আমি রূপসা - আমাকে বাঁচান
আলী ফোরকান
আমি রূপসা রাত-দিন কাঁদছি। আমার বুকে পাথর, মাটি, ইট, বালি দিয়ে চলার অযোগ্য হয়ে যাচ্ছি। মাটির ভারি বোঝা নিয়ে রাত-দিন কাঁদছি। কেউ কি আমার কান্না শুনতে পায়? মহাসমুদ্রে, তুরাগ নদীর সঙ্গে কথা বলেছি। সে এখন হালকা বোধ করছে। ডেইলি ষ্টার আর চ্যানেল আই নাকি, এদের কান্না শুনে এগিয়ে আসাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। পাথর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। যৌবন ফিরে আসছে। দু’কূলের মানুষকে আর প্লাবনের কষ্ট পেতে হবে না। ফলে-ফুলে দু’কূল ভরাট করে দিতে পারবে। কিন্তু আমি রূপসা ? আমাকে মফস্বলের ডাকার কারণ কি? আমার কি আর্ন্তজাতিক চরিত্র নেই। আমার কথা এরা বলেন না কেন? এদের কাজ কি শুধু ঢাকাকে নিয়ে? রূপসা পাড়ের মানুষগুলো কি এদের খবর পড়ে না? আমার জন্য কয়েকটি খবরের কাগজ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছে শুনেছি। কোথা থেকে কি হয় স্রষ্টাই জানেন, কাজ কিছুই হচ্ছে না। আর কতকাল বয়ে বেড়াব এই ভারি বোঝা। আপনারা কি লক্ষ্য করেছেন, আমার বুকে ব্রিজ? আমি বারবার আপত্তি জানিয়েছি, এটি আমার বুকে গেড় না। কিন্তু সন্ত্রাসী রাজনীতিবিদরা শোনেনি। গেড়েই দিল। এখন ব্রিজের নীচের ফাইল প্রোটেকশন দিন দিন পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কি করব, আমি মা। সব বোঝা আমাকে সহ্য করে বুকে জায়গা করে দিতে হয়। আমার দু-কূলে গড়ে ওঠা মাছ কোম্পানীসহ বিভিন্ন কোম্পানীর যত অনাচার-অত্যাচার বয়ে নিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে হয়। কিন্তু ইদানীং বয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে দেয়া হচ্ছে। ভরাট করা হচ্ছে সব চোখ, কান, নাককে। আমার বুক ঘেষে দু’পারে র্নিমিত পিলারগুলো দেখেছেন? আবর্জনা, মাটি যা আমার বুকে স্থান দেয়ার কথা নয়, পিলার আলিঙ্গন করে, জড় হচ্ছে। বুকের ওপর এরাও চেপে বসছে। আমার প্রাণের গভীরতায় এরা আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করছে। ঘটনা এখানে শেষ নয়। তালুকদার নামক ব্যক্তিরা ছিন্নমূলের নামে আমার বুক ছেদ করে, এখানে মাটি ভরাট করে বস্তি গড়ে তুলছে। এদের পেছনে আরও অনেক লোক আছে। প্রশাসন আছে শুনেছি। এরা আসে, নামমাত্র মামলা দেয় কিন্তু স্বর্ণজুতার আঘাতে এদের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ যায় কিছু পাওয়ার আশায়। পেলেই শান্তি। আমার যে কি কষ্ট, পুলিশ কি বুঝবে? বুঝলেও না বোঝার ভান করে। পারি না সহ্য করতে। দোহাই আপনাদের আমাকে বাঁচান। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমিও বলে দিতে চাই, বর্ষাভরা মৌসুমে, পানি বুকে ধারণ করতে ব্যর্থ হলে, দু’কূলের মানুষকে আমি ভাসিয়ে নিয়ে যাব। তখন আমার দোষ দিয়ে কোন লাভ হবে না। এখানে আরও একটি কথা পরিষ্কার করতে চাই, যে মংলা বন্দর নিয়ে খুলনাবাসী গর্ব করে, যে বন্দর দেশের আয় উৎপত্তির উৎস, এভাবে আমার বুকে, মাটির বোঝা চাপিয়ে দিলে, বন্ধ হয়ে যাবে। আমার বুকের অবাধ্য বালিগুলোকে প্রতিনিয়ত সাফাই করার কথা, চিরকালই চলে আসছে। নিউজপ্রিন্ট মিল বন্ধ হওয়ার আগে একথা আমি কখনও বলিনি। নিউজপ্রিন্ট মিলের কাচাঁমাল,গেওয়া-কেওড়ার ভেলায় আমার যৌবন উজ্জীবিত রাখতো। আমার যৌবনে ভাটা পড়েছে। আমি মেনে নিয়েছি। আমার যৌবনকে বৃদ্ধ করার বর্তমান মানসিকতা আর সহ্য করা হবে না। আমি কুদরতের দরবারে নালিশ করব। কুদরত যদি একবার রুষ্ট হয়, সব চুরমার করে ফেলবে। এক সময় ছিল, আমার বুকের ওপর দিয়ে যেত রাশি রাশি তুলা, ধান, শস্যসহ আরও কত কি। দূর-দূরান্তে যেত পাট। আগে যেত ডিঙিতে করে, এখন যায় বড় বড় স্টিমারে। দোহাই আপনাদের আমার বুক ভেদ করে যে যানগুলো এখনও যাতায়াত করছে, ওদের গতিপথে বাধার সৃষ্টি করবেন না। আকুল ফরিয়াদ, আমার কান্না শুনুন। আমার দিকে একটু মুখ ফিরান। কোন কিছুই চাই না আমি। শুধু বুকভরা পানি নিয়ে সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে মিশতে চাই। হ্যাঁ, মিশতে চাই বিনা বাধায়। দিয়ে যেতে চাই দুই কূলের মানুষদের সুখ-শান্তি-প্রগতি।
লেখক : গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
মোবাইল: ০১৭১১৫৭৯২৬৭
0 comments:
Post a Comment