Thursday, April 21, 2016

রেলে মানুষ চড়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে

রেলে মানুষ চড়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে
আলী ফোরকান 
রেলে বছরের পর বছর অবহেলা। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বের অভাব। যুগোপযোগি উন্নয়নের উদ্যোগ না নেয়ায় ধুঁকে ধুঁকে চলছে রেল। দেড়শ’ বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো প্রতিষ্ঠান রেল একই অবস্থায় রয়েছে। অথচ পার্শ^বর্তী দেশের অনেক প্রদেশে বাংলাদেশের প্রায় একই সময়ে রেল যাত্রা শুরু করেও এখন তারা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ভারত যেখানে রেলের যাত্রী ভাড়া কমিয়ে দিয়েও লাভ করছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে সেখানে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনছে। তারা যেখানে একটার পর একটা লাইন সম্প্রসারণ করছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে সেখানে অনেক শাখা লাইন বন্ধ করে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে রেলওয়ের উন্নয়নে কাগজে-কলমে কয়েকশ’ কোটি টাকা খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে এর কোন হদিস নেই। স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হলেও রেলপথ না বেড়ে বরং কমেছে। কমেছে রেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ। স্বল্পমাত্রার পরিবেশ দূষণ, কম জ্বালানি খরচ, ভূমির পরিমিত ব্যবহার এবং একযোগে বেশি যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে সুবিধার কারণে রেল সারাবিশ্বে জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এর উল্টো। নিুমান ও ভোগান্তির কারণে বাংলাদেশের রেলে এখন আর যাত্রী উঠতে চায় না। যারা উঠেন তারাও থাকেন উৎকণ্ঠায়Ñ কখন ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছবে। ‘ভাই ৬টার ট্রেন ক’টায় আসবে’Ñ একদা এমন একটি প্রবাদ বাক্যও চালু ছিল আমাদের দেশে। ইঞ্জিনের আয়ু নেই। বগি জরাজীর্ণ। কয়েকশ’ রেলব্রিজ ভাঙা। লাইনে পাথর নেই। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কয়েক হাজার কোটি টাকা বকেয়া তুলতে পারছে না । রেলের বিপুল সম্পদ বেহাত হওয়াÑ সবকিছু মিলিয়ে রেল চলছে ধুঁকে ধুঁকে। ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর ৫৩ দশমিক ১১ কিলোমিটার দর্শনা-জগতী লাইন এবং ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ১৪ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার লাইন নির্মাণের মধ্য দিয়ে ১৮৯১ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি নামে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৫ সালে ১৪৯ দশমিক ৮৯ কিলোমিটারের চট্টগ্রাম-কুমিল¬া এবং ৫০ দশমিক ৮৯ কিলোমিটারের লাকসাম-চাঁদপুর রেললাইন দুটি যাত্রীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। ব্রিটিশ থেকে আলাদা হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ২৬০৩ দশমিক ৯২ কিলোমিটার রেললাইন নির্মিত হয়। একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৬৯-৭০ সালে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলে এদেশে রেলপথ ছিল প্রায় ২ হাজার ৮৫৮ কিলোমিটার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটারে। আবার এ পথের অনেক স্থানে শুধু লাইন আছে কিন্তু রেল চলে না। অনেক স্থান থেকে আবার লাইনও তুলে ফেলা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ সারাবিশ্বে রেল লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে । সেখানে বাংলাদেশে রেলের এ শোচনীয় পরিণতির কারণ উদ্ঘাটনে চেষ্টা করেনি কোন সরকারই। বরং অলাভজনক আখ্যায়িত করে রেলের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে বারবার। বিগত সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘রেলের প্রয়োজন নেই।’ বিগত জোট সরকারের সময়ে রেলের উন্নয়নের পরিবর্তে যোগাযোগমন্ত্রীর নির্দেশে অলাভজনক আখ্যায়িত করে বেশক’টি শাখা লাইন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ একটু নজর দিলেই যে রেলকে লাভজনক করা যেত তা খতিয়ে দেখেনি কোন সরকারই। বিশ্বের যে কোন দেশে বসেই ইন্টারনেটে ভারতীয় ট্রেনের ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধান করে বিভিন্ন স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার সময়, ভাড়ার হার, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনের দূরত্ব, মেট্রো রেলের সিডিউল, ট্রেনের সিট সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সহজে পাওয়া যায়। আর বাংলাদেশ রেলওয়ের এসব তথ্য ওয়েবসাইটে পাওয় তো যায়ই না, স্টেশনে গিয়েও সঠিক তথ্য পাওয়ার কোন উপায় নেই। আমাদের বিশ্বাস, রেলে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে না পারা। চলার পথে যখন-তখন ইঞ্জিন বিকল হওয়া। যাত্রীসেবার মান নিুমানের ও লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা বগি ইত্যাদি হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে দুরবস্থার বড় কারণ। অনেকের বিশেষজ্ঞ’র ধারণা, বুঝে-শুনেই রেলওয়েকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান করে রাখা হয়েছে। রেলকে লাভজনক করার পরিকল্পনা কোন সরকারই নেয়নি। বরং রেলের যেন কোন প্রয়োজন নেইÑ এমন ভাব দেখিয়ে তারা কয়েকশ’ কিলোমিটার রেললাইন বন্ধ করে দিয়েছে। লাইন তুলে ফেলে সংকুচিত করা হয়েছে রেল যোগাযোগ। সংশি¬ষ্টরা বিগত দিনে পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই রেলকে অকার্যকর করে রেখেছে। বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে বাণিজ্যিকভাবে রেল চালানোর তাগিদ দেয় সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা কমিশন। কমিশন রেলের উন্নয়নে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রকল্পসহ একটি ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করে। পরিকল্পনা পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে ২০০২ সালের মধ্যে ২৩টি মধ্যমেয়াদি এবং ২০১০ সালের মধ্যে ১৬টি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। কিন্তু আজ অবধি একটি সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি। ক্ষমতা গ্রহণের পর বর্তমান সরকার রেলকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছে। যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন গত কয়েক বছরে নেয়া রেলের বিভিন্ন প্রকল্প, প্রকল্প ব্যয়, লাভ-লোকসান, যাত্রীসেবার মান ইত্যাদি খতিয়ে দেখে তার কাছে একটি সার-সংক্ষেপ উপস্থাপনের জন্য সংশ্লি¬ষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮-০৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ৮৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে যে ২৯টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে সেগুলোও বাস্তবায়নে তাগিদ দিয়েছে সরকার। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। ২২টি বিনিয়োগ প্রকল্প ও ৪টি জাপানি ঋণ মওকুফ প্রকল্প। রেলওয়ের মহাপরিচালক বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। সে অনুযায়ী রেলের আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে। যাত্রী ভ্রমণ আনন্দদায়ক করতে রেলকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এজন্য কোরিয়া থেকে ইঞ্জিন ও যাত্রীবাহী কোচ আনা হচ্ছে। এজন্য ইআরডি ও কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গবেষণার পরিস্যাখান হিসাবে, ১৯৯১ সালে তৎকালীন সরকার দাতাদের পরামর্শে অলাভজনক আখ্যা দিয়ে পৌনে ৩শ’ কিলোমিটার রেললাইন বন্ধ করে দেয়। এ সময় পূর্বাঞ্চলের ফেনী-বিলোনিয়া, শায়েস্তাগঞ্জ-শাল¬া, হবিগঞ্জ-শায়েস্তাগঞ্জ, পশ্চিমাঞ্চলের লালমনিরহাট-মোগলহাট, রূপসা-বাগেরহাট, কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া, ভেড়ামারা-রায়টা ও পাঁচুরিয়া-পুকুরিয়া লাইনে রেল চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এছাড়া আশির দশকে বন্ধ করে দেয়া হয় নারায়ণগঞ্জ শিল্প এলাকাকে কেন্দ করে গড়ে ওঠা নরসিংদী-মদনগঞ্জ রুট। আবার বর্তমানে যেসব লাইন বিদ্যমান আছে তার অনেক জায়গায় পাথর নেই, স্লি¬পার নেই। স্বাধীনতার পরের সরকারগুলো সড়কপথকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছে সে তুলনায় রেলপথ থেকেছে উপেক্ষিত। এরই সঙ্গে পাল¬া দিয়ে বেড়েছে অব্যবস্থাপনা। ফলে সারাবিশ্বে রেলওয়ে প্রধান বাহন হলেও বাংলাদেশে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  সরকারি হিসাবে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৮ সাল পর্যন্ত সড়ক, রেলওয়ে, নৌপরিবহন ও আকাশপথে সরকারের মোট বরাদ্দ ছিল ৫২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সড়ক খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বরাদ্দের ২৮ ভাগ এবং রেলওয়ে খাতে ২৪ ভাগ। বাকিটা ছিল নৌ ও আকাশপথের জন্য। এরপর থেকে রেলওয়েতে ক্রমাগত বরাদ্দ কমেছে। ২০০২-০৫ সাল পর্যন্ত রেলওয়েতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১২ ভাগ। একই সময়ে সড়কপথের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ৮৬ ভাগ। বিনিয়োগ না কমলে রেলওয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারত।  গবেষণার তথ্য মতে, জোট সরকারের আমলে রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন তা আটকে রেখে স্টেশনের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য প্রকল্প নেয়ার তাগিদ দেয়। এ সময় একশ’ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে ২০টি রেলস্টেশনের সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়। রেলের বগি, ইঞ্জিনের ব্যবস্থা না করে রেলস্টেশনের সৌন্দর্য বর্ধন কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়নি।  গবেষনার তথ্য মতে,  রেলের আয়ের বড় অংশ আসে মালামাল পরিবহন খাত থেকে। কিন্তু পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে মালামাল পরিবহনে রেল ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত সময় ব্যয় ও মালামাল পরিবহনে জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা এ পথ ব্যবহার প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন। এক সময় রেলওয়ে একচেটিয়া সরকারি মালামাল পরিবহন করত, এখন সেটাও নেই। আশির দশকে রেলে মালামাল পরিবহন কমতে শুরু করে। চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে প্রায় ৫ লাখ কনটেইনার উঠানামা করে। এ থেকে মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ হাজার কনটেইনার রেলওয়ের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। বর্তমানে রেলওয়ের মালামাল পরিবহনের মূল উৎস সরকারি জ্বালানি তেল। কিন্তু সেটারও খুব সামান্য অংশ রেলওয়ে পরিবহন করে। পোশাক শিল্প ব্যবসায়ী ও অন্য ব্যবসায়ীরা একবারে এক ওয়াগনের বেশি মালামাল পরিবহন করে না। তাই তারা রেলের ৬০টি ওয়াগন ভরার অপেক্ষায় না থেকে সড়কপথে মালামাল পরিবহন করে থাকেন।  রেলের ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল ২০ বছর। অথচ বাংলাদেশ রেলওয়েতে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলিয়ে ২০ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সী ইঞ্জিন রয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশ। বাকি ইঞ্জিনের বেশিরভাগের বয়স ৪০ বছরেরও অধিককাল পেরিয়ে গেছে। অধিক পুরনো ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চলাচলের কারণে প্রতিদিনই ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে। বিকল্প না থাকায় সময়মতো ট্রেন স্টেশন ত্যাগ কিংবা গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না। অনেক সময় মাঝপথে ট্রেন বিকল হলে ওই অঞ্চলের ট্রেন যোগাযোগ লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ১৯৬৯-৭০ সালে রেলের ইঞ্জিন ছিল ৪৮৬টি। বর্তমানে রেলের মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলিয়ে ইঞ্জিনের সংখ্যা মাত্র ২৮৬টি। বগি ছিল ১ হাজার ৬৪৩টি, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪শ’টি। একইভাবে মালবাহী ওয়াগনের সংখ্যাও কমেছে। ঐ গবেষণায বলা হয়েছে, সরকার  দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় নতুন ইঞ্জিন আনার প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে স্বাধীনতার পর থেকে শুধু প্রকল্পই নেয়া হয়েছে আর এসব প্রকল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে খরচ হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। রেলের ভাগ্য পরিবর্তন না হলেও আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে অসাধু কর্মকর্তারা। আমাদের বিশ্বাস সরকার সড়ক যোগাযোগের জন্য যে টাকা খরচ করে তার অর্ধেকও যদি রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যয় করে তাহলে রেলে মানুষ চড়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আমরা আশাকরি বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে রেলের উন্নয়নে এগিয়ে আসবেন।
                                                                                                                লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

0 comments:

Post a Comment