Thursday, April 21, 2016

বাংলাদেশের কয়লা সম্পদ

বাংলাদেশের কয়লা সম্পদ
আলী ফোরকান 
কয়লা বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত। কয়লানীতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা যাচ্ছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কয়লার রয়্যালটির হার ১৬ শতাংশে উন্নিত করা যায়নি। এতে করে খসড়া কয়লানীতি অন্ধকারে নিমর্জ্জিত হয়। বর্তমান সরকার কয়লানীতি অনুমোদন করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা এমত ব্যক্ত করেছেন। 
খসড়া কয়লানীতি:
ক। দেশে একটি কয়লা জোন গড়ে তোলা। 
খ। এই জোনে সম্ভাব্য মজুদ ৩৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) কয়লা উত্তোলন করা। 
গ। কয়লাভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা।
ঘ। কয়লার বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ঙ। বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা।
 চ। উম্মুক্ত পদ্ধতিতে কূপ খনন করা। 
ছ। কয়লা রফতানি এবং কয়লা অঞ্চলের অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা। 
কয়লা: কার্বন মৌলের অবিশুদ্ধ রূপ। অপর্যাপ্ত বাতাসে কাঠ পোড়ালে কয়লা হয়। এর নাম কাঠকয়লা। ভূগর্ভে খনিতে পাথরের মতো শক্ত এক ধরণের শিলাখন্ড পাওয়া যায়। এর নাম খনিজ কয়লা। এছাড়াও রয়েছে প্রাণীজ কয়লা, ভুসা কয়লা, সক্রিয় কয়লা, শর্করা কয়লা প্রভৃতি। প্রাণীদেহের চর্বিযুক্ত হাড়ের বিধ্বংসী পাতনের ফলে উৎপন্ন হয় প্রাণীজ বা অস্তিজ কয়লা। একে হাইড্রোক্লোরিক এসিডে দ্রবীভুত করে তৈরি হয় আইভরি ব্লাক। রঙ তৈরি এবং চিনির বর্ণ শোধনে এর ব্যবহার হয়। নারকেলমালার অন্তর্ধুম পাতনে সক্রিয় কয়লা আর চিনি থেকে পাওয়া যায় শর্করা কয়লা। বিভিন্ন প্রকার প্রদীপশিখা থেকে তৈরি হয় ভুসা কয়লা। প্রাকৃতিক নিয়মে পাথুরে বা খনিজ কয়লা সৃষ্টি হয়েছে উদ্ভিদ থেকে। হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর বিশাল অরণ্য নৈসর্গিক কারণে ভুগর্ভে চাপা পড়ে। বায়ু শুন্য,পৃথিবীর অভ্যন্তরে চাপ ও ভুস্তরের চাপের ফলে এর জৈব বিধ্বংসী পাতন ঘটে। এভাবে কয়লা সৃষ্টি হাজার হাজার বছর প্রয়োজন। সময়ের সাথে কয়লায় কার্বনের অনুপাত বাড়তে থাকে। আর কয়লার গুণগত মানও বদ্ধি পেতে থাকে। একারণে খনিজ কয়লার মধ্যেও শ্রেণী বিভাগ রয়েছে। খনিজ কয়লার বিধ্বংসী পাতনে গ্যাস-কয়লা পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ আবিস্কারের আগে কোল গ্যাস দিয়ে শহরে গ্যাসের বাতি জ্বালানো হত। ১৭৯২ সালে স্কটল্যান্ডের উইলিয়াম মার্ডক (১৮৩৯-১৯৫৪) প্রথম কোল গ্যাস দিয়ে তাঁর নিজের বাড়ি আলোকিত করেন। বহু প্রাচীন কাল (খ্রি:পূ: ২০০০) থেকেই মানুষ কয়লার ব্যবহার জানত। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে খনি থেকে কয়লা তোলা শুরু হয়। ১৩’শ শতকে শিল্পক্ষেত্রে কয়লার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। কাঠ-কয়লা ধাতু নিস্কাশন,ফিল্টার ও বারুদ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভুসা কয়লা ছাপার কালি,জুতোর কালি,রঞ্জক প্রস্তুতে ব্যবহৃত হয়। সক্রিয় কয়লা গ্যাস মুখোশ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। খনিজ  কয়লার প্রধান ব্যবহার জ্বালানি হিসেবে। এছাড়া কয়লা থেকে কোল গ্যাস, ঔষধ, রঙ, কীটনাশক, স্যাকারিন, রেনজিন, টলুইন, ন্যাপথলিন, আলকাতরা ইত্যাদি তৈরি করা হয়। কয়লা উৎপাদনে শীর্ষ দেশ চীন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, পোল্যান্ড ও জার্মানিতে প্রচুর কয়লা উৎপন্ন হয়।
বাংলাদেশে কয়লা সম্পদ: বাংলাদেশ কয়লার দিক থেকে সম্ভাবনাময় একটি দেশ । দেশে এ যাবত সাতটি কয়লা খনি আবিস্কৃত হয়েছে। ভূতাত্বিক জরিপে আরো বহু কয়লার খনির সন্ধান মিলেছে। ১৮৫৬ সালে অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ ভূতত্ববিদ ‘মেলেট’ বাংলাদেশের মাটির নিচে কয়লার অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পোষণ করেন। প্রায় ১’শ বছর তার এ ধ্যান-ধারণা কল্পনার বিষয়বস্তু ছিল। ১৯৫৯ সালে ঝঃধহফ ঠধপঁঁস ড়রষ পড়সঢ়ধহু খঃফ (ঝঞঅঠঅঈ) বর্তমান বগুড়া জেলার কুচমায় তেল না পেয়ে কূপ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে খনন কাজ চালাতে গিয়ে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২৩৮১ মিটার গভীরে গন্ডোয়ানা কয়লার সন্ধান লাভ করে। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর জাতিসংঘের সহযোগিতায় টঘ-চধশ সরহবৎধষ ংঁৎাবু প্রকল্পের আওতায় বৃহত্তর বগুড়া ও রাজশাহী জেলায় জরিপ পরিচালনা করে। এ সময় জামালগঞ্জে ১০৫০ মিলিয়ন টন সমৃদ্ধ কয়লা খনি আবিস্কার করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি) গঠিত হয়। জিএসবি ১৯৮৫ সালে  দিনাজপুর জেলায় বড়পুকুরিয়াতে,১৯৮৯ সালে রংপুর জেলার খালাশপীর নামক স্থানে এবং ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের দীঘিপাড়াতে পার্মিয়ান যুগের গন্ডোয়ানা কয়লাক্ষেত্র আবিস্কার করে। অষ্ট্রেলিয়ার ব্রোকেনহিল প্রোপাইটর ১৯৯৭ সালে দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ীতে ভূ-পৃষ্ঠের ১৫০ মিটার গভীরে গন্ডোয়ানা কয়লা আবিস্কার করে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পার্মিয়ান গন্ডোয়ানা কয়লাক্ষেত্রসমূহ ছাড়াও জিএসবি ১৯৬০-৬২ সালে বাংলাদেশ-মেঘালয় সীমান্ত বরাবর সুনামগঞ্জ জেলার টাকেরঘাট বাগলিবাজার এলাকায় ভূ-পৃষ্ঠের নীচে ৪৫ মিটার থেকে ৯৭ মিটার গভীরতায় টারশিয়ারী কয়লাক্ষেত্রের দুটি স্তর আবিস্কার করে। এছাড়া ফরিদপুর ও খুলনা অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পিট কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে। 

                                                                                  লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
                                                                                  মোবাইল:০১৭১১৫৭৯২৬৭

0 comments:

Post a Comment