বাংলাদেশে কাঁক্ড়া চাষের উজ্জল সম্ভাবনা
আলী ফোরকান
কাঁক্ড়া আর্থোপোড শ্রেণীর শক্ত খোলসবিশিষ্ট জলজ প্রাণী। প্রজাতি ভিত্তিক মিঠা ও লোনা পানি, উভয় পরিবেশে কাঁক্ড়া পাওয়া যায়। মিঠা পানিতে চার প্রজাতির এবং লোনা পানিতে এগার প্রজাতির কাঁক্ড়া রয়েছে। মিঠা পানির কাঁক্ড়া আকারে ছোট এবং লোনা পানির কাঁক্ড়া আকারে বেশ বড় হয়। লোনা পানির কাঁক্ড়া সমুদ্রে বসবাস করে। মিঠা পানির কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানী হয় না। সামুদ্রিক বড় আকারের কাঁক্ড়া বিদেশে রপ্তানী হয়। তাছাড়া সামুদ্রিক এগার প্রজাতির কাঁক্ড়া মধ্যে একমাত্র শিলা কাঁক্ড়া রপ্তানী হয়। ইহার বৈজ্ঞানিক নাম সাইলা সিরেটা। অনেক স্থানে ইহা ম্যাডক্রাব নামে পরিচিত। বিদেশে শিলা কাঁক্ড়ার মাংসই প্রিয় খাদ্য। বাংলাদেশে সর্বত্র সকল শ্রেনীর লোকের কাছে কাঁক্ড়া অতি পরিচিত প্রাণী। কাঁক্ড়া মৎস্য সম্পদের মধ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয়ভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠি খাদ্য হিসাবে কাঁকড়া গ্রহন না করলেও বিদেশে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশসহ ইউরোপ মহাদেশেও কাঁক্ড়ার চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার কাঁক্ড়া বিদেশে রপ্তানী করে থাকে। বিশ্ব বাজারে কাঁক্ড়ার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সংগ্রহ প্রক্রিয়া ও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি কাঁক্ড়ার চাষ পদ্ধতির কলাকৌশল সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে কাঁক্ড়া চাষ প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। বর্তমান রপ্তানীকৃত কাঁক্ড়ার প্রায় সবটাই উপকূলীয় চিংড়ি খামার ও সমুদ্রের মোহনা নদী এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থেকে আহরণ করা হয়ে থাকে।
পরিচিতি ও বি¯তৃতি: কাঁক্ড়া বা ম্যাডক্রাভ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলীয় ভারত উপকূল এবং ইন্দোপেসিফিক অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ এলাকায় দেখা যায়। এসব কাঁক্ড়ার চক্ষুপুঞ্জের দুই পার্শ্বে ঈধৎধঢ়ধপব এর উপরে নয়টি দাঁত রয়েছে যা ঝবৎৎধঃরড়হং বলা হয়। সিরাসন এর সংখ্যা দিয়ে কিশোর কাঁক্ড়া চেনা যায়। বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় সর্বত্র কাঁক্ড়া পাওয়া যায়। কাঁক্ড়ার বয়স সধারণত ১৬-১৮ মাসের হলেই পূর্নবয়স্ক বা প্রজননক্ষম হয়। এসময় একটি কাঁক্ড়ার ওজন হয় ৩০০-৫০০ গ্রাম। এটি কাঁকড়া সর্বোচ্চ ৫ কেজি পর্যন্ত
ওজনের পাওয়া গেছে। সধারনত এক বছর বয়সের কাঁকড়ার ওজন ৪০০ গ্রাম -৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে। বাগদা চিংড়ির ন্যায় স্ত্রী কাঁক্ড়া গভীর সমুদ্রে “নউপ্লি” ছেড়ে থাকে। যা পরবর্তীতে পাঁচটি লার্ভা স্তরে পার হয়ে ম্যাগালোপা ও পোষ্ট লার্ভা স্তরে উপনীত হয়্। এরা জোয়ার, ঢেউ ও বাতাসে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ এলাকায় ভেসে আসে এবং কিশোর স্তরে উপনীত হয়। একটি স্ত্রী কাঁক্ড়া ১-৮ মিলিয়ন ডিম দিতে পারে। বাগদা চিংড়ির ন্যায় কাঁক্ড়ার খোলস রয়েছে যা চিংড়ির চেয়ে অপেক্ষাকৃত শক্ত। দৈহিক বৃদ্ধির জন্য কাঁক্ড়া খোলস পরিবর্তন করে থাকে। কাঁক্ড়ার নিজ প্রজাতি ভক্ষণ প্রবণতা রয়েছে। কাকড়ার শক্ত সারসী বা চিমটা দ্বারা সহজে অন্য প্রাণীকে মেরে ফেলতে পারে। কাঁক্ড়া মাটিতে এবং বাঁধে গর্ত করতে পছন্দ করে। ডুবন্ত গাছের শেঁকড়ে ও ডালপালায় এরা আশ্রয় নেয়। তাই ম্যানগ্রোভ এলাকায় এদেরকে পাওয়া যায়। পানি ছাড়া কাঁক্ড়া দীর্ঘ সময় বাঁচতে পারে এবং হেঁটে হেঁটে এক স্থান থেকে সহজে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে।
কাঁক্ড়া চাষের প্রধান সুবিধাসমূহ:
ক্স বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের চাষের পরিবেশ বিদ্যমান।
ক্স আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকায় এর উৎপাদন লাভজনক।
ক্স বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক পোনা (কিশোর) পাওয়া যায়।
ক্স কাঁক্ড়ার খাবার স্বল্পমূল্যে গ্রহণ সম্ভব।
ক্স ওজন হিসেবে কাঁক্ড়ার বৃদ্ধির হার বেশী।
ক্স পঁচা আবর্জনা খেয়ে পরিবেশ রক্ষা করে।
কাঁক্ড়া চাষের উপযুক্ত পরিবেশ: বাগদা চিংড়ির ন্যায় কাঁকড়া উপকূলের লবনাক্ত পানিতে চাষ করা যায। কাঁকড়া চাষের মাটি ও পানির গুনাবলি নিæরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়।
মাটির গুনাবলী ঃ
(ক) নরম দোঁয়াশ বা এঁটেলে মাটি।
(খ) হাইড্রোজেন সালফাইট ও এ্যামুনিয়া গ্যাসযুক্ত মাটি।
(গ) জৈব পদার্থ ৭%-১২%।
(ঘ) এসিড সালফেট মুক্ত মাটি।
(ঙ) হালকা শ্যাওলা ও জলজ আগাছাযুক্ত পরিবেশ।
পানির গুনাবলি ঃ
(ক) লবনাক্ততা ঃ ১০-২৫ পিপিটি।
(খ) তাপমাত্রা ঃ ২৫-৩০ সেঃ ।
(গ) পি এইচ ঃ ৭.৫-৮.৫ ।
(ঘ) এ্যালকালিনিটি ঃ ৮০ মিগ্রা/লিঃ
(ঙ) হার্ডনেস্ ঃ ৪০-১০০পি পি এম।
(চ) দ্রবীভূত অক্সিজেন ঃ ৪পি পি এম এর উর্ধ্বে।
কাঁক্ড়া চাষের স্থান নির্বাচন ঃ সাধারণভাবে বাদগা চিংড়ির চাষের উপয্ক্তু স্থানে সহজেই কাঁক্ড়া চাষ করা যায়। কাঁক্ড়ার খাবার বা পুকুরে প্রতিনিয়ত লবানক্ত পানি পরিবর্তনের যথেষ্ট সুযোগ থাকতে হবে। বছরে ৮-১০ মাস ৫ পিপিটির উর্ধ্ব লবনাক্ততা থাকে এরুপ স্থান কাঁক্ড়া চাষের উপযোগী। কাঁক্ড়ার চাষ এলাকা বন্য প্রাণীও পাখিমুক্ত থাকতে হবে।
কাঁক্ড়া চাষের পুকুর নির্মাণ: বাগদা চিংড়ি চাষের পুকুরের ন্যায় কাঁক্ড়ার পুকুরের পানি ধরণের জন্য শক্ত বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কাঁক্ড়া হেঁটে বেড়াতে অভ্যস্ত। তাছাড়া মাটিতে গর্ত করে লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। তাই বাঁধের অভ্যন্তরে বেড়া স্থাপন করা আবশ্যক। বেড়ার উচ্চতা পানির উপরে ০.৫ মিটার রাখতে হবে। পুকুরের অভ্যন্তরে এই বেড়া বাঁশের ঘন পাটা, ঘন কঞ্চির বুনন, সিমেন্ট এর দেয়াল বা এ্যাসবেস্টাস দ্বারা দেয়াল তৈরী করা যায়। এই বেড়া কমপক্ষে ০.৫ মিটার মাটির নীচে বেিসয় দিতে হবে। যেন কাঁক্ড়া বেড়ার নিচে দিয়ে গর্ত করে পালিয়ে যেতে না পারে। এছাড়া বেড়ার বুনন এমন হতে হবে যেন কিশোর কাঁক্ড়া ফাঁক দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। এছাড়া অন্য ক্ষতিকর প্রাণীও যেন কাঁক্ড়ার পুকুরে প্রবেশ করতে না পারে। পুকুর শুকানো এবং পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাগদা চিংড়ির ন্যায় গেট বা বাক্স নির্মাণ করে পানি সঞ্চালনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পুকুরের আয়তন ০.২-১.০ হেক্টর হলে ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয়। পুকুরের গভীরতা ১.০-১.৫ মিটার রাখা ভাল।
পুকুর প্রস্তুতি: (ক) শুকানো ও ধৌত করণ: বাগদা চিংড়ির পুকুরের ন্যায় চাষ এলাকার মাটি শুকাতে হবে। শুকানোর পর মাটির উপরের অম্ল, লবন ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারনের জন্য পুকুরের তলদেশ ধৌত করতে হবে। পানি তুলে পুনরায় একদিন পর পানি ছেড়ে ধৌত প্রক্রিয়া সমাধা করা যায়। পুকুরের তলদেশ চাষ দেয়ার প্রয়োজন হলে চাষ দেয়ার পর একই নিয়মে তা পুনরায় ধৌত করতে হবে।
(খ) চুন প্রয়োগ : হেক্টর প্রতি সাধারণত ৩০০-৮০০ কেজি ঈধ চাষ পূর্ব মাটিতে এবং বাঁেধ দিতে হবে। মাটির পি,এইচ নির্ধারণপূর্বক চুন প্রয়োগ করা উচিত। মাটির পি,এইচ এর ভিত্তিতে সম হারে চুন দেয়া যায়।
(গ) আশ্রয় স্থল সৃস্টি।
কাঁক্ড়া খোলস ছাড়ার সময় জলজ প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। প্রকৃতিতে ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড়ের আড়ালে এরা আশ্রয় নেয়। তাছাড়া সিমেন্টের পাইপ বা পিভিসি পাইপের টুকরাও ব্যবহার করা যায়। সাধারনত ৪র্ র্ -৬র্ র্ ব্যাসের পাইপ ব্যবহার করা যায়। পাইপের ব্যাস বিভিন্ন সাইজের হলে ছোট বড় কাঁক্ড়া তাদের পছন্দ মত স্থানে আশ্রয় নিতে পারে। পুকুরের তলদেশে এবং অভ্যন্তরে বেড়ার পার্শ্বে এই আশ্রয় স্থল স্থাপন করা যায়। পচনশীল দ্রব্য আশ্রয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
পুকুরে পানি উত্তোলন ও সার প্রয়োগ চিংড়ি চাষের ন্যায় কাঁক্ড়ার চাষ এলাকায় অন্য পানির অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য সবসময় ০.২৫ মিঃ মিঃ ছিদ্রযুক্ত নাইলন জাল দিয়ে পানি ছেকে তুলতে হবে। প্রথমবার ৩০ সেঃ মিঃ পানি পুকুরে উঠিয়ে পানিতে জৈব সার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা যায়। পানিতে সার একত্রে সব না দিয়ে কয়েক ভাগে ভাগ করে প্রয়োগ করা হলে ভাল ফল পাওয়া যায়। যা আর্থিভাবেও লাভজনক। হেক্টর প্রতি ৫০০ কেজি জৈব সার, ১৫ কেজি টি এসপি এবং ১০ কেজি ইউরিয়া সার পানিতে গুলে সর্বত্র ছিটিতে দিতে হবে। পানির রং এবং ফাইটোপ্লাংকটনের উৎপাদনের পরিমাণ অনুযায়ী মাত্রা অনুসারে সার প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে পানির গভীরতা বৃদ্ধি করতে হবে। যা পানির গভীরতা ১ মিটারের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়। পানিতে উৎপাদিত ফাইটোপ্লাকটন কাঁক্ড়ার খাদ্য উপাদান বৃদ্ধিতে সহায়তার পাশাপাশি পুকুরের তলায় ছায়া দেয়। কাঁকড়া সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না এবং ছায়া পছন্দ করে। এছাড়া প্লাংকটন পাণির গুনাগত সঠিক মাত্রায় থাকার সাহায্য করে ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারনে সহায়তা করে।
কাঁকড়া মজুদকরণ : বর্তমানে কাঁক্ড়া চাষ বলতে কাঁকড়া মোটা তাজা করাকেই বুঝায়। কিশোর কাঁকড়া বাঁশের চাই বা ফাঁদ, পাতা জালে, থলে জাল দিয়ে ধরা হয়। ২০-৪০ গ্রাম ওজনের ৮-১০ হাজার কাঁক্ড়া প্রতি হেক্টরে মুজত করা যায়। স্ত্রী কাঁকড়ার চাষ বেশী লাভজনক। তাই স্ত্রী ও পুরুষের অনুপাত ৯.১ বা ৯০% স্ত্রী ১০ % পুরুষ মজুদ কাঁকড়ার চিমটা পা ও বুকের ফ্ল্যাপ দেখে সনাক্ত করা যায়। পুরুষ কাঁক্ড়ার চিমটা পা বড়, স্ত্রী কাঁকড়ার চিমটা পা একই বয়সের পুরুষ কাঁক্ড়ার চেয়ে ছোট। স্ত্রী কাঁক্ড়ার বুকের ফ্লাপটি অর্ধ গোলাকার অন্য দিকে পুরুষ কাঁকড়ার ফ্লাপটি অপেক্ষাকৃত সরু ও ইংরেজী ভি আকৃতির। একই বয়সের কাঁকড়া একত্রে সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই ওজন ভিত্তিতে কাছাকাছি ওজনের কাঁকড়া মজুদ করা হলে চাষকালীন পরিচর্যার সুবিধা হয়। কিশোর কাঁকড়া একস্থান হতে অন্য স্থানে বাঁশের ঝুড়িতে পরিবহণ করা যায়। রপ্তানির জন্য গুনাড বিশিষ্ট স্ত্রী কাঁক্ড়াগুলো সনাক্ত করা হয়। আহরণের পর যে সমস্ত স্ত্রী কাঁক্ড়া গুনাড / ডিম্বাশয়বিহীন অবস্থায় পাওয়া যায় সেগুলোকে স্থানীয়ভাষায় খোসা কাঁকড়া বলা হয়। এই খোসা কাঁকড়া বা নরম খোলসা বিশিষ্ট কাঁকড়া নির্দ্ধারিত পুকুরে ১৫-২০ দিন রেখে উপযুক্ত খাবার দেওয়া হয়। ইহাকে কাঁক্ড়া ফেটেনিং বলা হয়। কাঁক্ড়া ফেটেনিং পদ্ধতি অনেক স্থানেই প্রচলিত আছে।
খাবার সরবরাহ: কাঁকড়া সর্বভূক। এরা সাধারণত জীবন্ত খাদ্য পেতে পছন্দ করে। ছোট ছোট মাছ, সামুদ্রিক ক্রিমি, শামুক, ঝিনুক, কীট পতঙ্গ খেয়ে থাকে। তবে ময়লা ও পচা জৈব পদার্থ জাতীয় খাবার ও এরা খায়। খাদ্য হিসাবে ছোট গুড়া মাছ, শামুক, ঝিনুকের মাংস, চিংড়ি ও চিংড়ির মাথা, বিভিন্ন প্রকার দেহাবশেষ ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়। কাঁক্ড়ার খোলস তৈরীর জন্য ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধি খাদ্য প্রয়োজন। তাই মাংসের হাড় বা কাঁটাও কাঁকড়া খেয়ে থাকে। এছাড়া চালের কুড়া, গমের ভুষি, আটা, ফিস মিল ইত্যাদি মিশ্রণপূর্বক কাঁকড়ার খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। কাঁকড়া দেহের বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ট্রেতে খাবার দিয়ে খাদ্য গ্রহনের প্রবনতা পর্যবেক্ষণ পূর্বক খাবার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। কাঁক্ড়া বাগদা চিংড়ির ন্যায় নিশাচর প্রাণী। তাই বিকালে বা সন্ধ্যায় ও রাতে প্রত্যহ ২-৩ বার খাবার দিতে হয়।
পানি ব্যবস্থাপনা : অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় জোয়ার ভাটার প্রভাবে কাঁকড়ার পকুরের পানি পরিবর্তন করা যয়। পানির গুনাগুণ রক্ষার জন্য নিয়মিত চুন ও সার প্রয়োগ করতে হবে। কোন কারণে প্লাংকটন মারা গেলে কিংবা পানি দুষিত হলে সাথে সাথে পানি পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কাঁকড়া উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে অন্যত্র বের হয়ে যায়। কাঁকড়া শক্ত প্রাণী বটে কিন্তু পরিবেশের তারতম্য বা পানি দুষিত হওয়ার কারণে এরা মারা যায় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়।
কাঁক্ড়া আহরণ ও বাজারজাতকরণ : মজুদের ৩-৪ মাস পর কাঁক্ড়া আহরণ করা যায়। বাংলাদেশে সবচেয়ে চাষের উপযুক্ত সময় মার্ছ থেকে জুলাই মাস। এ সময় পানির গুনাগুন ও তাপমাত্রা উপযুক্ত পর্যায়ে থাকে। কাঁকড়া ধরার জন্য বাঁশের চাই অথবা জালের তৈরী ফাঁদি সবচেয়ে উপযুক্ত। ধরার সময় কাঁকড়ার পা ভেঙ্গে গেলে বাজারজাত করা যায় না। লিফ্ট নেট বা চাই ফাঁদে খাবার দিয়ে কাঁক্ড়া পর্যায়ক্রমে ধরা যায়। কাঁকড়া ধরার আগেই পুকুরে খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। কাঁকড়া একপাত্র থেকে অন্য পাত্রে নেয়া বা রাখার জন্য বাঁশের চিমটা এমন ভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন পা ভেঙ্গে না যায়। কাঁকড়াকে পিছন দিয়ে চিমটা বা হাত দিয়ে ধরা যায়। বর্তমানে জীবন্ত কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানী হয়ে থাকে। তাই কাঁকড়া চিমটা বা প্লাষ্টিকের ফিতা দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে ঝুঁড়িতে ভরে করে বাজারজাত করা যায়। পরিবহনের সময় ঝুড়িতে শ্যাত শ্যাতে ভাব বজায় রাখার জন্য লবন পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। কাঁকড়ার ঝুড়ি অন্ধকারে/ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে রাখতে হয়। বাংলাদেশ থেকে এখনও সিদ্ধ করা অথবা হিমায়িত কাঁকড়া বিদেশের বাজারে বাজারজাত করা হয় না। যদি ঐ অবস্থায় রপ্ত্নাী করা যেত তবে পরিবহন খরচ অনেক কম হত।
উপসংহার : কাঁকড়া চাষের উপযুক্ত পরিবেশ আমাদের দেশের উপকুল অঞ্চলে রয়েছে। যদিও এর চাষ এখনও তেমন প্রসার লাভ করে নাই। কাঁকড়ার রপ্তানী বাজারদর হিসাবে এর চাষ বেশ লাভজনক। সঠিকভাবে চাষ করা গেলে বর্তমান হিসাবে প্রতি কেজিতে ৬০ টাকারও বেশী নীট লাভ করা যায়। কাঁকড়াও একটি চাষযোগ্য প্রাণী এবং এর উৎপাদন একটি লাভজনক বিনিয়োগ। এ বিষয়টি প্রদর্শনের জন্য দেশে কাঁকড়া খামার স্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এ বিষয় সম্পর্কে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা সরকারী পর্যায়ে করতে হবে। বর্তমানে জীবন্ত কাঁকড়া রপ্তানীর জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। কাঁকড়া চাষ এবং উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের উপর ন্যাস্ত করতে হবে। উপকূলীয় এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরোপিট এলাকায় পরিকল্পিত কাঁকড়া চাষ করে জমির সুষ্ঠ ব্যবহার করা যায়। কাঁকড়ার বাচ্চা সরবরাহ নিশ্চিত করণের জন্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরীন খালসমূহে বেহুন্দী জাল ব্যবহার বন্ধ করাতে হবে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কাঁকড়া সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা।
0 comments:
Post a Comment