Sunday, February 18, 2018

হরিণ বাচাতে হবে

হরিণ বাচাতে হবে
আলী ফোরকান
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সুন্দরী সুন্দরবন। অফুরন্ত সম্পদের ভান্ডার এই বন। গেঁওয়া, সুন্দরী, পশুর ও বাইন গাছের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের সাথে বসবাস করছে নানা প্রজাতির প্রাণী। সুন্দরবনে বর্তমানে ১১৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৪৩ প্রজাতির সরীসৃপ, ২২ প্রজাতির উভচর ও ৮৮৮ প্রজাতির পাখী রয়েছে। এর মধ্যে সবেচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাণী চিত্রল হরিণ।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্রের কারণে এই বন আবহমানকাল  রে দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ হরিণ। সুন্দরবনের এক মনোরম ও প্রিয় দর্শন জন্তু হরিণ। নিঃসন্দেহে মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। বনের ৫৮ কম্পার্টমেন্টের সর্বত্রই চিত্রল হরিণের বিচরণ। বনে হরিণের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কেওড়া গাছ সমৃদ্দ এলাকায় সাধারনতঃ বেশি দেখা যায়। বনের মধ্যে বিভিন্ন পথে হরিণের পদচিহ্ন বেশি পাওয়া যায়। সুন্দরবনে হরিণের গমনাগমনের পথ আছে এবং এরা চলার সময় পদচিহ্ন রেখে যায়। হরিণ দলবদ্ধ হয়ে চলাচল করে খাদ্য সংগ্রহ করে। আবার দলবদ্ধ হয়ে বিশ্রাম করে। এরা খূবই আরামপ্রিয়। একটু উষ্ণ ছায়াশীতল স্থানে এরা বিশ্রাম করে থাকে। সৌখিন জন্তু কর্দমাক্ত স্থান পছন্দ করে না। তবে বাধ্য হয়ে এদের এইকষ্ট সহ্য করতে হং। গায়ে কাদা লাগলে বিরক্তি বোধ করে এবং ঝাড়া দিয়ে কাদা ফেলতে থাকে। পৃথিবীতে হরিণের ন্যায় ক্ষিপ্ত গতি বিশিষ্ট জন্তু আর আছে কি না সন্দেহ।
দেহের গঠন ও স্ববাব ঃ
হরিণের ইংরেজি নাম ঝঢ়ড়ঃঃবফ ফববৎ, বৈজ্ঞানিক নাম অীরং। অীরং এর অপর নামস্বর্ণমৃগ বা সোনার হরিণ। সারা গায়ে হলুদের ওপর বাদামী বা কালচে ফোঁটা ফোঁটা বরে একে ফোঁটা হরিণও বলে। চিত্রল হরিণ খুব ভীতু। নতুনের প্রতি আকর্ষণ অনেক বেশি। বনের কোন স্থানে এক সঙ্গে সবসময় নতুন কিছু দেখলেই তার দিকে তাকিয়ে তাকে। নতুনত্ব বা নানা রঙের সমাহার এদের খুব আকর্ষণ করে। সুন্দর পাল তোলা নৌকা, লঞ্চ, জাহাজ বা ছেলে-বাওয়ালীদের দেখলে বিস্ময় নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
চিত্রল হরিণের দেহের গঠন, গায়ের বর্ণ আর গতি তাদেরকে যতটা সুন্দর করেছে। তার চেয়ে তার করুন চাহনি একে আরো আদরনীয় ও মোহনীয় করেছে। বনের মধ্যে সবচেয়ে চঞ্চল জন্তু এরা। পাগুলো সরু সরু। লম্বা সরু কান। নয়ানভিরাম চিত্রল হরিণের অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মায়াবী আহবান। এযেন প্রকৃতির দান। হরিনের পাল সব সময় সতর্ক থাকে। কোন রকম শব্দ পেলে পালানোর চেষ্টা করে। বাঘের আক্রমণে দ্রুত পালিয়ে জীবন রক্ষা করার চেষ্টা চালায়। অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে জীবন হারায়। বাঘের খাবারে পরিণত হয়। সুন্দরবনে ক্ষুধার্ত বাঘ সুযোগ পেলে হরিণ ধরে খায়। বাঘের চলাচল বা আগমন টের পাওয়া মাত্র হরিণ তীব্র দৌড় দেয়। প্রতিযোগিতায় হরিণের কাছে বাঘ পরাজিত হয়। অতিমাত্রায় হুশিয়ার এই জন্তু বাঘ দেখা মাত্র কুঁ কুঁ শব্দ করে। এরা খুব চঞ্চল এবং সর্বদা সতর্কতার সাথে চলাচল করে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার লোকেরা বলে বাঘের লাফ কুড়ি হাত, হরিণের লাফ একুশ হাত। এক হাত ব্যবধানের কারণে অনেক সময় বাঘের শিকার থেকে হরিণ রক্ষা পায়। শিঙ্গেল হরিণ দ্রুত দৌড়ানোর সময় বৃক্ষলতার সাথে যাতে শিঙ্গ জড়িয়ে না যায় সেজন্য মাথা ও শিঙ্গ পিঠের ওপর ফেলে রাখে। হরিণের পাগুলো সরু ও দীর্ঘ্ এর জন্য এরা দ্রুত দৌঁড়াতে পারে। এদের গায়ে সাদা সাদা ডোরা থাকে। সুন্দরবনে ডোরাযুক্ত হরিণই অত্যাধিক। কিছু কিছু কুকুর হরিণও সুন্দরবনে আছে। এদের রং খেঁকশিয়ালের বর্নেরমত এবং দন্ত কুকুরের মত। কালো ও সাদা হরিণ কদাচিৎ সুন্দরবনে দেখা যায়। সাদা হরিণের গায়ে কালো ডোরা দেখা যায়। সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কোন কোন ঝোপ জঙ্গলে হরিণ খুব হৃদপুষ্ট হয়ে ইষৎ কালো বর্নের। রাতের বেলায় হরিণের চোখ জ্বল জ্বল করেজ্বলে। হরিণ ৪/৫ ফুট দীর্ঘ এবং ৩ ফুট উঁচু হয়।
হরিণের সংখ্যা, আবাসস্থল ও খাদ্য ঃ
১৯৯৩ সালের হিসেব ানুযায়ী বনে হরিণের সংখ্যা ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ। ১৯৯৫ সালে এফ এ ও – এবং ইউএনডিসি’র কারিগরী সহযোগিতায় পরিচালিত পশু শুমারী অনুযায়ী ৯১ হাজার চিত্রল হরিণ ও শঙ্কর হরিণের সংক্যা ২৯ হাজার। ইন্টারগ্রেটেড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৬-৯৭ সালে বন্য প্রাণী ওপর জরপি অনুযায়ী বনে ১ থেকে দেড় লাখ হরিণ রয়েছে। বিভাগীয বন কর্মর্কা ডিএফও উত্তম কুমার সাহা জানান, ২০০১ সালে সর্বমেষ জরীপ অনুযায়ী হরিণের সংখ্যঅ এক থেকে দেড় লাখ। প্রতিবছর ২ বার বাচ্চা দেয়। ফলে ৪ বছরের ব্যবধানে বনে আরও ২৫ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, বনে হরিণের বসবাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা চালানো হয়েছে। বনের এই আকর্ষণীয় প্রাণীর বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বনের অভ্যনতএর ছেঅট ছেঅট টুকুর ও খনন করা হয়েছ্ েপশুর নদীল তীরে করমজলে পর্যটকদের জন্য বন্য প্রাণী ও ট্যুরিজম বিভাগের তত্ত¡াবধায়কে ছোট একটা ঘেরা দেয়া স্থানে কয়েকটি হরিণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। হরিণ সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের পাতা ও ফল খায়। ওড়া, কেওড়া, গোল, ধোন্দল, গেওয়া প্রভৃতি গাছের ফর তারা যতেœর সাথে খায়। এসব ফল জোয়ারের পানিতে দূরে সরে যায়। জেচাযারের পানি সরে গেলে তলা বা ভূমি জেগে ওঠার পর সেখানে তারা কেওড়ার পাতা খেতে যায়। কেওড়ার পাতা ও ফর হরিণের সুখাদ্য। সুন্দরবনের নিকটবর্তী লোকালয় জলাবদ্ধভাবে এসে আমন ধানের পাতা খেয়ে যায়। এলাকাবাসী তারা করলে ক্ষিপ্ত গতিতে তারা জঙ্গলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। সুযোগমত হরিণের বাচ্চাতাদের হাতে ধরা পরে।
সুন্দরবনের জটকা, কবিখালী, দুবলা, চান্দেশ্বর, হিরণপয়েন্ট, বগী, চরখাল,ি সুপতি প্রবৃতি এলাকায় হরিণ বেশিরভাগ সময় অবস্থান করে।
বানরের সাথে সখ্যতা ঃ
সুন্দরবনে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার বানর বসবাস করে।  বনের জন্তুদের মধ্যে বানরের অবস্থান তৃতীয়। বানর বিভিন্নভাবে হরিণের দলকে উপকার করার জন্য গর্ব অনুভব করে। বনে বাঘের দেখা মিললে বানর ক্যাঁ ক্যাঁ শব্দ করে। আবার কোন কোন সময় সাধুর ন্যায় চোখ বন্ধ করে থাকে। অনেক সময় হরিণের বন্ধু বানর কেওড়া গাছে উঠে শব্দ করে পাতা খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। হরিণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গাছের পাতা ছিড়ে নিচে ফেলে দিয়ে বন্ধুসুলভ ব্যবাহর করে। বানর হরিণের জন্য ডাল ভেঙ্গে গাছের পাতা ও ফল খাওয়াকে আনন্দ অনুভব করে। আবার কোন কোন সময়ে হরিণের পিঠে চড়ে বেড়ায়, এতে তারা আনন্দ অনুভব করে। এতে হরিণের আপত্তি থাকে না। শিকারের সময় ক্রোধান্বিত বানর মানুষেল হাতে কামড় দেয়। বাঘের দেখা মেলার পর বানর শুধু হরিণকে বিপদ সংকেত দিয়ে সরিয়ে দেয় না, মানুষকেও বিশেষ ভাবে সাবধান করে দেয়। দূরের বাঘ দেখলে বানরেরা ধপাস করে গাছ থেকৈ মাটিতে পড়ে এবং নানারূপ অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে। বাওয়ালী ও শিকারীরা বিপদ সংকেত বুঝতে পেয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে।মায়াবী, নিরহ হরিণ ঐ সময় বাঘের আক্রমণের বিপদ সংকেত বুঝতে না পারলে বানর তার নিজের মুখে চপেটাঘাত করে।
পড়ন্ত বিকেলে জিম্বা সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মুক্ত হরিণের দল চরে বেড়ানোর অথবা নদলি তীরে সারিবদ্ধভাবে পানি পান করার দৃশ্য বা কোন শব্দে স্ব-স্ব ব্য¯Í হয়ে দ্রুত চোখেল নিমিষে পালিয়ে যাওয়া বা বানরের কেওড়া গাছে উঠে তার বন্ধু হরিণের জন্য পাতা ছিড়ে ফেলানোর দৃশ্য সত্যিই অবাক করে।
শিকারীদের কবলে চিত্রল হরিণ ঃ
সুন্দরবনে ঐতিহ্য চিত্রল হরিণ আতঙ্কের মধ্যে। কখন ফাঁদে ধরা পড়ে, গুলিতে জীবনটা যায়। শিকারীরা জাল পেতে খদ্যে বিষ মিশিয়ে, বরশি দিয়ে, ফাঁদ পেতে এবং গুলি করে বা তীর ছুঁড়ে হরিণ শিকার করে থাকে। শিকারীরা বনের এক থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকা ঘিরে লম্বা জাল পেতে রাখে। তারপর তারা হরিণের ঝাঁকে ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে হরিণ জালে আটকা পড়ে। ভীত সন্তস্ত্র হরিণগুলো এক পর্যায়ে জালের ফাঁসে মাথঅ আটকিয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে। এরপর হরিণগুরো ধরে নৌকায লুকিয়ে এনে গ্রামে অজ্ঞাতস্থানে আটকে রাখা হয়। শিকারীরা মাছ ধরার ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি বড়ো মোটা বড়শি দিয়ে হরিণ ধরার নতুন কৌশল বরে করেছে। দড়িতে বাঁধঅ বড়শিতে সাগরকলা গেঁথে ঝুলিয়ে রেখে শিকারীরা গাছের ডালে বসে থাকে। হরিণ কলা খেতে আসলে গলায় বড়শি বেঁধে যায় এবং আটকে পড়ে। তারপর শিকারীরা দ্রুত গাছ থেকে নেমে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হরিণকে দুর্বল করে নৌকা বা ট্রলারে করে গোপন আ¯Íানায় নিয়ে যায়। এভাবে ধরা হরিণ জবাইকরে মাংস বিক্রি করা হয়। আবার এক শ্রেণীর চোরা শিকারী হরিণ ধরার জন্য বনের অভ্যন্তরে বিশেষ করে কেওড়া গাছের তলায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চেতনা নাশক ঔষধ নিশ্রিত কেওড়া ফল ছড়িয়ে রাখে। হরিণ তার প্রিয় খাবার ভেবে এই ফল খায় এবং অল্প সময়ের মধ্যে চেতনা হারিয়ে ফেলে। নিরাপদ দূরত্বে অপেক্ষমান শিকারীরা সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানহীন হরিণ নিয়ে বনের বাইরে চলে যায়।
বন সংলগ্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন থেকেই তাদের এ তৎপরতা চালিয়ে আসছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রগুলো কটকা, কবিখালী, টিয়ারচর, শেলারচর, আড়–য়া বয়রা, কলমতেজী সহ চিহ্নিত কিছু এলাকায় বনের বিভিন্ন স্টেশন থেকে মৎস্য আহরণের পাস নিয়ে বনের প্রবেশ করে জালের ফাঁদ পেতে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হরিণ শিকার করে। সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা, উত্তর রাজাপুর, খুড়িয়াখালী, পাথরঘাটা উপজেলার জ্ঞানপাড়া, চরদুয়ারী, মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা, মোড়েলগঞ্জ উপজেলার জিউধরা ও ধানসাগর এলাকায বেশ কয়েকটি চক্র হরিণ শিকারে সক্রিয় রয়েছে।
স¤প্রতি শরণখোলা রেঞ্জের বনরক্ষীরা পৃথক অভিযান চালিয়ে শিকারী চক্রের ১২ সদস্য আটক এবং প্রায় ৬শ  হরিণ শিকারে ফাঁদ, শিকার করা  একটি হলিন এবং আরো একটি হরিণের চামড়া উদ্ধার করে।
২০০৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বাগেরহাট জেরার কুকিলমুনি এলাকা থেকে একটি হরিণ,প ্রায় ৫শত ফাঁদ সহ শিকারী চক্রের শহীদুল, করিম, রহিম ও সোহরাবহোসেন ধলা পড়ে। ২০০৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্য এলাকায় ফাঁদ ফেতে হরিণ শিকারের সময় ফাঁদ সহ আবুল হোসেন ও রিয়াদুল নামক দু’চোরা শিকারীকে বন বিভাগের লোকজন আটক করে।
একই বছর ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বন বিভাগ টিয়ারচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি হরিণের চামড়া, ৫২টি ফাঁদসহ ৬জন শিকারীকে আটক করে। ৩০ জুরঅই এই চক্র সুন্দরবন থেকে শিকার করা ৩০টি হরিণের মাংস বন সংলগ্ন তাফারাড়ি ও উপজেরা সদর রায়েন্দা বাজারে বিক্রির খবরে তোলপার শুরু হয়। এরপর ২বন কর্মকর্তাকে বরখা¯Í করা হয়। গত ২ আগস্ট সন্ধ্যায় রায়েন্দা বাজার থেকে ৩টি হরিণের চামড়া সহ হরিপদ ঋষি নামক এক ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করে। ১৯ মে টিয়ারচর টহর ফাঁড়ির বনরক্ষীরা বনের মধ্যে একটি নৌকা থেকে ২৬টি হরিণের চামড়াসহ বিপুল পরিমাণ মাংস উদ্ধার করে। বন কর্মচারীরা তড়িঘড়ি করে সুপতি স্টেশন এলাকায় হরিণের মাংস মাটি চাপা দেয়।
বনের হরিণ ভাসছে নদীতে সংবাদপত্রে শিরোনাম ঃ
সাতক্ষীরা তেকৈ প্রকাশিত দৈনিক পত্রদূত পত্রিকায় গত ৩মে (২০০৫) নদীতে ভসছে অসংখ্য হরিণ শীর্ষক প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়্ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গহীন সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের হাতে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এ সময় শিকারিদের গুলিতে নিহত হয় একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পরে শিকারি দলের কয়েকজন শিকারকৃত কমপক্ষে ১৫টি হরিণ নদীতে ফেলে দিয়ে বাঘের চমড়া নিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সুন্দরবনাঞ্চলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বনের মধ্যে নদীতে শিকারকৃত হরিণগুলো ভাসতে দেখা গেছে। নিহতের নামসাগর মুন্ডা (৫০)। তার বাড়ি শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্জি গ্রামে। শিকারী দলেল সদস্যদের উদ্ধৃতি দিয়ে একাধিক সূত্র জানায় গত ২৬ এপ্রিল একদল চোরা শিকারি হরিণ শিকারির লক্ষ্যে সুন্দরবনে যায়। তাদের কাছে ছিল ভাড়া করা দু’টি বন্দুক। উক্ত দলে ছিল শ্যামনগর উপজেলার সোরা গ্রামের নূর চেয়ারম্যান, রেজানুর রহমান, টেংরাখালি গ্রামের মহসিন, আব্দুল আজিজ, রাশেদুল, রামজীবনপুর গ্রামের জুলফিকার, মুজিবর, কালিগঞ্জের ফজর আলী ও পোড়াকাটলার বলেন্দ্র। শিকারি দলটি সুন্দরবনের দাইগাঙ, কাছিকাটা অঞ্চল থেকে ১৫টি হরিণ শিকার করে তাদের কাছে থাকা বরফ দিয়ে তা নৌকার মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখে। ২৬ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত হরিণগুলো শিকার করা হয়। ২৯ এপ্রিল রাত পৌনে ৯ টায় শিকারি দলটি ঝড়ের কবলে পড়ে। তারা ছোট বৈরি নদীতে থাকা জেলেদের কাছে আশ্রয় নেয়।
ঐ স্থানে অবস্থানরত জেলে ছোট ভেটখালি গ্রামের হযরত আলী, কামেশ গাইন, আবদউল মোমিন, আব্দুর রহিম জানায় তারা নদলি মাঝখানে নৌকা নোঙর কে অবস্থান করছিলো। ঝড়বৃষ্টি মেঘে প্রায় তিন’শ ফুট নদী সাহরে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার জেলেদের সাথে থাকা সাগর মুন্ডাকে আক্রমন করে। এবং তাকে ধে নিয়ে নদী সাতরে বনের দিকে যেতে থাকে। সে সময় বাঘের হাত থেকে সাগর মুন্ডাকে বাঁচাতে পর পর ৪ রাউন্ড গুলি ছুড়লে বাঘ ও সাগর মুন্ডা নিহত হয়। পরে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত সাগর মুন্ডার লাশ খোঁজাখুঁজি করা হয়। কিন্তু লাশ না পাওয়া গেলেও নিহত বাঘটিকে তারা উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। শিকারি দল বাঘটির চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেয় এবঙ ্কিেট দল বাঘের চামড়া নিয়ে রায়মঙ্গল দিয়ে ভারতে চলে যায়। অপর দলটি ৩০ এপ্রিল লোকালয়ে ফিরে আসে। এবং আত্মগোপন থেকে সাগর মুনডার পরিবারকে জাায় বাঘেল হামলায় সাগর মুন্ডা নিহত হয়েছে। এ খবর পাওয়ার পর সাগর মুন্ডার ভাই পরিতোষ মুন্ডাসহ মুন্ডা পল্লীর ভাগ্য, অতুল, হেমন্ত, রনজিতসহ এলাকার ৩০-৪০ জনকে সাথে নিয়ে বনের মধ্যে প্রবেশ কের। তারা দিনভর লাশের সন্ধান করে না পেয়ে ফিরে আসে। পরিতোষ মুন্ডা স্থানীয় চেয়ারম্যান আলমগীর হায়দারকে সাথে নিয়ে শ্যামনগর থানায় একটি সাধারণ ডাইরি করে। ডাইরির সূত্র ধরে থানার এএসআই মোর্শেদের নেতৃত্বে একদল পলিশ রোববার সুন্দরবনে যায়। তারা লাশ না পেয়ে ফিরে আসে। ঐদিন সুন্দরবনের সাতক্ষীরা-রেঞ্জের এসিএফ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে ঘটনা¯Íলে লাশের সন্ধান করা হয়। তারা লাশ না পেয়েও নদীতে অসংখ্য মরা হরিণের লাশ ভাসতে দেখে।
এদিকে শিকার দলের জনৈক ব্যক্তি ঐদিনে সাগর মুন্ডা গুলিতে নিহত হয়েছে এবঙ হরিণ শিকারের ঘটনা নিহতের পরিবারের কাছে ফাঁস করে দেয়। এবং তদের দেয়া তথ্য মতে গ্রামবাসীদের একটি দল রোবাবর বিকাল ৫ টায় নদীতে ভাসমান অবস্থঅয় সাগর মুন্ডার লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়্ তার লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এবং পরে থানায় এনে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়্ এ ব্যঅপারে শামনগর থানায় একটি ইউডি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সুরতহাল রিপোর্টে লাশের শরীরে কোন গুলির দাগ আছে কিনা তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে নিহতের পারিবারিক সূত্র জানায় লাশের শীরে গুলির দাগ ছিল। শিকারি দরীটর এক সদস্রেল দেযঅ তথ্য উদ্ধৃতি করে এলাকাবাসরিা জানায় শ্যামনগর উপজেলার একনজ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার গ্রামের বাড়ি রংপুরে পাঠানোর জন্য উক্ত শিকারি দলকে হরিণ শিকার করতে সুন্দরবনে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় সুন্দরবন অঞ্চলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে বন বিভাগ, পুলিশ সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোন আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা জানা যায়নি।
রাস মেলায় হরিণ নিধন ঃ
বছরজুড়ে বিশ্ব এতিহ্যসুন্দরবনে যে হরিণ নিদন হয় সে নিধনযজ্ঞের সিংহভাগই ঘটে রাস মেলা নামক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূণ্য স্নানের সময়। এ বছর রাস মেলার সময় সুন্দরবনে যে সহস্রাধিক হরিণ নিধন হয়েছে তার মধ্যে অনেগুলো গর্ভবতী ছিলো বলে একধিক সূত্রে জানা গেছে। বন বিভাগের একশ্রেণরি কর্মকর্তার যোগসাজশ ও দায়িত্বহীনতার সুযোগে হরিণ নিধনযজ্ঞসহ সুন্দরবন উজাড়ের সকল অপকর্ম নির্বিঘেœ চালানো হচ্ছে। প্রতি বছর ২৩-২৬ নভেম্বর চারদিন ব্যাপী এ মেলা সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোর কোলে অনুষ্ঠিত হয়। চোরা শিকারীরা মেলার সময়কে হরিণ নিধনের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নেয়। নির্ভরযোগ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীর সূত্র মতে, প্রতিবচরের মতো এবারও হরিণ নিধন উৎসবে মেতে ওঠার জন্যে অন্ততঃ ৫০টি গ্র“প সুনদÿবনে যায়। রাস মেলা শুরু হবার ১০/১২ দিন আগেই তার ামেলা ও আশপাশের বন এলাকায গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। ১০/১২টি করে ট্রলার ছিলে প্রতিগ্র“পে। প্রতি ট্রলারে ১৫ থেকে ২০জন শিকারী ছিলো। তার াহরিণ ধরার ফাঁদ পাতার জন্যে প্লাষ্টিকের কর্ড এবং প্রয়োজনীয় দা, কুড়াল, ছুরি এবং গাছ কাটার করাত সাথে নিয়ে যায়।
হরিণ শিকারে অংশগ্রহণকারী কয়েকজেনর সাথে আলাপ করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান। শিকারী দলগুলো পশর নদি ও শিবসা নদী দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করে। পশর নদী পথে প্রবেশ করে যারা তাদের চাঁদপাই রেঞ্জ অপিস, ঢাংমারী, জরমজন ও মরাপশব ফরেষ্ট স্টেশন, কোকিলমারী, জোংড়া হাড়বাড়িয়া ও ভুতুমমারী ফরেস্ট স্টেশন ম্যানেজ করে যেতে হয়েছে। এসব পথে যারা মেলায় যায় পূর্ণার্থীদের শরণখোলা ফরেষ্ট গার্ড আলতাফ হোসেন ও জোংড়া ভাসমান টহল ফাঁড়ির হাসমত আলী যথেষ্ট হয়রানি করেন। তবে অর্থ ও ডিজেল দিয়ে উৎকোচ দিলে এতে বশীভূত হয়ে শিকারীদের সহজেই যেতে দেয় তারা।
পশর নদী দিয়ে যে শিকারী দলগুলো ভেতরে যায় এবং অবস্থান নেয় হরিণ নিধনের জন্রে সে স্থানগুলো হলো জামতলার জঙ্গল, কালামের ভাবানদীর দু’পাড় মেহের আলীর চর, ভেদাখাল,ি টিয়ার চর, সপুতির ছাপড়া খাল, খেজুতলা, নীর বাড়িয়অর দু’দিক, তেতুলবাড়িয়া ত্রিকোনী জঙ্গলের মাঝাকনের খাল, ত্রিকোনী নদরি দু’পাড় ও সাগর পারে।
অপরদিকে শিবসা নদী দিয়ে যে দলগুলো যায় তারা অবস্থঅন নেয় নলিয়ান রেঞ্জ অফিস্ বেং কালাবগী হড্ডা, মাঝফুটা ও ডাটফোটা ফরেস্ট স্টেশনগুলো ম্যঅনেজ কিঙবা ফাঁকি দিয়ে সুন্দরবনে যায়। তাদের অপারেশন এরিয়া থেকে আলকি ও হরসরাজ। এ এলাকার এসিএফ এর কড়া নজরদারীর ফলে উক্ত এলাকার শিকারীরা তাদের টার্গেট ফুন করতে পারেনি বলেসূত্রটি জানায়।
শিকারীরা জানান, গ্র“পের সদস্যরা সুনদÿবন অভ্যন্তরে ছোট ছোট খাল দিয়ে নৌকা বেয়ে চরে নামে। এরপর হরিণ বিচরনের এলাকা খুঁজে নিয়ে বিকেলের দিকে ফাঁদ পাতা হয়। অনেক ফাঁদ পেতে রাতে ট্রলারে অবস্থান নেয়। ভোরে নেমে ফাঁদ্ োটকে পড়া হরিণ ছাড়িয়ে সেখানেই জবাই করে মাংস বানিয়ে নেয়। অনেকে সারারাত দল বেঁধে ফঁদের অদূরে অবস্থান করতে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মে হরিণ ফাঁদে ধরা পড়ে না। এ অবস্থায় দিনের বেলা দুই নদীর মাঝখানের জঙ্গলে আড়াআড়ি লম্বা করে ফাঁদ পাতা হয়। তারপর দলের সদস্যরা জঙ্গলে জোরে জোরে শব্দ করে এব হৈহল্লা করে হরিনের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে। ভীত হরিণরা ছুটে পালাতে গিয়ে ফাঁদে আটকা পড়ে। এ নিয়মে দেড় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ফাঁদ পাততে হয়। অনেক সময়  বন বিভাগের টহলদল অকুম্বলে এসে পড়লে তাদেরকে ম্যানেজ এবং সন্তুষ্ট করা হয়।
এবারের রাস মেলায় হরিণ শিকার করতে যাওয়া প্রতিটি গ্র“প ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত হরিণ শিকার করে। ২টি শিকারী গ্র“পের সাথে আলাপ করলে তারা ১৫/১৭টি হরিণ শিকার করতে সক্ষম হয় বলে জানায়। ফাঁদে অনেক গর্ভবতী হরিণও আটকা পড়ে। সেগুলো জবাই করে মাংস নেয়া হয় এবং গর্ভস্থ শাবক ফেলে দেয়া হয়। হিরণের মাথা, চামড়া এবং অন্যান্য উচ্ছিষ্ট নদীতে নিক্ষেপ অথবা মাটিতে পুঁতে রাখা হয়।
এসব শিকারীরা শুধু হরিণ নিধন করেই যে ক্ষান্ত থাকে তা নয়্ শিকারকালে তারা অসংক্য বৃক্ষ কেটে ধবংশ করেছে। এছাড়া তাদের শিকারের বিঘœ সৃষ্টি করতে পারে এ রকম অসংখ্য মৌচাক আগুনে পুড়িয়ে ধবংশ করে দিয়েছে। রাস মেলা গমনের নমে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও হাজার খানেক মানুষ পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবনের অপরূপ সুন্দর প্রাণী হরিণ এবং বনাঞ্চল ও অন্যান্য বনজ সম্পদের অপরিমেয় ক্ষতি অব্যাহত রেখেছে। প্রতিরোধের যেন কোনো উপায় নেই।
রাশমেলা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন
প্রতিবছর রাশমেলায় সময় প্রচুর হরিণ নিধন হয়। এ বছর হরিণ নিধণ নিয়ে স্থঅনীয় নাগরিক সমাজ ও এনজিও প্রতিনিধিরা মেলার পূর্বে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রাশমেলায় হরিণ নিধন  ব্েদ বেলা স্থানীয় রয়ের হোটেলে মতবিনিময় সভা করেছিল্ পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্স থেকে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়। সুন্দরবন সুরকষঅ প্রচারাভিযানের পক্ষ থেকেও এই উদ্দেশ্যে চার সদস্য বিশিস্ট একটি প্রতিনিধি দল দুবলার চরে রাশমেলায় যান। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় এবছরও মেলার সময় প্রচুর হরিণ নিধন হয়েছে। ব্যাপক প্রচার প্রপাগাণ্ডা এবং বন বিভাগের কড়া নজরদারি ও নানা আয়োজনকে উপেক্ষা করে রাশমেলায় হরিণ নিধনের ঘটনা তদন্তের জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তিনি সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গটন করা হয়েছে। সুন্দরবন সুরক্ষ প্রচারাভিযানের প্রতিনিধি দল ছিলেন লেট আস প্রোগ্রেসের নির্বাহী পরিচালক দেবব্রত সরকার, ধরিত্রীর সহকারী প্রকল্প সমন্বয়কারী পুলকেশ বিশ্বাস এবং সিডিপি’র প্রবীর বিশ্বাস ও মনোজ কুমার বিশ্বাস।
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সুপারিশ
ক) হরিণের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করতে হবে। সেখানে প্রচুর কেওড়া গাছ লাগাতে হবে।
খ) হরিণের অবাধ শিকার বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে বনরক্ষী বাড়াতে হবে।
গ) ৫অথবা ১০ বছর মেয়াদী একটা টার্গেট বেঁধে দিতে হবে। এর বার্ষিক মূল্যায়ন করে ত্র“টি-বিচ্যুতি বের করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঘ) পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন এবং বনে সরাসরি হরিণ-বানরের সখ্যতা দেখবার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে। তা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ হবে।

0 comments:

Post a Comment