Sunday, February 18, 2018

লবণ শিল্পকে বাচাঁন

লবণ শিল্পকে বাচাঁন 
আলী  ফোরকান
লবণের ওপর থেকে  আমদানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হচ্ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চাপে এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। এ সিদ্ধান্তে লবণ শিল্প ও চাষীরা চরম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এমনিতেই লবণ চাষীরা দামের ক্ষেত্রে প্রবল বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আমদানি-রফতানি দফতরের একটি সূত্র বলেছে, দু-এক মাসের মধ্যেই লবণ আমদানির ওপর থেকে সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে। এ প্রক্রিয়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে প্রায় চ‚ড়ান্ত করে ফেলেছে। এমন হলে প্রতিবেশী ভারত , মায়নমার ও থাইল্যান্ডের লবণে সয়লাব হয়ে যাবে দেশের বাজার। আমদানি-রফতানি দফতরের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ীর লবণ আমদানির অতি উৎসাহী মনোভাব ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চাপে এটা করা হলেও দেশের লবণ চাষীদের স্বার্থ দেখা হচ্ছে না। কয়েকটি লবণ উৎপাদন কোম্পানি বলছে আমদানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া হলে বাজার হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে। অন্যতম প্যাকেটজাত লবণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মোল্লা সল্ট, ক্রিস্টাল সল্ট, এসিআই, কনফিডেন্স ও মধুমতি লবণসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির অনেক কর্মকর্তাই তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, বাজার মুক্ত করে দেয়ার আগে সরকারকে দেশের লবণ শিল্প রক্ষার বিষয়টি ভাবা প্রয়োজন। তাদের মতে, আয়োডিনযুক্ত লবণ বাজারজাতে বাংলাদেশ এখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। এ সময় ভারত, মিয়ানমার কিংবা থাই লবণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটা দেশীয় শিল্পের জন্য কষ্টকর হবে। এতে বাজার অস্থিতিশীল ও লবণের দাম বেড়ে যেতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়ার আগে সরকারকে সব বিষয়ে আরো একবার ভালো করে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এদিকে লবণ চাষীরা দামের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হয় । খুচরা বাজারে লবণের দাম ১২ থেকে ১৮ টাকা। কিন্তু মাঠে লবণের দাম মাত্র দুই টাকা। প্রতি কেজি লবণে আয়োডিন মেশাতে খরচ পড়ে ১০ পয়সা। সবমিলিয়ে এক কেজি লবণে খরচ হয় তিন টাকার কিছু কম। অথচ বাজারে লবণের দাম ভালো। কাচা লবণের দামে আরেক দফা ধস নেমেছে। গত বছর এক মণ লবণের দাম ২০০ টাকা ছিল আর এখন প্রতিমণ লবণ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। প্রতি কেজি লবণের উৎপাদন খরচ তিন টাকার ওপরে পড়লেও মাঠেই চাষীকে প্রতি কেজি লবণ দুই টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম কমে যাওয়ায় চাষীরাও উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়েছে। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের ১০ শতাংশ লবণ চাষের জমি কমে গেছে এবার। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, দেশে মোট লবণের চাহিদা প্রায় ১৬ লাখ টন। এ কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও রাখা হয় ১৬ থেকে ১৭ লাখ টনের মধ্যে। প্রধান লবণ উৎপাদনকারী অঞ্চল কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রায় ৭৫ হাজার একর সমুদ্র তীরবর্তী জমিতে এ লবণ চাষ হয় । সারা বছর লবণ চাষ করা গেলেও নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্র“য়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত শুষ্ক সময়টাই লবণ চাষের উপযুক্ত সময়। চলতি মৌসুমে সমুদ্র তীরবর্তী কুতুবদিয়া, মহেশখালী,মাতারবাড়ী,ধলঘাটা, পেকুয়া, চকরিয়া, টেকনাফ, রামু, গোমাতলী, পোকাখালী,ভারোয়াখালী, চৌফলদন্ডি, নাপিতখালী, ইসলামপুর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাশখালী অঞ্চলে লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে। কক্সবাজার  এবং চট্টগ্রাম জেলায় উৎপাদিত এ লবণ দেশের চাহিদার সবটুকু যোগান দেয়। যার অবস্থান বায়ু আর পানির পরে। উপক‚লীয় অঞ্চল কক্সবাজার জেলা ও চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার ৭৫ হাজার একর জমিতে অত্যাবশকীয় লবণ উৎপাদিত হয়। প্রান্তিক চাষীরা প্রাকৃতিকভাবে এ লবণ উৎপাদন করে থাকে। গায়ের রক্ত পানি করে সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রখর রৌদ্রের খরতাপ নিজেদের রৌদ্রে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এ লবণ উৎপাদন করে । সরকারি হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে বাৎসরিক লবণের চাহিদা ১৬স লাখ টন। প্রকৃতি বিরুপ না ,হলে এ বছর চাহিদার অধিক লবণ উৎপাদিত হতে পারে বলে চাষীরা আশা ব্যক্ত করেছেন। প্রকৃতির অপরিসীম দান এ লবণ সম্পদে প্রায় ৩ লাখের বেশি লবণ চাষী আর ১৫ লাখ লবণজীবী মানুষ এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। ১৯৯৭ সাল হতে লবণের দামে ক্রমাবনতি লবণ চাষী আর লবণজীবী মানুষকে অসহায় করে তুলেছে। এ বছর মাঠ পর্যায়ে লবণ মণ প্রতি ৬৫ টাকা। পরিবহন খরচসহ যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে চাষীরা প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা পায়। যা উৎপাদন খরচের অনেক কম।
মহেশখালীর কালারমার ছড়া ইউনিয়নের লবণমিল মালিক তজু মেম্বার জানিয়েছেন, এবার প্রতি একর জমির বর্গা নিতে প্রায় দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। গত বছর যেখানে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় এক একর জমি বর্গা নেয়া যেতো এবার দিতে হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। যে কারণে জমি বর্গা নেয়া কমে গেছে। তিনি জানান, কক্সবাজারের ৭৫ হাজার একর লবণ চাষের জমির মধ্যে প্রায় ২০ হাজার একর জমিতে এবার লবণ চাষ হচ্ছে না। এ অবস্থার মধ্যে লবণ আমদানি হলে তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। বিসিক সূত্রে জানা যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আওতায় তারা কক্সবাজার এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ সমুদ্র এলাকায় লবণ উৎপাদনে চাষীদের সহায়তা করছে। লবণ আমদানির নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলে শুধু চাষীদেরই ক্ষতি হবে না, এতে বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন বুরো (ইপিবি) পণ্য ভিত্তিক যে উৎপাদন অঞ্চল গড়ে তোলার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 
বিসিক ও বিটাকের বক্তব্য: লবণ আয়োডেশন প্টè্যান্ট পরিচালনার জন্য নির্দেশনা এবং সতর্কতামূলক আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন,, প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজারে টিকে থাকতে হলে লবণ কারখানায় এসআইপি মেশিনের সঙ্গে ড্রায়ার এবং আর্দ্রতারোধক মেশিন দরকার। লবণ মিলে এসব মেশিন প্রদান করা হলে শতভাগ আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদনসহ গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। গত বুধবার বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সল্ফে§লন কেন্দ্রে বিসিক এবং বিটাকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআই) এই অনুষ্ঠান আয়োজনে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশ শিল্পও কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাকের) মহাপরিচালক আশীষ কুমার পালের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প সচিব ড. মোঃ নূরুল আমীন। বিসিকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুব উর রহমান, প্রকল্প পরিচালক (সিআইডিডি প্রকল্কপ্প) একেএম মোস্তাফিজুর রহমান, ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার (এমআই) ডা. জেবা মাহমুদ, লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি পরিতোষ কান্তি সাহা প্রমুখ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিটাক কর্তৃক এসআইপি মেশিন প্রদানকারী ৬৫ জন লবণ কারখানার মালিককে সনদ প্রদান করা হয়। গত ৬ মাস আগে এসব মালিকের কারখানায় লবণে আয়োডিন মিশ্রিত করার জন্য এসআইপি মেশিন প্রদান করা হয়। বক্তারা সারাদেশে ৩০০ লবণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য এসআইপি মেশিনের সঙ্গে লবণ শুকানো এবং আর্দ্রতারোধক মেশিন প্রদানের দাবি জানান। দেশের কারখানাগুলোতে উন্নত মানের মেশিন প্রদান করা হলে দেশীয় লবণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে গুণগত মান বজায় রেখে টিকে থাকতে পারবে।
লবণমিল মালিকদের বক্তব্য: খুলনার ৩৮টি লবণ মিলের মধ্যে ২৪টি মিল ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ১৪টির মধ্যে ৬টি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। খেলাপি ঋণের সব সুদ মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিলকরণ এবং নতুন ঋণ প্রদান করা না হলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা ৬টি মিলের সঙ্গে চালু থাকা অপর ৮টি মিলও যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ সংকট নিরসনে খুলনা লবণ মিল মালিক সমিতি নতুন ঋণ প্রদানসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছেন। গত রোববার খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে মিল মালিকরা এ দাবি জানান। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৮৩ সালে খুলনায় লবণ শিল্কেপ্পর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯২ সালে দেশের মধ্যে খুলনায় প্রথম আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন হয়। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত খুলনায় ৩৮টি লবণ মিল স্থাপিত হয়। এ শিল্পে অর্ধলক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান হয়। এসব মিল থেকে দেশের লবণ চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ হতো।  কিন্তু ১৯৯৮ সালের বন্যা, ১৯৯৯ সালে চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন এবং চোরাচালানের মাধ্যমে ভারত ও মিয়ানমার থেকে প্রচুর লবণ আসায় লোকসানের মুখে পড়ে খুলনার লবণ মিলগুলো। এর ফলে পর্যায়ক্রমে ২৪টি মিল বন্ধ হয়ে যায়। ২০০১ সালের ২৫ নভেম্বর লবণ মিলগুলো রক্ষার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অর্থ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা, সরকারি ও বেসকারি ব্যাংকের প্রতিনিধি ও মিল মালিকরা উপস্থিত ছিলেন।  বৈঠকে ব্যাংকিং সমস্যাকে স্পর্শকাতর সমস্যা চিহিৃত করে লবণ শিল্প রক্ষায় কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যেসব প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল বেসরকারি ব্যাংকগুলো তা বাস্তবায়ন করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক সেসব প্রস্তাব অদ্যাবধি বাস্তবায়ন করেনি। বরং এ দুটি ব্যাংক হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে লবণ মিল মালিকদের ঋণখেলাপি বানিয়ে মিলগুলোকে বন্ধ করে দিচ্ছে। এসব কারণে এ পর্যন্ত ২৪টি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছে ৩০ হাজার শ্রমিক। সে সঙ্গে খুলনায় লবণের উৎপাদন বার্ষিক ১০ লাখ টন থেকে ২ লাখ টনে এসে দাঁড়ায়। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের অতিউৎসাহী কিছু কর্মকর্তা মিলগুলোর নামে সুদ ও দন্ড সুদসহ পাওনা আদায়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা ছাড়াও মিল মালিকদের নামে বিভিন্ন প্রকার মিথ্যা ফৌজদারি মামলা দায়ের করছে। অগ্রণী ব্যাংক ক্লে রোড শাখার দায়েরকৃত মিথ্যা মামলায় খুলনা লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শেখ মাহবুবুল হক পিটারকে গত ৮ জানুয়ারি গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। আরো কয়েকজন মিল মালিকের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভারতের টাটা কোম্পানি বাংলাদেশে লবণ বাজারজাতকরণ শুরু করার ঘোষণার পর পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অতিউৎসাহী কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ সন্দেহজনক। এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সংবাদ সল্ফে§লনে আরো জানানো হয়, ২০০১ সালের ১৫ নভেম্বর লবণ শিল্পের বিভিন্ন ব্যাংকের মূল দেনা ছিল ৮ কোটি ৯৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। মিলমালিকরা মূল দেনা পরিশোধ করতে চায়। কিন্তু সুদ প্রদানের সামর্থ্য তাদের নেই। এচিত্র শুধু খুলনার নয়। এচিত্র সমগ্র লবণ উৎপাদন এলাকারও। কক্্রবাজারের মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ও মাতার বাড়ীতে দেশের সবচেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হয়। এ দুই ইউনিয়নের লবণমিল গুলো অর্থাভাবে এখন শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়ার আগে সরকারকে সব বিষয়ে আরো একবার ভালো করে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।  পাশাপাশি ৩ লাখেরও বেশি লবণ চাষী আর ১৫ লাখ লবণজীবী মানুষকে বাঁচানোর  ব্যবস্থাও সরকারকে করতে হবে।

0 comments:

Post a Comment