আলী ফোরকান
বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস। বাংলাদেশের ভূ-পৃষ্ঠের নীচের বিশাল পুরু পাললিক শিলার স্তর গঠিত হয়েছে নব জীবিয় যুগ বা ঈবহড়ুড়রপবৎধ থেকে। যা আজ থেকে প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে। বাংলাদেশে অবস্থান বৃহত্তর বেঙ্গল বেসিনে। যার উৎপত্তি প্রায় ৫ কোটি বছর আগে। পরে প্লয়োস্টিাসিন উপযুগে এই বেসিনের পূর্বাংশের ভূ-আলোড়নের ফলে পাহাড় শ্রেণরি উদ্ভব হয়। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের উৎস এবং অবস্থান পাহাড়ি অঞ্চল বা কোল্ড-বেল্ট এর ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে সর্ম্পকিত। এই পাহাড়ি অঞ্চলের উর্ধ্ব ভাগই হচ্ছে পেট্রোলিয়াম তথা (ল্যাটিন চবঃৎড়=জড়পশ বা খনিজ / শিলা, ড়ষবঁস= তেল) তেল ও গ্যাসের উৎকৃষ্ট ফাঁদ। প্রাকৃতিক গ্যাস হচ্ছে প্রকৃতিতে তৈরী হাইড্রোকার্বন যা সাধারণ তাপমাত্রা ও চাপে বাস্পীয় অবস্থায় থাকে। প্রাকৃতিক গ্যাসে সাধারণত: মিথেন, প্রোপেন বিউটেন সামান্য পরিমাণ মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। ওসঢ়ঁৎরঃরবং বা দূষক হিসেবে নাইট্রোজেন, কার্বনডাই অক্্রাইড ও সালফার-ডাই-অক্্রাইড থাকে।তবে সালফার ডাই অক্্রাইডের উপস্থিতি গ্যাসের গুণগতমান হ্রাস করে।কিন্তু বাংলাদেশের গ্যাসে ক্ষতিকরাক সালফার নেই বললেই চলে। এই গ্যাসে মিথিনের পরিমাণ ৯৩.৫% থেকে ৯৯.০৫%। এসব কারণে বাংলাদেশের গ্যাস গুণগত দিক থেকে বেশ উন্নত মানের।
বাংলাদেশের গ্যাসের অবস্থা ও মজুদঃ গ্যাস, তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদন সহজতর এবং সুনিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রেট্রোবাংলা বাংলাদেশের ভূ-খন্ড উপকূল অঞ্চলকে ২৩ টি ব্লকে ভাগ করেছে। প্রতিটি ব্লকের ক্রমিক নম্বর রয়েছে। গ্যাসের ২৩ টি ব্লকের অবস্থান, মওজুদ, উত্তোলন, আবিস্কার নিম্নে দেওয়া হল।
১. সিলেট-হরিপুর-১৯৫৫ সালে বার্মা ওয়েল কোম্পানী আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ০.৪৪৪ টিসিএফ। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ০.২৬৬ টিসিএফ। উত্তোলন ০.১৫৮ টিসিএফ ও অবশিষ্ট মওজুদ ০.১০৮ টিসিএফ।
২. ছাতক-সুনামগঞ্জ, ১৯৫৯ সালে বার্মাওয়েল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৬৭৭.০ বিলিয়ন ঘনফুট। প্রমাণিত ও সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৪৭৩.৯ বিলিয়ন ঘনফুট। উত্তোলন ২৫.৮ টিসিএফ ও অবশিষ্ট মওজুদ ৪৪৮.১ টিসিএফ।
৩. রাশিদপুর- সুনামগঞ্জ, ১৯৬০ সালে শেলওয়েল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ২,০০২.০ বিলিয়ন ঘনফুট । সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১.৪০১.২ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৩৫৬.৫২ ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ১,০৪৪.৬৮৪ বিলিয়ন ঘনফুট।
৪.কৈলাশটিলা-সিলেট, ১৯৬২ সালে শেলওয়েল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ২৭২০.১ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১,৯০৩.৩ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন ০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৩৪৩.৮৩ বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ১৫৬৯..৪৬৭ বিলিয়ন ঘনফুট।
৫.তিতাস-বিবাড়িয়া, ১৯৬২ সালে শেলওয়েল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৭,৩২৫.০ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৫,১২৭.৫ বিলিয়ন ঘনফুট । জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন২,৩৯৪.৬৭ বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ২৭৩২.৮২৭ বিলিয়ন ঘনফুট ।
৬. হবিগঞ্জ- ১৯৬৩ সালে শেলওয়েল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৫,১৩৯.০ বিলিয়ন ঘনফুট । সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৩,৮৫২.৩ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ১,২৫৮.৭৯ ও অবশিষ্ট মওজুদ ২.৫৯৩.৫০৯২ বিলিয়ন ঘনফুট।
৭. সেমুতাং-খাগড়াছড়ি, ১৯৬৯ সালে ওজিডিসি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ২২৭.০ বিলিয়ন ঘনফুট । সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১৫০.৩ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন ০৫- পর্যন্ত উত্তোলন ও অবশিষ্ট মওজুদ ১৫০.৩ বিলিয়ন ঘনফুট ।
৮.বাখরাবাদ-কুমিল্লা, ১৯৬৯ সালে শেলওয়েল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ১,৪৯৮.৬ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১,০৪৯.০ ঘনফুট । জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৬৪২.৫৯ ও অবশিষ্ট মওজুদ ২.৪২১ বিলিয়ন ঘনফুট।
৯. কুতুবদিয়া, ১৯৭৭ সালে ইউনিয়ন ওয়েল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৬৫.০ বিলিয়ন ঘনফুট । সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৪৫.৫ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ও অবশিষ্ট মওজুদ ৪৫.৫ বিলিয়ন ঘনফুট ।
১০.বেগমগঞ্জ নোয়াখালী, ১৯৭৭ সালে পেট্রোবাংলা আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৪৬.৭ বিলিয়ন ঘনফুট । জুন -০৫ পর্যন্ত অবশিষ্ট মওজুদ ২৩.৭ বিলিয়ন ঘনফুট ।
১১.বিয়ানীবাজার-সিলেট, ১৯৮১ সালে পেট্রোবাংলা আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ২৪৩.১ বিলিয়ন ঘনফুট । প্রমাণিত ও সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১৭০.২ বিলিয়ন ঘনফুট । জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৩৪.৮৭ ও অবশিষ্ট মওজুদ ১৩৫.৩৩০ বিলিয়ন ঘনফুট।
১২. ফেনী, ১৯৮১ সালে পেট্রোবাংলা আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ১৮৫.২ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১২৯.৬ বিলিয়ন ঘনফুট । জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৪৭.২৯ বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ৮২.৩১৫ বিলিয়ন ঘনফুট ।
১৩. কামতা-গাজীপুর, ১৯৮১ সালে পেট্রোবাংলা আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৭১.৮ বিলিয়ন ঘনফুট । সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৫০.৩ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ২১.১বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ২৯.২ বিলিয়ন ঘনফুট।
১৪.ফেঞ্চুগঞ্জ-সিলেট, ১৯৮৮সালে পেট্রোবাংলা আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৪০৪.০ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ২৮২.৮ বিলিয়ন ঘনফুট । জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ১২.৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ২৭০.০৬০ বিলিয়ন ঘনফুট।
১৪.জালালাবাদ-সিলেট, ১৯৮৯ সালে সিমিটার কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ১,১৯৫.০ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৮৩৬.৫ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ২৬১.০৮বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ৫৭৫.৪১৮বিলিয়ন ঘনফুট।
১৫.মেঘনা-নরসিংদী, ১৯৯০ সালে পেট্রোবাংলা আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ১৭০.৬ বিলিয়ন ঘনফুট । সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১১৯.৬বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৩৪.২০ বিলিয়ন ঘনফুট। ও অবশিষ্ট মওজুদ ৮৫.৪০২ বিলিয়ন ঘনফুট।
১৬.নরসিংদী, ১৯৯০ সালে পেট্রোবাংলা আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৩০৭.২ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ২১৫.১ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৫৭.৮৭ বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ১৫৭.২২৬ বিলিয়ন ঘনফুট ।
১৭.শাহবাজপুর-ভোলা, ১৯৯৫ সালে বাপেক্্র আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৬৬৪.৩ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৪৪৫.৬ বিলিয়ন ঘনফুট। উৎপাদনে যায়নি, অবশিষ্ট মওজুদ ৪৪৫.৬বিলিয়ন ঘনফুট ।
১৮.সাঙ্গু-চট্টগ্রাম, ১৯৯৬ সালে কেয়ান এর্নাজি কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ১,০৩১ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৮৪৮.৫ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৩২১.১৬ বিলিয়ন ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ৫২৭.৩৩৭বিলিয়ন ঘনফুট।
১৯.সালদা-বিবাড়িয়া, ১৯৯৬ সালে বাপেক্র আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ১৬৫.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ১১৬.১ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৪১.২২ ঘনফুট ও অবশিষ্ট মওজুদ ৭৪.৮৮০বিলিয়ন ঘনফুট ।
২০. মৌলভীবাজার, ১৯৯৭ সালে ইউনিকল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৪৪৮.৯ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ৩৫৯.৬ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত উত্তোলন ৭.৩৩ বিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান অবশিষ্ট মওজুদ ৩৫২.৩৭৫ বিলিয়ন ঘনফুট।
২১.বিবিয়ানা ১৯৯৮ সালে ইউনিকল কোম্পানি আবিস্কার করে। সম্ভাব্য মোট মওজুদ ৩,১৪৪.৫ বিলিয়ন ঘনফুট। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য ২৪০০.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। জুন -০৫ পর্যন্ত অবশিষ্ট মওজুদ ২,৪০০.৮ বিলিয়ন ঘনফুট।
২২.লালমাই, ২০০৫ সালে ট্যাল্লো কোম্পানি আবিস্কার করে।
২৩.শ্রীকাইল, ২০০৫ সালে বাপেক্্র আবিস্কার করে।
২৪.ভাঙ্গুরা, ২০০৫ সালে বাপেক্্র আবিস্কার করে।
১৯৫৫ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত গ্যাস মওজুদের পরিমাণ ৩০ টিসিএফ গ্যাস । ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে ৩৫ টিসিএফ গ্যাস মওজুদ রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এর পরিমাণ আরো অধিক হতে পারে বলে তাদের অভিমত। তবে সরকারি হিসেব মতে, ২২ টি গ্যাস ক্ষেত্রের মোট প্রাক্কলিত গ্যাস মওজুদের পরিমাণ ২৮.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। প্রাথমিক উত্তোলনযোগ্য মওজুদের পরিমাণ ২০.৫১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
বাংলাদেশের চাহিদা ও সরবরাহ: পেট্রোবাংলার হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে আবিস্কৃত গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে যে গ্যাসের মওজুদ আছে তা বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে। ভবিষ্যতে গ্যাস আবিস্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা সেটা হিসেব করলে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী খুব বড় জোর ৩০ বছর চলবে। বিদ্যুতের বর্তমান ঘাটতি ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা বিপুল। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির হার দিন-দিন বাড়ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহৃত হয় ৪৬.৬৩ ভাগ। সারকাখানায় ২১.৭০ ভাগ, শিল্প কারখানায় ১০.৮৭ ভাগ। গৃহস্থালীতে ১১.৫১ ভাগ, বাণিজ্যিকে ১.১৩ ভাগ। ক্যাপটিভ ৭.৪৯ ভাগ, চা শিল্পে ০.১৯ ভাগ। সিএনজি ০.৪৫ ভাগ ও মৌসুমী ব্যবহৃত হয় ০.০৩ ভাগ। আর গ্যাসের সিষ্টেম লস ২৪.৪৫ ভাগ। (সুত্র-অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৬)
দেশের সকল মানুষকে বিদ্যুৎ, গৃহস্থালী সুবিদা ও শিল্পকারখানার ভিত্তি করতে গ্যাসের চাহিদা বর্তমান অনেক বৃদ্ধি পাবে। এমতাবস্থায় রফতানি করার অনুমতি দিলে দেশের গ্যাস ৫/৭ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তখন কাঁচাশাল কিংবা জ্বালানি হিসেবে গ্যাস পাওয়া যাবেনা। গ্যাস উৎপাদিত দ্রব্যাদি ও বিদ্যুৎ আমদানি করতে হবে। এতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মরণ ফাঁদে পড়তে হবে সাধারণ জনগণকে। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে গ্যাসের ব্যবহার, শিল্পায়ন ও উন্নয়ন ঘটানো একান্ত দরকার। যতটুকু প্রয়োজন উত্তোলন ও সংরক্ষণ করা উচিত বলে জানিয়েছেন বিশেজ্ঞরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রে বাৎসরিক গ্যাসের চাহিদা ২০০৫ সালে ২৫ টিসিএফ। ২০১৫ সালে ৩১ টিসিএফ ও ২০২০ সালে ৪০ টিসিএফ ধরা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ৭০ বছরের গ্যাস মওজুদ রয়েছে। সে তুলনায় আমাদের মওজুদ কেমন তা সহজেই অনুমেয়।
বিদেশী কোম্পানীর সঙ্গে গ্যাস উত্তোলন চুক্তি: ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার ৬ টি বিদেশী কোম্পানীর সাথে গ্যাস উত্তোলন চুক্তি করে। অরকো, ইউনিয়ন ওয়েল, নিপ্পন ওয়েল, কালডিয়ান সুপরিয়র ওয়েল, ইনাফ ও অশল্যান্ড ওয়েল। কোম্পানীগুলোর সাথে সমুদ্র উপকূলে খনিজ সম্পদ সন্ধানের জন্য (ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ ংযধৎরহম ঈড়হঃৎধপঃ (চঝঈ) )চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রধান ধারা গুলো: ক. বিদেশীরা নিজ ব্যয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার করবে। খ. এজন্য বিদেশী কোম্পানী গুলো উত্তোলিত গ্যাসের ৪০% পাবেন। বাকি ৬০% পাবে বাংলাদেশ সরকার। গ. ৪০% গ্যাস বিক্রয় লব্ধ অর্থ থেকে বিদেশী ব্যয় সম্পূর্ণ উঠে আসার পর যে গ্যাস থাকবে তার ৮০% পাবে বাংলাদেশ আর ২০% বিক্রয় লব্ধ অর্থ পাবে বহুজাতিক কোম্পানী। কিন্তু বর্তমান এই চুক্তির ধারা গুলো অনুসৃত হয়নি ।
বর্তমানে বিদেশী কোম্পানী গুলোর সঙ্গে যে চুক্তি রয়েছে তার বৈশিষ্ট্য: প্রথম পর্যায়ে খরচ উঠানোর জন্য বিদেশী কোম্পানীরা পাবে ৭৯.২% পক্ষান্তরে বাংলাদেশ সরকার পাবে ২০% গ্যাস। বিদেশী কোম্পানীর ভাগে যে ৮০% গ্যাস, তা তারা বাংলাদেশে বিক্রি করতে পারবে এবং বাংলাদেশকে তা আর্ন্তজাতিক দামে কিনতে হবে। যদি বাংলাদেশে এই বাজার না থাকে তাহলে খঘএ (তরল আকারে) বাইরে রপ্তানি করা যাবে।
১৯৭৫ পূর্ববর্তী ও বর্তমান চুক্তির পার্থক্য:
১। আগের চুক্তিতে বাংলাদেশের ভাগ ছিল ৬০% থেকে ৮০%। বর্তমান চুক্তিতে বাংলাদেশের ভাগ কমে হয়েছে ২০%।
২। বর্তমান চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারকে আর্ন্তজাতিক দামে নিজের গ্যাস অন্যের কাছ থেকে কিনতে হবে।পরিসংখ্যানে দেখাযায়, বাংলাদেশ সরকার নিজেদের ফিল্ড থেকে যে গ্যাস তুলছে এর দাম ১.২ ডলার (প্রতি হাজার টিসিএফ)। কিন্তু নতুন চুক্তি অনুযায়ী গ্যাসের দাম প্রায় আড়াইগুণ বৃদ্ধি পেয়ে এখন এর দাম দাড়ায় ২.৬ ডলারে (প্রতি হাজার টিসিএফ)। ৩। বর্ধিত দাম দিয়ে কিনে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ, সারশিল্পে ও গৃহস্থালিতে সরবরাহ করে তাহলে সরকারকে বিপুল পরিমাণ র্ভতুকি দিতে হবে। অন্যথায় সরকারকে গ্যাসের দাম আড়াইগুণ বাড়াতে হবে। সরকার যদি গ্যাসের দাম আড়াইগুণ বৃদ্ধি করে তাহলে সারের দাম ৮০% ও বিদ্যুতের দাম ৫০% বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান সরকার গ্যাস রপ্তানি চুক্তির ব্যাপাওে তাড়াহুড়া কওে কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টির উপর আরও ভেবেচিন্তে নিবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা করেছেন। বিশেষজ্ঞরা আফ্রিকা মহাদেশের তেল সমৃদ্ধ,দেশ নাইজেরিয়ার উদ্ধাহরণ দিয়ে বলেন, ১৯৭১-৮০ দশকে দেশটির ঈড়সসবৎপরধষ বহবৎমু পড়হংঁসঢ়ঃরড়হ ধাবৎ পধমব ধহহঁধষ মৎড়ঃিয ৎধঃব- সূচক ছিল ১৯। বিবেচনাহীন ভাবে বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে আশু লাভ সামনে রেখে বিদেশের কাছে তেল রপ্তানি করে। এক পর্যায়ে ৯০-’র দশকে সম্পদহীন দরিদ্র দেশে পরিণত হয়। এ সময় তার ঈড়সসবৎপরধষ বহবৎমু পড়হংঁসঢ়ঃরড়হ ধাবৎ পধমব ধহহঁধষ মৎড়ঃিয ৎধঃব- এর সূচক দাঁড়ায় মাত্র ১-এ। ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে যেন এ ভাগ্যবরণ করতে না হয়। কেবল রাজনীতি ও স্বার্থের কারণে বাংলাদেশ যেন বহুজাতিক লুটেরা গোষ্ঠীর কবলে না পড়ে যায়। অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে তেল-গ্যাস বা যে কোন প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানী এবং বিকল্প ব্যবহারের সিন্ধান্ত নেয়ার এখনই প্রকৃত সময়।
লেখক:গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
( রূপসা ডিগ্রী কলেজ)
০১৭১১৫৭৯২৬৭
0 comments:
Post a Comment