বিশ্বের তেলসম্পদ ও মুসলিম বিশ্ব
আলী ফোরকান
তেল পৃথিবীর অতি প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ। বিশ্বে এটিই একমাত্র জ্বালানি চাহিদার অবলন্বন। তেলের বিকল্প কার্যকর অর্থে এখনো আবিস্কার হয়নি। শিল্প-কারখানা, স্থল,জল,বিমান, পরিবহন, যোগাযোগ সবক্ষেত্রে খনিজ তেলের বিকল্প নেই। পৃথিবীর মহামুল্যবান এই খনিজ সম্পদ কিন্তু পরাশক্তিগুলোর নেই। এই খনিজ সম্পদের মালিক মুসলিম দেশগুলো। পৃথিবীতে তেলের আবিস্কার ও তেল রির্জাভ পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো।
প্রথম তেলকূপ আবিস্কার: খনিজ তেলের আবিস্কার আধুনিক যুগের নয়। হাজার হাজার বছর ধরেই মানুষ অপরিশোধিত খনিজ তেলের সাথে পরিচিত। তখন প্রদীপ জ্বালানো থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ছিল। তবে ১৮৫০ সালের দিকে এর ব্যাপক বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়েছিল। র্জামানিতে ১৮৫৭ -৫৯ সাল পর্যন্ত তেলের অনুসন্ধান চালায়। প্রথম সফল লাভ করেন এডউইন এল ড্রেক। ১৮৫৯ সালের ২৭ আগষ্ট মাটির ৬৯.৫ ফুট নিচে খনন করে পৃথিবীর প্রথম তেল কূপটির উদ্বোধন করেন তিনি। দৈনিক ২০ ব্যারেল তেল উৎপাদন শুরু হয়। ড্রেকের সাফল্য দেখে তার আশপাশে এসে বিভিন্ন কোম্পানী কূপ খনন শুরু করে। এসময় বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদনের চেয়ে ড্রেকের উৎপাদন ছিল দ্বিগুণ। রাতারাতি এলাকার চেহারা পাল্টে যায়। ড্রেক এ আবিস্কারে বিশেষ লাভবান হতে পারেননি। বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনের ফলে তেলের দাম কমে গেল। এক পর্যায়ে মুল্য বৃদ্ধির জন্য ১৮৬২ সালে প্রথম তেল ধর্মঘট করে। তেল ধর্মঘটের কিছুদিন পর ড্রেক মারা যায় নিতান্ত দরিদ্র অবস্থায়। পাশাপাশি তেলের মওজুদ ও শেষ হয়ে যায় ।
তেলের জন্য দেশ দখল: এডউইন এল ড্রেকের কল্যাণে তেলের উৎপাদন বাড়তে থাকে। তেল কোম্পানিগুলো তখন অপরিশোধিত তেল থেকে পাওয়া কেরোসিন বিশ্বব্যাপী রপ্তানি শরু করে। অর্ন্তদহ ইঞ্জিনের আবিস্কার ও অটোমোবাইল চালুর পর তেলের চাহিদা বেড়ে গেল চরমভাবে। জ্বালানি হিসেবে কয়লার পরিবর্তে তেল ব্যবহার শুরু হয়। বিশ্বযুদ্বের সময় তেলের চাহিদা ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। ১৯১৭-১৮ সাল নাগাদ তেলের ঘাটতি দেখাদেয়। তখনই বিশ্ববাসী টের পেল তেলের গুরুত্ব। আগামীতে তেলই হয়ে উঠবে অর্থকরি পণ্য তা ব্যবসায়ীরা প্রথম উপলব্ধি করে। তখন ক্ষমতাধর দেশগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় তেল কোম্পানি। র্মাকিন প্রধান তেল কোম্পানিগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্বের আগেই আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় তেলের অনুসন্ধান শুরু করে। নিজদেশে তেল ক্ষেত্র না থাকায় ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড ও ফ্রান্সসহ তাদের উপনিবেশগুলোতে তেলের সন্ধান চালায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইরানে প্রথম তেলকূপটি চালু করে ব্রিটিশরাজ। পরবর্তীতে তিন দশক ধরে র্মাকিন তেল কোম্পানিগুলো বিশ্বব্যাপী তাদের ব্যাবসা স¤প্রসারণ করে। ১৯৫৫ সাল নাগাদ র্মাকিন পাঁচটি প্রধান তেল কোম্পানি বিশ্ব তেল বাজারের দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে। বিশেষত: উসমানিয়া আমলের পর মুসলিম বিশ্ব গ্রাস করে নেয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। মুসলিম বিশ্বের সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, সিরিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ খনিজ তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো এক এক করে ব্রিটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। ইরানে প্রথম তেল কূপটি খনন করে ব্রিটিশ কোম্পানি প্রথম বিশ্বযুদ্বের আগে। ব্রিটিশরাজ ইরানের তেলের ওপর দখল কায়েম করেছিল অ্যাংশো-পার্শিয়ান অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আরব রাষ্ট্রগুলো ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। যার রাজধানী ছিল তুরস্কে। তখন ব্রিটিশ এবং র্জামান কোম্পানিগুলো যৌথভাবে টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি দখলে নেয়ার ষডযন্ত্র শুরুকরে (টার্কিশ কোম্পানির স্বত্ব ছিল ইরাকের তেলের ওপর)। বিশ্বযুদ্বের কারণে তাদের ঐ পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। যুদ্বে র্জামানির পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় অটোমান সাম্রাজ্য। যুদ্বের পর ইরাকের তেলের দখল নিয়ে মিত্র বাহিনীর ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে রীতিমতো যুদ্ব লেগে যায়। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৯২০ সালে এক গোপন চুক্তি হয়। চুক্তি মতে, ইরাকের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থাকবে ব্রিটেনের এবং বিনিময়ে ফরাসিরা পাবে টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানির জার্মান অংশ। বিট্রিশ ও মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেল ক্ষেত্রগুলো দখল করে নিতে পারে এ শঙ্কায় ফরাসিরা ব্রিটেনের সঙ্গে আরো কিছু যৌথ উদ্যোগ নেয়। এতে আমেরিকা ক্ষিপ্ত হয়। কারণ ঐসব পরিকল্পনায় আমেরিকার ভাগে কিছুই রাখা হয়নি। ওয়াশিংটন তখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ওপর নিষেধাজ্ঞার চিন্তাভাবনা শুরু করে। তারা টার্কিশ পেট্রেলিয়াম কোম্পানির সঙ্গে বিলুপ্ত অটোমান সাম্রাজ্যের চুক্তিকে অকার্যকর বলে মত দেয়। চাপের মুখে ব্রিটিশরা আমেরিকাকে কিছু শেয়ার দেয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়। এসময় সৌদি আরবে বিশাল তেল ক্ষেত্র আবিস্কার হয়। ইরাকে ১৯২৭ সালের অক্টোবরে প্রথম তেলকূপ খনন করে ব্রিটিশ। ১৯২৮ সালের জুলাই মাসে ইরাকের তেল নিয়ে বিবাদমান দলগুলো ‘রেড লাইন এগ্রিমেন্ট’ চুক্তির মাধ্যমে সমঝোতা করে। এচুক্তিতে পরাজিত অটোমানরাজ ও তাদের মিত্র জার্মানি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সব অধিকার হারায়। আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের শক্তি অনুসারে ভাগ করে নেয় তেল সম্পদ। ব্রিটেন নেয় অর্ধেক,বাকি অর্ধেক সমানভাবে ভাগ করে নেয় ফ্রান্স ও মার্কিনিরা। আর এসব ভাগবাটোয়ারার কোনো কিছুই মধ্যপ্রাচ্যের কেউ জানতে পারেনি। তাদের সঙ্গে কোনো পক্ষই আলাপ করেনি। ১৯৩২ সালে ইরাক স্বাধীন হওয়ার পরও ১৯২২ সালের চুক্তি মতে তাদের তেল সম্পদ লুন্ঠিত হতে থাকে। শুধু ইরান বা ইরাক নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ তেলক্ষেত্রই ধীরে ধীরে পশ্চিমাদের দখলে চলে যায়।
বিশ্বের তেল রিজার্ভ পরিস্থিতি: বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল রিজার্ভ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। বিশ্বের তেল রিজার্ভের ৬৪.৫% (৬৯৪, ৬০৫, ৯০০,০০ ব্যারেল) রয়েছে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে। আর মুসলিম দেশগুলোতে রয়েছে বিশ্বের মোট রিজার্ভের ৭২ শতাংশ। তাছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদক ও শীর্ষ তেল মজুদকারি দেশ সৌদী আরব। বিশ্বের দ্বিতীয়,তৃতীয়,চতুর্থ ,পঞ্চম শীর্ষ তেল মওজুদকারি দেশ যথাক্রমে ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান। তেলের দিক দিয়ে আমেরিকার অবস্থা গত ৩৩ বছর ধরেই খারাপ। আমেরিকার প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল লাগে এবং এই চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমান প্রয়োজনের ৭০ শতাংশ তেলই আমদানি করতে হয় আমেরিকার। পশ্চিমের শিল্পোন্নত অন্যান্য দেশেরও কমবেশি একই অবস্থা। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০১৫ সালের মধ্যে ব্রিটেনের প্রয়োজনীয় তেলের অর্ধেকই আমদানি করতে হবে। নরওয়ে জানিয়েছে আগামী ১০ বছরের মধ্যে উত্তর সাগরে তেলের উৎপাদন অর্ধেক কমে যাবে। আর্জেন্টিনা, কলন্বিয়ায় ইতিমধ্যেই তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্ব তেল পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বের অনুকূলে। মুসলিম বিশ্বের তেল ছাড়া বলা যায় বিশ্ব অচল।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিস্থিতি: সৌদি আরব-৩৭.৮%, ইরাক-১৬.২%, ইরান-১৪.৩%, আরব আমিরাত-১৪.০%, কুয়েত-১৩.৯%, কাতার-১.৯%, ওমান-০.৯%, সিরিয়া-০.৪% ও অন্যান্য-০.৬% ।
বিশ্বের তেল রিজার্ভ পরিস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্য:-৬৪.৫% ;৬৯৪, ৬০৫, ৯০০, ০০০ ব্যারেল।
ল্যাটিন আমেরিকা:-১১.৫% ; ১২৪ ৩২৫, ০০০, ০০০ (ভেনিজুয়েলা: ৬১.৮%)
আফ্রিকা: ৮.৯% ;৯৫,৪৬১,৯০০,০০০ (লিবিয়া ৩৮%,নাইজেরিয়া ৩৬%)
পূর্ব ইউরোপ: ৬.২% ; ৬৭,১৫৯,৭০০,০০০ ( সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ৯৭.২%)।
এশিয়া প্যাসিফিক: ৪% ; ৪৪,৩৯০,৫০০,০০০ ( চীন ৫৪%)।
উত্তর আমেরিকা: ২.৮% ;৩০,৪৯১,০০০,০০০ (আমেরিকা ৭.৪%)।
ইউরোপ: ২.০% ; ২১,০৬৫,৬০০,০০০ (নরওয়ে ৬২.৪%)।
0 comments:
Post a Comment