Sunday, February 18, 2018

জীববৈচিত্র্য-ভান্ডার সংরক্ষণ করুন

জীববৈচিত্র্য-ভান্ডার সংরক্ষণ করুন
আলী ফোরকান 
২২ মে আর্ন্তজাতিক জীববৈচিত্র দিবস। কিন্তু জীববৈচিত্র্য কি তা আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকের কাছেই তা অজ্ঞাত, অপরিচিত। কারণ জীববৈচিত্র্য বিষয় আমাদের দেশে প্রচার অতি সীমিত। কিন্তু মানবসভ্যতার নিয়ামকশক্তি জীববৈচিত্র্য। সে জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্য ও সহজলভ্যতার ওপর বিশে^র কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য, অস্তিত্ব নির্ভরশীল। পৃথিবীর প্রাণবৈচিত্র্য বাঁচাতে, এর টেকসই ব্যবহার ও সংরক্ষণ, দর্শন, দিকনির্দেশনা তৈরির উদ্দেশ্যেই জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৯২ সালে রিওতে অনুষ্ঠিত ‘কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি’তে প্রতিনিধিরা সমবেত হয়েছিলেন। এই কনভেনশনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল পৃথিবীব্যাপী জীববৈচিত্র্য হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়ার কারণে। মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে জীববৈচিত্র্যের স্বর্ণভান্ডার দিন দিন কমতে শুরু করে। চিন্তাশীল মানুষ এর ভয়াবহ পরিণতি ভেবে আতঙ্কিত  হয়ে ওঠে। তারা বিপর্যয় ঠেকাতে কাজ শুরু করে। চিন্তা একটাইÑ কি করে প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করে মানুষের চাহিদা মেটানো যায়। পৃথিবীর মানবসভ্যতাকে দীর্ঘায়িত করা যায়। প্রয়োজন জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে শিক্ষা, আহরণ বিধি তৈরি, হুমকিগুলো দূর করা এবং সংরক্ষণ নীতিমালা ঠিক করা। কাজটি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা রাষ্ট্রের একার নয়। সমস্যাটা সারা পৃথিবীর । তাই এসব বিষয়ে বিশ^ স¤প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ ও অংশগ্রহণ জরুরি। এ লক্ষ্যে আর্ন্তজাতিক সংরক্ষণ সংস্থ’া আইইউসিএন জীববৈচিত্র্য সংক্রান্ত একটি আর্ন্তজাতিক সম্মেলনের প্রস্তাব পাঠায় জাতিসংঘ হেডকোয়ার্টারে। জাতিসংঘের ১৬তম সাধারণ সভা ওই প্রস্তাব গ্রহণ করলে ১৯৮৭ সালে আইইউসিএন একটি খসড়া দলিল তৈরি করে। ১৯৮৮ সালে এই দলিল বিতরণ করা হয় ইউএনইপির গভর্নিং কাউন্সিলে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে। ১৯৯০ সালে বিশে^র ৭৫টি রাষ্ট্র্রের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের এসব বিষয়ক একটি ওয়ার্কিং গ্র“পের সুপারিশে ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয় ‘কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি’। গৃহীত হয় একটি আর্ন্তজাতিক সনদ বা দলিল। ওই কনভেনশনে গৃহীত দলিলে স্বাক্ষরদাতা আর্ন্তজাতিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্য সংক্রান্ত নীতিমালা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হন। ২২ মে বিশ^ব্যাপী ‘আর্র্ন্তাতিক জীববৈচিত্র্য দিন’ পালন ওই কনভেনশনেরই ফসল। দিবসটির তাৎপর্য এই যে, জৈববৈচিত্র্যের অবদান সর্ম্পকে, জীববৈচিত্র্যের হুমকিগুলো সর্ম্পকে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব সর্ম্পকে জনসাধারণকে সচেতন করা, শিক্ষিত করা, উ™^ুব্দ করা এবং এর সংশ্লিèষ্ট করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ দিবসটির গুরুত্ব^ অপরিসীম। বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য জরিপের কাজ যথাযথ হয়নি, তবু লব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়Ñ ৫৪ হাজার বর্গমাইল আয়তনের এ ছোট দেশটি জীববৈচিত্র্যেসমৃদ্ধ একটি দেশ। আমাদের জিন, প্রজাতি ও পরিবেশ প্রণালি বৈচিত্র্য চমৎকার। ছোট এ দেশটিতে কোনাল ডাইভারসিটি আশ্চর্যজনক। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভ‚মি স্তন্যপায়ী হাতির উপস্থি’তি আমাদের প্রাণবৈচিত্র্যের তালিকাকে বিশে^র দরবারে এক বিশিষ্ট স্থ’ান করে দেয়। আমাদের দেশে প্রায় ৭০০ প্রজাতির পাখির উপস্থি’তি বিশ^বাসীকে বিস্মিত করে। 
বাংলাদেশেও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে: জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। এরই মধ্যে সুন্দরবনসহ উপক‚লের বিশাল এলাকার জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সা¤প্র্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধানে চিটা পড়া ও নদীগুলোতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার জন্য জলবায়ুর পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া অনেকাংশে  দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই কারণে সেন্টমার্টিনস ™^ীপের কোরাল মাছ সাদা হয়ে মরে ভেসে উঠছে। মহেশখালীর ধলঘাটা ও কুতুবদিয়া সমুদ্রতীরে অনেক প্রজাতির মাছ মারা পড়ছে প্রতিনিয়ত জেলেদের জালে। এছাড়া সমুদ্রতীরে মানুষের অবাধ বিচরণ ও অপরিণামদর্শী কর্মকান্ডের কারণে কাছিম, লাল কাঁকড়াসহ অসংখ্য প্রাণী মারা পড়ছে। জলবায়ু পাল্টাচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশের তাপমাত্রা দশমিক ১৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ছে। বৃষ্টিপাত বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৫ মিলিমিটার। আন্তঃদেশীয় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত রিপোর্টে (আইপিসিসি) বলা হয়েছে, চলতি শতা¦ন্ধীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৯ থেকে ৮৮ সেন্টিমিটার বাড়বে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সুন্দরবন সর্ম্পকে মন্তব্য করতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বিশে^র সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনের ৭২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ডুবে যাবে। এই বিস্তর্র্ণ এলাকার বেশির ভাগ বৃক্ষ ও প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে অধিক তাপমাত্রায় স্পর্শকাতর আমাদের এই জাতীয় মাছের প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে ধারণা করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নদী গবেষণা কেন্দ্রের মহাপরিচালক ড. ম ইনামুল হক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘শুধু ইলিশ নয়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়া ও ক্রমাগত দূষণের কারণে মাছের উৎপাদন প্রতি বছরই কমছে। সে সঙ্গে  কমে আসছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা । পানি ও কৃষির ওপর বিরূপ প্রভাব আইপিসিসির রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, হিমালয়ের বরফ ক্রমাগত গলতে থাকায় আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছরে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বাড়বে। তবে ৩০ বছর পর পানির প্রবাহ আবারো কমে আসবে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের যেসব এলাকায় নদী শুকিয়ে গেছে সেসব এলাকায় তীব্র খরার কারণে বাড়বে মরু-প্রবণতা। দেশজুড়ে  তীব সুস্বাদু পানির সংকট দেখা দেবে। নদী-তীরবর্তী এলাকার ফসলি জমি ও প্রাণীকূল পড়বে মারাত্মক হুমকিতে। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতরের জলবায়ু বিভাগের উপ-পরিচালক মির্জা শওকত জানান, এসব পরিবর্তনকে মাথায় রেখে সঠিক পরিকল্কপ্পনা নিতে পারলে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভ¢ব । আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আইনুন নিশাত ধানে চিটা পড়াসহ বিভিন্ন ফসলের বৈচিত্র্য বিপন্ন হওয়ার জন্য  জলবায়ুর পরিবর্তন আংশিক দায়ী বলে মনে করেন। এ পরিবর্তনের কারণেই কৃষকরা চাষের জন্য আগের মতো ধানের সঠিক জাত বাছাই করতে পারছেন না । হাইব্রিডের বদলে দেশীয় জাতের বীজ ব্যবহারের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেন তিনি। কৃষি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. জেড করিম জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে গমের উৎপাদন কমে যাবে এবং ভুট্টার উৎপাদন ভালো হবে বলে মন্তব্য করেন। তবে জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ পাভেল পার্থের মতে এরই মধ্যে আমাদের দেশ থেকে কয়েক হাজার প্রজাতির ধান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জলবায়ু পরির্তনের কারণে আরো অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হবে। স্থ’ানীয় মানুষের লৌকিক জ্ঞান ও বিশ^াসকে কাজে লাগিয়ে এ সম্পদকে রক্ষা করা সম্ভ¢ব বলে তিনি মতামত দেন।  হাতি ও বাঘের খাদ্য সংকট ২০০১-২০০২ সালে হাতির ওপর করা আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন বনে দেশি হাতির সংখ্যা ১৯৬ থেকে ২২৭টি। আর অভিবাসী হাতির সংখ্যা ৮৪ থেকে ১ শ’টি। অন্যদিকে ইউএনডিপির জরিপে বলা হয়েছে, দেশে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ৪২০টি। তবে বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা ৩৫০টির বেশি নয় বলে জানা গেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বনে প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাব এবং শিকারীদের ক্রমাগত উৎপাতের কারণে  হাতি ও বাঘের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, অবাধে বন উজাড় এবং সুন্দরবন এলাকায় পানিতে  লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই দুটি প্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি চোরা শিকারীদের হাতে মারা পড়ছে এসব প্রাণী। ফলে এদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ২০০৫-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী দেশের ৮টি এলাকাকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সুন্দরবন, কক্সবাজার ও টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিনস ও সোনাদিয়া ™^ীপ, হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর, মারজাত বাওড় ও গুলশান লেককে ক্রিটিক্যাল এলাকা ঘোষণা দিয়ে সেখানে প্রাকৃতিক বন এবং গাছপালা কর্তন, বন্যপ্রাণী হত্যা ও শিকার, ঝিনুক, কোরাল, কচ্ছপ ও অন্য বন্যপ্রাণী ধরা বন্ধসহ বিভিন্ন বিধিনিষে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম ভাঙার নিয়ম কাগজে কলমে নিয়মের উপস্থি’তি থাকলেও বাস্তবে নিয়ম মানা হচ্ছে খুবই কম। পরিবেশ অধিদফতরের পর্যবেক্ষণে আইন ভঙ্গের অনেক ঘটনা উঠে এসেছে। সমুদ্রে যন্ত্রচালিত নৌযানে মাছ ধরা এবং সৈকতে মানুষের অবাধে বিচরণ নানাবিধ ক্ষতিকর কর্মকান্ডের কারণে সামুদ্রিক কচ্ছপ ও লাল কাঁকড়ার জীবন বিপন্ন হতে চলেছে। ২০০৭ সালে পরিবেশ অধিদফতরের এক জরিপে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ১৭৫টি কচ্ছপ মরে পড়ে থাকার কথা উল্কেèখ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা কারণ হিসেবে  মাছের জালে আটকে পড়ে আহত হওয়াকেই এদের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন। এদের একেকটির ওজন ২০ থেকে ৬০ কেজি। একইভাবে প্রতিদিনই কয়েক শ’ লাল কাঁকড়াকে সৈকতে মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রাণবৈচিত্র্যের বিচারে আমরা একটি ধনবান রাষ্ট্রের বাসিন্দা। আমরা যেটুকু ভাত-মাছে আছি সেটা আমাদের নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। আর আমরা যে গরিব তার কারণ জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার অবাধ লুণ্ঠনের কারণ। দেশের প্রায় ১৫ কোটি মানুষের আহারের কথা ভাবতে হলে আমাদের জৈববৈচিত্র্য ভান্ডারখনির যথাযথ সংরক্ষণ ও আহরণ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এছাড়া উপক‚লের উপযোগী কৃষি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। 

0 comments:

Post a Comment