পাটশিল্পের সেকাল-একাল
আলী ফোরকান
শিল্পনগরী বলেই এক সময় খুলনার পরিচয় ছিল। সাথে ছিল বন্দর নগরীও। অর্থাৎ শিল্প ও বন্দর নগরী খুলনার শিল্পাঞ্চলে এখন ভিক্ষুক প্রবেশ না করার কথা আগেই বলা হয়েছে। না খেয়ে শ্রমিক-কর্মচারী মারা যাবার ঘটনাও ঘটেছে। গত ৬ জুন’০৭ থেকে ১৫ জুলাই’০৭ পর্যন্ত না খেয়ে ও বিনা চিকিৎসায় ৮ জন নারী-পুরুষ মারা গেছে বলে ঐসব লোকের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। এরা হলেন, গোপালগঞ্জের বড়ফা গ্রামের বাসিন্দা, প্লাটিনাম জুবীলি জুট মিলের ¯িপনিং বিভাগের শ্রমিক আবুল কালাম (৬ জুন), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের আন্দুয়া কলাগাছীর বাসিন্দা, পিপলস্ জুট মিলের বেচিং বিভাগের শ্রমিক মোঃ সিরাজুল হক(৫২), প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলের দারোয়া তৈয়েবুর রহমান (৫৩), দিঘলিয়ার সেনহাটির বাসিন্দা, স্টার জুট মিলের মেকানিক বিভাগের শ্রমিক আবুল হোসেন (৫৫), ঝালকাঠির বাসিন্দা ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের তাঁত বিভাগের শ্রমিক সুলতান আহমেদ (৪৭), বরিশালের বানরীপাড়ার চাকার গ্রামের বাসিন্দা ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের তাঁত বিভাগের শ্রমিক সুলতান কাজী(৫৫), বরিশালের বানরীপাড়ার নাজিরপুরের বাসিন্দা ও পিপলস্ জুট মিলের ফিনিসিং বিভাগের করণিক হেমায়েত উদ্দিন (৫০) এবং পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা ও পিপল্স জুট মিলের ফিনিসিং বিভাগের শ্রমিক বাদশা মিয়ার স্ত্রী শাহিদা (৪৫)।
শ্রমিক সংশ্লিষ্ট এলাকায় বর্তমানে এহেন দূরাবস্থা চললেও পাটকল চালু রাখার পরিবর্তে বন্ধের সিদ্ধান্তেই অটল রয়েছে বিজেএমসি। অবশ্য বিজেএমসি গড়ার মূলে ছিল পাটকল। পাটকল রক্ষার দায়িত্ব যেখানে বিজেএমসি’র সেখানে আজ তারা একের পর এক চিঠি দিয়ে পাটকল বন্ধের কথা জানিয়ে দিচ্ছে। যদিও ঐ প্রতিষ্ঠানটি এজন্য সরকারের ওপর দায়ভার চাপিয়ে দিচ্ছে। এখানে অবশ্য পাটকল সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হচ্ছে, যে অজুহাত দেখিয়ে আজ বিজেএমসি মিলগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে সে কারণগুলো আগেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাহলে এগুলোর ব্যাপারে তখন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন- এ প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। সেদিকে না গিয়ে এখন অনেকটা ‘মাথা ব্যাথা থেকে বাঁচার জন্য মাথা কেটে ফেলা’র সিদ্ধান্তই নেয়া হচ্ছে প্রকারান্তরে। যা কোন সমাধানের পথ হতে পারে না। যতদূর জানা যায়, কৃষিজাত পণ্যকে শিল্পজাত পণ্যে রূপান্তর করে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দেশে শিল্প কাঠামো গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা ইত্যাদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতীয় স্বার্থে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাটেিশল্পের গোড়াপত্তন করা হয়। ষাটের দশকে বহির্বাণিজ্যে প্রতিকুল পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও ব্যাক্তিমালিকানাধীন মিলগুলো লাভজনক ছিল। প্রাক-স্বাধীনতা আমলে পাটজাত পণ্যের রপ্তাণী বাণিজ্যে কাংখিত মুনাফা অর্জিত না হওয়ায় তৎকালীন সরকার পাটজাত পণ্যের রপ্তানী মূল্যের উপর ৩৫% পর্যন্ত বোনাস ভাউচার প্রদান করে। পাটকল মালিকগণ এই বোনাস ভাউচার আমদানীকারকদের নিকট খোলা বাজারে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করে পাটকলের আয় হিসেবে প্রদর্শন করায় স্বাধীনতা পূর্বকালে পাটকলগুলোতে লাভ হত। এছাড়া পাটকলগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক রাখার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সময়ে আদমজী, লতিফ বাওয়ানী, করিম ও অন্যান্য বড় বড় মিল মালিকগণ পাটকল ব্যতিত লাভজনক শিল্প প্রতিষ্ঠা স্থাপন/ক্রয় করে সেগুলোকে পাটকলসমূহের ইউনিট হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করেছিল। স্বাধীনতা উত্তরকালে বোনাস ভাউচার প্রদান প্রথা প্রত্যাহারের পর হতেই পাটকলগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অবনতির সূচনা হয়। একমাত্র ১৯৮১ সালেই দেশের কিছু পাটকলে লাভ হয় বলে দেখা যায়। কিন্তু তার পর আর কখনই পাটকলে লাভের মুখ দেখেনি।
বিজেএমসি’র ইতিহাস ঃ ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ২৭ নং আদেশ বলে প্রাথমিক পর্যায়ে ৬৭টি ও পরবর্তীতে আরও ১০টি পাটকল ও ২টি যন্ত্রাংশ/সরঞ্জামাদি উৎপাদন কারখানা বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন-বিজেএমসি’র আওতায় ন্যস্ত করা হয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে বিজেএমসি ২টি কার্পেট কারখানা ও ১টি জুট প্লাষ্টিক কারখানা স্থাপনের ফলে বিজেএমসি’র নিয়ন্ত্রণে মোট কলকারখানার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২টিতে। ১৯৭৭-৭৮ সালে ৮টি ক্ষুদ্র পাটকল থেকে পূঁজি প্রত্যাহার, ১৯৮২-৮৩ সাল থেকে ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত ৩৫টি পাটকল ব্যাক্তি মালিকানায় হস্তান্তর, ১৯৯২-৯৩ সাল থেকে ১৯৯৫-৯৬ সাল পর্যন্ত জেসাক কর্মসূচীর আওতায় ৪টি মিল বন্ধ, ২০০২ সালের পয়লা জুলাই আদমজী জুট মিলস্ ও এ্যাসোসিয়েটেড ব্যাগিং কোম্পানী বন্ধ এবং একই বছর ৭ ডিসেম্বর সরকারের বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির আওতায় দৌলতপুর, নবারুন, হাফিজ, টেক্সটাইল ও নিশাত জুট মিলস্ বন্ধ করার পর বর্তমানে বিজেএমসি’র নিয়ন্ত্রণে চালু পাটকলের সংখ্যা ২২টি। এছাড়া খুলনার পিপলস্ জুট মিলটি গত ১৯ এপ্রিল’০৭ থেকে লে-অফ করার পর ১১ জুলাই থেকে সকল শ্রমিক-কর্মচারী (৩হাজার ৩৩৯ জন) ছাঁটাই এবং পয়লা আগষ্ট থেকে মিলটি একেবারেই বন্ধ করা হয়। এছাড়া দেশের বর্তমানের বৃহত্তর পাটকল ক্রিসেন্টসহ প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস্ ও স্টার জুট মিলও ১৯ এপ্রিল’০৭ লে-অফ করা হলেও শুধুমাত্র স্যাকিং বিভাগের লে-অফ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সিবিসি ও হেসিয়ান বিভাগের লে-অফ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
এদেশের পাট দিয়ে এখনও ভারত-পাকিস্তানের পাটকলগুলো চলছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজ এ জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে। বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রেসক্রিপশন নিয়ে দেশ পরিচালনা করায় এ শিল্পটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ব্যাক্তি মালিকানা ও সরকারী মিলের লাভ-লসের পার্থক্যের কারণ ঃ
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে ৭৭টি পাটকল থাকলেও বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রয়েছে মাত্র ২২টি এবং ব্যাক্তি মালিকানায় ২৫টিরও বেশী। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার মিলগুলোতে লোকসান হলেও ব্যাক্তি মালিকানা মিলগুলো লাভ করছে। আবার বিজেএমসি নিয়ন্ত্রিত মিলগুলো বন্ধ হলেও ব্যক্তি মালিকানাধীন নতুন নতুন পাটকল স্থাপিত হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে নিæলিখিত বিষয়গুলো চিহ্নিত করা গেছে।
১। সরকারী মিলের শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মজুরী-বেতন বেশী কিন্তু ব্যাক্তি মালিকানা মিলে মজুরী-বেতন কম।
২। সরকারী মিলে কাজের জবাবদিহিতা কম কিন্তু ব্যাক্তি মালিকানা মিলে জবাবদিহিতা বেশী।
৩। সরকারী মিলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে যথাসময়ে কাঁচা পাটের টাকা ছাড় না দেয়া পক্ষান্তরে ব্যাক্তি মালিকানাধীন মিলে সেটি নেই বললেই চলে।
৪। সরকারী মিলে শ্রমিক নেতাদের কাজ না করে মজুরী নেয়া এবং ভূয়া হাজিরা ও টিএ বিল গ্রহণের প্রবণতা বেশী কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন মিলে সেটির সুযোগ কম।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মিলে লোকসানের কারণ ঃ
বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন বা বিজেএমসি নিয়ন্ত্রিত পাটকলগুলোতে লোকসানের ইতিহাস খুব বেশী দিনের নয়। মূলত: আশির দশক থেকেই পাটকলে লোকসানের বোঝা শুরু হয়। আর এ লোকসানের কারণ সম্পর্কে মিল কর্তৃপক্ষ, সিবিএ নেতা, সাধারণ শ্রমিক, ব্যবসায়ী, সাপ্লায়ারসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বললে বের হয়ে আসে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। তবে কিছু কিছু জায়গায় অমিল থাকলেও মূলত: পাটকলের লোকসানের কারণ সম্পর্কে সকলেই প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। সকলের বক্তব্য থেকেই বের হয়ে এসেছে যে, বিজেএমসি’র অধীনস্থ পাটকলগুলো অনিয়ম, দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয়, অদক্ষতা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সঠিক মূল্যে সঠিক গ্রেডের পাট ক্রয়ে ব্যর্থতা, পাটের মানজনিত ত্র“টি, ওজনজনিত ত্র“টি, আদ্রতাজনিত ত্র“টি, উৎপাদন ঘাটতি, উৎপাদনজনিত ত্র“টি, উৎপাদিত পণ্য নিæমান, কম রপ্তানী মূল্য, কম ভর্তুকী প্রদান, মজুরী/পে-কমিশন বাস্তবায়নজনিত বর্ধিত মজুরী/বেতন ব্যয় ইত্যাদি কারণে বিপুল লোকসান দিয়ে আসছে। ফলে বিপুল পরিমাণ তহবিল ঘাটতি হয় যার কিয়দাংশ সরকার জাতীয় বজেটে অথবা সরকারী গ্যারান্টির মাধ্যমে ব্যাংক হতে প্রদত্ত ঋণের দ্বারা বিজেএমসি’র মিলকে প্রদান করে আসছে। এছাড়া পাটখাত সংস্কার কর্মসূচীর (জেসাক) আওতায় ১৯৯৩ সালে ক্যাশ ক্রেডিট ঋণের এক তৃতীয়াংশ মওকুফ এবং দুই তৃতীয়াংশ রিষ্ট্রাকচার্ড ঋণে রূপান্তরের পর ১৯৯৬-৯৭ সাল হতে উক্ত ঋণ হিসেবের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করায় বিপুল তহবিল ঘাটতি দেখা দেয়। লোকসান পরিহার করতে না পারায় নানা প্রতিকুলতার মধ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুইটির দেনা অপরিশোধিত/বকেয়া রেখে এবং সীমাতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ উত্তোলনের মাধ্যমে মিলগুলো কোন রকমে চালিয়ে রাখা হচ্ছে।
পাটকলগুলোতে লোকসানের কারণসমূহ ঃ
১। ব্যবস্থাপনা ঃ
ক) দক্ষ জনবলের অভাব
খ) শূন্যপদ পূরণের জটিলতা
গ) সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণহীনতা
ঘ) শ্রমিক নিয়োগে ঘাপলা
ঙ) শ্রমিকদের নিকট থেকে কাজ আদায়ে মিল কর্তৃপক্ষের ব্যার্থতা
চ) মিলের প্রয়োজন অনুযায়ী সেট-আপ প্রনয়ন না করা
ছ) শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব
জ) ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সিবিএ নেতৃবৃন্দের অযাচিত হস্তক্ষেপ
২। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়ন সমস্যা ঃ
ক) দৈনিক প্রয়োজনীয় মেরামত না করা
খ) সাপ্তাহিক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ তালিকা প্রণয়ন না করা
গ) সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার প্রতিটি মেশিন পরিস্কার না করা
ঘ) প্রতি শুক্রবার প্রতি মেশিন প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষন ও মেরামত না করা
ঙ) মাসিক বাজেট বরাদ্দ মোরাত না করেই খরচ দেখানো
চ) প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না কিনে বিল করে নেয়া
ছ) যন্ত্রাংশের মূল্য অধিক দেখানো
জ) বড় ধরনের ত্র“টি সারানো ও মেশিন চালু না করে ফেলে রাখা
ঝ) যন্ত্রাংশ ও লোহালক্কর গোপনে সরিয়ে ফেলা
ঞ) প্রতি শনিবার প্রথম শিফটে যান্ত্রিক প্রকৌশলী কর্তৃক সকল মেশিন উৎপাদন প্রধানকে বুঝিয়ে না দেয়া ও উৎপাদন প্রধন কর্তৃক বুঝে না নেয়া
ট) উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করা
ঠ) উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচী না থাকা
৩। পাট ক্রয় সংক্রান্ত ত্র“টি ঃ
ক) পাট ক্রয় সংক্রান্ত ভুল নীতিমালা
খ) ক্রয় মূল্য নির্ধারনে জটিলতা
গ) ক্রয় মূল্য নির্ধারণে বিজেএমসি’র বিলম্ব
ঘ) প্রয়োজনের তুলনায় অত্যাধিক ক্রয় কেন্দ্র
ঙ) ব্যাচ অনুযায়ী সঠিক গ্রেডের পাট ক্রয় না করা
চ) প্রয়োজনের তুলনায় অনেক নিæমানের পাট ক্রয় করা ও উচ্চমান দেখানো
ছ) পাটে পানি ও বালি মেশানো
জ) মূল্য অধিক দেখানো
ঝ) বাস্তবতা বিবর্জিত অধিক পরিবহন খরচ
ঞ) প্রতি মন ৪০ কেজিতে কিনে প্রতি মন ৩৭.২০ কেজি মিলে বুঝিয়ে দিয়ে প্রতি মনে ২.৮০ কেজি লোপাট করা
ট) ৩৭.২০ কেজির চাইতেও ওজনে ঘাটতি
ঠ) বিজেএমসি’র সঠিক তদারকিতে ব্যার্থতা
ড) সঠিকভাবে এ্যাসোর্টিং না করা
ঢ) সঠিকভাবে ব্যাচিং না করা
ণ) এ্যাসোর্টিং ও ব্যাচিং-এ তদারকির অভাব
ত) একই কর্মকর্তার ক্রয় কমিটি, মাননিয়ন্ত্রণ কমিটি ও উৎপাদন কমিটিতে অবস্থান
থ) ক্রয় কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি না থাকা
৪। উৎপাদন ত্র“টি ঃ
ক) সঠিক ব্যাচিং বুঝে না নেয়া
খ) নিæমানের পাট বুঝে নেয়া
গ) সঠিকভাবে ইমালশন না মেশানো
ঘ) পাইলিং এ ম্যাচুরিটি আসার আগেই উৎপাদনে নিয়ে যাওয়া
ঙ) ত্র“টিপূর্ণ উৎপাদন বাজেট
চ) উৎপাদন বাজেট ও উৎপাদন ক্ষমতার সমন্বয়হীনতা
ছ) উৎপাদন ক্ষমতার চাইতে কম বাজেট নির্ধারণ
জ) রক্ষণাবেক্ষন বিহীন ও ত্র“টিপূর্ণ মেশিনের ব্যবহার
ঝ) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব
ঞ) শ্রমিকদের কাছ থেকে কাছ থেকে সঠিক ও প্রয়োজনীয় কাজ আদায় করতে না পারা
ট) সুষম শ্রমিক নিয়োগ না করা
ঠ) ভূয়া হাজিরা দেখানো
ড) অপ্রয়োজনীয় তৃতীয় শিফট চালানো
ঢ) চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন না করা
ণ) বিনা রেকর্ডে পন্য উৎপাদন ও বিনা রেকর্ডে বিক্রি
ত) নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার না করা
থ) নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন না করা
দ) চাহিদা নাই এমন পন্য উৎপাদন করা
৫। বিপনন সমস্যা ঃ
ক) দক্ষ কর্মকর্তার অপ্রতুলতা
খ) বিপণন উৎপাদনের সাথে সমন্বয়হীনতা
গ) আন্তর্জাতিক বাজার ও চাহিদার তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভাব
ঘ) দৈনন্দিন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারের চাহিদা যাচাই না করা
ঙ) দৈনন্দিন বাজার মূল্য বিবেচনা না করা
চ) বৃহত্তর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যাক্তিগত স্বার্থ সংরক্ষণ করা
ছ) সকল পণ্যের আলাদা আলাদা মূল্য নির্ধারণ না করে ব্যাসিস মূল্য নির্ধারণ করে ক্রেতাদেরকে হয়রানী করা
জ) সকল ক্রেতাকে সমান দৃষ্টিতে না দেখা
ঝ) বিদেশী ক্রেতার নিকট তথ্য সরবরাহে কার্পণ্য
ঞ) উৎপাদন ক্ষমতার অধিক ক্রয়াদেশ গ্রহণ
ট) এল,সি বিহীন বিক্রি চুক্তি
ঠ) চাহিদা ও মূল্যের ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে দীর্ঘ মেয়াদী বিক্রি চুক্তির ফলে কম মূল্যে পন্য সরবরাহে বাধ্য হওয়া
ড) বিজেএমসি ও মিল সমূহের নামে দুই ধরনের বিক্রয় চুক্তির ফলে পন্য সরবরাহে জটিলতা
ঢ) উচ্চমূল্যে বিক্রির সুযোগ থাকা সত্বেও কম মূল্যে বিক্রির আগ্রহ
ণ) বিক্রয়ের অগ্রাধিকার তালিকা সংরক্ষণ না করা
ত) পরে আসা ক্রেতার নিকট আগে পন্য বিক্রি করা
থ) বিদেশী মিশনসমূহ বন্ধ রাখা
দ) আন্তর্জাতিক দরপত্রে স্বচ্ছতা না থাকা
ধ) ত্র“টিপূর্ণ কাগজপত্র ও পদক্ষেপের কারণে বহুদেশে অর্থ আটক থাকা
ন) বিপননে জনবলের আধিক্য
৬। গবেষনা ও মাননিয়ন্ত্রণ সমস্যা ঃ
ক) গবেষণা সচল না থাকার ফলে বহুমূখী পন্য উদ্ভাবন, উৎপাদন ও বিপনন ন হওয়া
খ) উৎপাদন খরচ কমানোর বিষয়ে গবেষণা না করা
গ) পাটের আঁশ উন্নয়নে গবেষণা না করা
ঘ) উন্নত মানের পাট উৎপাদনে গবেষণা না করা
ঙ) অধিক মূল্য সংযোজন করা যায় এমন পণ্য উৎপাদন না করা
চ) বর্তমানে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ না করা
ছ) কাঁচা পাটের বাজার উন্নয়নে গবেষণা না করা
লোকসানের হাত থেকে বাঁচিয়ে পাটকল রক্ষার উপায় ঃ
পাটচাষ, পাটের জমিতে প্রদত্ত শ্রম, বাজারজাতকরণ, ব্যবসা, পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানী খাতসমূহে বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ জড়িত। পাটকলসমূহ লাভজনকভাবে চালু রাখতে পারলে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ থেকে শুরু করে রপ্তানীর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি পাবে। এজন্য প্রয়োজন আলোচিত ত্র“টি-বিচ্যুতিগুলো দূর করে এ শিল্প রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসা। এছাড়া লোকসানের অজুহাতে পাটকলগুলো বন্ধ বা শ্রমিক ছাঁটাই না করে নিæলিখিত কারণগুলোই পারে পাটকলগুলো বাঁচিয়ে রাখতে।
১। সঠিক গ্রেডের পাট ক্রয়ের নিশ্চয়তা বিধান
২। অনুৎপাদনশীল খাতের খরচ পরিহার
৩। তদারকি কার্যক্রম জোরদার
৪। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার
৫। দৈনিক/সাপ্তাহিক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষন কার্যক্রম জোরদার
৬। অন্যান্য প্রত্যক্ষ কাঁচামালের ক্রয় মূল্য ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ
৭। পাট যাচাই-বাছাই কার্যক্রম জোরদার
৮। শ্রমিকদের নিকট হতে কাজ আদায় কার্যক্রম জোরদার
৯। ভূয়া হাজিরা পরিহার
১০। বিনা কাজে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের হাজিরা বন্ধ
১১। অপ্রয়োজনীয় তৃতীয় শিফ্ট বন্ধ
১২। মওসুমের শুরুতেই দরিদ্র কৃষকগণের নিকট হতে ন্যায্যমূল্যে কাঁচাপাট ক্রয় নিশ্চিতকরণ
(এজন্য অর্থ বছরের শুরুতেই পাটের জন্য অর্থ ছাড় দেয়া আবশ্যক)
১৩। পাটকলগুলোর স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতার ঙঢ়ঃরসঁস খবাবষ এ পৌঁছে প্রায় ২.৫২ লক্ষ মে: টন পাটপন্য উৎপাদন
১৪। ২.২১ লক্ষ মে: টন পাটজাত পণ্য রপ্তানী করে প্রায় ৮০০.০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং স্থানীয় বাজারে ০.৪০ লক্ষ পাটজাত পণ্য বিক্রি করে ১৩২.১৪ কোটি টাকা আয়
১৫। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পাট পণ্য বিক্রি করে হৃত বাজার পুনরুদ্ধার করা এবং রপ্তানী বৃদ্ধি করা
১৬। বিজেএমসি, ম্যানেজমেন্ট ও সিবিএ’র দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা
১৭। মিল কোয়ার্টারে হিটার ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা
১৮। অযোগ্য ও অসৎ কর্মকর্তাদের সরিয়ে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তা বসানোর ব্যবস্থা করা
১৯। বিজেএমসি থেকে সরিয়ে মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা বাড়ানো
২০। মোট শ্রমিক-কর্মচারীর ৫০ ভাগ স্থায়ী, ২০ ভাগ বদলী ও ৩০ ভাগ মাষ্টাররোলে রাখা
২১। বিশ বছরের উপরের চাকুরীজীবীদের স্বেচ্ছায় অবসর দেয়া।
২২। বয়লার আধুনিকায়ন করা
২৩। পরিকল্পনার জন্য সৎ, যোগ্য ও দক্ষ প্রকল্প প্রধান বসানো এবং যাদের কমপক্ষে তিন বছর চাকুরী আছে তাদেরকে প্রকল্প প্রধান করা
২৪। অফিসিয়াল ব্যয় কমানো
২৫। বিদ্যুৎ বিলের রেট ও ব্যাংক সুদ কমানো
২৬। সিবিএ’র বর্তমান ও সাবেক নেতাদের কাজ না করে পয়সা নেয়ার মানসিকতা পরিহার করা
২৭। আন্তর্জাতিক বাজারে নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন আন্তর্জাতিক পাট সংস্থাকে বাংলাদেশের পাটের নাজুক পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক বিশ্ব বাজারের উপর কোটা নির্ধারণের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা
২৮। মিলের মেশিনারির সংস্কার ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করা।
২৯। পলিথিন ও প্লাষ্টিক জাতীয় ব্যাগ বন্ধ যেমন শুরু হয়েছে তেমনি বিকল্প ব্যবহার হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি করা যেতে পারে
৩০। পাট ক্রয়, স্টোর ও খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়ে দুর্নীতি রোধ করা
৩১। মিলের এজেন্সী তুলে দিয়ে ঘাটে বা গেইটে পাট ক্রয়ের ব্যবস্থা করা
৩২। ভারত থেকে নিæমানের পাটবীজ আমদানী বন্ধ করা
৩৩। আন কাট কাচ্চা পাট বিদেশে রপ্তানী না করা
৩৪। পাট ও পাট শিল্পের বিকাশের জন্য সরকারের আন্তরিকতা বৃদ্ধি করা
শেষ কথা ঃ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পাটের অবদান অনস্বীকার্য এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ লোকবল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট চাষ, প্রক্রিয়াকরণ তথা শিল্প এবং এ খাতের বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাটখাতের উপর নির্ভরশীল এবং দেশের বেশীর ভাগ লোকই দরিদ্র জনগোষ্ঠী। সুতরাং এ শিল্পকে নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারনী মহলে চিন্তা-ভাবনা করলে শিল্পটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব। কৃষিজাত পণ্যকে শিল্পখাত পণ্যে রূপান্তর করে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, পাট ও পাটপণ্য রপ্তানী থেকে এখনও দেশের মোট রপ্তানী আয়ের ৮ থেকে ১২% অর্জিত হয়। তাই জাতীয় স্বার্থেই এ শিল্পটি টিকিয়ে রাখা দরকার। দেশে শিল্প কাঠামো গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিপূর্বক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সরকারের দায়িত্ব। তাই পাট শিল্পকে রক্ষা করতে পারলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাছাড়া এ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা যেমন সম্ভব তেমনি গ্রামাঞ্চলে প্রধান জ্বালানী হিসেবে পাট কাঠির ব্যবহারের ফলে একদিকে বনজ সম্পদ রক্ষন অন্যদিকে জ্বালানী আমদানীর ওপর কম চাপ প্রয়োগ হবে। সর্বোপরি মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে পাটের চাষের সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রধানত: পাট চাষীদের সমস্যাটির মূল্যায়ন করে ভারতীয় পাট বীজ বর্জনসহ দেশীয় বীজের যোগান যেমন সরকারের দিতে হবে তেমনি ঐ পাট সরাসরি যাতে তারা মিলগুলোতে বিক্রি করে সঠিক মূল্য গ্রহণ করতে পারে সেজন্য মধ্যস্বত্ত¡ভোগীদের থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। রোধ করতে হবে তথাকথিত ‘ব্রিফকেস বাণিজ্য’। প্রতি বছর পাট মৌসুম আসলেই বিজেএমসি থেকে কম মূল্য বেধে দেয়ার জন্য কিছু কিছু পাট ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ব্রিফকেস নিয়ে ধর্না ধরা হয় বলেও চাষীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। এসব থেকে সতর্ক থাকতে পারলে পাট শিল্পের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নতুবা কতিপয় দুবৃত্তের হাতে জিম্মি হয়ে থাকা এ শিল্পটি রক্ষা করা কঠিন।
0 comments:
Post a Comment