Saturday, February 17, 2018

ভয়ঙ্কর মাদক আত্মঘাতী ‘ইয়াবা’

ভয়ঙ্কর মাদক আত্মঘাতী ‘ইয়াবা’
আলী ফোরকান 
মাদকাসক্তি ও মাদকদ্রব্যের অবৈধ চোরাচালান পৃথিবীর জন্যই একটা বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। মাদকাসক্তি প্রতিরোধে প্রতিবছর বিশ্বে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে আন্তরর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিরোধী দিবস পালিত হয়ে আসছে।  কিন্তু হেরোইন, ফেন্সিডিল, পেথেড্রিনসহ নানা মাদকদ্রব্যের ব্যবসা বন্ধ করা যাচ্ছে না। তরুণ সমাজের মাদকাসক্তির শিকার হওয়ার খবর পত্র-পত্রিকায় প্রায় নিয়মিত প্রকাশ পায় । আকাশপথে নিষিদ্ধ হেরোইনের চালান আটক এবং সীমান্তপথে ফেন্সিডিলসহ মাদকদ্রব্য আটকের ঘটনা অহরহ ঘটছে। সম্প্রতি র‌্যাবের হাতে আটক রাজধানীর গুলশান-বনানীর ইয়াবাসক্ত ৬ বখাটে যুবক সমাজে উদ্বেগজনক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছে। তারা ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। দামি গাড়িতে চড়ে হেরোইনের মতো ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রির ব্যবসা করে আসছিল। নিজেরা ইয়াবার নেশায় বিকৃত জীবনাচারে অভ্যস্ত। এ ছাড়া দামি এই মাদকদ্রব্যের নেশা ও বাণিজ্যের বিস্তাÍ করে অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে বিপথগামী করেছে। ধনীর দুলাল-দুলালি এসব বখাটে তরুণ-তরুণীদের যে বিকৃত জীবনাচারের খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, তা গোটা সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ২০০২ সালে ডিসেম্বর মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর রাজধানীর বনশ্রী আবাসিক এলাকা থেকে ৫’শ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ তিন যুবককে গ্রেফতার করে । অভিভাবকদের প্রভাবে কিছুদিন পর তারা জামিনে মুক্তি পায়। কিন্তু ইয়াবার মরণ ছোবল থেকে তারা মুক্ত হতে পারেনি। উপরন্তু সমাজের সম্ভাবনাময় যুবদের জীবন ধ্বংসের মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটায়। মাদকদ্রব্য সমাজে যে বিষক্রিয়া ছড়াচ্ছে, তা প্রতিরোধের জন্য ব্যাপক ও কার্যকর ব্যবস্থা অপ্রতুল। ২০০৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, সারাদেশে সব ধরনের মাদক সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ। ২০০৫ সালে সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর  সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ১১১ জন, একবছর পর তাদের সংখ্যা দাঁড়ায়া প্রায় ৪০ হাজার। একইভাবে ইয়াবার মরণ ছোবলও দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। সিরিঞ্জে মাদকগ্রহণকারী ও ইয়াবা সেবনকারীর উচ্ছৃঙ্খল যৌনাচারে দেশে এইচআইভি সংক্রমণের হারও বেড়ে চলেছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ইয়াবার ব্যবহার ও অহরহ বিকিকিনি চলছে । উচ্চবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত তরুণ সমাজের একটি অংশ ইয়াবাসক্ত হয়ে পড়েছে। এরা দিন দিন ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মিয়ানমার ও ভারতীয় সীমান্ত পথে এই ট্যাবলেট পাচার  হয়ে আসছে। রাজধানীর দেড় শতাধিক স্পটে প্রতিদিন কোটি টাকার মাদকদ্রব্য বেচাকেনা হয় বলে খবর প্রকাশ পেয়েছে। নানা ধরনের অপরাধ ও অপরাধজগতের সাথে  রয়েছে মাদকের নিবিড় সম্পর্ক। অথচ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাদক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। মাদকের চোরাচালান ও মাদক মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মাদকাসক্তির বিস্তার রোধ করা যাবে না। উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে-মেয়েরা ইয়াবাসহ ব্যয়বহুল মাদকের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে।  আর নিম্নবিত্ত পরিবারের বখাটে ও বেকার ছেলে-মেয়েরা অল্প টাকায় মাদকভর্তি ইনজেকশন সেবন করছে। এ সমস্যাটি কেবল শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামাঞ্চলে ও এর বিস্তার প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষত সীমান্ত সংলগ্ন পল্লী এলাকায় বিপথগামী অনেক তরুণ-তরুণী মাদক সেবনে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। এর বড় কারণ মাদকদ্রব্য সহজলভ্য ও তাদের হস্তগত হওয়ার পথটি সারাদেশেই উন্মুক্ত। মাদকাসক্তরা শুধু নিজেদের জীবনীশক্তি ধ্বংস করছে না। সমাজেও তারা শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত করছে নানাভাবে। যেসব পরিবারের কোনো সদস্য নেশাসক্ত হয়েছে, সেসব পরিবারের দুঃখ-দুর্গতি অর্š—হীন। জীবন-বিধ্বংসী এ নেশার কবলে পড়ে কতো  অসংখ্য তরুণ-তরুণীর সম্ভাবনাময় জীবন নিঃশেষিত হচ্ছে তার কোন হিসাব নেই।
উৎপাদন ও বাংলাদেশে প্রবেশ : থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও নেপালে ইয়াবার উৎপাদন হয়ে থাকে। থাইল্যান্ডে ইয়াবা সেবনের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়লে ১৯৭০ সালে তা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। সেখানে চোরাই মার্কেটে এসব ইয়াবা বিক্রি হয়ে থাকে। বিকল্কপ্প মার্কেট হিসেবে বিদেশিরা বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ইন্সপেক্টর শামসুল কবীর ও এক র‌্যাব কর্মকর্তা জানান।
ইয়াবা যেমন : বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইয়াবা ট্যাবলেট সাধারণত সবুজ ও লাল রংয়ের হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বাজারে সাদা রংয়ের কিছু ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে। তা নিম্নমানের ও কম দামি। এই সুযোগে কোনো কোনো ব্যবসায়ী ভেজাল ইয়াবা তৈরি করেও বাজারে ছেড়েছে বলে র‌্যাব জানতে পেরেছে। বাংলাদেশের ইয়াবাসেবীরা সাধারণত অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েলের ওপর ট্যাবলেট রেখে নিচে আগুনের তাপ দিয়ে পাইপের মাধ্যমে সেবন করে। কিন্তু থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মুখে বা পানিতে গুলিয়ে ইনজেকশন হিসেবে এটি ব্যবহƒত হয়। 
যারা ব্যবহার করতেন : জানা যায়, ™ি^তীয় বিশ্ব^যুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অ্যামফিটামিন ওষুধটির বহুল প্রচলন হয়। এমনকি অ্যাডলফ হিটলারও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যাফিটমাইন সেবন করতেন। থাইল্যান্ডে এক সময় বহুল জনপ্রিয় ইয়াবা ওষুধটি সেখানকার গ্যাস স্টেশনগুলোতে বিক্রি করা হতো। মহাসড়কে চলাচলরত ট্রাকচালকরা রাত জাগার জন্য এই ওষুধ সেবন করত। কিন্তু বেশকিছু দুর্ঘটনা ও চালকদের স্বাস্থ্যগত পাশর্^প্রতিত্রিক্রয়ার কারণে থাই সরকার ১৯৭০ সালে ইয়াবা ট্যাবলেট নিষিদ্ধ করে। ইয়াবা ট্যাবলেট খাওয়ার পর প্রথমে খুব ভালো লাগে। রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ায় শরীরে এক ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ঢাকা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার ফিরোজ আহম্মদ’র মতে, ধনীর পরিবারের সন্তানেরা ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি ও সেবন করে থাকে। সাধারণ লোকজন এগুলোর ধারেকাছেও যেতে পারে না। ইয়াবা ট্যাবলেট খেলে শারীরিক উত্তেজনা, যৌন উত্তেজনা, মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। নেশা করে সেবনকারী উত্তেজিত হয়ে যে কোনো কাজ করতে পারে। সেবনকারীর অনিন্দ্রা দেখা যায়, বদমেজাজি হয়ে ওঠে। এছাড়া সেবনকারীর লিভার ও কিডনি বিকল হয়ে যায়। ডাক্তার ফিরোজ বলেন, ইয়াবায় আসক্তকারীদের দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা দিলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।  আশার কথা যে, ইয়াবাসক্ত আটককৃত যুবকদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী ইয়াবাবিরোধী অভিযান জোরালো হচ্ছে। তবে আমরা মনে করি, বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দেশব্যাপী মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সমাজের সচেতন সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তসহ সারাদেশে মাদকদ্রব্য পাচার ও বিক্রয়ের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে না পারলে মাদকের ভয়াবহ অভিশাপ থেকে দেশকে  সহজে মুক্ত করা যাবে না। এ জন্য আইন-শৃঙ্খলা রÿাবাহিনীকে যেমন আরো কঠোর হতে হবে, তেমনি মাদকাসক্তদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর সেবামুখি কার্যক্রমও জোরদার করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীরা যাতে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি পায়, তার জন্য মাদক-বিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের কথা সরকারকে ভাবতে হবে। আর তা এখন থেকে কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

0 comments:

Post a Comment