সৌর বিদ্যুৎ-সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
আলী ফোরকান
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নাম সৌরবিদ্যুৎ। নিরাপদ ও অফুরন্ত এই শক্তি। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় অবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দিচ্ছে। জ্বলছে বাতি, চলছে টিভি-ফ্যান, হচ্ছে মোবাইল র্চাজ। সামান্য উদ্যোগ নিলে এই বিদ্যুৎ হতে পারে লাগসই প্রযুক্তি। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার একটা বড় অংশ মেটানো যেতে পারে সৌরশক্তি দিয়ে। এটি অর্থনৈতিকভাবে ও লাভজনক হবার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। বিকল্প শক্তি হিসেবে সৌরশক্তির ব্যহার চলছে পৃথিবী জুড়ে। ক্রমান্বয়ে এর ব্যবহার বাড়ছে। আমেরিকা, ফ্রান্স, জামার্ন, ইংল্যান্ডসহ উন্নত দেশে এটি ব্যবহার হচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। প্রতিবেশি দেশ ভারতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। বিক্লপ জ্বালানির গুরুত্ব অনুধাবন করে ভারত ১৯৯৯ সালে। এবছর ভারত সরকার একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত করে। ভারত বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে মাত্র ৫ বছরে বিশ্বের চতুর্থ স্থানে উঠে আসে। কিন্তু আমাদের দেশ সেভাবে এগোয়নি। যাও ব্যবহার হচ্ছে তা, সারা দেশে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার হচ্ছে। দেশে এমুহুর্তে ৮টি প্রতিষ্ঠান সৌর শক্তি নিয়ে কাজ করছে। এদের উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ১ মেগাওয়াট। পাওয়ার সেলের তথ্যমতে, মার্চ ২০০৬ পর্যন্ত এনজিও গ্রামীণ শক্তি ৩৪ হাজার ৪৭৬ টি, ব্র্যাক ১৬ হাজার ২৩৫ টি, স্বজনী বাংলাদেশ ২ হাজার ৫৫১ টি, কোস্ট ৯৩৪ টি, টিএমএসএস ৮৮৫ টি, সিএমইএস ৯৩৮ টি, আইডিএফ ৯১১ টি, সুবাস্তি ৭৫৬ টি, ইউবিও এমইউএস ৮৩০ টি, ড্রপ ৩৩ টি, ব্রিজ ৬৩ টি, পিএসইউকে ৫ টি এবং অন্যান্য সংস্থা ৪৪ টি সোলার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করেছে। এসব সংস্থা দেশের উপকূলীয় এলাকা, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল স্থানে প্লান্ট গুলো স্থাপন করেছে। এছাড়াও মাগুরা, বগুড়া, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, খুলনাসহ সমভুমি এলাকায়ও এই সিস্টেম প্রসারিত করেছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ৭০ টির মধ্যে ৬ টিতে সৌরশক্তির কার্যক্রম চলছে। এলজিইডি ও ২৩ টি এনজিওর মাধ্যমে সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ১.১৪ মিলিয়ন ডলারের এপ্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কক্্রবাজার, চট্টগ্রাম। এলজিইডির অপর প্রকল্প টি হচ্ছে ২৬ মিলিয়ন ডলারের। এপ্রকল্পের মাধ্যমে মাদারীপুর, কুষ্টিয়া, কিশোরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, শেরপুর, ঝিনাইদহসহ কয়েকটি সাইক্লোন সেন্টারে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে। গ্রামীণ শক্তি সৌরশক্তি বিতরণের পাশাপাশি সিডা ও এশিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সহায়তায় গবেষণা করছে। সৌরশক্তি নিয়ে গবেষণারত এক বিশেষজ্ঞ জানায়, বাংলাদেশ গবেষণার জন্য উপযুক্ত স্থান। উন্নত দেশগুলো গবেষণার জন্য বাংলাদেশকে পছন্দ করে থাকে। কারণ হিসেবে তিনি জানায়, অনুদান বা ঋণের টাকা দেওয়ার আগে বাংলাদেশকে সহজে কোন না কোন গবেষণার বিষয় জুড়ে দেয়া যায়। সৌরশক্তির উপর গবেষণার জন্যও বিশ্বের অনেক দেশ অর্থ সহায়তা করে ও করতে চায়। তিনি আরো বলেন, বিদেশী সহায়তায় এলজিইডি সৌরশক্তির উপর কাজ শুরু করে ১৯৯৬ সালে। এখান থেকে গবেষণা করে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এগিয়েছে অনেক দূর। অথচ বাংলাদেশ সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। পৃথিবীতে ব্যতিক্রম কিছু বাদ দিলে সারা দেশে মূলত ঘরোয়া কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ৪ রকমের সৌরবিদ্যুৎ সহায়তা দিচ্ছে। সহায়তা দাতা প্রতিষ্ঠানের ভাষায়, সিস্টেমঃ-১ এতে ৩৬ ভোল্টের ব্যাটারি চার্জ হবে ও ৮ ওয়াটের ৩টি লাইট জ্বলবে। সিস্টেমঃ-২ এতে ৪৬ ভোল্টের ব্যাটারি র্চাজ দেওয়া যায় ও ২টি ৮ ওয়াটের লাইট জ্বলবে। এছাড়া এতে ক্যাসেট প্লেয়ার বা টিভি দেখা যায়। সিস্টেমঃ-৩ এতে টিভিসহ লাইট জ্বলবে ৭ টি। সিস্টেমঃ-৪ এতে ৪৫০ ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এবিদ্যুৎ প্যানেলের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি বাড়িতে সবোর্চ্চ ১৮ টি লাইট ও একটি টিভি চালানো যায়। সাইক্লোন সেন্টারগুলোতে মুলত এই পদ্বতিই ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন সৌরশক্তি ব্যবহার করে মহেশখালী উপজেলার নিভৃত পল্লী ধলঘাটার মমতাজ বেগম। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কি সমস্যা হয়? উত্তরে সে জানায়, প্রথমে
অনেক গুলো টাকা দিতে হয়। কিছুদিন পর ব্যাটারি ডাউন হয়ে যায়। ৫ বছরের গ্যারান্টি থাকলে ও
বছর দেড়ক থেকেই ডিস্টার্ব দেখা দেয়। মমতাজ বেগম আরো জানায়, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৭৫ ওয়াটের একটি সোলার সেল লাগাই। খরচ পড়েছে ৪২ হাজার । প্রথমে অগ্রিম দিতে হয় ৫ হাজার। এর পর প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা করে কিস্তি দিতে হয়। এভাবে কিস্তি চলবে ১২ বছর। এরপর যদি ব্যাটারি ডাউন হয় বা লাইট নষ্ট হয় তা নিজের খরচে কিনতে হয়। এছাড়া রয়েছে সাথে সার্ভিস চার্জ।
সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে ছাত্রাবস্থায় গবেষণা করছেন সফিউল আযম তুহিন। এর্নাজি প্যাক নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তিনি। তার মতে, সৌরশক্তির প্রাথমিক বিনিয়োগ খুব বেশি বলে যে কেউ এর ব্যবহার করতে পারবে না এ কথা ঠিক নয়। যে কেউ ঋণ নিয়ে এর ব্যবহার করতে পারে। সমস্যা মূলত ফটোভোল্টাইক সেল নিয়ে। এটি ব্যবহারে সৌরশক্তি থেকে ডিসি ভোল্টেজ তৈরি করা যায়। সেটির দক্ষতা কম। জাপানে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দক্ষতা বাড়িয়েছে। আর আমাদের দেশে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। সৌরশক্তি উৎপাদনের জন্য যে সরমঞ্জাদি প্রয়োজন তার পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের একটি সিমেন্স বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানায়, ‘সোলার সেল’ সেমি কন্ডাক্টর ডিভাইস তৈরি এখনো সাশ্রয়ী নয়। তাই এটি কষ্ট ইফেক্টিভ করা সম্ভব হয়নি এখনো। সৌরশক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বুয়েটের শিক্ষক এম এ ররশিদ সরদার। তার ধারণা গত ২০ বছরে ৮০ শতাংশ কমেছে। এছাড়া আগামী দু-এক বছরে ফটোভোল্টাইক সেলের দাম কমে আসবে উল্লেখযোগ্য হারে। আর এর ফলে ভারত, জাপান, চীনসহ উন্নত দেশগুলো চাহিদার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পূরণ করবে সৌরশক্তি দিয়ে। সারাদেশে এখনো ৭০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসেনি। বাকি যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে তারাও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাচ্ছেনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের সীমিত গ্যাস, কয়লা মওজুদ শেষে জ্বালানি সমস্যায় পড়তে হবে। তাই আমাদের এখনই বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবতে হবে। রোদ্রতাপিত সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশে হতে পারে এক সম্ভাবনার উৎস। মাঠ পর্যায়ে সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে যে পরীক্ষা চলছে তাতে আশার আলো দেখা যায়। সরকার সক্রিয় হলে, সৌরবিদ্যুৎ আমাদের দেশে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে স্বল্প সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করবে । সৌর বিদ্যুতের মূল অংশ সোলার সেল ভারত ও চীনে তৈরী হচ্ছে। বড় আকারের স¤প্রসারণ ঘটালে এগুলো দেশেই তৈরি করা সম্ভব হবে। আমাদের দেশের বেকার জনশক্তি এ ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগ আনতে সহায়ক হতে পারে। সোলার সেল ছাড়া অন্য অংশ গুলো দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। বাজার স¤প্রসারিত হলে আরো সাশ্রয়ী ও কম দামে টেকসই ব্যাটারি, জংশনবোর্ড, আনুসাঙ্গিক পার্টস তৈরি করা সহজ হবে। খুব সহজেই পরিবেশ বান্ধব দূষণমুক্ত সৌর বিদ্যুৎ কার্যক্রম স¤প্রাসারন করা যায়। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সেরকারি ভাবে ও উদ্যোক্তরা এগিয়ে আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, খুব অল্প সময়ে জ্বালানি সংকটে পড়বে পৃথিবী। বাংলাদেশ বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
0 comments:
Post a Comment