চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা:সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবক্ষয়
আলী ফোরকান
চলচিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। চলচ্চিত্র দেশের সংস্কৃতিও বহন করে। সমাজ ও জাতিগঠনে সুস্থ চলচ্চিত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জীবনঘনিষ্ঠ, সুস্থ চলচ্চিত্র দেশের আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক পট পরির্বতনেও সহায়ক হয়। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অশ্লিলতা অনাকাঙ্খিতভাবে বেড়ে চলেছে। অশ্লিলতার কালথাবা আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক জীবনে ফেলেছে বিরুপ প্রভাব। অশ্লিলতা-অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আবদ্ধ চলচ্চিত্রকে উদ্ধার করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে চলচ্চিত্রের অতীত গৌরব। নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সুন্দর ও রুচীশীল সংস্কৃতি এক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা: উপমহাদেশে ১৯৪৫ সালের ৫ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় চলচ্চিত্র সংসদ ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’ বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদের সূচনা পাকিস্তান ফিন্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।এটি ১৯৬৩ সালে গঠিত হয়।১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটির নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ’। কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নেমে আসে নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল। ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তর ও সামরিক নিরাপত্তা দপ্তর কাগজপত্র পরীক্ষা করে। পরীক্ষাশেষে চলচ্চিত্র সংসদের ওপর আরোপিত হয় নিয়ন্ত্রণাদেশ। ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে চলচ্চিত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি আইন পাস হয়। এভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্র সংসদের দীর্ঘ পথ চলার দ্বার উন্মোচিত হয়।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের সাংবিধানিক স্বীকৃতি: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে মত বা ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। যে কোনো পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের মাধ্যমে নিজের কিংবা অন্যের ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে। এতে বলাহয়েছে, ‘আইনের দ্বারা আরোপিত বিধি নিষেধ সাপেক্ষে কোন পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের কিংবা কারবার বা ব্যবসা পরিচালনার জন্য আইনের দ্বারা কোন যোগ্যতা নির্ধারিত হইয়া থাকিলে অনুরুপ যোগ্যতা সম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন আইন সঙ্গত পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের অধিকার রয়েছে’। কেউ চলচ্চিত্রকে তার পেশা বা বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন এবং এর মাধ্যমে তিনি তার নিজের বা অন্যের ভাব প্রকাশ করতে পারেন।
চলচ্চিত্র ও সেন্সরশিপ: চলচ্চিত্রের শক্তিকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনা। কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করে একটি চলচ্চিত্র অপর দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে প্রভাব বিস্তার এবং অনুকূল কিংবা প্রতিকূল জনমত গড়ে তুলতে পারে। সে হিসেবে চলচ্চিত্র খুবই ক্ষমতাধর গণমাধ্যম। তাই এ মাধ্যমের ওপর প্রতিনিয়ত খবরদারি বা নজর রাখা দরকার- এরকম একটি বোধ শাসক শ্রেণীর মধ্যে সব সময় কাজ করে। চলচ্চিত্রের ওপর এখবরদারির নামই সেন্সরশিপ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত এবং সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত¡াবধানেই এ বোর্ড পরিচালিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বোর্ড গঠন করা হয় ক্ষমতাসীন দলের পছন্দ ও ইচ্ছানুযায়ী । স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মর্যাদা নাথাকায় বোর্ডের কোন স্বাধীনতা নেই। ফিল্ম সেন্সর বোর্ডে যারা নিযুক্ত হন তাদের নিজস্ব মতামত প্রকাশের কোনো সুযোগ থাকেনা। ছবি বিচারের পর বোর্ডের সদস্যরা যে রায় দেন, তা প্রণীত হয় সরকারের ঘোষিত সেন্সরবিধি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয় নিজস্ব ব্যাখ্যার ভিত্তিতে; বিচক্ষণতা, সমাজ চেতনা এবং বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নয়। একদিকে সরকার মনোনীত আমলা এবং অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত কিছু সুবিধাভোগী সদস্য এ প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট হয়ে একে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ফড়িয়াদের একচেটিয়াত্ব কায়েম করে চলেছেন। তাদের আক্রোশমুক্ত শিল্পসম্মত এমন কোনো চলচ্চিত্র নেই যা, সেন্সর বোর্ড এর রোষাণলে পড়েনি। ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধূসর যাত্রা’য় এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। এ সেন্সর বোর্ড সুস্থ চলচ্চিত্র র্নিমাণের পরিবেশ যাতে সৃষ্টি না হয় তার ব্যবস্থা করে চলেছে। আলৌকিক কাহিনী, নকল গান,অশ্লীল যৌনতা এবং অকারণ ভায়োলেন্স সমৃদ্ধ জীবন বিমূখ অপসংস্কৃতির অন্যতম বাহন হচ্ছে আমাদের দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র। কুরুচিপূর্ণ অবাস্তব এবং আলৌকিক ছবির দৌরাত্ম্যে আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আজ ধ্বংসের পথে। বাংলাদেশের বর্তমান সেন্সর নীতিমালা মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্তরায় হলেও তা এখনো প্রত্যক্ষভাবে ধরা পড়েনি। প্রচলিত নীতিমালায় উদ্ভট, অশ্লীল জাতীয় চেতনা বিরোধী ছবি নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও সেন্সর বোর্ড এক্ষেত্রে অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে।
ভিডিও ছবি, চলচ্চিত্রসংসদ এবং সেন্সরবিধির অসারতা :বাংলাদেশে ভিডিও চলচ্চিত্র বর্তমানে একটি সাংস্কৃতিক রুপ নিয়েছে। ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে পূর্ণ বা স্বল্পদৈর্ঘ্যর কাহিনীই চিত্রই কেবল নয়, একজন নির্মিতা ভিডিওতে বিভিন্ন বিষয়ে ছবি নির্মাণ করতে পারেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রযুক্তিগত কারণে ভিডিও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সেন্সর বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও অবৈধ ভাবে চোরা পথে আসা ভিডিও ক্যাসেটের ওপর সেন্সর বোর্ডের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। চলচ্চিত্র প্রর্দশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেন্সর বোর্ড দুমুখোনীতি প্রয়োগ করে আসছে। একারণে এদেশের সুস্থ চলচ্চিত্র বিকাশ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। চলচ্চিত্র সংসদ কালাকানুন প্রয়োগ করার পর সদস্যদের দেখানোর জন্য বিদেশ থেকে যেসব ছবি (সত্যজিৎ রায়ের ‘জন-অরণ্য’ উপলেন্দু চক্রবর্তীর ‘চোখ’) পেয়ে থাকে সেব ছবির ওপর বোর্ড কড়া সেন্সর আরোপ করে থাকে। অপরদিকে ভিডিও ক্লাব গুলোতে বোম্বাইসহ সারো দেশের তাবৎ কুরুচিপূর্ণ পর্ণোগ্রাফি ছবি নিয়মিত প্রর্দশিত হয়। অনেকেই আবার মননশীল ছবি নিমার্ণ না করে ভিডিওতে কুরুচিপূর্ণ অশ্লীল, মারদাঙ্গা ভয়ংকর ছবি নির্মাণ করছেন। কারণ ভিডিওতে নির্মিত ছবির সেন্সর হয়না।
অশ্লীল ছবির নেপথ্যে: সরকারি নিয়ন্ত্রণের অভাব, কার্যকরিতার অপ্রতুলতা, নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়ের কারণে অশ্লীল ছবি বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। এর নেপথ্যে বিশেষজ্ঞরা দুটি কারণকেই চিহ্নিত করেছেন। ১. পরিচালক সমিতির ব্যর্থতা:দেশের পরিচালকরা এক সময় নির্মাণ করেছেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ ‘বাদী থেকে বেগম’ ‘আলোর মিছিল’ ইত্যাদি কালজয়ী ছবি । সেই দেশের পরিচালকদের প্রতিনিধি সংগঠন চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে এখন কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ছবি নিমার্ণের অভিযোগ রয়েছে। দেশীয় ছবিতে আজ যে অশ্লীলতার বিস্তার,তা একদিনে হয়নি। প্রথমে শুরু হয় অশ্লীল সংলাপ ও সংলাপে অশ্লীল ভাষার ব্যবহার দিয়ে। মন্দ ভাষা ও সংলাপ ব্যবহারের কারণে কাজী হায়াতের ‘ধর’ ছবিটি নিষিদ্ধ হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে তার ‘চাদাঁবাজ’ ছবিতে প্রথম অশ্লিল দৃশ্য সংযোজন করা হয়েছিল। শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘বীরপুরুষ’ ছবিও অশ্লীলতায় পূর্ণ ছিল। তার নির্মিত ‘ফায়ার’ও ‘নিষিদ্ধ নারী’ ছবিতে অশ্লীলতা আরো বেড়ে যায়। এভাবে এদেশের চলচ্চিত্রে অবলীলায় অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। বর্তমানে যে সব ছবি নির্মিত হচ্ছে তার অধিকাংশই সুস্থ ছবি নয়।
২. অশ্লীলতা ও সহিংস পোষ্টার: অনেক ক্ষেত্রে পোষ্টারের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের স্বরুপ বোঝা যায়। অশ্লীল ও সহিংস পোষ্টার প্রদশর্নের কারণে যুব সমাজ নীতিনৈতিকতা বর্জন করে ধাবিত হয় অশ্লীল ছবির দিকে। এ অশ্লীল ছবি দেখে এক সময় তারা নানা সামাজিক অপরাধে লিপ্ত হয়। অসুস্থ চলচ্চিত্রের বিভিন্ন অংশের কুরুচিপূর্ণ ও সহিংস ছবি সম্বলিত পোষ্টার লাগানার বিষয়টি চঁনষরপ হঁরংধহপব ধপঃ ছাড়া অন্য কোন আইন দ্বারা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। অথচ বিষয়টি যে অতি গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।
চলচ্চিত্রের অশ্লীলতা দূরীকরণের গৃহীত পদক্ষেপ: দেশের বিভিন্ন সময়ের সরকার, সংস্থা, ব্যক্তি বিশেষের অদূরদর্শিতা, সেন্সর বোর্ডের কোটারি স্বার্থের কারণে চলচ্চিত্র কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশে র্সৃজনশীল চলচ্চিত্র নিমার্ণের প্রয়াস বাধার সম্মুখীন। চলচ্চিত্র বোদ্ধারা ধ্বংসের হাত থেকে চলচ্চিত্র শিল্পকে রক্ষার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন। ১. বিকল্প ধারার ছবি নির্মাণ, ২. ভিডিও পাইরেসি বন্ধ, ৩. সেন্সরবিধির কার্যকারিতা, ৪. ভিডিও ছবি নির্মাণে সুনিদিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, ৫. ছবির ভাষা ব্যবহারে পরিচালকদের সংযমী মনোভাব পোষণ, ৬. ভাব প্রকাশে নৈতিকতা অবলন্বনে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি।
সেন্সরবিধির উপযোগিতা বৃদ্ধি: চলচ্চিত্রে সমাজের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়। একারণে এ শিল্পের উপকারিতা ও অপকারিতা উভয় দিকই বিদ্যমান। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করা যায়। কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা স্থুল প্রবৃত্তির সুড়সুড়ি দিয়ে ছবি নির্মাণ করে মানুষের রুচি নষ্ট করছে। কিছু বলার এবং আত্ম প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান সম্মত। তবে সমাজ ও দেশের ক্ষতিকর কোন কাজ বা মত প্রকাশ করা স্বাধীনতার পরিপন্থী। এসব বিষয়ে সেন্সরবিধির উপযোগিতা বৃদ্ধি পেলে কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ছবি নির্মাণ বন্ধ হতে পারে। ইতোমধ্যে বেশকিছু বিকল্প ধারার ছবি ও স্বল্প দৈর্ঘ ছবি আমাদের দেশের দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। “আগুণের পরশমণি, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন, ‘দুই দুয়ারী, ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি,‘মাটির ময়না ও ব্যাচেলর ছবি ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। অশ্লীল ছবি দূরীকরণে ও দর্শকদের সুস্থ চলচ্চিত্রের দিকে আকৃষ্ট করতে বিকল্প ধারার ছবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের চলচ্চিত্র এর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ব্যাপক মর্যাদার অধিকারী ও আমাদের সমাজ, সংস্কৃতির ধারক বাহক হয়ে ওঠবে এটিই সকলের প্রত্যাশা। আমরা আশাকরি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ এব্যাপারে যথাযথ নজর দিবেন।
0 comments:
Post a Comment