গলদা চিংড়ি চাষ
আলী ফোরকান
গলদা চিংড়ি অতি মুল্যবান মৎস্য সম্পদ। বিশ্ববাজারে গলদা চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ এই মাছ রপ্তানি করে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। গলদা চিংড়ি মিঠা পানির চিংড়ির মধ্যে সর্ব বৃহৎ এবং দ্রুত বর্ধনশীল মাছ। পুকুর, দীঘি, খাল, বিল, হাওড়-বাওড়সহ জলাশয়ে এককভাবে কিংবা রুই জাতীয মাছের সাথে গলদা চিংড়ি চাষ করা যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে ইহা মিঠা পানি এবং আধা লবাণাক্ত পানিতে পাওয়া যায়। উপকূলীয় অঞ্চলের যে সমস্ত নদ-নদীতে জোয়ার-ভাটার তারতম্যের প্রবনতা বেশি সেখানে গলদা চিংড়ির আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। গলদা চিংড়ির বেশির ভাগ মূলত:প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে আহরিত হয়ে থাকে। তবে ইদানিংকালে বিশ্ববাজারে গলদা চিংড়ির চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়াতে এখন এর চাষ স¤প্রসারিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে খুলনা, বাগের হাট, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও নড়াইল জেলায় এককভাবে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুকুরে মিশ্রভাবে এর চাষ হচ্ছে। এছাড়া কোন কোন জায়গায় ধানের সাথে ও গলদা চিংড়ির চাষ হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ঊৎপাদিত চিংড়ির পরিমান প্রায় ১,০১,৪১৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে মুক্তজলাশয় থেকে ৬১,০০০ মেট্রিক টন গলদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়।
গলদা চিংড়ি চাষের সুবিধা: গলদা মিঠা পানির চিংড়ি হওয়ায় সারা দেশের জলাশয়ে এর চাষের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। রুই জাতীয় মাছের সাথেও মিশ্রভাবে এর চাষ করা যায়। এ মাছ পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার তারতম্য সহ্য করতে পারে। মিঠা ও আধা লবণাক্ত পানিতে বিল এলাকায় ও ধানক্ষেতে সহজেই চাষ করা যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং হ্যাচারি পোনা পাওয়ার সুযোগ থাকায় দেশে গলদা চিংড়ি চাষের ব্যাপক সুবিধা বিদ্যমান। গলদা চিংড়ি কাটাবিহীন সুস্বাদু পুষ্টিকর মাছ। ফলে এ মাছের চাহিদা দেশে বিদেশে সর্বত্র ও অর্থকরি।
পোনা প্রাপ্তি: দেশের বিভিন্ন নদীতে এর পোনা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নদীর মোহনায় সংযুক্ত নীচু বা খালি অঞ্চলে যেখানে জোয়ার ভাটার প্রভাব থাকে। সে সব অঞ্চলে এপ্রিল থেকে আগষ্ট মাস পর্যন্ত গলদা চিংড়ির পোনা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কক্্রবাজার ও খুলনা অঞ্চলে স্থাপিত হ্যাচারিতে মার্চ থেকে আগষ্ট পর্যন্ত কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত গলদা চিংড়ির পোনা পাওয়া যায়।
গলদা চিংড়ির পোনা চেনার উপায়: প্রাকৃতিক ভাবে প্রাপ্ত গলদা চিংড়ির পোনা ছোট অবস্থায় চেনা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সাধারনত ২-৪ সেন্টিমিটার আকারের গলদা চিংড়ির মাথায় ক্যারাপাস নামক আবরনে ২-৫টি কালচে রং এর আড়া আড়ি দাগ থাকে। পোনা একটু বড় হলেই দাগগুলি আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যায়। তাছাড়া গলদা চিংড়ির রোষ্ট্রাম বাকানো এবং উপরে ও নীচে খাঁচ কাটা থাকে। পা গুলো বেশ লন্বা এবং ১ম ও ২য় জোড়া পা চিমটাযুক্ত।
চাষ পদ্ধতি: চিংড়ি চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। দেশে সনাতনী, উন্নত হালকা এবং আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে বর্তমানে মৎস্য চাষ চলছে। উন্নত হালকা পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের পূর্বে স্থান র্নিবাচন, মাটি ও পানির গুণাগুণ এবং পরিপার্শ্বিক কিছু বিষয় বিবেচনা করা বাঞ্চনীয়। এ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের জন্য ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণ,পানি ব্যবহার উন্নয়ন,মাটি ও পানির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধির জন্য চুন, সার ও প্রয়োজনীয় সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হয়। এতে প্রতি বর্গমিটার পানিতে ১টি থেকে ৫টি চিংড়ি চিংড়ি পোনা অর্থাৎ হেক্টর প্রতি ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার পোনা ছাড়া যেতে পারে।এ পদ্ধতিতে প্রতি কেজি চিংড়ির উৎপাদন খরচ হয় ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকা। পুকুরের আকৃতি হবে বর্গাকার কিংবা আয়তাকার হবে। পুকুরের –খামারের আয়তন হবে ০.৫০ হেক্টর থেরক ৫.০০ হেক্টর। পুকুরের গভীরতা ৪-৫ ফুট হওয়া বাঞ্চনীয়। এই পদ্ধতির চাষে হেক্টর প্রতি উৎপাদন ৩৫০ থেকে ১৭৫০ কেজি হতে পারে।
স্থান নির্বাচন: যেখানে নদ-নদী,খাল-বিল থেকে কিংবা গভীর-অগভীর নলকূপ,হস্তচালিত নলকূপের সাহায্যে পরিমানমত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায়। এমন স্থানকে গলদা চিংড়ি চাষের পুকুর-খামারের জন্য নির্বাচন করা যেতে পারে। খামারের জমির উপরিভাগ প্রায় সমতল বা একদিকে সামান্য ঢালু হলে ভাল হয়।
মাটির গুণাগুণ: দোঁ-আশ, এটেল বা বেলে দোঁ-আশ মাটি গলদা চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত। এ শ্রেনীর মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বেশি। এছাড়া এ সব মাটি দিয়ে সহজেই পুকুর-খামারের বাঁধ নির্মাণ করা যায়। অম্লীয় বা কষযুক্ত মাটি চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। অম্লীয় মাটির উর্বরা শক্তি কম এবং মাটি ও পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন সহায়ক নয়। মাটির পি এইচ ৫ থেকে ৬.৫ এর মধ্যে থাকলে তা চাষের জন্য উপযোগী। তবে মাটি অম্লযুক্ত হলে চুন প্রয়োগের মাধ্যমে তা শোধন করে নিতে হবে।
পানির গুণাগুণ: চিংড়ির ভাল ফলন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পানির গুণাগুণের উপর নির্ভরশীল। পানির রং সবুজ বা হালকা সবুজ, বা বাদামী সবুজ ও হলদে সবুজ হলে এ পানি চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত। বুঝতে হবে এ পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য রয়েছে। পানি যদি স্বচ্ছ পরিস্কার, ঘোলাটে, লালচে বা কালচে র্দুগন্ধযুক্ত হয় তবে তা চাষের জন্য অনুপযুক্ত। ভাল ফলন পেতে হলে পানি দুষনমুক্ত, তাপমাত্রা ১৮-৩৪সেন্টিমিটার (সর্বোত্তম ২৮-৩১সে:)। দ্রভিভূত অক্্িরজেনের পরিমান ৫.৪ মিলি লিটার, পিএইচ মান ৭ থেকে ৮.৫, স্বচ্ছতা ২৫-৩৫সেন্টিমিটার এবং পানির লবনাক্ততা ০-৪ পিপিটি হওয়া প্রয়োজন।
0 comments:
Post a Comment