক থাকলেই পানি অগ্রহণযোগ্য বা আর্সেনিক দূষণযুক্ত বলে ধরা হয়। ইউনিসেফের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন নিরাপদ পানি পাচ্ছে এমন লোকের সংখ্যা ৯৮ থেকে ৭৪ শতাংশ । পানিতে আর্সেনিক ধরা পড়ার পর ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে এক যুগ। এতোদিনে সবার জন্য নিরাপদ পানি দূরের কথা, এমনকি দেশের বিশেষজ্ঞরা জোট হয়ে বলতে পারেননি নিরাপদ পানির সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য উৎস কোনটি। নিরাপদ পানি সম্পর্কে সরকারি নীতিমালা ও আর্সেনিক দূরীকরণ কৌশল সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। গত এক যুগে দেশের ৬১ জেলার ২৭০ উপজেলায় আর্সেনিক দূষণযুক্ত পানির কারনে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ গুরুতর রোগে আক্রান্ত হয় । আক্রান্তদের মধ্যে দরিদ্র নারীর সংখ্যাই বেশি। আর্সেনিক দূষণের শিকার ২৭০ উপজেলার ৫০ লাখ ৭০ হাজার টিউবওয়েলের পানি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ লাখেরও বেশি টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এমনকি দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে গভীর নলক‚পের পানিতেও আর্সেনিক দূষণ ধরা পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্সেনিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় নিরাপদ পানি পান করা। কিন্তু সেই নিরাপদ পানির অনুসন্ধান বা উত্তোলন করা কাজটি খুব কঠিন ও ব্যয়বহুল। দেশের এসব এলাকার কোনো কোনো টিউবওয়েলের পানিতে এক দশমিক পাচ থেকে দুই ভাগ মাত্রার আর্সেনিক দূষণ ধরা পড়েছে। বিশ্বখ্যাত আর্সেনিক বিশেষজ্ঞ ও কলকাতার যাদবপুর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. দীপংকর চক্রবর্তী তিন নদীর অববাহিকায় পরিচালিত তার এক গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালÑ এ তিন দেশের গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকার ৫৫ কোটি মানুষ বর্তমানে ভয়াবহ আর্সেনিক ঝুকির মধ্যে রয়েছেন। এ সংখ্যা উল্লিখিত তিন নদী অববাহিকার মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ৬০ ভাগ। তাদের মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই ঝুকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ছয় কোটি মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিক দূষণযুক্ত পানি পান ও ব্যবহার করায় তাদের প্রতি হাজারে ১৩ জনের দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট সূত্রে জানা গেছে, ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৪০টি নদীর মধ্যে শতাধিক নদীর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। দেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা ও ডাকাতিয়ার পানি প্রতি বছরই শুকনো মৌসুমে কমে যাচ্ছে। নদীগুলোতে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন পলি বা বালি জমে। এ জন্য প্রতি বছর ৫ কোটি ১৮ লাখ ঘন মিটার ড্রেজিং করা দরকার। কিন্তু ড্রেজিং করা হয় মাত্র ৯০ লাখ ঘন মিটারের মতো, যা প্রয়োজনের মাত্র ১৫ ভাগ। পরিবেশ বাচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের বিশিষ্ট কর্মী ড. নাসের হোসেন খান এ সম্পর্কে বলেছেন, প্রাকৃতিক কারণে এমনিতেই নদীগর্ভে পলি জমে নাব্যতা কমে যায়। সেই সঙ্গে লোভী মানুষের দখলবাজি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের নদ-নদী এখন সত্যিই বিপন্ন। আর নদীর পানি দূষণের কথা তো বলাই বাহুল্য। ঢাকার প্রাণপ্রবাহ বুড়িগঙ্গার পানিতে এতোটাই দূষণ ঘটেছে যে, ঐতিহ্যবাহী এ নদী বস্তুত এখন ড্রেনে পরিণত হয়েছে। যা মাঝে-মধ্যে কেবল পচা দুর্গন্ধই নয়, ওষুধের গন্ধও ছড়ায়। অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা রাজধানীর নানা রকম বর্জ্যরে সঙ্গে শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই বুড়িগঙ্গা তীরে বসবাসকারী গরিব-নিম্নবিত্তের মানুষ এখন ভাতের চেয়েও নিরাপদ পানির জন্য বেশি কষ্ট পাচ্ছে। নদী দূষণ শুধু বুড়িগঙ্গায়ই সীমাবদ্ধ নেই। শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, বালু ও কর্ণফুলীসহ ছোট-বড় যে কোনো শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় সব নদীই দূষণের শিকার। মেঘনার মতো নদীও দূষণের বাইরে নেই। আশ্চর্য হলেও সত্যি পৃথিবীর শতকরা ৯৭ ভাগ পানিই লোনা। অবশিষ্ট মাত্র ৩ ভাগ পানি মিষ্টি। যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ব্যবহার করতে পারে। বাকীটা আছে মেরু অঞ্চল ও হিমবাহের বরফে। কিন্তু এই ১% পানি আমরা দূষণমুক্তভাবে রক্ষা করতে পারছি না। সুষ্ঠভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। এদেশের বেশিরভাগ শিল্প কারখানা কোন না কোন পানির উৎসের কাছাকাছি অবস্থিত। যার শিল্পজাত জৈব আবর্জনাগুলো সব নির্গত হয়ে পড়ে পানিতে। এগুলো মিশে যাবার ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন যায় কমে। এতে করে জলজ প্রাণীর জীবন ধারণের ও ক্ষতি হয়। ড. নাসের খান আরো বলেন, বর্তমানে দেশ জুড়ে পানি সঙ্কট ও পানি দূষণ ছাড়াও বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, মাটি দূষণ, মেডিকাল বর্জ্য দূষণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌছেছে। এ থেকে বাচতে বিষয়টি একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য সব মানুষকে তার অবস্থান থেকেই এ আন্দোলনে যোগ দিতে হবে। এখনই পানি নিয়ে ভাবতে হবে। আর বাঁচতে হলে এ ১% পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ভয়াবহ পানি সংকটের আশঙ্কা: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বিশুদ্ধ পানি নিয়ে আশঙ্কা করছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০০৭ শিরোনামে সমীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে, পানি সরবরাহ, অপরিশোধিত পানি সংগ্রহ এবং পানি দূষণরোধ নিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা নজর দেন না। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দশ বছরের মধ্যে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশুদ্ধ পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দেবে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের ঢাকা, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও পাকিস্তানের করাচির মতো মেগাসিটিগুলোতে এ সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করছে। ওদিকে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও একই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। পানি ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা না থাকায় ২০১০ সালে ঢাকায় পানির চাহিদা দাঁড়াবে ২৭০ কোটি লিটার। আর ২০২০ সাল নাগাদ পানির চাহিদা হবে ৪১০ কোটি লিটার। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, বর্তমানে ওয়াসা ২ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করলেও ৫০ লাখ টন পানির ঘাটতি রয়েছে। এবং পানির স্তর নেমে যাওয়ায় প্রতি বছর ৭ থেকে ৮টি করে পাম্প অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। ফলে এসব পাম্প নতুন করে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই রাজধানী ঢাকায় শুকনো মৌসুমে প্রায় অর্ধেক পাম্পে পানি উঠে না। ওয়াসার বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বেশকিছু পাম্পে শিগগিরই পানি উত্তোলন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, নগরের ওপর অধিক জনসংখ্যার চাপই যে বর্তমান সমস্যার মূল কারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উদ্বেগজনক হারে পানির স্তর নেমে গেছে। এটা রোধ করতে হলে এখনই উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এজন্য বিশুদ্ধ পানির জন্য ভ‚গর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফেলতে হবে। আর ভ‚গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে হলে নদীসহ উপরিতলের পানির উৎসকে নিরাপদ ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে। কাজটি সহজ নয়, কিন্তু এর কোনো বিকল্পও আমাদের সম্মুখে খোলা নেই। প্রয়োজনে ঢাকা শহরে অন্য নিরাপদ স্থান থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি যত্রতত্র ডিপ টিউবওয়েলের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশালাকার রিজার্ভ ট্যাঙ্কের কথাও মাথায় রাখতে হবে। শুধু সচেতন হওয়া ছাড়া পানির এ সমস্যা সমাধান কোনো ব্যক্তিমানুষের উদ্যোগের বিষয় নয়। সিদ্ধান্ত যা নেয়ার তা সরকারকেই নিতে হবে। আমরা আশা করছি এ ভয়াবহ বিপর্যয় আমাদের চেপে ধরার আগেই সরকার সুরাহার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
0 comments:
Post a Comment