Tuesday, February 27, 2018

বাংলাদেশের চাই পারমাণবিক বিদ্যুৎ

বাংলাদেশের চাই পারমাণবিক বিদ্যুৎ
আলী ফোরকান 
 বিদ্যুৎ শক্তি বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। যে কোনো দেশের অর্থনৈকি উন্নয়ন, উৎপাদন ও বিনিয়োগে বিদ্যুৎ শক্তি অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশে দ্রুত শিল্পায়ন, উৎপাদন, কৃষির বহুমুখী ব্যবহারে চাই পারমাণবিক বিদ্যুৎ। কারণ বাংলাদেশের পানিবিদ্যুৎ বা তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন এখন নানা সমস্যার সম্মুখীন। পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন বাংলাদেশের পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতির বিবেচনায় এখন বেশ জটিল। এছাড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুলও। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছ্।ে কিন্তু গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। তার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কয়লা অনেক সস্তা। কিন্তু আমাদের দ্রুত চাহিদা মেটাতে আহরিত কয়লায় দেশের বিদ্যুতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাও কঠিন। ঠিক এমুহুর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজন পারমাণবিক বিদ্যুৎ। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক দূর্ঘটনা ও উন্নয়নশীল দেশের পরমাণু অস্ত্র তৈরির কারণে পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপন এখন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বাধাঁর সম্মুখীন। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক ইনার্জি অথরিটি তথা আইএইএ যেকোনো পারমাণবিক বিষয়েই এখন খুবই সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। উত্তর কোরিয়া ও ইরানের পারমাণবিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা বিশ্বব্যাপী এক দ্ব›দ্ব-সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বের ৩১ টি দেশে (২০০০ সাল পর্যন্ত ) ৪৩৮ টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হযেছে। ইনডিয়া পাকিস্তান, ব্রাজিল ও চেক প্রজাতন্ত্রসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে এগুলো স্থাপিত হয়েছে। ফ্রান্স. ব্রাজিল, বেলজিয়াম, লিথুনিয়া, গণচীন ও সুইডেনসহ বিশ্বের বহুদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ এখন অধিক হারে ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে ৭৬.৪ শতাংশ ব্যবহার করে ফ্রান্স। এক্ষেত্রে ফ্রান্স রয়েছে সর্বোচ্চ অবস্থানে। পানি বিদ্যুৎ ও তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্য্যয় অনেক কম। তাছাড়া এ প্রযুক্তি সবদিক থেকেই অত্যন্ত নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে এ ক্ষেত্রে বর্তমান বিধি-নিষেধ, দ্ব›দ্ব, মতানৈক্য হচ্ছে পরমাণু প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহার নিয়ে। পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পাশাপাশি কেউ যেন এপ্রযুক্তি সামরিক খাতে প্রয়োগের প্রয়াস না পায়। এক্ষেত্রে নিশ্চয়তা বিধান করা একান্ত আবশ্যক। এঅবস্থায় ইনডিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (মার্চ ২০০৬)। ২০০৫ সালের ১৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ওভালে বুশ-মনমোহন’র  বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে চুক্তি টি সম্পাদিত হয়। এ চুক্তির ফলে ইনডিয়া বেসামরিক পরমাণু প্রযুক্তি লাভ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। তৎ সময় ইনডিয়ার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, ইনডিয়া -যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তির ফলে ইনডিয়ার কৌশলগত সামরিক স্বার্থ ক্ষুন্ন হবেনা। বরং এর ফলে ইনডিয়ায় জ্বালানি উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যাবে। অপরদিকে ইনডিয়া আর্ন্তজাতিক পরমাণু স¤প্রদায়ের পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা পেল। বাংলাদেশের না আছে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো প্রায়োজন, না আছে কোনো পরিকল্পনা। তবে বাংলাদেশের জ্বালানি ক্ষুধা নিবারণে এক্ষুনি প্রয়োজন বেসামরিক চুল্লির জন্য পরমাণবিক প্রযুক্তি। ইনডিয়া পরমাণবিক চুল্লি শিল্পায়ন ও জ্বালানির ক্ষেত্রে সীমাহীন ভাবে লাভবান হয়েছে। কিন্তু ইনডিয়াকে তার বেসামরিক স্থাপনায় আর্ন্তজাতিক পরিদর্শনের অনুমতি দিতে হবে। ইনডিয়া তার ২২ টি পরমাণু চুল্লির মধ্যে ১৪ টি চুল্লি 
আর্ন্তজাতিক পর্যবেক্ষকদের পরিদর্শন করতে দিতে সম্মত হয়েছে। আকৃতি-প্রকৃতি ক্ষুদ্র হলেও ২০০৬ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সহযোগিতা চুক্তি হয়। তেজস্ক্রিয়তাজনিত ঝুঁকি কমানো এবং পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে এচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।  বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগিতা ধারা অনুযায়ী এর আগেও একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশই হচ্ছে এ ক্ষেত্রে প্রথম দেশ, যার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা চুক্তি করেছে। এর কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় স্থাপনা ও সুত্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি জোরদার হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সুযোগ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এটাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা চুক্তির এটিই মুখ্য উদ্দেশ্য। তৎকালিন পূর্ব 
পাকিস্তানে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সরকার ১৯৬১ সালে একটি পরমাণবিক বিদ্যুৎ  প্রকল্প  হাতে নেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি কোম্পানি এ প্রকল্পের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাচাই শুরু করে। পরবর্তীতে পাবনা জেলার রূপপুরে একটি বিশাল এলাকা অধিগ্রহণ করা হয়। এ কেন্দ্র থেকে ১৯৬৯ সালে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইডেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বেলজিয়াম থেকে বিভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন চুল্লি সংগ্রহের জন্য তৎসময়ের ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিল একটি প্রকল্প অনুমোদন করে। এপ্রকল্পে পুঁজি সরবরাহের  জন্য বিদেশী কিছু কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করা হয়। এছাড়া ইউএসএইড প্রাথমিকভাবে ৭০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসাহ দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত সরে যায়। কানাডার পরমাণু স্থাপনা রূপপুর প্রকল্পে এগিয়ে এসেও ১৯৬৫ সালে করাচিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু করায় রূপপুর প্রকল্পে আর আসেনি। এরপর ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একটি ১৪০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে কাজ করার যৌথ প্রস্তাব দেয়। পাকিস্তান সরকার তা সুবিধাজনক মনে করেনি। ১৯৬৮ সালে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন।  সেটি ছিল দুই টারবাইন বিশিষ্ট  (প্রতিটি ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন) উচ্চচাপসম্পন্ন পানিভিত্তিক চুল্লি। এপ্রকল্পে বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ডও বারবার কাজ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো না কোনো কারণে সেগুলো বেশিদূর এগুতে পারেনি। রূপপুরে প্রস্তাবিত আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসে বেলজিয়ামের ব্যাংক কনসোর্টিয়াম। তারা তাদের সরকারের সহায়তাসহ কম সুদে প্রকল্পটির তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে এ প্রকল্পের জন্য বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বেলজিয়াম সরকারের দু’টি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু তখনই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ আবারো অনিশ্চিৎ হযে পড়ে। তবে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বেলজিয়াম আবার এব্যাপারে কথাবার্তা শুরু করে। কিন্তু দেশের পুর্নগঠনের কারণে এক্ষেত্রে তখন সরকার অর্থ যোগান দিতে পারেনি। পরে ১৯৭৪-৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি মিশন যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, জার্মান, ফ্রান্স সফর করে। ইতোমধ্যে আইআইএ ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের বিদ্যুৎ ও চুল্লির ব্যাপারে একটি জরুরী জরীপ শুরু করে। এঅবস্থায় ১৯৭৭ সালে ফরাসী একটি কোম্পানি রূপপুর পারমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের আবার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করে। যা পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে শেষ হয়। এতে রূপপুরে একটি ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন চুল্লি স্থাপনের প্রস্তাব চুড়ান্ত হয়। কিন্তু এসময় দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে  তা আর অগ্রসর হযনি। বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বের বহু কোম্পানিই এধরনের পরমাণু প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যবহার ও হস্তান্তর নীতিতে কাজ করছে। বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক পুঁজি সরবরাহ সংস্থার মাধ্যমে  এ ব্যাপারে তহবিল সংগ্রহ করাও সম্ভব। কিন্তু এখন সমস্যা হচ্ছে আইএইএকে নিয়ে। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া বর্তমানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ একেবারেই অসম্ভব। এর মূল কারণ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের আশঙ্কা। বাংলাদেশের সে অবস্থা নেই। তবুও এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ২০০৬ সালে সম্পাদিত চুক্তির ধারাবাহিকতায় যদি আধুনিক পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিৎ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হয়। তাহলে জ্বালানি শক্তির ক্ষেত্রে এদেশে একটি বিপ্লব সাধিত হবে। সে বিপ্লব বাংলাদেশকে শিল্পায়ন,উৎপাদন, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে  বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। 

0 comments:

Post a Comment