বর্তমান প্রেক্ষাপট ও নজরুল
ড.ফোরকান আলী
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব (১৮৯৯-১৯৭৬)। তিনি তার লেখনীতে ধারণ করেছেন যুগমানসকে। তখনকার পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমি ছিল তার রচনার বিষয়বস্তু। নজরুলই সে সময়ের একমাত্র কবি। যিনি প্রমাণ করলেন ‘অসির চেয়ে মসি’ কতো ক্ষুরধার ও শক্তিশালী হতে পারে। তার লেখনী ছিল অত্যাচারী বৃটিশের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার তরবারি। তাই নজরুল বারবার রাজশক্তির রোষানলে পড়েছেন। ভোগ করেছেন কারাবরণ। তার অনেক সৃষ্টিকর্ম রাজরোষের কবলে পড়ে। বৃটিশ সরকার কর্তৃক হয় বাজেয়াপ্ত। তবুও কবি থেমে থাকেননি। বন্ধ থাকেনি তার লেখা। লেখনীর মাধ্যমে একের পর এক বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন। তিনি কারামুক্ত অবস্থায়ও, কারারুদ্ধ অবস্থায়ও। শুধু বৃটিশবিরোধী নয়। রাজনৈতিক-সামাজিক সব অসাম্যের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধারণ করেছেন। তার লেখার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল কুলি-মজুর, কৃষক, নারী, জেলে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ। পরাধীনতার লাঞ্ছনা। রাজনৈতিক শোষণ। সমাজের ভ-ামি তার কবিমানসকে করে তুলেছিল অশান্ত। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী। ডাক দিয়েছিলেন বিপ্লবের। অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছিল তার কণ্ঠে।
যেমন ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় :
‘বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।’
অথবা
‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ।’
অথবা
‘আমি চির বিদ্রোহী বীরÑ
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!’
অত্যাচারীর বিরুদ্ধে। সমাজের বিদ্যমান শোষণ ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে। এমন সংগ্রামী আহ্বান আর কারো মুখে শোনা যায়নি।
কবির বিরুদ্ধে বারবার ভারতীয় ফৌজদারি দন্ডবিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নজরুল তার নিজেরই প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ‘ধূমকেতু’তে প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামের কবিতার জন্য প্রথম দ-িত হন। নজরুলের আগেও কয়েকজন কবি। নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক সরকারি রোষে পড়েছেন। দ-িত হয়েছেন। কিন্তুু নজরুলের মতো কারারুদ্ধ কবিকে নিয়ে বিক্ষোভ, আন্দোলন কারো ক্ষেত্রে ঘটেনি। এমনকি সে সময়ের বরণীয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ, দেশবন্ধু, সুভাষ চন্দ্র নজরুলের জীবনরক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।
নজরুলের যে গ্রন্থটি প্রথম সরকারি রোষের কবলে পড়ে। তা হলো তার প্রবন্ধ সঙ্কলন যুগবাণী (১৯২২)। ১৯২২ সালে বাংলা সরকার ফৌজদারি বিধির ৯৯(এ) ধারানুসারে বইটি বাজেয়াপ্ত এবং গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা নিষিদ্ধ করে। সরকারি ফাইলে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বইটি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ২০ বছর পরও সরকারি মহলে বইটি নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা ছিল।
এর এক বছর পরই ১৯২৪ সালের ২২ অক্টোবর ফৌজদারি বিধির ৯৯(এ) ধারা অনুসারে গেজেট ঘোষণা (নং-১০৭২ পি) দ্বারা ‘বিষের বাঁশী’ (১৯২৪) নিষিদ্ধ হয়। ‘বিষের বাঁশী’র উল্লেখ দেশদ্রোহমূলক গ্রন্থ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়। শুধু বাজেয়াপ্ত করেই সরকার ক্ষান্ত হয়নি। ১৯২৪ সালের ২৯ অক্টোবর চিফ সেক্রেটারিকে লেখা পুলিশ কমিশনার টেগার্টের চিঠিতে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ২৩ তারিখে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে (বিশেষ করে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা, যাদের সঙ্গে নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল এবং হুগলিতে কবির বাড়িতে) তল্লাশি চালিয়ে ‘বিষের বাঁশী’র ৪৪ কপি বই আটক করে। ১৯৪৫ সালে বাংলা সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘বিশেষ বাঁশী’র ওপর থেকে বাজেয়াপ্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙ্গার গান’ও ফৌজদারি বিধির ৯৯(এ) ধারা অনুসারে ১৯২৪ সালের ১১ নভেম্বর বাজেয়াপ্তি ঘোষণা করা হয়। বৃটিশ শাসন বজায় থাকা পর্যন্ত ‘ভাঙ্গার গান’র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ওঠেনি। এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয় ১৯৪৯ সালে।
‘ভাঙ্গার গান’র পর ‘প্রলয় শিখা’ (১৯৩০) সরকারি রোষে পড়ে। বইটির প্রকাশক কবি নিজেই। ‘প্রলয়শিখা’ বাজেয়াপ্ত হয় ১৯৩১ সালে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি (নং-১৪০৮৭ পি) বের হয় ১৯৩০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ভারতীয় ফৌজদারি দন্ডবিধির ১২৪(এ) এবং ১৫৩(এ) ধারানুসারে বইটি নিষিদ্ধ হয়েছিল। ‘প্রলয় শিখা’র ওপর থেকে বাজেয়াপ্তি আদেশ প্রত্যাহার করা হয় ১৯৪৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে (নং-৮৫ পিআর)। বস্তুতপক্ষে ‘প্রলয় শিখা’র আবির্ভাব ভারতের বিপ্লববোন্মুখ যুগে। এ গ্রন্থ বাংলাদেশে প্রলয় সৃষ্টি করেছিল। এ গ্রন্থের জন্য খোদ কবির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
‘প্রলয় শিখা’র পর নজরুলের বাজেয়াপ্ত গ্রন্থ ‘চন্দ্রবিন্দু’ (গান)। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ‘প্রলয় শিখা’ নিষিদ্ধ হওয়ার এক মাস পরই ‘চন্দ্রবিন্দু’ নিষিদ্ধ হয়। বাজেয়াপ্তির গেজেট ঘোষণার তারিখটি ছিল ১৪ অক্টোবর ১৯৩১। বিজ্ঞপ্তি নং-১৭৬২৫ পি। গ্রন্থটি ব্যঙ্গ রচনার সঙ্কলন। এ গ্রন্থটির ওপর থেকে বাজেয়াপ্ত আদেশ উঠে যায় ইংরেজ আমলেই। বাজেয়াপ্তির আদেশ প্রত্যাহারের গেজেট ঘোষিত হয় ৩০ নভেম্বর ১৯৪৫-এ।
যুগবাণী, বিষের বাঁশী, ভাঙ্গার গান, প্রলয় শিখা, চন্দ্রবিন্দুÑএ পাঁচটি বই ছাড়া নজরুলের আরো অনেক লেখা রাজরোষে পড়ে। যেমন অগ্নিবীণা (১৯২২), ফণিমনসা (১৯২৭), সঞ্চিতা (১৯২৮), সর্বহারা (১৯২৬), রুদ্রমঙ্গল (১৯২৬) প্রভৃতি। যদিও শেষ পর্যন্ত সেসব গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হয়নি। অগ্নিবীণা যদিও নিষিদ্ধ হয়নি; কিন্তু যেখানেই এ বইটি পুলিশ পেয়েছে সেখানেই আটক করেছে। নজরুলের কবিতার নির্বাচিত সঙ্কলন ‘সঞ্চিতা’ বাজেয়াপ্ত না হলেও সরকারের রোষানলে পড়েছিল। বইটি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র বিভাগের রাজনৈতিক শাখায় ফাইলও খোলা হয়েছিল।
ফণিমনসা গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত করার জন্য পাবলিক প্রসিকিউটর ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার সুপারিশ করেছিলেন। এ সম্পর্কে ডেপুটি কমিশনার সিইএম কেয়ার ওয়েদার চিফ সেক্রেটারিকে ১৯২৭ সালের ১২ আগস্ট পত্রও লেখেন। তবে পদস্থ পুলিশ অফিসার ও গোয়েন্দারা চাইলেও শেষ পর্যন্ত ফণিমনসা বাজেয়াপ্ত হয়নি।
নজরুলের শ্রেণীচেতনার স্বাক্ষরবাহী কাব্যগ্রন্থ ‘সর্বহারা’। এ কাব্যগ্রন্থটির জন্যও তৎকালীন পুলিশ কর্তা স্যার চালস টেগার্ট এবং পাবলিক প্রসিকিউটর রায়বাহাদুর তারকনাথ সাধু বইটি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মতামত দেন। কিন্তু তাদের সুপারিশ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বইটি বাজেয়াপ্ত করেনি সরকার।
নজরুলের প্রবন্ধগ্রন্থ রুদ্রমঙ্গলও নিষিদ্ধ করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা এবং সরকারি আইন বিশারদরা। আনুষ্ঠানিকভাবে বইটি নিষিদ্ধ করা না হলেও এর প্রচার নিষিদ্ধ হয়েছিল।
কবির বইগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জোর দাবি উঠলেও, এমনকি বঙ্গীয় আইনসভায় তা নিয়ে আলোচনা হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তার কোনো বইয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়নি। তার আগেই কবি হয়ে পড়েন বাকরুদ্ধ।
লেখক: গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
০১৭১১৫৭৯২৬৭
0 comments:
Post a Comment