Sunday, February 18, 2018

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষা করা জরুরী

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষা করা জরুরী
আলী ফোরকান 
সুন্দরবন সারা বিশ্বের একক সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। বিশ্ব পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে এই বনভূমির ভূমিকা অপরিসীম। এছাড়া সুন্দরবন অর্থনৈতিক সম্পদের এক বিশাল আধার। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের  ওপর জীবিকা নির্বাহ করে থাকে প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ । কেউ মাছ ধরে। কেউ কাঠ কাটে। কেউ মধু আহরণ, চিংড়ির পোনা ধরে তাদের জীবিকা চালায়। বঙ্গোপসাগরের কূল জুড়ে গড়ে ওঠা এ বনকে প্রাকৃতিক দানব সিডর নামের ঘূর্ণিঝড় ক’দিন আগে লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে। এ বনে যারা নানা ধরনের কাজকর্ম করে তাদের বলা হয় বনজীবী। আর এ বন সংলগ্ন সাগর, নদী-খালে যারা মাছ ধরে তাদের বলা হয় মৎস্যজীবী। সিডরের তান্ডব বন ও মৎস্যজীবীদের কেবল প্রাণ সংহারই করেনি, সুন্দরবনের কোটি কোটি টাকার অমূল্য সম্পদও ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। দক্ষিণ উপক‚লীয় এলাকা  খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সুন্দরবন। প্রায় ২৩ শ’ বর্গমাইল এলাকা জোড়া এ সুন্দরবন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। একই সাথে দেশের দক্ষিণ জনপদের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার একটি বড় উৎস। প্রায় ৬০ মাইল লম্বা সুন্দরবন সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে টানে। একইভাবে দক্ষিণ উপক‚লীয় অঞ্চলের মানুষ এ বন থেকে কোটি কোটি টাকার সম্পদ আহরণ করে থাকে। 
সুন্দর বনের পেশাজীবী: বছরের বারো মাসই সুন্দরবনে হাজার হাজার মানুষ জীবন-জীবিকার খোঁজে কর্মতৎপরতা চালায়। তবে শীত মওসুমের শুরু থেকে সুন্দরবনে কর্মজীবী মানুষের আগমন ক্রমে ক্রমে বাড়তে থাকে। অক্টোবর মাস থেকে ফেরুয়ারি মাস পর্যন্ত সর্বাধিক সংখ্যক লোক সুন্দরবনে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকে। শীত মওসুমের শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জেলেরা সুন্দরবনে আসতে শুরু করে। বন সংলগ্ন এলাকা ছাড়াও চট্রগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার  হাজার হাজার জেলে আনুসঙ্গিক সামগ্রী নিয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন চরে আসে । সাগরক‚লের দুবলাসহ বিভিন্ন চরে তারা অস্থায়ী বসতি স্থাপন করে। এখানে ৪/৫ মাসের জন্য ৫০ থেকে ৬০ হাজার জেলে সারিবদ্ধভাবে খুপড়িঘর স্থাপন করে। জেলেদের স্থাপিত এ বসতি এলাকাকে স্থানীয় ভাষায় বলে জেলেপল্লী। প্রতি বছর অক্টোবর মাস থেকে হাজার হাজার জেলের পদভারে সুন্দরবনের এসব চর থাকে মুখর। তারা ট্রলার নিয়ে সাগর ও বনের বিভিন্ন নদ-নদীতে মাছ ধরতে নামে। যারা সাগরে নামে তারা বেশ কয়েক দিনের রসদ (খাদ্য-খাবার) নিয়ে যায়। সাগর থেকে আহরিত মাছ নিয়ে তারা আবার বনের চরে ফেরে। আহরিত সামুদ্রিক এসব মাছ চরে নিয়ে আসার পর তা বাছা-খোটা করা হয়। পরে তা কেটে চরে বানানো চালিতে নেড়ে রেখে শুকানো হয়। এসব কাজ যারা করে তাদের বলা হয় শুঁটকি শ্রমিক। তারা ট্রলার থেকে মাছ নামিয়ে শুঁটকি করে তা আবার বস্তা ভরে চরের গুদাম ঘরে নিয়ে রাখে। সুন্দরবনের চরগুলোতে এ ভাবে দিনরাত চলে এক অর্থনৈতিক বিশাল কর্মযজ্ঞ। শুঁটকি মাছ এখান থেকে কার্গো বা ট্রলারে করে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয় চট্রগ্রাম, কক্সবাজরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সাগর বা বনের নদ-নদী থেকে আহরিত চিংড়ি সাথে সাথে এখানেই (চরে) বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি বছর শীত মওসুমে সুন্দরবনের দুবলাচর এলাকায় আগত জেলেরা এক শ’ থেকে সোয়া শ’ কোটি টাকার মাছ আহরণ করে থাকে। জেলেরা এখানে ৫ মাস ধরে যে আয় করে তা দিয়ে প্রায় সারা বছরই তাদের জীবিকা চলে। এক এক জন জেলের পরিবারে কমপক্ষে ৫ জন করে সদস্য থাকে। গড়ে ৩০ হাজার জেলের হিসাবও যদি ধরা হয় তবে অন্তত দেড় লাখ লোকের জীবিকা নির্বাহ হয় এখান থেকে। এ কারণে সুন্দরবনকে প্রকৃতির আকর বলা হয়ে থাকে। এতো গেল জেলেদের কথা। বছরের ডিসেম্বর মাসে সুন্দরবনে নামে বাওয়ালীরা। ডিসেম্বর হচ্ছে বাদাবনে ঢোকার মওসুম। বন বিভাগ প্রতি বছর এসময় বনের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের অনুমতি দেয়। বাওয়ালীরা বন বিভাগের নিকট থেকে পাশ-পারমিট নিয়ে কাঠ, গোলপাতা, মধু আহরণসহ নানান কাজের জন্যে এ বনে আসে। এদের এক কথায় বলে বনজীবী। বনে কাজ করে তারা তাদের জীবন-জীবিকা চালায় বলে তাদের ওই নামে ডাকা হয়। ৩০ থেকে ৪০ হাজার বাওয়ালী প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে সুন্দরবনে আসে। তারা বড় বড় নৌকা নিয়ে জঙ্গলে ঢোকে। বন বিভাগ বাওয়ালীদের নৌকার আকার দেখে তাদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় করে থাকে। 
সুন্দর বনের প্রশাসন: কাজের সুবিধার জন্য গোটা সুন্দরবনকে  কয়েকটি প্রশাসনিক ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। তেইশ শ’ বর্গমাইল এলাকা জোড়া এ বনে রয়েছে ২টি বিভাগ। একটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ। আর অপরটি সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ। বাগেরহাট জেলার অংশের সুন্দরবনকে বলা হয় পূর্ব বন বিভাগ। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের রয়েছে ২টি রেঞ্জ অফিস। এর একটি হলো শরণখোলা রেঞ্জ ও অপরটি চানপাই রেঞ্জ। আর পশ্চিম বন বিভাগের ও  রয়েছে আরো ২টি রেঞ্জ অফিস। এর একটি খুলনা জেলা এলাকায়। এটির নাম নলিয়ান রেঞ্জ। আর অপরটি সাতক্ষীরা জেলা এলাকায়। এটির নাম বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ। এসব রেঞ্জের অধীনে আবার রয়েছে ষ্টেশন অফিস। আর ষ্টেশন অফিসের অধীনে রয়েছে বেশ কয়েকটি ক‚প অফিস। এই অফিসগুলোয় কর্মরত কর্মকার্তা-কর্মচারিরা সুন্দরবনের যাবতীয় দেখভাল করে থাকেন। বনের সংরক্ষণ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড তারাই পরিচালনা করে। 
সুন্দর বনের রাজস্ব:গোটা সুন্দরবন থেকে প্রতি বছর রাজস্ব আয় হয় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। সুন্দরবন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থ বছরে (২০০৬-২০০৭) সুন্দরবনের ৪টি রেঞ্জ এলাকা থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ২৩ হাজার ৪১০ টাকা। এর আগের বছর (২০০৫-২০০৬) এ বন থেকে রাজস্ব আদায় হয় ৫ কোটি ৮২ লাখ ১৩ হাজার ৩২৬ টাকা। আর গত ২০০৪-২০০৫ অর্থ বছরে সুন্দরবনের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ ৩৮ হাজার ১২০ টাকা। কিন্তু সিডর নামের হিংস্র দানব গত ১৫ নভেম্বর বিশ্ব ঐতিহ্যের এ সুন্দরবনকে দুমড়ে মুচড়ে লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে। এ বনের বিভিন্ন চরে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে আসা কয়েক হাজার জেলের প্রাণ কেড়ে নিয়ে গেছে। ধ্বংস করে দিয়ে গেছে বনের অমূল্য বৃক্ষরাজি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের হিসাব অনুযায়ী সিডরের আঘাতে সুন্দরবনে এক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমন ধ্বংসযজ্ঞের পর এ বছর সুন্দরবনে বাওয়ালীরা হয়তো যাওয়ার সুযোগ পাবে না। এ বন থেকে তাদের আয়-রোজগার এবারের মত বন্ধ থাকতে পারে বলে সুন্দরবন বিভাগের একটি সূত্র আভাস দিয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্য সুসন্দর বন: সুন্দর বনের গুরুত্ব বিবেচনা করে স¤প্রতি ওটঈঘ সুন্দরবনকে ডড়ৎষফ ঐবৎরঃধমব হিসেবে ঘোষণা করেছে। গাঙ্গেয় বদ্বীপে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ পম্চিমাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরেরর তীরে ঘেঁষে ৮৯.০০ ৮৯.৫৫ পূর্ব অক্ষাংশ এবং ২১.৩০-২২.৩০ উত্তর দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভূখন্ড জুড়ে বি¯তৃত। বাংলাদেশর ভূখন্ডে এ বনের আয়তন ৫৫,৭৮৫ হেক্টরের মধ্যে ৪১,১৬৮৫ হেক্টর বনভূমি। বাকি ১৫,৫৬০০ হেক্টর নদী, খাল, খাড়ি এবং মোহনা অঞ্চল। এসব নদী, খাল, খাড়ি এবং মোহানার জলাভূমি সুন্দরবনে জালের মত ছড়িয়ে আছে। সমুদ্রের জোয়ার ভাটার ফলে এ অঞ্চলের নদী ও জলাভূমিতে পাওয়া যায় মাছসহ নানা জাতের জলজ প্রাণী। আবার মোহানা অঞ্চলের পানির লবনক্তাতা নদীর পানির দ্বারা প্রবাহিত স্বাদু পানির মিশ্রনে হঠাৎ অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে গেলেও এসব জলজ প্রাণী তা অনায়াসে সহ্য করতে পারে। তাছাড়া নদীবাহিত পানির দ্বারা খনিজ লবন এবং অন্যান্য পুষ্টি নদী মোহনায় মিশে যায়।  একারনে  এসব অঞ্চলে পানির উর্বরতা শক্তি অনেক বেশি থাকে। এখানে প্রাকৃতিক ভাবে প্রচুর মাছের খাদ্য তৈরী হয় এবং সে কারণে এ অঞ্চলে প্রচুর মাছও পাওয়া যায়। তাছাড়া সুন্দরবনের বিরাট বি¯তৃত এবং অপেক্ষাকৃত অভগীর জলরাশিতে বনের গাছপালার প্রচুর লতা পাতা পড়ে পচে যায় এবং জৈব পদার্থের সৃষ্টি করে।  যা মাছের খাদ্য শিকল তৈরী এবং আবাস ও চারণভূমি হিসাবে গড়ে উঠতে বিশেষ সহায়ক হয়। সুন্দরবন নানা জাতের সামুদ্রিক এবং লোনা পানির মাছের লালন এবং চারণভূমি। এবন বাংলাদেশের একটি অমিয় সম্ভাবনাময় মৎস্য মম্পদ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। 
ম্যানগ্রোভ সম্পদ: সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সম্পদ একটি অনন্য বৈশিষ্টধর্মী সম্পদ। সুন্দরবনে রয়েছে এক বিপুল বনজ সম্পদ। যা থেকে মূল্যবান কাঠ এবং কাগজের মন্ড তৈরীর জন্য অত্যন্ত জরুরী উপাদান সংগৃহীত হয়। এ বনে আছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যধর্মী বন্য প্রাণী সম্পদ আর আছে বিপুল বি¯তৃত পানি সম্পদ এবং মাছ। বর্তমান তথ্যমতে সুন্দরবনে মোট ৩৩৪ প্রজাতির গাছ পাওয়া যায়। এসব প্রজাতির মদ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুন্দরী, গেওয়া গরান, গোলপাতা, হেঁতাল ইত্যাদি । বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আহরিত অন্যান্য দ্রব্য হচ্ছে মধু, মোম, ঝিুনকের শেল, কাঁকড়া, বাগদা এবং গলদা, চিংড়ির পোনা, বড় বাগদা এবং গলদা চিংড়িসহ  নানা জাতের সাদা মাছ। সুন্দরবনে মোট ৪২৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী রয়েছে। এদের মধ্যে ৪৯ টি স্তন্যপায়ী প্রজাতি, ৩১৫ টি পাখি প্রজাতি, ৫৩টি সরীসৃপের প্রজাতি এবং ৮টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি রয়েছে। এসব প্রজাতি যথাক্রমে সারা বাংলাদেশের  স্তন্যপায়ী প্রাণীর শতকরা ৩৪ ভাগ, পাখির প্রজাতির শতকরা ৩৫ ভাগ এবং সরীসৃপ প্রানীর প্রজাতির শতকরা ২৯ ভাগ। এ থেকে অনুমান করা যায় বন্য প্রাণীর দিক থেকে সুন্দরবন কত বিপুল  এবং বৈচিত্রময়। আগেই বলা হয়েছে সুন্দরবনের বিশাল জলরাশি বি¯তৃত নদী-নালা এবং খাল দ্বার সংযুক্ত। এ জলরাশিকে মোটামুটিভাবে ৪টি নদীর মোহনায় বিভক্ত করেছে। এগুলো হচ্ছে রায়মঙ্গল, ক্ঙ্গুা, ভাংরা এবং মালঞ্চ মোহনা। এসব মোহনার অনেক গুলোর আড়াআড়ি দৈঘ্য স্থানভেদে এমনকি ১০ কিঃ মিঃ পর্যন্ত বি¯তৃত। পশুর এবং শিবসা নদীর মোহনাকে কুঙ্গা বন্দর মোহনা বলা হয় এবং এর প্রবাহের উজানেই পশুর নদীতে মংলা বন্দর স্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের জলসম্পদের বহৎ অংশটিই হচ্ছে সুন্দরবনের এই জলসম্পদ। এই বনের জলরাশির দ্বারা দৈনিক আনুমানিক ৩৪,০০০ ঘন মিটার পানি বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। এ বিপুল জলরাশির বেশির ভাগ পানিই আসে গঙ্গা-পদ্মার শাখা, উপনদী, গড়াই, মধুমতি দিয়ে। 
সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ: সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ অত্যন্ত প্রাচুর্যময়। সুন্দরবনে বছরে যে পরিমাণ মাছ আহরিত/উৎপাদিত হয় তা সারা দেশে বাৎসরিক উৎপাদিত মাছের প্রায় শতকরা ৫ ভাগ। সুন্দরবনের বনভূমি এলাকার জলাশয় এবং জোয়ার ভাটা অঞ্চল স্বাদুপানি, সামুদ্রিক এবং লোনা পানির এক বি¯তৃতি প্রজাতির মাছ এব চিংড়ি মাছের প্রজনন এবং লালন ভুমি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এ বনের জলাভূমিকে ছোট ও প্রান্তিক আকারের জেলে গোষ্ঠির দ্বারা এক বিরাট বি¯তৃত এবং অনিবিড় আহরণ পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। এই আহরণ প্রক্রিয়ার এক বিপুল সংখ্যক  জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের আহরণ ও ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশ বন বিভাগ কর্তৃক পরিচালীত হয়। এই ব্যবস্থাপনা খুলনা সুন্দরবন বিভাগ এবং এর আঞ্চলিক ও মাঠ পর্যায়ের অফিস দ্বারা পরিচালিত হয়। 
সুন্দরবনের জলাভূমির পানি অত্যন্ত উর্বর এ কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পানিতে উদ্ভিদ প্লাস্কটনের প্রাচুর্যতা বিষেয় অনেক সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। ঋতু ভেদে এর জলাভূমিতে অনেক উচ্চহারে উদ্ভিদ প্লাস্কটেনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। একটু বড় অথচ ক্ষুদে আকারের বিভিন্ন মাছ কিংবা অমেরুদন্ডী প্রানীর লার্ভা যাকে প্রাণী বিজ্ঞানে ইকথিরোপ্লাস্কটন বলা হয়। তাদের উপস্থিতির হারও পরীক্ষামূকভাবে অনেব বেশী দেখা গেছে। সুন্দরবনের জলাভূমিকে উচ্চাহারে ইকথিয়োপ্লাস্কটনের উপস্থিতি কেবল একথাই ইংগিত করে যে এই অঞ্চল নিসন্দেহ অনেক প্রজাতির সাদা মাছ এবং চিংড়ি মাছের এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এবং লালন ভূমি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 
সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ আসলেই বেশ বি¯তৃত। এ বনের জলাভূমিতে ২৭ গোত্রের আওতায় ৫৩ প্রজাতির অভীগর পানির মাছ, ৪৯ গোত্রের আওতায় ১২৪ প্রজাতির গভীর পানির মাছ, ৫ গোত্রের আওতায় ২৪ প্রজাতির চিংড়ি. ৩ গোত্রের আওতায় ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ২ প্রজাতির শামুক, ৬ প্রজাতির ঝিনুক, ৪ প্রজাতির লবষ্টার, ৩ প্রজাতির কচ্ছপ, ১০ প্রজাতির সাপ, ৩ প্রজাতির ব্যাঙ এবং ২ প্রজাতির কুমির পাওয়া যায। সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য মৎস্য প্রজাতিসমূহ হচ্ছে ঐরষংধ রষরংযধ, খধঃবং পধষবধৎরভবৎ ঢ়ড়সধফধংুং যধংংধ, চড়ষুহবসড়ঁং ংঢ়ঢ়লড়যহরঁং ফঁংংঁসবৎর, ও. ধৎমবহঃধঃঁং, ঐধৎঢ়ড়ফড়হ হবযবৎবঁং, ঞৎরপযরঁৎঁং যধহসবষধ, ঝবঃরঢ়রহহধ ঃধঃু, চধসঢ়ঁং ধৎমুহঃবঁং, ঝৎফরহধষধ ংঢ়ঢ় ঝবষধৎ ংঢ়ঢ় গধপৎড়নধৎপযরঁস ৎড়ংবহনবৎমরর, চবহধবঁং সড়হড়ফড়হ, চবহধবঁং, রহফরপঁং, গবঃধঢ়বহধবঁং সড়হড়পবৎড়ং চধৎধঢ়বহধবড়ঢ়ংরং ংঢ়ঢ়ংপুষষধ ংবৎৎধঃধ এবং রয়েছে বিভিন্ন জাতের হাঙ্গর মাছ। 
সুন্দরবনের মৎস্য ইনশোর এবং অফশোর মৎস্য এ দুভাগে বিভক্ত। অফশোর ফিশারী সমুদ্র তীরের ৩২১০ বর্গ কিলোমিটার বি¯তৃত। এ অঞ্চলে প্রধানত সেট ব্যাগ নেট দ্বারা মৎস্য আহরণ করা হয়ে থাকে। ইনশোর প্রকৃতির ফিশারী বণাঞ্চলের অভ্যন্তরের জলাশয়ের ৮১৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। এ এলাকায় প্রায় ১৪ রকমের জাল/যন্ত্র দিয়ে মাছ আহরণ প্রক্রিয়া চলে। এগুলো হলো শোর নেট, শোর সীন নেট, অপার নেট, ইলিশ গীল নেট, স্টিক নেট, হুজ ও লাইন, ক্যা¯ট নেট, চিংড়ি নেট, ক্যানাল গীল নেট, ক্যাব হুক ও লাইন, পাংগাস গীল  নেট, বাগদা চিংড়ির পোনা টানা জাল, বাগদা চিংড়ি সেট ব্যাগ নেট ইতাদি। এসব জাল/যন্ত্র দিয়ে সুন্দরবনে প্রায় ২ লক্ষ জেলে মাছ ধরার কাজে জড়িত আছে। সুন্দরবনে অধিকাংশ মাছ এবং চিংড়ির রোদে শুঁকিয়ে শুটকী বানিয়ে কিংবা লবন মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। এছাড়াও অনেক মাছ এবং চিংড়ি সরাসরি নিকটস্থ বাজারে বিক্রি করা হয়। আবার অনেক মাছ খুলনা অঞ্চলের মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানায় ও বিক্রি করা হয়ে থাকে। শুটকী মাছ এবং লবন মিশ্রিত মাছের বেশির ভাগই চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। 
সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের সমস্যা: সুন্দরবনের এই সম্ভাবনাময় মৎস্য সম্পদ নানা সমস্যার সম্মুখীন। এ সব সমস্যা সমাধানের জন্য আশু ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এ সব সমস্যার মধ্যে  অতিরিক্ত মৎস্য নিধন, অবৈধ মৎস্য আহরণ এবং দূর্নীতি বন বিভাগ কর্তৃক সুন্দরবনের মৎস্য আহরণ এবং ব্যবস্থাপনায় কেবল সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আসলে জৈব ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নানা বিষয়কে কখনো আমল দেয়া হয় বলে মনে হয় না। তাছাড়া এত বিশাল জলরাশিতে নিয়োজিত বিপুলসংখ্যক জেলে গোষ্ঠির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার জনবল এবং অবকাঠামো সুন্দরবন বিভাগের নেই। তাই একটি সুচিন্তিত ও সুবিন্যস্ত পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পরিচালিত করে এ সম্পদের সংরক্ষণ করা আজ একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। 
সুন্দরবনাঞ্চলে এবং এর অন্তর্গত নদী, খাল এবং মোহনায় এক বিরাট জনগোষ্ঠী বাগদা ও গলদা চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করে থাকে।  এসব অঞ্চলের সা¤প্রতিক কালে গড়ে উঠা চিংড়ি চাষের ঘেরে বিক্রি করে। বাগদা ও গলদা চিংড়ির পোনা সংগ্রহের সময় বিপুল সংখ্যক অন্যান্য জাতের মাছ এবং চিংড়ির পোনা ধরা পড়ে। এসব অবাঞ্ছিত জাতের পোনা মাছ শুকনায় ফেলে দিয়ে যথেচ্ছ নিধন চলছে। এ নিধন প্রক্রিয়া সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদকে এক গভীর সংকটের মধ্যে নিপাতিত করছে। এ বিষয়ে পরিচালিত বিভিন্ন সমীক্ষার ফলাফলে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। 
সুন্দরবনের নদী-নালা: সুন্দরবনের নদী-নালা খাল এবং মোহনায় মাছ ধারা জন্য প্রত্যেক নৌকাকে পাশ প্রদান করা হয় এবং প্রতি নৌকায় কতজন জেলে মাছ ধরবে তাও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। তাছাড়া মাছ ধরার পর মাছের জাত এবং পরিমাণের উপর ভিত্তি করে কর আরোপ করা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে মাছ ধরার ফলে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের কোন ক্ষতি হবার কথা নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ বিষয়ে সুন্দরবন বিভাগের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তদুপরি পাশ প্রদান এবং কর আরোপের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অব্যস্থাপনা এবং দুর্নীতির কথা শোনা যায়। ফলে ঠিক কত সংখ্যক জেলে কি প্রকারের জাল বা যন্ত্র দিয়ে সুন্দরবনে মছ আহরণ করছে তার পরিসংখ্যান বিষয়ে এক বিরাট রকমের তথ্যের ফাঁক রয়েছে। ফলে এ সম্পদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ অবস্থার বিষয়ে তাৎক্ষণিক এবং নির্ভরযোগ্য কোন তথ্যই পাওয়া সম্ভব নয়। যা এই সম্ভবনাময় মৎস্য সম্পদের জন্য কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। চাঁনতারাশ্রী (১৯৯৪) সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের উপর একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেন এবং বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে উৎপাদন আহরণ হার এর নির্ধারণ করেন। সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, সুন্দরবনের গহীনে ছোট ছোট খালে অনেক দূর্নীতিপরায়ন মৎস্যজীবী এমনকি বিষ প্রয়োগেও মাছ আহরণ করে থাকে। যা এই মৎস্য সম্পদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ। অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন পদ্ধেিত সুন্দরবনে মৎস্য আহরণের কারণে ইতোমধ্যই সম্পদের অনাকাঙ্খিত ক্ষতি হয়ে গেছে। যা ধারণা করার মত অনেক সংগত কারণ রয়েছে। বিগত ১৯১১-৯২ থেকে ১৯৯৫-৯৬ পর্যন্ত সময়ে সুন্দরবনের পরিসংখ্যান থেকে ও সা¤প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, উক্ত সময়ে সুন্দরবনের অধিকাংশ জাতের মাছের ক্ষেত্রে বার্ষিক মোট আহরণের পরিমান যেমন কমেছে, তেমনি বার্ষিক রাজস্ব আয়ের পরিমানও কমেছে। 
উপসংহার : সুন্দরবনের এই সম্ভাবনাময় মৎস্য সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষনের জন্য এর বর্তমান ব্যবস্থাপনায় আমুল পরিবর্তন আনা দরকার। সুন্দরবন বিভাগের আওতায় পরিচালিত বর্তমান ব্যবস্থাপনায় জড়িত জনবলে কোন মৎস্য জীব বিজ্ঞানী নিয়োজিত নেই। মৎস্য সম্পদ যেহেতু একটি নিরেট জৈব সম্পদ তাই এর ব্যবস্থাপনায় মৎস্য জীব বিজ্ঞানী নিয়োগ করা ব্যতীত কোন গত্যন্তর নেই। পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক গুরুত্বের প্রেক্ষিতে এবং সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণের স্বার্থে সুন্দরবনের জৈব-জলজ সম্পদের উপর অবিলম্বে একটি বিস্তারিত জরীপ হওয়া প্রয়োজন। এতে করে এ বনঞ্চালের জলাশয়ে কোন প্রজাতির মাছ বছরের কোন সময় এবং কোন নদীর মোহনায় প্রজনন করে ও কোন এলকায় লালিত হয় তা জানা যাবে। এছাড়া সেভাবে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে। সুন্দরবনের মাছের বর্তমান ষ্ট্যান্ডিং স্টক কত এবং এর গঝণ  কত হওয়া উচিত। তা সঠিক জানা প্রয়োজন এবং  সে ভাবেই এর ব্যবস্থাপনা নীতি গৃহীত হওয়া উচিত। আমরা আশাকরি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ জীববৈচিত্রময় সুন্দরবন রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থায়  এগিয়ে আসবেন। 

0 comments:

Post a Comment