মুক্তা চাষের উজ্জল সম্ভাবনা
আলী ফোরকান
মুক্তা একটি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাকৃতিক মুক্তা সংগ্রহ করে আসছে। চীন দেশে সর্বপ্রথম শিল্পভিত্তিক কৃত্রিম উপায়ে মুক্ত চাষ শুর হয়। পরবর্তীতে জাপান,অষ্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম উপায়ে মুক্ত উৎপান ও চাষ শুরু হয়। তবে বাংলাদেশী গোলাপী মুক্তা পৃথিবীখ্যাত। এখনও দেশের গোলাপী উজ্জল মুক্তার বিদেশে কদর রয়েছে। অষ্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকগন বাংলাদেশ থেকে গোলাপী উজ্জল মুক্তা কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মুক্তাচাষ সরকারী এবং বেসরকারী উদ্যোগ সেভাবে গড়ে উঠেনি।
১৯৭৪-৭৯ সালে মৎস্য অধিদপ্তর মুক্তা বহনকারী ঝিনুক চাষের পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করে। পরবর্তীতে ময়মনসিংহ মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে ও মৎস্য গবেষণা ইনষ্টিটিউট এর সহযোগিতায় পরীক্ষামূলক ভাবে কৃত্রিম উপায়ে মুক্ত চাষের প্রচেষ্টা চালায়। সুষ্ঠ পরিচর্যা, সঠিক লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব হয়নি। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে গবেষণা করছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়েও এদেশে অনেকই বর্তমানে মুক্তা চাষে এগিয়ে আসছে।
মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুকসমূহ: বাংলাদেশে পাঁচ প্রকার ঝিনুকে মুক্তা পাওয়া যায়। তবে গোলাপী মুক্তা পাওয়া যায় খধহফংষরফবং এবং চৎঁংংরধ জাতের ঝিনুকে। যা শতকরা ১-৩ ভাগ এবং খধসবষষধব’ং গধৎমরহধষরুব প্রজাতির শতকরা ৭-১০ ভাগ মুক্তা পাওয়া যায়। এছাড়া প্লাকুনা প্লাসিন্টা নামক এদেশীয় সামুদ্রিক ঝিনুকেও মুক্তা পাওয়া যায়।
মুক্তা বহনকারী ঝিনুক চাষ ও মুক্তা উৎপাদনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
(ক) মুক্তা পৃথিবীব্যাপী মেয়েদের অংলকার ও গৃহ সজ্জায় ব্যবহৃত হয়।
(খ) মিঠা পানির ঝিনুক থেকে উৎপাদিত বাংলাদেশী গোলাপী মুক্তা সারা পৃথিবীতেই সমাদৃত।
(গ) ঝিনুকের মাংস পৃথিবীর বহুদেশই (যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ইত্যাদি) অত্যন্ত সুপ্রিয় খাবার হিসেবে বিবেচিত।
(ঘ) বাংলাদেশে ঝিনুকের মাংস হাঁস-মুরগীর প্রধান প্রাণিজ আমিষ জাতীয় খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
(ঙ) ঝিনুকের খোলসা খেলনা ও ঘর সাজানোর কাজ ছাড়াও বোতাম তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।
(চ) ঝিনুকের খোলা পারিবারিক ও ব্যবসায়কি পর্যায়ে চুন, সিরামিক কারখানা, পেপার মিল ও ব্লিচিং পাউডার তৈরীরে ব্যবহৃত হয়।
(ছ) হাঁস-মুরগীর প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম জাতীয় দ্রব্য হিসেবে ঝিনুকের গুঁড়া ব্যবহার বহুল সমাদৃত এবং এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
(জ) মুক্তার গুঁড়া পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের বসন্ত দাঁত, হাড়, চোখের রোগ, হৃদরোগ, এবং যৌবন ধরে রাখার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মুক্তা বহনকারী ঝিনুক প্রাপ্তিস্থান : বাংলাদেশে নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুরে পরিপূর্ণ মুক্তা বহনকারী ঝিনুকের প্রাচুর্য্যে ভরপুর। এদেশে ঝিনুকে মুক্তা হওয়ার মতো পানি ও মাটির রাসায়নিক গুন এবং সুন্দর আবহাওয়া বিদ্যামান। মুক্তা বহনকারী ঝিনুক বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই পাওয়া যায়। তবে উন্নতমানের গোলাপী মুক্তা শুধু বৃহত্তর ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল জেলায় পাওয়া যায়।
মুক্তার প্রকারভেদ: মুক্তা বিভিন্ন আকারের, রঙের ও নামের হয়ে থাকে। আকারের দিকে দিয়ে লম্বা, ত্রিকোনা, গোলমুক্তা মেথী, গারা, চুমকী, রাইটকী, ফসকী ডিম্বাকৃতি গোল ও চুর, ঝুর নামে পরিচিত। অপরিপক্ক মুক্তাকে চুর/ঝুর বা গুঁড়া মুক্তা বলা হয়ে থাকে। মুক্ত সাধারণত সাদা, গোলাপী, উজ্জল গোলাপী, কালো সোনালী, সোনালী হলুদ, ধূসর ও মরা মুক্তা (রঙহীন) রঙের হয়ে থাকে।
মুক্তা উৎপাদনের প্রযুক্তিগত দিক:
(ক) ঝিনুকের খাদ্যভ্যাস: ঝিনুক মিঠা, লোনা উভয় প্রকার জলাশয়ে জম্মায়। পানির তলদেশে বিচরণ ও নীচের স্তরের পচাগলা জৈবিক পদার্থ খেয়ে থাকে বলে পচাগলা ভোজী প্রাণী হিসেবে পরিচিত। খাদ্য গ্রহণের প্রতিযোগীতায় ঝিনুকের সাথে পুকুরের তলদেশের খাদ্যভোজী অন্যান্য মাছ (মৃগেল, চিংড়ি, মিরর কার্প, ব্লাক কার্প প্রর্ভতির) চাষ করা যায় না। ঝিনুক বিভিন্ন পরজীবীর পোষক হিসেবে কাজ করে। ঝিনুকের স্পর্শে পুকুরের নীচের স্তরের মাছ বা চিংড়ি রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
(খ) ঝিনুক সংগ্রহ, মজুদ, পুকুর প্রস্তুত ও ছাড়ার সময়: প্রাকৃতিকভাবে ঝিনুকের চাষে ভালো প্রজাতির লেমিলিডেন্স অরজিনালিস প্রজাতির লম্বাটে ফোলা বা একটু মোটা ধরনের ঝিনুক সবচেয়ে ভালো। জুন-জুলাই মাসে ঝিনুক নদী নালা খাল বিলে ডিম ছাড়ে। ডিমগুলো আঁঠালো বিধায় জলাশয়ে নির্মিজ্জিত বাঁশ, বাঁশের কঞ্চি বা আগাছার সাথে আটকে থাকে। দুই মাসের মধ্যে খোলসসহ ২-৩ সেন্টিমিটার ছোট ঝিনুকে পরিণত হয়। তখন ঝিনুক সংগ্রহ করে পুকুর বিলে মজুদ করা ভাল। নাইলনের জালের বা বাঁশের গড়া দিয়ে তৈরী বেষ্টনীর মধ্যে ছাড়লে মুক্তা চাষের জন্য অপারেশনের সময় সংগ্রহ করা সহজ হয়। পুকুরে/বিলে তখন রাসায়নিক সার, জৈব সার ও চুন প্রয়োগ করতে হবে। এক বিঘা পুকুরে মাছের সাথে সর্বোচ্চ ২ হাজার ঝিনুক ছাড়া যেতে পারে। ৩ বৎসর পর বা ঝিনুকের আকার সাধারণত ১০ সেঃ মিঃ এর উর্ধ্বে হলে জলাশয় থেকে উঠিয়ে মুক্তা সংগ্রহ করতে হবে। মাছ ও ঝিনুক চাষের জন্য পুকুরের গভীরতা ২ মিটার হলে ভাল। মাটি দো-আঁশ বা এঁটেলে দোÑআঁশ। পুকুর শুকিয়ে বিঘা প্রতি ৬০ কেজি চুন এবং পরবর্তীতে ৫-৬’শ কেজি পচা গোবর প্রয়োগ করে পুকুরে তলদেশের মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বর্ষার পানিতে পুকুর ভরে গেলে ঝিনুক ও মাছ ছাড়তে হবে । মাছ চাষের নিয়মানুযায়ী রাসায়নিক সার বিঘা প্রতি ১৫ কেজি ইউরিয়া ও ১৫ কেজি টি এস পি প্রয়োগ করা যেতে পারে। পরবর্তীতে প্রতি মাসে ৫ কেজি করে প্রয়োগ করতে হবে।
কৃত্রিম উপায়ে মুক্তা চাষের জন্য ঝিনুক নির্বাচন:
(ক) ঝিনুকটি সুস্থ্য ও রোগমুক্ত হতে হবে এবং কমপক্ষে ৫ সেঃ মিঃ লম্বা হতে হবে।
(খ) সাধারণত এক থেকে দেড় বছর বয়সের ঝিনুক নির্বাচন করতে হবে।
(গ) খধহফংষরফবং জাতের ঝিনুক বাছাই করতে হবে।
প্রাকৃতিক মুক্তা উৎপাদনের কারিগরি দিক ও কলা কৌশল ঃ সাধারণত মুক্তা ঝিনুকের শরীরের ছয়টি অংশে পাওয়া যায়। মুক্তার রাসায়নিক পরীক্ষা করে দেখা গেছে এতে শতকরা ৯২ ভাগ ক্যালসিয়াম, ৬ ভাগ অজৈব খনিজ পদার্থ ২ ভাগ পানি। মুক্তার আকার ও রং ইত্যাদি নির্ভর করে ঝিনুকের ভিতর, ক্যালসিয়াম জাতীয় কি ধরনের কণিকা প্রবেশ করেছে তার উপর। প্রাকৃতিকভাবে খাদ্য আহরণ কালে বা চলন্ত অবস্থায় ঝিনুকের খোল থেকে কোন কণা বা বাইরে থেকে যদি কোন দ্রব্য, (বালির কনা, ময়লা বা কোন পোকা) যদি ঝিনুকরে গায়ে পড়ে তাহলে ঝিনুকের শরীর থেকে এক ধরনের লালা নিস্বরণ হয়ে তা ঐ পদার্থের চারপাশ ঢেকে দেয়। প্রনিনিয়ত তার উপর লাল আবরণের পর আবরণ জমা হতে হতে এক সময় মুক্তায় পরিনত হয়। মাটি, পানি ইত্যাদির রাসায়নিক গুনের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রঙ্গের মুক্তা তৈরী হয়ে থাকে।
কৃত্রিম উপায়ে মুক্তা উৎপাদনের কৌশল: ঝিনুকের বাইরের শক্ত আবরণ বা খোলটি ক্যালসিয়াম কার্বনেট দ্বারা তেরী। শক্ত আবরনের নীচেই ম্যানটেল নামক পাতলা একটি পর্দা আছে এবং পর্দার উপরের অংশটি ভীষণ সংবেদনশীল। পর্দার এই অংশ (অর্থাৎ পায়ের উর্ধ্বাংশ যেখানে ডিম্বাশয় শুরু) ছিদ্র করে কেটে ক্ষুদ্র কনা/পুতি/ছোট মরা মুক্তা ঢুকানো হয়। ফলে উপরের অংশের বিভিন্ন কোষে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় কোষসমূহ বহিরাগত কণিকা সংস্পর্শ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লালা নিঃসৃত করে এবং বস্তুটিকে ঢেকে দেয়। ফলে ঝিনুকের দেহের উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং বেশী পরিমাণে লালা বেরিয়ে কণিকাটিকে শক্ত আকারে রুপান্তরিত কওে ও মুক্তায় পরিণত করে। ঋড়ৎসরহম ঢ়ধৎঃরপষব ঢুকানোর পর ঝিনুকের মৃত্যুহার শতকরা ২০-২৫ ভাগ এবং কমপক্ষে ১০ ভাগ ঝিনুক শরীর থেকে বহিরাগত কণিকাটিকে বের করে দেয়। জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, লিফিপাইন, বার্মায় বর্তমানে ৭০-৮০ ভাগ ঝিনুক এ পদ্ধতিতে মুক্তা উৎপাদন ও আহরণ করে থাকে।
ঝিনুক অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি
(ক) ঝিনুকের বহিরাবরণ/খোসা খোলার যন্ত্র ষ্টীলের তৈরী হলে সর্বোত্তম, অন্যাথায় কাঠের দ্বারা তৈরী হলে ও চলবে। এটি ঝিনুকের খোলসের মুখ প্রসারিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। যন্ত্রটির প্রশস্থ দিক পাতলা হওয়া প্রয়োজন। যাতে অতি সহজেই ঝিনুকের খোলের মুখে প্রবেশ করানো যায়।
(খ) সংযোজন কলা কাটা ছুড়ি: ম্যানটাল টিস্যু গ্রাফটিং বা নির্দিষ্ট আকারে কাটার জন্য ব্যবহৃত হয়।
(গ) ক্ষত করার যন্ত্র: এ যন্ত্রটির মাথা সরু, চিকন ও ধারালো। এর সাহায্যে মুক্তা উৎপাদনের জন্য আনিত বহিরাগত কণিকা প্রবেশের জন্য ক্ষত করা হয়।
(ঘ) নিউক্লিয়াস প্রবেশ করানোর যন্ত্র: ক্ষত স্থানে ভিতর দিয়ে অতি সহজেই প্রতি স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত হয়।
(ঙ) সংযোজক কলা প্রতিস্থাপন যন্ত্র: সংযোজক কলা স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত হয়।
(চ) বড়শীসহ স্যাটিউলা: ঝঢ়ধঃঁষধ রিঃয যড়ড়শ এ যন্ত্রটির সাহয্যে ঝিনুকের অভ্যন্তরীন অংগ প্রতঙ্গ বিন্যাস করা হয়।
(ছ) চিমটা: বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ধরার কজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
(জ) ঝিনুক ধারক: এটি একটি আয়তাকার মাঠের কুটরা ( লম্বা ১৫ সেঃ মিঃ প্রস্থ ১০ সেঃ মিঃ) এবং সামনের দিকে অপেক্ষা কিছুটা ঢালু এবং উপরিভাগে ঝিনুক অপারেশনের সময় ঝিনুককে ধরে রাখার জন্য একটি ক্লিপ লাগানো ্থাকে এবং সাইজ জানার জন্য স্কেল লাগনো থাকে।
(ঝ) বহিরাগত কণিকা: ছোট গোলাকৃতি বস্তু যেমন কাঁচ, মরামুক্তা, পাথর, ঝিনুকের খোলা ইত্যাদি।
কৃত্রিম উপায়ে মুক্তা উৎপাদনের জন্য আপারেশন কার্যক্রমকে আরামদায়ক ও সুন্দরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় চেয়ার, টেবিল, ট্রে, গামলা, বালতি, শুকনা কাপড়, স্পঞ্জ, এন্টিবায়েটিক ওষুধ ইত্যাদি উপকণের প্রয়োজন।
ঝিনুক আপারেশনের জন্য স্থান নির্বাচন: ঘরের ভিতরে বা বাইরে পুকুর পাড়ে ছায়ামুক্ত স্থান আপারেশনের জন্য উত্তম। আপােেশনের ০৫-১০ দিন আগে সিসেন্টের তৈরী ট্যাস্কে ঝিনুক সংগ্রহ করা রাখা ভালো। যাতে সঠিক ব্যবস্থাপনায় আপারেশনকৃত ঝিনুক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রতিপালন করা যেতে পারে।
আপারেশন পদ্ধতি: কৃত্রিমভাবে সাধারণত ঃ ঝিনুকের দুই স্থানে যথা এড়হধফ ও দেহস্থিত মোট আবরনীয় (গধহঃষব) মধ্যে ঘঁপষবঁং প্রতিস্থাপন করা হয়ে থাকে। এড়হধফ থেকে চক্রাকারে ও গধহঃষব থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজ, মুক্তা উৎপাদিত হয়ে থাকে।
(ক) চক্রাকার পদ্ধতি: আপারেশনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি উপরকণসমূহ গরম পানিতে ধুয়ে বা ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। জীবিত স্্ুস্থ্য ঝিনুক কেটে ছোট ছোট টুকরার ম্যান্টাল টিস্যু সংগ্রহ করতে হবে । এবার ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে ও স্পঞ্জের সাহায্যে পিচ্ছিল পদার্থ শুকিয়ে ফেলতে হবে।
ম্যাল্টলের পুরু অংশ বা বহিঃকিনারা থেকে লম্বলম্বিভাবে ১.৫ হতে ৩ মিঃমিঃ বাদ দিয়ে ২ মিঃ মিঃ প্রশস্ত করে লম্বা ফিতার আকারে কেটে নিতে হবে। এরপর ২ মিঃ মিঃ বর্গাকারে কেটে নিতে হবে। অবশ্য নিউক্লিয়াসের আকারের উপর নির্ভর করে টিস্যু সাইজ করাই উত্তম। এরপর ট্রেতে রাখা আপারেশনের জন্য সংগৃহিত ঝিনুকগুলো থেকে একটিকে খোলস খোলার যন্ত্র দিয়ে/কাঠের টুকরা দিয়ে ৫ সেঃ মিঃ প্রশস্ত ফাঁক করে কাঠের নির্মিত কীলক দিয়ে পৃথক রাখতে হবে। আপারেশনের সুবিধার্থে ঝিনুকটিকে কাঠের ধারকের সাথে আটকাতে হবে। স্প্যাটউলার সাহায্যে দক্ষিণ ফুলকা উপরের দিকে উত্তোলন করে নিতে হবে। যাতে দেহমধ্যস্থিত সকল অংশ দৃষ্টিগোচর হয়। এপর ছিদ্র করার যন্ত্রের সাহায্যে পায়ের উর্ধ্বাংশে তিনটি ছিদ্র করতে হবে। ছিদ্রপথে সংযোগ কলা বাহকের সাহায্যে পূর্বে প্রস্তুতকৃত সংযোজক কলার টুকরা প্রতিস্থাপন করতে হবে। নিউক্লিয়াস বাহক দ্বারা নিউক্লিয়াস প্রবেশ করাতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ছিদ্র হয়ে বা কেটে না যায়। খোলের মুখ থেকে এরপর কালক সরিয়ে দিয়ে চিহিৃত করে এবং খাতার রেকর্ড করে বাঁশের বা নাইলন খাঁচায় ভরে পুকুর/বিলে ছেড়ে দিতে হবে। অপারেশনের পূর্বে অবশ্যই দেখতে হবে (১) ঝিনুকটি দুর্বল কিনা, দুর্বল ঝিনুক অপারেশনে মৃত্যু হার বেশী থাকে। (২) ঝিনুকের খোল ক্ষত-বিক্ষত এবং চুন বেরুতে থাকলে ঝিনুকটি নির্বাচন করা বিধেয় নয়। (৩) এড়হধফ ডিম/শুক্র পূর্ন থাকলে আপারেশন করা যাবে না, কারণ প্রচন্ড চাপে ঝিনুক ঘঁপষবহং বের করে দেয়ার চেষ্টা করে ও ডিম ছাড়ার সময় ঘঁপষবহংটিও বেড়িয়ে যায়। এছাড়া ঝিনুক পায়ের সাহায্যে চলাফেরা করার সময় সংকোচন প্রসারণের জন্যও ঘঁপষবহং বেরিয়ে যেতে পারে।
(খ) ঝববফ চবধৎষ বা ধানী মুক্ত উৎপাদন পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে সধহঃষব এর ভিতরে বাহির থেকে কেবলমাত্র সংযোজক কলা প্রবেশ করিয়ে ম্ক্তুা উৎপাদন করা হয়ে থাকে। চীন, জাপান ও ভারতের মাদ্রাজে এ পদ্ধেিততে মুক্তা উৎপাদন বহুল প্রচলিত। এই প্রক্রিয়ায় ঘঁপষবহং ব্যবহৃত হয়না বলে সংযোজক কলা অতি সহজেই সধহঃষব এর সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকে। সংযোজক কলার আকার বড় হলে বীজ মুক্তা ও বেশ বড় হয়ে থাকে।
ঝিনুক অপারেশন পরবর্তী কাজসমূহ : (ক) অপারেশনকৃত ঝিনুকটির গায়ে ধাতব পদার্থ দিয়ে চিহৃ এবং নম্বর একে দিতে হবে।
(খ) অপারেশন কৃত ঝিনুকগুলোকে বাঁশের তৈরী চৌকানা বাক্সে ১২-১৮ সেঃ মিঃ পুরু মাটিসহ পুকুরে রাখতে হবে। নাইলনের নেটে একই পদ্ধতিতে রাখলেও চলবে। এতে বাছাই ও মৃত্যুর হার নির্ণয় সহজ হবে।
(গ) দুই একদিন পর পরীক্ষা করে দেখতে হবে অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলো মারা গেল কিনা। মৃত মুখ খোলা ঝিনুকগুলো খাঁচা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
(ঘ) দুই মাস পর জীবিত সুস্থ ঝিনুকগুলোকে বাক্স/খাঁচা থেকে বের করে পুকুরে চেড়ে দিতে হবে এবং মুক্তা আহরণের জন্য অন্তত ৩০ মাস অপেক্ষা করতে হবে।
(ঙ) ঝিনুক পুকুরে ছাড়ার পর মাছরাঙ্গা, কাঁকড়া, হাঁস, শিয়াল ও জলজ উদ্ভিদ থেকে রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপারেশনকৃত ঝিনুক মৃত্যুর কারণসমূহ:
(ক) দেহাভ্যন্তরের কোন অংশ যেমন- খাদ্যনালী, পাকস্থলী, কিডনী, লিভার ইত্যাদি কেটে যাওয়া।
(খ) খোলস ফাঁকা করার সময় অনফঁপঃবৎ গঁংবষব (অন্তমূখী মাংসপেশী) ছিড়ে যাওয়া।
(গ) বড় মুক্তা পাওয়ার লোভে বড় ঘঁপষবঁং প্রবিষ্ট করা।
(ঘ) অপারেশনকৃত স্থানে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণজনিত কারণ।
(ঙ) দীর্ঘক্ষণ ধরে অপারেশণ করা এবং অপারেশন পরবর্তীতে তাড়াতাড়ি পানির মধ্যে না রাখা।
মুক্তা ও ঝিণুক আহরণ:
ঝিনুকের অভ্যন্তরে মুক্তার বৃদ্ধি দুই থেকে আড়াই বৎসর দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর পর বৃদ্ধির হার কমে আসে। ৩০ থেকে ৩৬ মাস পর যখন ঝিনুকগুলো ১০ সেঃ মিঃ বা তদুর্ধ্ব হবে তখন সেগুলো পানি থেকে উঠাতে হবে। সংগৃহিত ঝিনুকগুলো কেটে খোলসমুক্ত করে মাংস আলাদা করার পর্বে হাতে আঙ্গুল দিয়ে টিপে দেখতে হবে। কোন শক্ত পদার্থ অনুভব করলে তা মাংস থেকে বিছিন্ন করে পরিস্কার পানির পাত্রে রাখতে হবে। এভাবে মুক্তা সংগ্রহ করা যায়। আবার শতকরা ৫ ভাগ পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড এর পানির দ্রবণে ১০ মিনিট আহরিত ঝিনুকগুলো রেখেও মুক্তা আলাদা করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে মুক্তা থাকলে পাত্রের নীচে জমা হবে।
¯তৃপিকৃত ঝিনুকের খোলস চুন প্রস্তুতকারীদের নিকট বিক্রি করা যায়।
মুক্তার মুল্য: মুক্তার মুল্য আকার ,রঙ ও সাইজের উপর নির্ভর করে। সাদা মুক্তার চেয়ে ঝিকমিক করা গোলাপী প্রভাবিশিষ্ট বড় মুক্তা ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। ছোট মুক্তার এবং অনুজ্জল মুক্তার মূল্য কম। এমনকি টাকা হিসেবেও প্রতিটি কিনতে পাওয়া যায়। পাঁচ সেঃমিঃ গভীর এবং ৭.৫ সেঃ মিঃ লম্বা মুক্তাটি এশিয়ার মুক্তা নামে খ্যাত। ১৬২৮সালে বাহরাইনের নিকটে, পারস্য উপসাগরে এক ডুবুরী মুক্তাটি পেয়েছিল। যেটি এখন যুক্তরাজ্যের ভান্ডারে রক্ষিত আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে যার মূল্য ছিল ৩০হাজার পাউন্ড ষ্ট্যালিং। এর ধরণের বড় মুক্তা আজও এক অপার রহস্যময়তার ঘিরে আছে। যা আমাদেরকে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা কাজ করতে প্রলুব্ধ করে। নক্ষত্র দেখে ভবিষ্যৎদান বিদ্যায় মুক্তার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখে থাকেন অংঃৎড়হড়সরংঃ গণ। যেমন ধন সম্পদ প্রাপ্তির জন্য সোনালী মুক্তা, আদর্শে জন্য সাদা মুক্তা, দর্শন গভীরতার জন্য কালো মুক্তা, সৌন্দর্যের জন্য গোলাপী মুক্তা, লাল মুক্তা ব্যবহৃত হয় । স্বাস্থ্য, শক্তি ও চিন্তাশক্তি উন্নয়নের জন্য ধূসর মুক্তা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীগন।
উপসংহার/ করণীয়: মুক্তার মুল্য অনেক। অলংকার হিসেবে হীরার পরই এর স্থান। শুধু মিঠা পানির ঝিনুকই নয়, সামুদ্রিক ঝিনুক বা ওয়িস্টারে মুক্তা চাষ করে দেশীয় প্রয়োজন মিটানোসহ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। জাপানের মিকিমটো নামে এক বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম কৃত্রিম উপায়ে ম্ক্তুা তৈরী করেন। তার নামে জাপানে একটি দ্বীপের নাম মুক্তা দ্বীপ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারের মহেশখালী, সোনাদিয়া, সেন্টমার্টিন ইত্যাদি এলাকায় প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক বড় সাদা মুক্তা বহনকারী পাকুনা প্লাসিন্টা নামক ঝিনুক ও মুক্তা চাষের কর্মসূচী গ্রহণ করা যেতে পারে। ঝিনুক ও মুক্তার এ অবহেলিত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করা সম্ভব। মাছের পাশাপাশি মুক্তার চাষ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও স¤প্রসারণ করা গেলে আমাদের দেশেও অন্যান্য দেশের মতো মুক্তা রপ্তানী কারক দেশে হিসেবে গণ্য হতে পারে। মুক্তা রপ্তানীকরে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হবে।
0 comments:
Post a Comment