সংবাদ ও সাংবাদিক প্রসঙ্গঃ প্রয়োজন ঐক্য
আলী ফোরকান
সংবাদ বিশ্বে সবচাইতে মুল্যবান একধরণের পণ্য। এ থাকে ফাইলে। অফিসার ও মন্ত্রীদের পরিমন্ডলে। অথবা নিয়ন্ত্রিত কক্ষপথে। সেই সংবাদের পশ্চাদধাবন করতে গিয়ে। বিশ্বে অনেক সাংবাদিক প্রাণ দিয়েছেন। হয় যুদ্ধক্ষেত্রে নয়তো গুপ্ত ঘাতকের হাতে। বাংলাদেশেও সাংবাদিক নির্যাতন,হয়রানি ও খুনের সংখ্যা কম নয়। বিশ্বের যেকোন সময়, যে কোন মানুষ, যেকোন ঘটনা। অথবা কোন ঘটনার আবিস্কার বা গতি-প্রকৃতি সংবাদ হয়ে উঠতে পারে। মানুষের কাছে আর্কষনীয় ও নতুন তথ্য, যে কোন বিষয় থেকে উদঘাটিত হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় একটি অবহেলিত বিষয় থেকেও অত্যন্ত বিস্ফোরক সংবাদ বেরিয়ে আসে। আমাদের দেশে এমন তথ্য অনেক। গত ৩৬ বছরে এদেশ থেকে বহু শতকোটি টাকার ভাস্কর্য পাচার হয়ে যায়। ব্যাপারটি জনগণের কাছে সহজে লক্ষ্যযোগ্য হয়নি। কিন্তু বিষয়টি এক সাংবাদিকের নজরে আসে। সে প্রমাণাদিসহ সিরিজ তৈরি করে তার পত্রিকায় প্রকাশ করে। সে সময় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন তার ওপর ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু ক’দিন পরেই সেই সিরিজের লেখা বন্ধ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ করতে হয়নি। সংশ্লিষ্ট চোচালানির সম্ভ্রান্ত গ্র“প মালিকের সাথে কথা বলে সংবাদ সিরিজটি বন্ধ করে দেয়। এ সংবাদ উদঘাটনের সেখানেই সমাপ্তি ঘটে। সেই সাংবাদিক শেষ পর্যন্ত চাকরি ছাড়েন,আহত মন নিয়ে। দৃষ্টান্তটি হচ্ছে সরকারের বাইরের শক্তির সংবাদ বন্ধ করার নমুনা। আরেকটি হচ্ছে সরকারি ভাবে সংবাদ বন্ধ করার দৃষ্টান্ত। ১৭৬৬ সালে উইলিয়াম বোন্টাস তার “বেঙ্গল গেজেট” (সাপ্তাহিক) পত্রিকায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লুটের কাহিনী প্রকাশ করে তৎসময়ের সরকারের রোষানলে পড়ে। এছাড়া তিনি ঐপত্রিকায় গর্ভনর জেনারেল হেস্টিংসের স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করায় তার বহুবার জেল জরিমানা হয়েছে। ১৮১৮ সালে ‘দিগদর্শন’,‘সমাচার দর্পণ’ ইত্যাদি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তবে এগুলো বাঙ্গালি উদ্যোগে হয়নি। ১৮১৮ সালে প্রথম বাঙ্গালি উদ্যোগে ‘বাঙাল গেজেট’ নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। দ্বিতীয়টি রাজা রামমোহন এর ‘সংবাদ কৌমুদী’। রাজা রামমোহন রায় ফার্সি ভাষায় প্রকাশ করেন ‘মিরাৎ উল আকবর’। রাজা রামমোহন রায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিলেন। রামমোহন রায়ের কাগজটিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গর্ভনর জেনারেল এডাম (তিনিই বাকিংহামকে তাড়িয়ে ছিলেন) ১৮২৩ সালে জরুরী প্রেস আইন প্রবর্তন করেন। ১৮৬৮ সালে ইংরেজি ও বাংলায় প্রকাশিত ‘অমৃত বাজার পত্রিকা’ জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে ভূমিকা রেখে আসছিল। এ সময়ও সরকার প্রেস ও সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার একের পর এক আইন জারি করতে থাকে। লর্ড লিটন ১৮৭৮ সালে ‘ভার্ণাকুলার প্রেস এ্যাক্ট’ নামে বিশেষ আরো একটি আইন পাস করে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রেস এ্যান্ড এ্যাক্ট প্রণীত হয়। এরশাদ সরকারের সামরিক শাসনের পর ১৯৯১ সালে পত্রিকাগুলো আবার ধীরে ধীরে স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বাংলাদেশে অনেক স্বাধীনভাবে সংবাদ স¤প্রচার করতে পারছে। ফিনান্সিয়াল এক্্রপ্রেসের নির্বাহী সম্পাদক শহীদুজ্জামান খান ২০০৬ সালে তার জম্মদিনে বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। শহীদুজ্জামান খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েক বছর স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রচার হয়েছে। কিন্তু এক সময় সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে তথ্য অধিদফতর (পিআইডি) হস্তক্ষেপ শুরু করে। বাকশাল চালুর পর তৎসময়ের সরকার ৪টি পত্রিকা রেখে বাকি গুলো বন্ধ করে দিয়েছিল। তখনো আমরা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারিনি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবাদপত্রগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতো। মূলত তখন থেকেই সংবাদপত্রগুলো স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল। গণমাধ্যমে পুঁজিবাদের প্রসার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে পুঁজিপতিরা অর্থাৎ কালো টাকার মালিকরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিনিয়োগ করছে। এর মাধ্যমে তারা কালো টাকা সাদা করতেও পারে। পুঁজিপতিদের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ায় সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে সাংবাদিকরা নিজেদের ক্যারিয়ার সম্পর্কে অনেক সচেতন। তারা নিজেদের স্বার্থেই ভালো ও স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করে। প্রয়োজন বোধে কর্মস্থল পরিবর্তন করতেও পিছ পা হয়না। তবে তিনি মনে করেন, পুঁজিপতিদের সঙ্গে কাজ করলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাঁধাগ্রস্থ নাও হতে পারে। সাংবাদিক নির্যাতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের মিডিয়াগুলো স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে পারছে। সেই সুযোগে সত্য ও বস্তুনিষ্ট সংবাদে অনেকের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে থাকে। কোনো ক্ষেত্রে তা খুন ও শারীরিক নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ছে। সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো বর্তমানে তেমন উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখতে পারছেনা বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে দ্বিধা বিভক্তির কারণেই কোনো গ্র“পই জোর দিয়ে কিছু করতে পারছেনা। তবে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে সফলভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবে। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের দুবার সভাপতির দায়িত্ব পালনকারি প্রবীণ সাংবাদিক-কলামিস্ট কামাল লোহানী সংবাদ ও সাংবাদিক প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন,তখন আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এখনকার মতো বিভক্তি ছিলনা। ১৯৭৫ সালে ৪টি পত্রিকা রেখে অন্য পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দেয়ার পর আমাদের অভিমত ছিল ইউনিয়ন কোনো নির্দিষ্ট দলে যোগদেয়ার সিদ্ধান্ত দেবেনা। কারণ সেখানে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক ছিল। তখন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্মল সেন, মহাসচিব গিয়াস কামাল চৌধুরীসহ আমরা বেকার সাংবাদিকদের বিভিন্ন স্থানে সংস্থান করার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে গিয়াস কামাল চৌধুরীর এসময় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তারপরও অনেকে বাকশালে যোগ দিয়েছেন। তাদের অনেকেই পরে প্রচুর টাকা পয়সার মালিকও হয়েছেন। কিন্তু ঐ বিপর্যয়টা আমাদের ইউনিয়নের ব্যাপক ক্ষতি করেছিল। যা আইয়ুব খান ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট গঠন করেও পারেনি। কামাল লোহানী বলেন, আমাদের সময় যে কোনো পত্রিকারই সাধারণ কর্মচারি,প্রেস শ্রমিক ও সাংবাদিকরা ৩টি ফেডারেশনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতো। তার মতে, ইউনিয়ন হলো পুরো সাংবাদিকমহলের প্রধান অভিভাবকের মতো। তিনি অরো বলেন, আগে ইউনিয়নের অধীনে একটি রিপোটার্স স্ট্যান্ডিং কমিটি ছিল। তারা রিপোর্টারদের বিরুদ্ধে কোন কিছু ঘটলে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে তাৎক্ষণাৎ সিন্ধান্ত নিতে পারতো। এখন এরকম কার্যক্রম চোখে পড়েনা। ফলে দিন দিন সাংবাদিক নির্যাতন, হত্যা ও হয়রানি বেড়ে যাচ্ছে। তবে স¤প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে সে আদলে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। আমরা আশাকরি এ কমিটি সারা দেশের সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। এছাড়া পেশাগত কারণে সবাইকে মতের উর্ধ্বে রেখে একই ব্যানারে আনতে পারলে সেটিই মঙ্গল। আর কাল ক্ষেপণ করার অবকাশ নেই। এখনই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়।
0 comments:
Post a Comment